তৃতীয় শ্রেণি থেকে আমার স্কুলজীবন শুরু হয়

আপডেট : ২২ জুলাই ২০১৪, ১৯:৪৮
নাহার ফরিদ খান, জীবনের নীলাকাশে পেঁজাতুলোর মতো ভাসতে থাকে স্মৃতির মেঘগুলো। কখনো তা শরতের আকাশের মতো উজ্জ্বল, কখনো তা শ্রাবণের আকাশের মতো বিষণ্ন। মানুষ মাত্রই স্মৃতিকাতর। আজকের এই পরিণত বয়সে এসে মনে পড়ে ছেলেবেলার (নাকি মেয়েবেলার) কত না কথা, কত না স্মৃতি। ছেলেবেলা থেকেই শুরু হয় মানুষ হয়ে ওঠার উত্তরণ। পড়াশুনার পাঠ, প্রকৃতি ও জীবনের সাথে পরিচিত হবার পাঠ, মানুষের সাথে ধীরে ধীরে সখ্যতা গড়ে ওঠার পরিধি বাড়তে থাকে বাল্যকাল থেকে। ছেলেবেলার প্রথম পাঠ শুরু হয়েছিল মায়ের পাঠশালায়। হাতেখড়ি যাকে বলে। বাবা চট্টগ্রাম পোর্টে চাকরি করতেন। সেই সুবাদে আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামেই। বাবার কর্মস্থল থেকে দেয়া বাড়িটি ছিল কর্ণফুলী নদীর পাড়ে একতলা বাড়ি। পাশে বিশাল মাঠ। ফাঁকা ফাঁকা বাড়িঘর। খুব সম্ভবত সেই জায়গাটির নাম ছিল তত্কালীন পাকিস্তান বাজার। ছয়বছর বয়সে সেখান থেকে অন্যত্র বাড়ি বদল হলো। চট্টগ্রাম বন্দরের জাহাজগুলো যেখানে ভিড়তো (যাকে জেটি বলা হয়) তার উল্টোদিকের রাস্তার ওপারে ‘নিউমুরিং’-এ বাসভবনগুলো ছিলো। দু’পাশে কর্মকর্তাদের বাড়ি। মধ্যে মাঠ ও মসজিদ। পোর্টের একটি কিন্ডার গার্ডেন স্কুল ছিলো। কিন্তু বেশ দূরে। তখনকার দিনের বাবা-মায়েরা তো বাচ্চাদের নিয়ে স্কুলে নিয়মিত ছোটাছুটি করতেন না এখনকার মতো। পাড়া বা মহল্লায় ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে বা আয়ার নেতৃত্বে স্কুলে যাওয়া-আসা করতো। মা আদর্শলিপি, যোগ-বিয়োগ, গুণ-ভাগ, নামতা, ইংরেজিতে ছোট ছোট বাক্যগঠন ঘরেই শিখিয়েছিলেন। আমাদের বাড়িগুলোর পেছন দিকটায় চট্টগ্রামের স্থানীয় লোকজনদের বাড়িঘর ছিলো। এবং সেখানে একটি প্রাইমারি স্কুল ছিলো। স্থানীয় একজন গণ্যমান্য লোকের নামানুসারে সেই স্কুলটির নাম ছিলো। খুব সম্ভবত স্কুলটির নাম ছিলো আলী আহমদ প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঁচটি কক্ষ ও শিক্ষকদের একটি কক্ষ। লম্বা লম্বা বেঞ্চ পাতা ছিল। পোর্টের একটি কিন্ডারগার্ডেন স্কুল ছিল কিন্তু বেশ দূরে ছিলো তাই বাবা আমাকে স্থানীয় স্কুলটিতে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করান। সকালে এ্যাসেম্বলী হতো। ক্রমানুসারে লাইনে দাঁড়াতে হতো। তখনকার দিনে অনেকেই বেশি বয়সে পড়াশুনা করতো। ক্লাসে আমিই সবচে’ ছোট ও কমবয়সী ছিলাম বিধায় লাইনে সামনেই দাঁড়াতে হতো। তত্কালীন জাতীয় সঙ্গীত গাইতে আমাকেই ডাকা হতো সবসময়। কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে এ্যাসেম্বলী শুরু হতো। স্কুলের টিফিনের আগে ঘণ্টা পিটিয়ে বাইরের মাঠে ডাকা হতো ছাত্র-ছাত্রীদের। গোল করে দাঁড়িয়ে নামতা মুখস্ত করানো হতো। বেতের মারের প্রচলন, মুরগি বানানো শাস্তি, ক্লাস থেকে বের করে দেয়া, বেঞ্চের উপরে দাঁড় করানো— এসব শাস্তির প্রচলন ছিল। চতুর্থ শ্রেণিতে ওঠার পরে বাবার কর্মস্থল থেকে স্কুল-কলেজ থেকে মেয়েদের আনা-নেয়ার জন্য বাস চালু হওয়ায় চতুর্থ শ্রেণিতেই কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি হই। এবং পরবর্তীতে পোর্ট ট্রাস্ট গার্লস হাইস্কুল থেকেই ম্যাট্রিক পাস করি। কলেজ জীবন পর্যন্ত বাসের সুবিধাটুকু ছিলো। ইউনিভার্সিটিতে সেটা ছিল না। মাতৃআলয়ই সত্যিকার অর্থে আমার প্রথম পাঠশালা। শৈশবে মায়ের মুখে মুখে অনেক প্রবাদ, ছড়া, কবিতা শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে যেতো। দুপুরে ঘুমানোর চেষ্টা করানোর জন্য আমাদের ভাইবোনদের নিয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ছড়া কাটতেন। ‘বিষাদ সিন্ধু’ থেকে মুখস্থ পড়তেন যা সেই বয়সে বোঝার সাধ্য ছিল না, আজ সেগুলো যখন মনে পড়ে তখন বুঝি মা কতটা স্বশিক্ষিত ছিলেন। ক্লাস সিক্স-সেভেন পর্যন্ত মায়ের কাছেই পড়তাম, এখনকার শিশুরা যেমন সময়ের ঘেরাটোপে বাঁধা। তখন আমাদের ছোটবেলাটা এমন ছিল না। একেবারে অবাধ আনন্দে ভরা শৈশব-কৈশোর। আমরা অবারিত মাঠে বৃষ্টিজলে পা ডুবিয়ে হাঁটতাম, গোল্লাছুট আর বৌছি খেলা, ঘাস ফড়িংয়ের পেছনে ছোটা। কি যে আনন্দ ভরা সে দিনগুলো! সাত-আট বছর বয়সে আমপারা বা আরবী পড়া শিক্ষার জন্য সকালে উঠে মসজিদে যেয়ে ঈমামের কাছে পড়তাম আরবী। ‘সোনার খাঁচায় দিনগুলো মোর রইলো না। নানা রঙের দিনগুলো।