স্বপ্ন-পূরণের অবিচল পথ

আপডেট : ২২ জুলাই ২০১৪, ১৯:৪২
অদম্য একটা ইচ্ছে। অনেক চেষ্টা করে দমন করে অভি কিন্তু এবার বুঝি আর পারল না। মায়ের মন-মেজাজটা ভালো দেখে, অভি খুব নরম ও বিনীতভাবে বলেই ফেলল— মা এই রমজানে একটা ব্যবসা করতে আমার দারুণ ইচ্ছে। ব্যবসা মানেই লাভ। আর এই লাভ শব্দটা শোনা মাত্রই মায়ের মনে একটা চেতনার সৃষ্টি করে। মুখে একটা হাসিও ফুটে ওঠে। অভি নানা সময়ে নানান কথা বলে থাকে কিন্তু ব্যবসার কথা কোনোদিন বলেনি। তবে ব্যবসা করতে যে টাকা লাগে তা বোধহয় উপলব্ধি করতে পারেনি। তবে তার এই উত্সাহটাকে ভাটা ধরাইনি মা। সায়লা বানু একটা লম্বা শ্বাস ছেড়ে বলল, ব্যবসায় নাম চাস, টাকা পাবি কোথায়? টাকা ছাড়া কোনো ব্যবসা আছে। যেখানে তিন বেলা ভালোভাবে ভাতই জোটে না। সেখানে ব্যবসার কথাটা মাথায় আসে কি করে? আমি যদি দু’দিন কাজে না যাই। তা হলেই তো আমাদের উপোস থাকতে হয়। মায়ের কথাগুলো খুবই সত্য। যা তার মনটাকে স্পর্শ করে যায় তবু তো পৃথিবীতে ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য একটা কিছু অবলম্বন করে তাকে দাঁড়াতে হবে। তাতে যত কঠিন পরিশ্রম হোক, কষ্ট হোক, সয়ে নেবে। যেহেতু টাকার অভাবে পড়াশোনা করতে পারেনি। মা, এবার আমি ইফতার বানানোর ব্যবসা করবো। বেশি টাকা লাগবে না। প্রথমে অল্প অল্প বানালাম। আমাদের তো লোকজনের দরকার নেই। তুমিই তো ভালো বানাতে পারো। তোমার হাতের ইফতার, অলিতে-গলিতে সাজানো ইফতারের চেয়ে অনেক ভালো হবে। তা আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি। ছেলের কথা শুনে সায়লা বানু একদিকে যেমন আনন্দ পায় অন্যদিকে আবার উত্সাহ বোধ করে। প্রস্তাবটা মন্দ নয়। তার হাতে অল্প যে ক’টা টাকা আছে। তা কাজে লাগাতে পারবে। মা এতো সহজে রাজি হয়ে যাবে। যা ভাবতেও পারেনি অভি। এখন যে করেই হোক, এই সুযোগটা কাজে লাগাতে হবে। ব্যবসাটা ভালোভাবে জমিয়ে তুলতে পারলে তার দিনগুলো আলোকিত হয়ে উঠবে। হাতে টাকা আসবে। আর পৃথিবীতে টাকার কোনো তুলনা নাই। অভি আরো ভাবে, যদি ব্যবসায় সফলতা আসে। অনেক উন্নতি করতে পারে। হাতে প্রচুর টাকা চলে আসে। তা হলে আবার ইস্কুলে ভর্তি হয়ে যাবে। মন দিয়ে পড়াশোনা করবে। ভালো রেজাল্ট হবে। একদিন আলোকিত মানুষ হয়ে এই সমাজে আলো ছড়াবে। কারণ এই সমাজ প্রতিনিয়তই তাকে আতংক ও ঘৃণা দিয়ে যাচ্ছে। সে কিছুতেই বৈষম্যটা মেনে নিতে পারছে না। একজন মানুষ অন্য একজন মানুষকে মানুষ হিসাবেই মূল্যায়ন করা উচিত কিন্তু অনেকেই গরীবদেরকে মানুষ হিসাবেই গণ্য করতে চায় না। সায়লা বানু সকালেই হাতিরপুল বাজারে চলে যায়। আনন্দে থই থই করা মনে সঙ্গে যায় অভি। তার হাতে বড় বড় দুটো ব্যাগ। চোখে হাজারটা স্বপ্ন। মা ইফতার আয়োজনের আইটেমগুলো একটা