ইসরায়েলি বর্বর হামলার শিকার হচ্ছে ফিলিস্তিনি শিশুরা। গত কয়েক দিনের নৃশংস হামলায় যারা নিহত হয়েছে তাদের এক-চতুর্থাংশই শিশু। সভ্য বিশ্ব ইসরায়েলিদের পৈশাচিকতা কার্যত নীরব দৃষ্টিতেই দেখছে। ইসরায়েল নামের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অবৈধভাবে। ফিলিস্তিনিদের তাদের ভিটেমাটি থেকে উত্খাত করে সেখানে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত ছিল জাতিসংঘ এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জয়ী পশ্চিমা শক্তির একটি সুস্পষ্ট অপরাধ।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যা নতুন নয়। এ সমস্যা সহসাই সমাধান হবে—এরও সম্ভাবনা নেই। কেননা এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্য নিহিত। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বিষয়টি ইহুদি-মুসলমান দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখা হলেও তা মূলত ধর্মীয় কারণে নয়।
মধ্যপ্রাচ্যের অসামপ্রদায়িক চেতনাকে কলুষিত করে তোলে ফিলিস্তিনে ইসরায়েলিদের আগমন এবং জেঁকে বসার ঘটনা। তারপর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে বিষফোঁড়ার মতো অবৈধভাবে আবির্ভূত ইসরায়েল নামের রাষ্ট্রটি একদিকে যেমন ফিলিস্তিনিদের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে, অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যও সৃষ্টি করছে নিরাপত্তাহীনতা।
পশ্চিমা দেশগুলো শিশু অধিকারের প্রতি নিজেদের অঙ্গীকারবদ্ধ বলে দাবি করলেও ফিলিস্তিনি শিশুদের হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে নীরব। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজায় ইসরায়েল যে সর্বাত্মক হামলা চালাচ্ছে তার পেছনে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো হচ্ছে জঙ্গিবাদী সংগঠন হামাসের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনাকে। বলা হচ্ছে, হামাস জঙ্গিবাদীদের স্তব্ধ করতে পালটা হামলা চালানো হচ্ছে। কিন্তু ইসরায়েলি হামলার ধরনে ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়ে গেছে ফিলিস্তিনি সাধারণ মানুষই তাদের টার্গেট। শিশুহত্যাকেও বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে ইসরায়েলিরা। রোজার মাসে কাপুরুষোচিত হামলা চালিয়ে শিশু-নারী নির্বিশেষে নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হলেও আরব দেশগুলো রহস্যজনক্যভাবে নীরবতাই পালন করছে।
নিজেদের সভ্য মানুষ হিসেবে দাবি করার ক্ষেত্রে যাদের অহংকারের শেষ নেই সেই পশ্চিমা বিশ্বও উদ্বেগ প্রকাশের মধ্যেই তাদের দায়দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রেখেছে। আমরা মনে করি মানবতার স্বার্থেই ইসরায়েলি হামলা শুধু বন্ধই নয়, এই দুর্বৃত্তপনার শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত। হামাসের হঠকারিতার পালটা ব্যবস্থা হিসেবে ফিলিস্তিনি নারী ও শিশুদের ওপর হামলা অন্যায়। নিজেদের সভ্য ও শান্তিবাদী হিসেবে দাবি করতে চাইলে ইসরায়েলি বর্বরতার বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীকে রুখে দাঁড়াতেই হবে। বন্ধ করতে হবে শিশুহত্যা।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে। সেখানে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। এ হত্যার অসহায় ও নিষ্ঠুর শিকার হচ্ছে সেখানকার শিশুরাও। গাজা উপত্যকায় বিমান হামলার পাশাপাশি স্থল অভিযানও শুরু করেছে ইসরায়েলি নৌ কমান্ডোরা। এ পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক নিহত ও আহত হয়েছে দুই হাজারেরও বেশি মানুষ।
হামলার সঙ্গে সঙ্গে তারা এও ঘোষণা দিয়েছে যে, প্রাণে বাঁচতে চাইলে গাজাবাসীকে বাড়িঘর ছেড়ে দ্রুত অন্যত্র চলে যেতে হবে। এরই মধ্যে অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে চলে যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এটা কি যুদ্ধ না গণহত্যা? এ ধরনের গণহত্যার মানে কী? এটা হচ্ছে সবলের ওপর দুর্বলের অত্যাচার, নির্যাতন। এ হামলার কারণ ঠুনকো, এটা অজুহাত মাত্র। তিনজন ইসরায়েলি অপহরণের প্রতিক্রিয়ায় এ হামলা চালানো শুরু হলেও এটা রাজনৈতিক প্রতিহিংসারই নিষ্ঠুর ফল।
এ হামলার প্রতিবাদে বিশ্বব্যাপী নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। বিশেষ করে নির্বিচারে শিশুহত্যা বিশ্বের কোনো বিবেকবান মানুষই মেনে নিতে পারছে না। এছাড়া জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকে ইসরাইল এবং ফিলিস্তিনের মধ্যে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে একটি শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এ ঘটনায় যদি বিশ্ববিবেক জাগ্রত না হয় তাহলে এটা হবে সামপ্রতিক সময়ের সবচেয়ে ঘৃণিত ও লজ্জাজনক ঘটনা।
ঢাকা
