আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালের গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার এজাহারনামীয় অন্যতম আসামি শেখ সিরাজুল হক ওরফে সিরাজ মাষ্টার ওরফে কসাই সিরাজকে (৮০) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সোমবার রাত সাড়ে দশটায় বাগেরহাট মডেল থানা পুলিশের একটি দল বাগেরহাট সদর উপজেলার ডেমা গ্রামে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালে তার বিরুদ্ধে বাগেরহাটে ছয়টি গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
শেখ সিরাজুল হক বাগেরহাট সদর উপজেলার গোটাপাড়া ইউনিয়নের গোটাপাড়া গ্রামের প্রয়াত হারেজ উদ্দিন শেখের ছেলে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি গোটাপাড়া গ্রাম ছেড়ে ডেমা গ্রামে জমি কিনে সেখানে পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। এই নিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বাগেরহাটের তিন ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেফতার করল।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালে কসাই সিরাজের বিরুদ্ধে বাগেরহাটে যে ছয়টি গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে বাগেরহাট সদর উপজেলার চুলকাঠি গ্রামে সাতজনকে, একই উপজেলার রণজিত্পুর গ্রামে ৪২ জনকে, কান্দাপাড়া গ্রামে ১৮ জনকে, কচুয়া উপজেলা সদরে ৫ জনকে, একই উপজেলার শাঁখারীকাঠি গ্রামে ৪২ জনকে এবং রামপাল উপজেলার ডাকরা গ্রামে ৬ থেকে সাতশ’ নারী-পুরুষকে হত্যা। বাগেরহাটের এসব হত্যাকাণ্ড তিনি নিজে নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পাকিস্তানী সেনাদের সহযোগিতাকারী হিসাবে তিনি চিহ্নিত হত্যাকারী রাজাকার নামে পরিচিত ছিলেন।
এর আগে গত ১৯ জুন রাজশাহী মহানগরের এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ থানা পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে আকরাম হোসেন খানকে (৬০) এবং ১১ জুন বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার সোলারকোলা গ্রাম থেকে আব্দুল লতিফ তালুকদারকে (৬৫) গ্রেফতার করে। এর মধ্যে আকরাম খানের বাড়ি বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার দৈবজ্ঞহাটি গ্রামে এবং আব্দুল লতিফ তালুকদারের বাড়ি কচুয়া উপজেলার সোলারকোলা গ্রামে।
বর্তমান সরকারের সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলে ২০০৯ সালে নিমাই চন্দ্র দাস নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি বাদী হয়ে রাজাকার আকরাম হোসেন খান, আব্দুল লতিফ তালুকদার ও শেখ সিরাজুল হক ওরফে সিরাজ মাষ্টার ওরফে কসাই সিরাজের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ২০-৩০ জনের বিরুদ্ধে বাগেরহাটের আদালতে একটি মামলা করেন। ঐ অভিযোগ ছাড়াও শেখ সিরাজুল হকের বিরুদ্ধে বাগেরহাটে আরো পাঁচটি এলাকায় অসংখ্য নিরীহ মানুষকে গুলি ও জবাই করে হত্যা করার অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালের তদন্ত কর্মকর্তা জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার মো. হেলাল উদ্দিন মুঠোফোনে সোমবার রাতে এই প্রতিবেদককে বলেন, আকরাম হোসেন খান ও আব্দুল লতিফ তালুকদার ও কসাই সিরাজসহ অজ্ঞাত ২০-৩০ জন সশস্ত্র লোকজন ১৯৭১ সালের ৫ মে কচুয়া উপজেলার শাঁখারীকাঠি বাজারে গিয়ে নিরীহ লোকজনের ওপর হামলা চালিয়ে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং ৪২ জনকে হত্যা করে। এ সময়ে মোঃ হেলাল উদ্দিন কসাই সিরাজের বিরুদ্ধে পূর্বে উল্লেখিত গণহত্যাগুলোর কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাগেরহাটের রোমহর্ষক গণহত্যাগুলোর ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে সিরাজ মাষ্টারের বিরুদ্ধে সব গণহত্যায় নেতৃত্ব দেয়ার প্রমাণ মিলেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১০ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালে সিরাজ মাষ্টারকে গ্রেফতার করার আবেদন জানালে আদালতের বিচারক তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারী করেন।
বাগেরহাট মডেল থানার ওসি মো. আলী আজম খান এই প্রতিবেদককে বলেন, সিরাজ মাষ্টার ওরফে কসাই সিরাজ ২০০৯ সালের পর এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। সম্প্রতি তিনি তার গ্রামে ফিরেছেন এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সোমবার রাত সাড়ে দশটার দিকে পুলিশের একটি দল সেখানে অভিযান চালিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালের গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি কসাই সিরাজকে গ্রেফতার করে।
