বেল

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০১৪, ১৯:৩৫
(Wood Apple) বিষ্ণু দাশ,গবেষক বৈজ্ঞানিক নাম : Aegle marmelos, বেল গ্রীষ্ম ঋতুর একটি পুষ্টিকর, সুস্বাদু ও উপকারী ফল। কাঁচা ও পাকা উভয় অবস্থাই বেল খাওয়া যায়। বেলের আদি জন্ম ভারতবর্ষে। বেলকে শ্রীফল বলা হয়। কেননা সনাতন ধর্মীরা পুজা-অর্চনায় বেলের পাতা ও ফল ব্যবহার এবং বেল কাঠকে পবিত্র বলে মনে করে ও বেল কাঠ পুড়িয়ে রান্না করে না। বাংলাদেশ, ভারত পাকিস্তান, মায়ানমার, শ্রীলংকা. দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বেলের বিস্তৃতি রয়েছে। তেলুগী ভাষায় বেল গাছকে ভেলগা পান্ডু, তামিল ভাষায় ভেলাম প্লাম নামে পরিচিত। কোনো যত্ন ছাড়াই বনে-জঙ্গলের এ গাছের উপস্থতি দেখা যেত। বর্তমানে বনেজঙ্গলে বেল গাছ চোখে পরেনা। উদ্ভিদ তত্ব বেল মাঝারী আকারের বৃক্ষ। এ বৃক্ষ শাখায়িত এবং উচ্চতায় ৯-১২ মিটার হয়ে থাকে। বেলের কান্ড অমসৃণ, অত্যন্ত দৃঢ় প্রকৃতির। বেলের বাকল কাটাযুক্ত ও গাছ যখন ছোট থাকে তখন তাতে অনেক শক্ত ও তীক্ষ্ন কাঁটা থাকে। গাছ বড় হলে কাঁটা কমে যায় শীতকালে বেল বৃক্ষের সব পাতা ঝরে যায়, আবার বসন্তে নতুন পাতা গজায়। বেল পাকার সময় বেল বৃক্ষে একটি পাতাও থাকে না। কিন্তু বেলের ডালে ডালে বেল ঝুলতে দেখা যায়। এ দৃশ্য অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। বেল পাতা ত্রিপত্রযুক্ত, সবুজ, ডিম্বাকার ; পত্রফলকের অগ্রভাগ সূঁচালো। পাতা আকৃতিতে ২-থেকে ৩৫ মি.মি লম্বা এবং ১০ থেকে ২০ সি.সি চওড়া হয়ে থাকে। নতুন গাছের পাতার আকৃতিকে বড় হয়। বেলের পাতা পিষলে লেবু গাছের মত গন্ধ বেড় হয়। ফুল হালকা সবুজ থেকে সাদা রঙের। বোঁটা ছোট, ৪-৫টি পাঁপড়ি থাকে, পুংকেশর অসংখ্য, গর্ভাশয় বিস্তৃত ও কেন্দ্রস্থলমুক্ত। ফুলে মিষ্টি গন্ধ আছে। বেল ফল ও বেলের পুষ্টি উপাদান পরিপক্ক বেল আকৃতিতে বেশ বড়, গোলাকার, শক্ত খোসাবিশিষ্ট। বেল পাকা অবস্থায় বেল গাছ থেকে ঝরে পড়ে। ফলের ভিতরে শাঁস সুগন্ধযুক্ত; ৮-১৫টি খন্ডে বিভক্ত থাকে। প্রতিটি ভাগে বা খন্ডে চটচটে আঠার সাথে অনেক বীজ অবস্থান করে। কাঁচা ফলের রঙ সবুজ, পাকলে হলদে হয় যায়। ভিতরের শাঁসের রঙ কমলা বা হালকা হলুদ। খাদ্য হিসেবে বেল অত্যন্ত সুস্বাদু ও উচ্চমানের পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ একটি ফল। এতে প্রচুর পরিমাণ শ্বেতসার, ক্যারোটিন, ভিটামিন-বি কমপ্লেক্স, ক্যালসিয়াম ও আয়রন রয়েছে। বেলের প্রতি ১০০ গ্রামে বেলের আহারোপযোগী অংশ ৬০% এবং জলীয় অংশের পরিমাণ ৭৭.