স্বজনদের সান্নিধ্যে ঈদের আনন্দ উদযাপন করতে ঘরমুখো হয়েছেন মানুষ। রাজধানীর বাস টার্মিনাল-রেল স্টেশন ও লঞ্চঘাটে বয়ে যাচ্ছে মানুষের সে াত। ঈদে যাতায়াত দুর্ভোগ থাকলেও ঘরে ফেরার আনন্দের কাছে তা একেবারেই তুচ্ছ! তাইতো বাস, ট্রেন ও লঞ্চ কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই নাই। যতই ঝক্কি-ঝামেলা হোক প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ আনন্দ উপভোগে উবে যাবে সব কষ্ট!
গতকাল শুক্রবার ছুটির দিনে রাজধানী ছেড়েছেন লাখ লাখ মানুষ। সঠিক সময়ে বাস-ট্রেন-লঞ্চ না আসা এবং চিরচেনা যানজটে দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যেও যাত্রীদের চোখে-মুখে ছিল ঈদের আনন্দ। তবে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে তীব্র যানজটে দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে যাত্রীদের।
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মতে, ঈদে সড়ক, রেল ও নৌপথে বাড়ি যেতে রাজধানী ছাড়বে পৌনে এক কোটি লোক। গত বৃহস্পতিবার শুরু হয় ঘরে ফেরা। আর ঘরে ফেরার চূড়ান্ত জনসে াত ছিল গতকাল সকাল ও রাতে। গত দুই দিনের ঘরে ফেরার জনসে াতে রাজধানী কিছুটা ফাঁকা হয়েছে। শপিং মল, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন কিংবা লঞ্চঘাটের সামনে ছাড়া শহরের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন মোড়ে নেই চিরপরিচিত যানজট। ট্রাফিক কন্ট্রলরুম জানিয়েছে, ঈদ যতই ঘনিয়ে আসবে ততই ঢাকা ফাঁকা হতে শুরু করবে। গতকাল সকালে রাজধানীর মহাখালী ও গাবতলী বাস টার্মিনাল পরিদর্শন করেন যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। ঈদে ঘরমুখী যাত্রীদের আতঙ্কিত হওয়ার মতো কোন খবর নেই জানিয়ে ওবায়দুল কাদের দাবি করেছেন, রাস্তার কারণে কোন যানজট সৃষ্টি হবে না। গত ১০ দিনে যানজটের কোন খবর নেই। ঈদে রাস্তার কারণে কোন যানজট হবে না, যাত্রীরা যথা সময়ের আগেই গন্তব্য চলে যেতে পারছেন।
কাউন্টারেই ঘন্টার পর ঘন্টা
অধীর আগ্রহে অসংখ্য মানুষ দাঁড়িয়ে। বাচ্চাদের অনেকেই ঘুমিয়ে পড়েছে, বিশাল বিশাল ব্যাগ-প্যাকের ওপর। গাবতলী বাসস্ট্যান্ডের দৃশ্য এমনটাই ছিল গতকাল। প্রতিটি বাসের সিডিউল বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। মহাখালী ও সায়েদাবাদেও গতকাল ভোর থেকে ঘরমুখী মানুষের ভীড় ছিল লক্ষ্যণীয়। সড়ক-মহাসড়কের বেহাল দশা, যানজট ও ফেরি পারাপারের দীর্ঘ বিলম্বের কারণে কোনো পরিবহনের বাসই নির্ধারিত সময় গন্তব্যে পৌঁছতে পারেনি। দূরপাল্লার পরিবহন কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যেই ঈদের বিশেষ ট্রিপ শুরু করলেও চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবী ফরিদ হাসান্ সকাল সাড়ে ৭টা নির্ধারিত সময়ের আগেই গাবতলি বাস কাউন্টারে পৌঁছান। কিন্তু কাউন্টারে গিয়ে বাসের সিডিউল জানতে গিয়েই বড় ধরনের হোঁচট খান তিনি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাফ জবাব, গাড়ি যশোর থেকে কখন ঢাকায় এসে পৌছবে তা এখনো তারা জানেন না। ভাঙ্গাচোরা রাস্তায় যানজট সৃষ্টি হওয়ায় কোনো পরিবহনের সিডিউল মানাই সম্ভব হচ্ছে না। তবে যারা অগ্রিম টিকিট কিনে রেখেছিলেন, তারা অপেক্ষার পর নির্বিঘ্নে ঢাকা ছাড়তে পারলেও যারা আগে টিকিট কিনতে পারেননি, তাদের টিকিট জোগাড়ে গলদঘর্ম হতে হচ্ছে। