ভাষার গল্প
কঙ্কন সরকার
সাবেক সহযোগি শিক্ষক
শিবরামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
পড়ার ঘরে অর্ক ও পিউ ব্যাকরণ বিষয়ক কোন একটি অধ্যায় পড়ছে। মুখস্থ করতেই হবে এমন তাদের পড়াশুনার ধরনটা। দাদু ঘরে ঢুকলেন। কান পেতে তাদের পড়াশুনাটা শুনছেন। দাদু এক সময় বললেন, তোমরা কী ব্যাকরণ পড়ছ?
দু’জনে : হ্যাঁ, দাদু।
দাদু : পড়।
অর্ক : ব্যাকরণ যে খুব কঠিন লাগে দাদু, বুঝতেই পারিনা।
পিউ : আমারও কঠিন লাগে দাদু। কী সব কঠিন কঠিন বিষয় এতে!
দাদু : হাসলেন। ঘরময় পায়চারি করতে লাগলেন।
দু’জনে : ও দাদু,বলনা কী করা যায়?
দাদু : মাথা দুলিয়ে- হ্যাঁ সেইটেই তো ভাবছি।
দু’জনে : পড়া ভালভাবে না শিখে ক্লাশে যেতেই মন চায়না।
দাদু : ঠিক বলেছ। আমারও এমন হতো। ব্যাকরণ বিষয়টা পড়তে আমিও সমস্যায় পড়তাম। এখনও মনে হয়।
পিউ : দাদু আপনি সমস্যায় পরলে কী করতেন?
দাদু : সেটাই তো বলছি। আমাদের এক স্যার ছিলেন। ক্লাশে এসে প্রথমেই বলতেন- সবাই বই বন্ধ কর। মনোযোগি হও। ভাবখানা খুব গম্ভীর করবেন। সবাই আমরা যখন বই বন্ধ রেখে তার মুখের দিকে তাকাতাম এক হাসির আভা ফুটিয়ে বলতেন, দারুন! এরপর সহজ-সরল ভঙ্গিমায় বলতেন- গল্পটি যেন কোথায় ছেড়েছি? আমরা সকলে হাসতে হাসতে সেটি বলতাম। এরপর পাঠের বিষয়কে গল্পে গল্পে শুরু করতেন। এমন ভাবে যেতে যেতে এই কঠিন বিষয়টি হূদয়ে জায়গা করে নিল। আমরাও একে অপরকে সময় পেলেই গল্পাকারে অধ্যায়গুলো বলতাম। এভাবে রপ্ত হতে থাকল ব্যাকরণের বিষয়গুলো। সত্যি আজও তা ভুলে যাবার নয়।
পিউ : এত্ত মজার!
অর্ক : দাদু আপনিও বলেন না গল্পাকারে-
দাদু : আচ্ছা আমরা প্রতিদিন একটা সময় বেছে নিতে পারি কী না?
পিউ : (মাথা চুলকিয়ে) অবশ্যই। তা সন্ধ্যার পরপরই শুরু করা যায় দাদু।
অর্ক : তাই দাদু্। তবে শুধু ব্যাকরণ নয়, অন্যান্য বিষয় গুলোও কিন্তু...
দাদু : ঠিক আছে আমরা সবাই মিলে পাঠকে আকর্ষণীয় ও আনন্দদায়ক করে তুলব।
এভাবেই শুরু গল্পে গল্পে ব্যাকরণের পাঠ...
দাদু :কেমন আছো তোমরা?
অর্ক ও পিউ : ভালো। আপনি?
দাদু : হেসে হেসে বললেন- ভালো।
অর্ক : দাদু গতকাল আমাদের শ্রেণি পাঠে ’ভাষা’ নিয়ে এক ঘটনা ঘটেছে।
দাদু : ঘটনা আবার কী?
অর্ক : মানে, স্যার বলেছেন এক শিক্ষার্থীকে-বলত ভাষা কী?
