রাহিলের মায়াভরা ডাগর ডাগর চোখ দুটো আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ও গত বছর ঢাকায় এসেছিল সামারের ছুটিতে। সবার কথা মনে আছে তার। সবার কথা। এমনকি রাস্তায় একটা গরু দেখেছিল সেটাও। কী মজার প্রাণী। হাম্বা হাম্বা করে ডাকে। রাহিল এই প্রথম নিজের চোখে গরু দেখল। গরুটার চোখ দুটোও টানা টানা। মনে হয় এক্ষুণি কেঁদে ফেলবে।
রাহিল থাকে আমেরিকায়। ওর জন্ম বেড়ে ওঠা ওখানে। টেক্সাসের অস্টিনে। ভালমন্দ মিলিয়ে ঢাকা ভারী পছন্দের রাহিলের। মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলে, ‘আই লাইক ঢাকা মাম্মি।’ মা হেসে বলেন, থ্যাঙ্ক য়্যু— ধন্যবাদ।’ ঢাকা আমার জন্মভূমি। আমি ভালোবাসি ঢাকা।
ঢাকা মজার সিটি। ফ্ল্যাটগুলোর সামনে ফুলগাছের কেয়ারী- আবার একটু দূরে নোংরা ডাস্টবিন। রাস্তাগুলো কোথাও মসৃণ কোথাও ভাঙা। অস্টিনে এমন নেই। স্মুথ রাস্তাঘাট। ছবির মতো ঘরবাড়ি। বাড়ির সামনে ঘাস কেটে সাইজ মতো করে না রাখলে জরিমানা হয়। ঢাকায় এত লোক এত হৈচৈ, গাড়ির হর্ন, রিকশা, ভ্যান, সিএনজি। বাব্বাহ! রাঙা ফুফুর বাড়ি সেগুনবাগিচা, ধানমন্ডি থেকে ওখানে যেতে আড়াই ঘন্টা লেগে গেল। ভীষণ যানজট। রাহিলের ভালো লাগে ধানমন্ডির এই ফ্ল্যাট বাড়িটার ব্যালকনি ধরে ফেরিওয়ালাদের হাঁকডাক শুনতে। ‘কাগু-জ কা-গুজ- শিলিই বোতল’ রাহিল উপর থেকে ডাকে ‘হ্যালো হ্যালো’। কাগজআলা ঘাড় বেঁকিয়ে উপর দিকে চেয়ে দাঁত বের করে হাসে। একটা বুড়ো হাঁসওয়ালা যায় এই ৪ নম্বর রাস্তা ধরে। ‘হাঁস এই হাঁস।’ ‘মুরগিই-ই’ মুরগিঅলা মুরগিগুলো দুলিয়ে লম্বা টান দিয়ে ডাকে।
এবার রাহিলের নানাভাই বুবু বেড়াতে গেছে অস্টিল। রাহিল রুসামা ওদের মা লাবনী বাবা ইমন মহাখুশী। রাহিল নানুভাই, বুবুর কাছে কত কথা জানতে চায়। ‘বুবু কাগজঅলাটা কি অমনি করে হাঁক ছাড়ে— কাগু-জ- আর কম-লা নিবেন কমলা-রা’ বল না বুবু?