৪%। এ ছাড়াও পুষ্টি উপাদান হিসেবে বেলে ২ গ্রাম আমিষ, ০.২ গ্রাম স্নেহ, ০.৯ গ্রাম খনিজ পদার্থ; ২.১ গ্রাম আঁঁশ ৩১ গ্রাম, ১৮.৮ গ্রাম শর্করা; ৮৭ কিলোজৌলস খাদ্য শক্তি পাওয়া যায়। বেল ফসফরাসের পরিমাণ ৫০ মিলিগ্রাম; লৌহ ০.৬ মিলিগ্রাম; ভিটামিন বি ১- ০.০৩ মি.গ্রাম; ভিটামিন বি ২- ০.০২ মিলি গ্রাম; নায়াসিন ১.১ মি.গ্রাম; ভিটামিন-সি ৯.০ মিগ্রাম বিদ্যান যা বেলের পুষ্টিমানকে সমৃদ্ধ করেছে। বেলের উপকারীতা কাঁচা বেল ডায়রিয়া ও আমাশয় রাগে ধন্বন্তরী হিসেবে কাজ করে। পাকা বেলের শরবত সুস্বাদু। বেলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, এ এবং ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও পটাসিয়ামের মত মূল্যবান পুষ্টি উপাদান। বেল ল্যাক্সেটিভ গুণসম্পন্ন যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর, আমাশয় নিরাময়, হজমের সমস্যা দূর; অন্ত্রের কৃমিসহ অন্যান্য জীবাণু ধ্বংস; শরীরে পানিজমা রোগ প্রতিরোধ; পাকস্থলির আলসার, পাইলস; দৃষ্টিশক্তি ঠিক রাখা; চোখের ছানি ও জ্বালা উপশম ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বৃদ্ধি; হার্ট এবং লিভার ভালো রাখা; মানবদেহের টিউমার কোষের বৃদ্ধি রোধ; ব্রেস্ট ক্যান্সার ও ইউটেরাস ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাস; ইনফার্টিলিটির ঝুঁকি কমানো; স্কার্ভি রোগ প্রতিরোধ; মানবদেহের বিভিন্ন সংক্রমণ রোধ; শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বৃদ্ধি এবং একিউট ব্রঙ্কাইটিস প্রতিকারে বিশেষ ভূমিকা রাখে। বেল পাতার রস ঠাণ্ডা ও ক্রনিক কফ চিকিত্সা’; জয়েন্টের ব্যথা হূাস, জন্ডিস নিরাময়, রক্ত পরিষ্কার বিশেষভাবে উপকারী। বেলগাছের ছাল ও ডালপালায় এক ধরনের গাম থাকে, যা ডায়াবেটিস রোগের জটিলতা কমাতে ভূমিকা রাখে। বেল ও বেল গাছের ব্যবহার: বেল সরবত তৈরি করা হয়। হাঠে-বাজারে বেলের সরবত বিক্রি করা হয়। এ ছাড়াও কাঁচা ও পাকা বেল শুকিয়ে পেটের পীড়ার ওষুধ হিসেবে বিক্রি করা হয়। বর্তমানে বনে-জঙ্গলে আর বেল গাছ দেখা যায় না। চাষের মাধ্যমে পারিবারিক পর্যায়ে সীমিত পর্যায়ে বেল গাছ দেখা যায়। বেল কাঠ সব ধরনের কাজে ব্যবহূত হয়। তবে আসবাবপত্র তৈরিতে ব্যবহারকরা হয় না। পল্লী এলাকায় গৃহ র্নিমানে বেল কাঠের ব্যবহার দেখা যায। প্রাকৃতিক পর্যায়ে এ গাছটির সমপ্রসারণে আমাদের সকলের এগিয়ে আসা উচিত্।