গর্ভবতী মায়েদের পদে পদে দুর্ভোগ

আপডেট : ২২ জুলাই ২০১৪, ২২:৫২
গর্ভবতী মায়েদের দুর্ভোগের শেষ নেই ঝালকাঠি জেলায়। গর্ভধারণ থেকে শুরু করে সন্তান জন্মদানের পুরো সময়টাতেই চিকিত্সা নিতে গিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে তাদের। পুরো জেলায় রয়েছে মাত্র একজন মহিলা গাইনি বিশেষজ্ঞ, তাও জেলা সদর হাসপাতালে। আর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে কোন গাইনি বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকই নেই। যার কারণে গর্ভবতী মহিলারা তাদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কথা বলতে পারছেন না। জানতে পারছেন না তাদের করণীয়। এতে ঝুঁকির মধ্যে থাকে মা ও পেটের শিশু। দুর্গম জেলা ঝালকাঠিতে এমনিতেই চিকিত্সা নিতে ভীষণ কষ্ট করতে হয়। কারণ যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনো অনেক স্থানে খুব খারাপ। আর গর্ভবতী মা’দের এই দুর্ভোগ বেড়ে দাঁড়ায় কয়েকগুণ। চিকিত্সা না পেয়ে সন্তান জন্মদানের সময় নানা জটিলতায় মারা যান অনেক মা ও তার নবজাতক সন্তান। এছাড়া হাসপাতালে রয়েছে নানা সমস্যা। সরবরাহকৃত ওষুধ পাচার হয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অপারেশন ব্যবস্থা থাকার পরও জনবলের অভাবে সেগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। হাসপাতালের ভেতরের ও বাইরের পরিবেশ অত্যন্ত নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর। জেলায় চিকিত্সকের পদ ১০৫টি। এরমধ্যে ৬২ জন চিকিত্সকের পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি। জেলায় চিকিত্সক কাজ করছেন মাত্র ৪৩ জন। এছাড়া নার্স, টেকনিশিয়ানসহ জনবলের তীব্র সংকট প্রকট। যেসব চিকিত্সক এখন কাজ করছেন তারাও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে থাকতে চান না। সদর হাসপাতালসহ ৪টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, একটি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, ৩০টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং ৮৭টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে জেলায়। সদর হাসপাতালে ৫০ শয্যার লোকবল দিয়ে চলছে ১০০ শয্যার কার্যক্রম। চিকিত্সকের ২৩টি পদের মধ্যে কর্মরত আছে ১২ জন। সহকারী নার্সের ৫টি পদের মধ্যে ৪টি শূন্য। হাসপাতালে প্রায়ই পানি থাকে না। বাথরুম-টয়লেটের অবস্থা খুবই শোচনীয়। খাবারের মান নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাঙ্গের ছাতার মত গজিয়ে উঠেছে বেসরকারি প্রাইভেট ক্লিনিক। সেখানেও হা করে বসে থাকে দালাল। চলে রোগী ছিনিয়ে নেয়ার প্রতিযোগিতা। সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের অধীনে ২২টি কমিউনিটি ক্লিনিক, ৩টি সাব সেন্টার, ১০টি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। এসব ক্লিনিক ও কেন্দ্রে ১২ জন চিকিত্সক থাকার কথা থাকলেও আছেন মাত্র তিন জন। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের ১০টি পদের ৮টি পদই শূন্য। ফার্মাসিস্ট পদে আছে একজন। উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শকের ১৪ পদের মধ্যে ৪টি পদ শূন্য। ঝালকাঠির মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের কর্তব্যরত চিকিত্সক ডা.জোহায়ের আলী জানান, এখানে তিন বছর ধরে অ্যানেসথেসিস্ট নেই। প্রতি সপ্তাহে বাইরে থেকে একজন অ্যানেসথেসিস্ট গর্ভবতী মায়েদের সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়। রোগীর চাপ বেশি থাকায় ও অ্যানেসথেসিস্ট না থাকায় অনেক জটিল রোগীর সিজারিয়ান করা সম্ভব হচ্ছে না। কাঠালিয়া উপজেলা: স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৩১ শয্যার। কমিউনিটি ক্লিনিক ১৬টির মধ্যে ১৪টিরই ভবনের ছাদ থেকে পানি পড়ে। ব্যাহত হয় চিকিত্সা সেবা। কাগজে কলমে ৬টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র থাকলেও স্থাপনা আছে মাত্র ২টির। একটি কাঠালিয়া সদরে অপরটি আওরাবুনিয়ায়। উপজেলায় ১৫ জন চিকিত্সকের পদ থাকলেও ২ বছর ধরে ১২টি পদই খালি। কাঠালিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নার্সের ১২টি পদের মধ্যে ২ জন আছে প্রেষণে। এমএলএসএস’র ৬টি পদের মধ্যে ৩টি খালি। ওষুধ চুরির অভিযোগ আসে অহরহ। প্রায়ই রোগীদের কাছ থেকে খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ পাওয়া যায়। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অপারেশন থিয়েটার নেই। হয় না সার্জারি। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখানে কোন মহিলা ডাক্তার নাই। দিনের প্রায় ১২ ঘন্টাই বিদ্যুত্ থাকে না, নাই কোন জেনারেটর। ফলে ইনডোর ও আউটডোরে চিকিত্সা দিতে সমস্যায় পড়তে হয়। কাঠালিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে টেলি মেডিসিন কর্নারটি প্রায়ই বন্ধ থাকে বিদ্যুত্ না থাকার কারণে। এছাড়াও অফিস স্টাফের ৩টি পদের মধ্যে ২টি খালি, পরিসংখ্যানবিদ ১ জন, রেডিওগ্রাফার ১ জন, ল্যাব টেকনিশিয়ান ১ জন, ডেন্টাল টেকনিশিয়ান ১ জন, সহকারী সেবক ১, ওয়ার্ড বয় ১ জন, বাবুর্চি ১ জনসহ ফার্মাসিষ্ট ৪টি পদের মধ্যে ৩টিই খালি। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোঃ জাফর আলী খান জানান, তীব্র চিকিত্সক সংকট এবং অন্যান্য শূন্য পদের কারণে কাঠালিয়ায় চিকিত্সা সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ৫০ শয্যার হাসপাতালের কাজ প্রায় শেষ। সেটি চালু হলে আশাকরি লোকবল বাড়বে, সমস্যার কিছুটা উন্নতি হতে পারে। রাজাপুর উপজেলা: রাজাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোন রকমে জোড়াতালি দিয়ে চালিয়ে নেয়া হচ্ছে চিকিত্সা সেবা। ১৫ জন চিকিত্সকের মধ্যে আছেন মাত্র ৩ জন। সেবিকা পদে ১০ জন কর্মরত আছেন। কাগজে কলমে ২২টি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও চালু আছে ১৯টি। এরমধ্যে ৫টি সংস্কার করা হলেও বাকিগুলো চলছে জোড়াতালি দিয়ে। ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও ৩১ শয্যার লোকবল দিয়ে চলছে রাজাপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কার্যক্রম। কমপ্লেক্সে ১০টি চিকিত্সকের পদ থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে ৭ জন চিকিত্সকের পদ খালি। রাজাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. মোঃ আবুল খায়ের মাহমুদ রাসেল জানান, বিদ্যুত্ না থাকায় জরুরি বিভাগ ও আন্তঃবিভাগে কাজকর্মে ব্যাপক সমস্যায় পড়তে হয় আমাদের। প্রতিদিন বহির্বিভাগে ২০০/২৫০ জন রোগী চিকিত্সা সেবা নিচ্ছে। তিন বছর আগে একটি জেনারেটর দেয়া হলেও সেটি তখন থেকেই বিকল হয়ে পড়ে আছে। ওটি থাকলেও ডাক্তারের অভাবে দীর্ঘদিন তা বন্ধ আছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা রোগীদের খাদ্য নিয়ে। আইনি জটিলতার কারণে নতুন করে টেন্ডার হচ্ছে না। রোগীরা প্রায়ই খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ করে আসছে। নলছিটি উপজেলা ঃ নলছিটি উপজেলা ৫০ শয্যার হাসপাতালে ৩২টি চিকিত্সক পদের মধ্যে কর্মরত আছে ১১ জন। ২৭টি কমিউনিটি ক্লিনিকের মধ্যে চালু আছে ২৩টি, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র আছে ১০টি। নলছিটি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোঃ ফারুক আলম বলেন, বহির্বিভাগে রোগীর চাপ থাকলেও চিকিত্সক স্বল্পতার কারণে সঠিক সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ঝালকাঠি জেলায় চিকিত্সক সংকটের বিষয়ে সিভিল সার্জন ডা. বিনয় কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, চার উপজেলায় ৭০ ভাগ চিকিত্সকের পদ শূন্য। এ কারণে জনগণের স্বাস্থ্য সেবা প্রদানে বিঘ্ন ঘটছে। সরকার সারা দেশে ৬ হাজার চিকিত্সক নিয়োগ দিচ্ছে। আশাকরি এই নিয়োগের পরে ঝালকাঠি জেলার চিকিত্সা সংকট কেটে যাবে। অ্যানেসথেসিস্ট না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, এই পদটি বিশেষজ্ঞ পদ হওয়ায় এ পদে লোক নিয়োগে সময় লাগবে। তবে এই পদটিতে লোক নিয়োগ করা হলে অধিকাংশ হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সমূহে জটিল রোগের অপারেশন করতে রোগীদের কষ্ট হবে না। এছাড়া হাসপাতাল সমূহের শয্যা বাড়ানো হলেও লোকবল নিয়োগ না করার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ব্যাপার জানিয়ে তিনি রোগীদের খাবারের বরাদ্দ প্রসঙ্গে বলেন, বিভিন্ন স্থানে মামলা জটিলতার কারণে অনেক পূর্বের দরে বর্তমানে খাবার পরিবেশন করা হয়।