উত্তরে ছাত্রটি বলল- পাখি যেখানে থাকে।
দাদু : এরপর কী হলো?
অর্ক : কী আর হবে? স্যার, মৃদু হাসলেন। বললেন ও নয় বাবা, ভাষা হচ্ছে অন্য এক বিষয়। আর পাখি যেখানে থাকে তার নাম ‘বাসা’। শ্রেণি পাঠের সময় শেষ হয়েছে তো স্যার বললেন, অন্যদিন এ বিষয়টি বুঝিয়ে দেবেন। দাদু বলেনতো ভাষা কী?
দাদু : এই যে তুমি বললে আমি বুঝলাম, আমি বললাম তুমি বুঝলে এখানেই ভাষা এসেছে।
পিউ : পরিষ্কার হলো না।
দাদু : তার মানে আমরা মুখ দিয়ে যা উচ্চারণ করি তাই ভাষা।
অর্ক : কুকুর, গরু এরাও তো উচ্চারণ করে। তাকেও ভাষা বলব?
দাদু : দারুণ তো তোমার বুদ্ধি। শোন, ওদের শব্দটাকে ভাষা বলা যাবে না। কেননা, ওদের উচ্চারণে কোন অর্থ বোঝা যায় না। ওদের মধ্যে মনের কথা প্রকাশ হলেও আমরা বুঝতে পারি না। পারি কী?
পিউ : পোষা পাখিও তো অনেক সময় কথা বলে।
দাদু : ঠিক আছে বলে। তবে কথা বললেও হবে না। কেননা, ওরা তো মায়ের মুখ থেকে পায়নি। শেখানো বুলি। আর সব পাখি কী কথা বলে? আরো বলি,বাকশক্তিহীন মানুষ অর্থাত্ বোবা মানুষ ইশারা ঈঙ্গিত দিয়ে কিংবা শিশু কান্নার মাধ্যমে চাওয়া বুঝায়, আবার, আঁঁঁকানো বা তোলা ছবিও কিন্তু অনেক কিছু বুঝায় তবুও ভাষা নয়। কেননা, কথাবার্তা নেই তাতে।
দু’জনে : অল্প কথায় ভাষা কী দাদু?
দাদু : মনের কথা একজন অপরজনের নিকট মুখ দিয়ে প্রকাশই কিংবা উচ্চারণই ভাষা। আবার, মনের কথা প্রকাশে মুখ দিয়ে উচ্চারিত ধ্বনিকেই ভাষা বলে।
আর শোন, ভাষার কিন্তু দুটি রূপ আছে। একটি হলো লিখিত রূপ অন্যটি কথ্য বা মৌখিক রূপ। এর মধ্যে একটা হলো সাধু রূপ আর একটি চলিত রূপ।
অর্ক : দাদু, পৃথিবীর সব মানুষ কি একই ভাষায় কথা বলে?
দাদু : না। মানুষের অবস্থান ও বাস অনুযায়ী নানা ভাষার সৃষ্টি হয়েছে। পৃথিবীতে অনেক ভাষায় মানুষ কথা বলে। যেমন: আমাদের ভাষা বাংলা, চীন দেশের অধিবাসীদের ভাষা চীনা, ইংল্যান্ডের ভাষা ইংরেজি। আরও শোন, পৃথিবীতে প্রায় ছয় হাজারের মত ভাষা প্রচলিত আছে। বাংলা ভাষায় প্রায় ছাব্বিশ কোটি লোক কথা বলে। ভাষার দিক থেকে অবস্থান ষষ্ঠ। কারও মতে পঞ্চম।
পিউ : মাতৃভাষা কী দাদু?
দাদু : মায়ের মুখ থেকে শেখা ভাষার নামই মাতৃভাষা।
যেমন: তুমি তোমার মায়ের মুখ থেকে বাংলাভাষা শিখে বাংলায় কথা বলছ। তাই তোমার মাতৃভাষা বাংলা।