একটা করে কিনছে আর অভি ব্যাগে পুরে নিচ্ছে। কেনাকাটা শেষ করে দু’জন বস্তিতে চলে যায়। সায়লা বানু যতক্ষণ ইফতার তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকে, ততক্ষণ ঠিক ছায়ার মতো মায়ের পাশে থেকে কাজ করে যায় অভি। বিকেল হতেই ইফতারগুলো রোডে নিয়ে আসে। আজ প্রথম দিন। তাই আলাদা একটা আমেজ অনুভব করছে অভি। অন্যদিকে একটা রঙিন স্বপ্ন। এলিফেন্ট রোড আমতলা হোটেলের পাশে, একটা লম্বা টুল পেতে কয়েকটা বলে থরে থরে সাজায় ইফতারগুলো। যাতে মানুষের চোখে পড়ে। তারপর উত্সুক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে অভিও সায়লা বানু। যখনই সন্ধ্যাটা কাছাকাছি আসতে শুরু করেছে ঠিক তখনই ইফতার বিক্রির ধূম লেগে যাচ্ছে। কার আগে কে কিনবে, এমনই একটা প্রতিযোগিতা যেন। বিক্রির ধূম লেগেছে আমতলা হোটেলে। সাত-আটজন কর্মচারী শতব্যস্তভাবে ইফতার দিয়ে যাচ্ছে। এর মাঝেও যেন একটা প্রতিযোগিতা আছে। অন্যদিকে অভির দোকানে কোনো বেচাকেনা নেই। এমন কি বনি পর্যন্ত করতে পারছে না। কেউ এদিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। এক ভদ্রলোক সামনে দিয়ে গেলে, অভি অনুরোধের গলায় বলল, নিন স্যার। একদম গরম আছে। খুব ভালো ইফতারি স্যার। ভদ্রলোক নাক সিটকে বলল, বস্তির নোংরা পরিবেশে বানানো। ওসব খেলে পেটে অসুখ হবে। কথা শুনে অভি ও সায়লা বানু অবাক হয়ে যায়। একি বলছে। লোকটার কি কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই। দেখেও জিনিসগুলো চিনতে পারছে না। কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ। দেখতে দেখতে ইফতারির সময় হয়ে গেল। আমতলা হোটেলের ইফতার বেচাকেনা শেষ। অন্যান্য আয়োজন তো শেষই। একপিস জিলিপি পর্যন্ত নেই। বল থালা সব ফাঁকা হয়ে আছে। কর্মচারীরা ধোয়া-মোছা করে হোটেলের ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে। অভি চোখে আর পানি ধরে রাখতে পারেনি। ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে। সায়লা বানু একবার ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে চোখের দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেয়। সে তীব্রভাবে উপলব্ধি করতে পারছে যে অভি অনুশোচনায় দগ্ধ হচ্ছে। তার এই পদক্ষেপটা ঠিক ছিল না। না জেনে, কোনো কাজ করা ঠিক নয়। এখন এই ইফতারগুলো কি করবে? পরেরদিনের জন্য রাখাও সম্ভব নয়। যে গরম। সারা রাতে একদম নষ্ট হয়ে যাবে। সুতরাং এখনই ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। সায়লা বানুর খুবই কষ্ট হচ্ছে। তবু নিজেকে সংযত করে নিয়ে বলল, অভি কষ্ট হলেও হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমাদের জন্মই হয়েছে পোড়া কপাল নিয়ে। তাই সারাটি জীবন কষ্টই