রাহিল ঢাকা এসে খুব মজা করেছে। কিন্তু বুয়াদের দেখে ওর মন খুব খারাপ হয়ে গেছে। ও মনযোগ দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে রোগাটে বুয়া একটা ভেজা ন্যাকড়া দিয়ে ডলে ডলে ফ্লোর মুছছে। রাহিল বুবুকে বলে, ‘বুবু ওরা কেন এত কষ্ট করে তোমাদের ফ্লোর ওয়াশ করছে, হোয়াই? ওদের হাতে পেইন হয় না!’ বুবু হাসেন, ওরা তো সারা বছর এই কাজই করে। ওর মাও আমাদের বাসায় পার্টটাইম এসব কাজ করেছে। খুব এক্সপার্ট। বুঝলে রাহিল বাবু? ওরা তো মান্থলি মানি পায়। ওরা খুশী আছে’। রাহিল ভেজা ভেজা চোখ মেলে বলে, ‘ওর ড্রেস ক্লীন নয় কেন? ও এত রিকেটি কেন? ও কী গুড ফুড পায় না?’ নানীমা হাসে, হয়েছে বুড়োদের মতো অত ভাবতে হবে না তোমাকে। ওরা ভালোই আছে। আমরা ওদের অনেক হেল্প করি।’ রাহিল বলে, আমাদের অস্টিনে তো আমরা সবাই কাজ করি। মা, বাবা দুজনেই কিচেনে কাজ করেন। শুধু মাঝে মাঝে একজন ক্লিনার এসে বাথরুম কিচেন ক্লীন করে দিয়ে যায়।
রাহিল সারাক্ষণ কিচেনে ঘুর ঘুর করে। বুয়ারা ফ্লোরে বঁটি পেতে ছাই দিয়ে মাছ কোটে। তরকারী কোটে। এমনকি ফ্লোরে বসেই ভাত খায়। রাহিল সবচেয়ে ভড়কে যায় বুয়ার বেডরুম দেখে। ‘এ-ত্ব ছোট! এত ছোট ঘরে বুয়া ঘুমায় কী করে! স্ট্রেঞ্জ!’
রাহিল রাগ করেছে ভাত খাবে না। মাকে বলে, ‘মাম্মি বুয়ার রুম এত ছোট কেন, টেল মি? ও কেমন করে ঘুমায় ওখানে টেল মি।’ মা একটু বিরক্ত হন। এ ছেলেকে নিয়ে তার মহাজ্বালা। কেবল বড়দের মতো ভাবনা।
নানা-নানী এবার ঢাকা ফিরে যাবেন। রাহিলের চোখে পানি টপ টপ করে ঝরে পড়ে। ‘তোমরা যাবে কেন বল? ঈদ করে যাও। তোমাদের আমি খুব মিস করব। নানু রাহিলের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন, ‘আমি আবার আসব নানু— কাঁদে না’। রাহিল চোখ মুছে বলে, ‘আমি বুয়ার জন্যে ঈদের গিফ্ট পাঠাবো। আমার কাছে বাংলাদেশি কারেন্সী আছে। ২১০ টাকা। ওটা তুমি বুয়াকে দেবে, ঠিক আছে?’
যাবার দিন রাহিল ওদের সুন্দর লন থেকে একটা গন্ধরাজ ফুল তুলে নেয়— তারপর গোলাপি খামে টাকা ভরে ফুলটা স্কটেপ দিয়ে আটকে বুবুকে দেয়। নানীমা নয় বছরের রাহিলের মায়া-মমতা দেখে অবাক হয়ে যায়।
বড় ভ্যানেটি ব্যাগে গিফট ভরে ফেলেন তিনি। সবার কাছ থেকে বিদায় পর্ব চলে। রাহিলের আপি রুসামা কাঁদে মা লাবনী কেঁদে আকুল। বাবা রাশেদেরও মন খারাপ।
টার্কিশ প্লেনে ঢাকা ল্যান্ড করবে। বুবু রাহিলের গিফট খুঁজে খুঁজে হয়রান। ‘কোন চুলায় যে রাখলাম’ নিজেই নিজেকে শাসান। ওনার কোন কিছু মনে থাকে না আজকাল। ব্যাগে হ্যান্ড টিস্যু, বিসু্কট, ওষুধ আরো কত কী বোঝাই। হায় আল্লাহ গিফট খুঁজে না পেলে কী হবে! খুঁজতে খুঁজতে দেখে পেছনের চেনের ভিতরে কিছু একটা আছে। চেন টেনে দেখেন রাহিলের গিফট বহাল তাবিয়তে আছে। গন্ধরাজ দিয়ে কী মিষ্টি গন্ধ! রাহিলের মায়ার মতো। খেতে বসে বারবার বলছিল, ‘বুয়াকে বুয়া বলবে না। ও আমার ফ্রেন্ড। আমার ফ্রেন্ড।’ বিমানে তখন বিমানবালারা সফট ড্রিঙ্কস পরিবেশন করছেন।