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ও মহাখালী থেকেও ছোট লোকাল বাসে করে পরিবার পরিজন নিয়ে রওনা হয়েছেন ঘরমুখো মানুষ।
ট্রেনের ছাদে যাত্রীরা
ঘরে ফেরা চাপ বাড়ছে রেলস্টেশনে। কিন্তু সেই তুলনায় সীমিত ট্রেন আর ট্রেনের বগি সংকটে হিমশিম খেতে হচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়েকে। রেল মন্ত্রণালয়ের সচিব আবুল কালাম আজাদ জানান, যতগুলো বগির প্রয়োজন ততটা নেই।
বাড়ি ফেরা মানুষের ব্যস্ততায় সরগরম ছিল কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলস্টেশন। তবে বিমানবন্দর রেলস্টেশনে যাত্রীর ভিড় ছিল বেশি। যেখানে শত শত মানুষ ছাদে উঠে নিচ্ছে ঝুঁকি। সকাল পৌনে সাতটায় ছেড়ে যায় সিলেটগামী ট্রেন পারাবত এক্সপ্রেস। এভাবে দিনভর ২৮টি আন্ত ঃ নগর ট্রেন ছেড়েছে কমলাপুর থেকে। এসব ট্রেনের মধ্যে নোয়াখালীগামী উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনটি ৩টা ২০ মিনিটের পরিবর্তে ৫টায় স্টেশন ছেড়েছে। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এই ট্রেনটি বিলম্বে ছাড়লেও অন্য ট্রেনগুলো ছেড়েছে সময়মত। এদিকে আজ থেকে ঈদ উপলক্ষে বিশেষ ট্রেন বহরে যুক্ত করা হচ্ছে। প্রথমদিন ৩টি বিশেষ ট্রেন কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ছেড়ে যাবে। ঈদের পর সাতদিন পর্যন্ত ঢাকা থেকে পার্বতীপুর, দেওয়ানগঞ্জ ও খুলনার উদ্দেশে তিনটি বাড়তি ট্রেন চলাচল অব্যাহত থাকবে। কমলাপুর স্টেশন ম্যানেজার খায়রুল বশীর বলেন, আগাম টিকেট শেষ হলেও প্রতিদিনই স্ট্যান্ডিং টিকেট দেয়া হচ্ছে। এতে কস্ট হলেও অনেকে বাড়ি ফেরার সুযোগ পাচ্ছেন।
আল্লাহর উপর ভরসায় লঞ্চ যাত্রা
সদরঘাট লঞ্চঘাটে দেখা যায়, আল্লার উপর ভরসা করে ঈদে বাড়ি যাচ্ছে দক্ষিণবঙ্গের লাখ লাখ মানুষ। নিরাপত্তার কোন দু:চিন্তা নেই, জীবন মৃত্যু নিয়েও কোন উদ্বেগ নেই। ঈদের আগে বাড়ি যাওয়াটাই মুখ্য তাদের কাছে। ঢাকা থেকে চাঁদপুর, ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, হাতিয়াসহ সব রুটের লঞ্চগুলোর কেবিন বিক্রি হয়ে গেছে ১৫ জুলাইয়ের আগেই। যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন, সাধারণ ভাড়ার কয়েকগুণ বেশি টাকা দিয়ে তাদের টিকিট কিনতে হয়েছে। নৌপথের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কর্মকর্তারা বলেছেন, এবার সড়কের অবস্থা কিছুটা খারাপ হওয়ায় লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী ওঠানো বন্ধ করা যাবে না। সব কিছু ছাপিয়ে এখন স্বজনদের সাথে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করার স্বপ্নে বিভোর ঘরমুখো মানুষেরা।