বয়ে যেতে হবে। মা, আজকের এই অবস্থার জন্য তো আমিই দায়ী। আমিইতো উত্সাহ দিয়ে, প্রেরণা দিয়ে, রঙিন স্বপ্ন দেখিয়ে তোমাকে ব্যবসায় নামিয়েছি। অন্যায়টা তো আমিই করেছি। তোর কথাগুলো ঠিক নয়। মানুষ বারবার ব্যর্থ হয়, আমরা মাত্র একবার ব্যর্থ হয়েছি। এতোটুকুতে ভেঙে পড়লে চলবে না। তবে এই ব্যবসাটা আর করব না। অন্যকিছু চিন্তা কর। রাতেরবেলা সায়লা বানু ঘুমিয়ে পড়লেও অভির চোখে কোনো ঘুম নেই। সে কেবল এপাশ ওপাশ করছে। আজকের এই আর্থিক ক্ষতিটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না সে। মা অবশ্য মুখে কিছু বলেনি। বরং তাকে সাহস দিচ্ছে কিন্তু এই ধাক্কাটা সামলে নিতে মায়ের খুবই কষ্ট হচ্ছে। যদিও তা প্রকাশ করেনি। অভি মনে মনে ভাবে লোকসান হচ্ছে হোক। তবু সে আরেকটা পদক্ষেপ নেবে কিন্তু তা নির্ভর করবে মায়ের উপর। তাকে রাজি করানোটা খুব কঠিন হবে বলে মনে হচ্ছে। তবু সে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাবে। সায়লা বানুর হঠাত্ ঘুম ভেঙে যায়। দেখে অভি চুপচাপ বসে আছে। তার ধারণা অভি বসে বসে কাঁদছে এবং সারাটি রাতে এক ফোঁটাও ঘুমায়নি। তার মনটা আরো খারাপ হয়ে যায়। তবু নিজেকে সংযত করে নিয়ে উত্সাহিত গলায় বলল, অভি তোকে না বললাম, কোনো চিন্তা করবি না। মা আমি লোকসান জেনেও আরেকটি পদক্ষেপ নিতে চাই। তাতে তোমার আরো কিছু টাকা নষ্ট হবে। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে সায়লা বানু না করতে পারেনি। ওর প্রস্তাবটি মেনে নিল। পরেরদিন আবার ইফতার তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে দু’জন। তবে আজ আর ইফতার নিয়ে রোডের পাশে বসতে হবে না। ক্রেতার জন্য উত্সুক হয়ে তাকিয়ে থাকতে হবে না। ভাসমান ক্রেতাদেরকে কোন পাত্তাই দিচ্ছে না অভি। তার মনে অন্যরকম একটা ভাবনা আজ। বিকেলবেলা। ইফতার নিয়ে কলোনিতে ঢোকে অভি। পেছনে তার মা। আস্তে আস্তে কলোনির সমস্ত পরিবারের কাছে ইফতার পৌঁছিয়ে দেয় অভি। ঘন্টা দু’য়েকের মধ্যে সমস্ত ইফতার শেষ হয়ে যায়। সায়লা বানুর মনে নানা রকম প্রশ্ন একের পর এক জাগতে থাকে। প্রথমে অভি বললেও সে বিশ্বাস করেনি। এখন দেখছি অভির কথাই ঠিক। রীতিমতো যে ম্যাজিক। আচ্ছা, অভি ব্যাপারটা তো আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। মা আমি সকালের দিকে ঘরে ঘরে গিয়ে অনুরোধ করে এসেছি। আমি ইফতার দিয়ে যাব। যদি ভালো হয়, পরেরদিন টাকা দেবেন আর যদি খারাপ হয়, টাকা দেবেন না। এখন ইফতার দিয়ে গেছি। বাকিটুকু আমাদের ভাগ্য। সত্যি ভাগ্যলক্ষ্মী বুঝি মুখ তুলে তাকাল। পরেরদিন অভির হাতে শুধু ইফতারের টাকা ধরিয়ে দেয়নি। হালকা প্রশংসা শুনিয়ে দিল। শুরু হয়ে গেল অভির শুভ যাত্রা। খুলে গেল রঙিন স্বপ্ন, অবিচল পথ।