ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বাংলাদেশ সফরের আগ্রহ প্রকাশ করে বলেছেন, তিনি নিজ চোখে শেখ হাসিনা সরকারের অর্জনগুলোকে দেখতে চান। বিশেষ করে জঙ্গিবাদ এবং মৌলবাদ দমনসহ সামাজিক উন্নয়নে বর্তমান সরকারের প্রসংশা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ সফর করে এই অর্জনের কৌশল নিজ চোখে দেখতে ও জানতে চান তিনি। লন্ডন সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এমন আগ্রহের কথা জানান। গতকাল স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে আটটা থেকে সোয়া নয়টা পর্যন্ত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ১০ ডাউনিং স্ট্রীটে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ বৈঠকের জন্য ৩০ মিনিট সময় নির্ধারিত থাকলেও তা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হয়। বৈঠক পরবর্তী এক প্রেস ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক এসব কথা জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব একেএম শামীম চৌধুরী সাংবাদিকদের কাছে দ্বি-পাক্ষিক বৈঠকের বিস্তারিত তুলে ধরেন। এ সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব আব্দুস সোবহান শিকদার প্রমুখ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন।
অত্যন্ত সৌহার্দপূর্ণ ও আড়ম্বর পরিবেশে দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনা হয়েছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক বলেন, এ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি ব্রিটিশ সরকারের আস্থার প্রকাশ ঘটেছে। বাংলাদেশ সফরের আগ্রহ প্রকাশ করে ডেভিড ক্যামেরন বলেন, বাংলাদেশ সামাজিক উন্নয়নে যে সাফল্য দেখিয়েছে তার কৌশল আমি নিজ চোখে দেখতে চাই। এছাড়া মৌলবাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় শেখ হাসিনার সরকারের দক্ষতার কৌশলও জানতে চান তিনি। বাংলাদেশে বিশেষ করে সিলেট অঞ্চল সফরের আগ্রহ দেখান ক্যামেরন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ সফরের জন্য আন্তরিক আমন্ত্রণ জানান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ দমন, বাল্য বিবাহ ও জোরপূর্বক বিবাহ প্রতিরোধে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন। নারীর ক্ষমতায়ন ও নারী নির্যাতন রোধে প্রয়োজনীয় আইনের সংস্কার সাধন এবং শিক্ষার প্রসারে নেয়া নানা পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়নে তার সরকারের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। দুই প্রধানমন্ত্রী সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করার মনোভাব ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লন্ডনে অনুষ্ঠিত গার্ল সামিটে যোগ দিতে যুক্তরাজ্য সফর করছেন। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর এটাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রথম কোনো ইউরোপের দেশ সফর।
মঙ্গলবার ডাউনিং স্ট্রীটের বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি চলে যান লন্ডনের ওয়ালওয়ার্থ একাডেমিতে। এখানেই সকাল সাড়ে ৮টা থেকে শুরু হয় গার্ল সামিট ২০১৪। সামিটে ২০ সদস্যদের বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলকে নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
ব্রিটিশ সরকার এবং ইউনিসেফের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত প্রথম এ গার্ল সামিটের প্রতিপাদ্য হল মেয়েদের স্বার্থ বিরোধী দুইটি সামাজিক প্রথা ‘ফিমেইল জেনিটাল মিউটিলেশন’ (এফজিএম) ও শিশু, বাল্য ও জোরপূর্বক বিবাহ প্রতিরোধ। এক প্রজন্মের মধ্যেই নারীর প্রতি এসব অন্যায় প্রতিরোধ করাই এ সামিটের মূল লক্ষ্য। বিশ্বের ৫০টিও বেশি দেশের সরকারি প্রতিনিধি, বেসরকারি সংস্থা, চ্যারিটি এবং এনজিও এ সামিটে অংশ নেয়। প্রাক সম্মেলন ঘোষণায় বলা হয়, বৈষম্য ও সহিংসতামুক্ত পরিবেশে বসবাস করে নিজেদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের অধিকার মেয়েদের রয়েছে। কিন্তু লাখ লাখ নারী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে প্রতিদিন শিকার হচ্ছে এফজিএম ও সিইএফএম এর মত ক্ষতিকর প্রথার। বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে এফজিএম ও সিইএফএম এর মত ক্ষতিকর প্রথা অবসানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নারী, বিভিন্ন কমিউনিটি ও ধর্মীয় নেতাসহ সরকার, সিভিল সোসাইটি, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বেসরকারি খাতের অঙ্গীকার আদায়ে গার্ল সামিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সামিটে ভাষণদান কালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বের দেশে দেশে এখনো নারীর প্রতি নির্যাতন, নারীকে বাল্য বিবাহ কিংবা জোরপূর্বক বিবাহদানের ঘটনা ঘটছে। নারীর প্রতি এমন আচরণ বন্ধ হওয়া জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ জন্য প্রয়োজন নারীর ক্ষমতায়ন। নারী নির্যাচন বন্ধ এবং নারীর ক্ষমতায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী তিনটি বিষয়ের উপর গুরুত্বারোপ করেন। এগুলো হল নারী দারিদ্র্য বিমোচন, নারী শিক্ষা এবং নারীদের জন্য কর্মসংস্থান। তিনি বলেন, নারীদের শিক্ষিত করে তাদের জন্য যথাযথ কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে নারীদের স্বাবলম্বী করে তোলা গেলেই নারীর প্রতি সকল নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব হবে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে নারী নির্যাতন বন্ধ এবং নারীর ক্ষমতায়নে তার সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং আইনের সংস্কারের কথা তুলে ধরেন।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী সামিট ভ্যানুতেই আলাদা কক্ষে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রী ডেসমন্ড সোয়াইন টিডি ও ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক অ্যান্থনি লেকের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। গতকাল যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আয়োজিত এক ইফতার মাহফিলে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। এর স্থানীয় সময় বিকাল ৪টায় তার সঙ্গে হোটেল কক্ষে দেখা করেন যুক্তরাজ্যের শ্যাডো পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডগলাস আলেকজান্ডার। এরপর অল পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপের একটি প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত্ করে।
প্রথমবারের মত অনুষ্ঠিত এ গার্ল সামিটে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এই প্রতিনিধি দলে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ এম মাহমুদ আলী এমপি, মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি এমপিসহ অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা। আজ বুধবার তিন দিনের সফর শেষে স্থানীয় সময় বিকাল ছয়টায় প্রধানমন্ত্রী ঢাকার উদ্দেশ্যে লন্ডন ত্যাগ করবেন। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে নয়টায় তিনি ঢাকায় পৌঁছাবেন।
