গ্রীনলাইন ভলভো বাসটার জানালার পাশে বসায় এই মেঘলা পৃথিবীতে রাতুল এত বুঁদ হয়ে ছিল যে পাশের সিটে বসা লোকটির অস্তিত্ব সে ভুলেই ছিল। পাশের ভদ্রলোকটি ওকে উপেক্ষা করে কথা বলেই যাচ্ছেন। উপেক্ষা এ কারণে—তিনি কারো সাথে কথা বলা শেষ করেই অশ্রাব্য শব্দটা ছুড়ে দিচ্ছেন
‘ব্লাডি ফাকার।’
এমন বাজে শব্দ কানে পড়লেই নীলার মাথা ব্যথা অস্থির মাত্রা পেত। ভদ্রলোকের ব্যবহূত অশ্রাব্য শব্দটা নীলার বাজে স্মৃতিটা উস্কে দেবার জন্য যথেষ্ট। পাশে থাকা মানুষের অন্তর্লোকে যন্ত্রণার সুর তোলা এক ধরনের বড় পাপ, তা অজান্তে হলেও; ভাবল রাতুল।
বিয়ের পর নীলাকে স্বাভাবিক করার জন্য মধুচন্দ্রিমার দীর্ঘ সেই সময়গুলো! ‘আহ, নীলা! কেন তুমি এই পৃথিবীটাকে এত ভালোবাসতে শেখালে। ভালোবাসতে শিখে ঘৃণা করতেও যে কষ্ট হয়!’ রাতুল প্রাণপণে সব ভুলতে চাইল। তার সে চেষ্টা যত সূক্ষ্ম হলো, হাসপাতালে কাটানো নীলার শেষদিনগুলো দৃশ্যকল্প হয়ে ততই ভাসতে থাকল। নীলা আর এই মেঘের আড়ালে লুকানো আলোহীন দিনের কোলে খেলা করা কীসের এক বেদনা কেড়ে নিয়েছে রাতুলের চোখের আলোর উচ্ছ্বাস। উচ্ছ্বাস হারানো মানুষ বুঝি সবার উপেক্ষার পাত্র হয়! না হলে এমন সুদর্শন চোখের যুবকের পাশে বসে আরেকজন কীভাবে স্পষ্টতই উচ্চারণ করে ‘ব্লাডি ফাকার!’
মোবাইল ফোনের লাইন কেটে দেওয়ার পর কারো উদ্দেশে একজন ভদ্রলোককে কেন খারাপ শব্দ ব্যবহার করতে হয়, ভাবছিল রাতুল। সেই ভাবনা থেকেই হয়তো রাতুল তার পাশের লোকটির অনবরত মোবাইলে বলা কথাগুলোর দিকে মনোযোগ দিল। তিনি বলছেন, ‘ওয়ালাইকুম। ভালো আছেন শাকিল সাহেব?... ওহ, মিটিং করছেন? দ্যটস নাইস... ভালোই হলো, আপনি আমার সার্কুলারটা পেয়েছেন তো?... ওই যে মেট্রিয়ন আইভি ইনজেকশন নিয়ে...? পেয়েছেন! গুড, গুড, আমি জানি ইউ আর ভেরি সিনসিয়ার। ... ওহ গড! সাথে প্রিন্ট কপিও এনেছেন! সো লাভলি! শুনুন, যেহেতু এখন মিটিং চলছে, এই সুযোগে আপনি সবাইকে আমাদের কোম্পানির তৈরি লেটেস্ট এই মেডিসিনটা সম্বন্ধে জানিয়ে দিন... এই যেমন অন্যান্য কোম্পানি ইনজেকশনটা প্লাস্টিক কন্টেইনারে প্যাকেট করলেও আমরা সাইড-ইফেক্ট কমানোর জন্য কাচের বোতলে তা প্যাকেট করছি, তাতে আমাদের এক্সট্রা পনের টাকা বেশি খরচ হবে।... যাহোক আপনি ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছেন তো?... জি, তিনশত উনসত্তর টাকা। ... হা, হা, একটা ইনজেকশনের জন্য। ... আহা, শাকিল সাহেব, ডিলাররা ছয়টা কিনলে একটা তো ফ্রি পাচ্ছেই। এই কথাগুলো তাদের বুঝিয়ে বলতে হবে, নিশ্চিত জানবেন এ ব্যাপারে আপনি আমার আস্থাভাজন ... না, আপাতত ইউরোপের মার্কেটের জন্য আমরা ওয়ান ক্রোর প্রোডাক্ট করছি, তবে আমাদের মূল টার্গেট বাংলাদেশের মার্কেট।’
ফোনের অন্য-প্রান্তের ভদ্রলোক দীর্ঘক্ষণ কথা বললেন। এই রাতুলের পাশের ভদ্রলোক হা, হু। রাইট বলে চললেন ‘ইয়েস, ইয়েস... অ্যাবসল্যুটলি। আপনি জানেন মি. শাকিল, দ্যাটস হোয়াই আই লাইক ইউ সো মাচ। আপনার মতো করে মার্কেটটা আর কেউ-ই জাজ করতে পারে না। ইউ আর সো ডাইনামিক অ্যান্ড কিউট অ্যা পারসন টু বি চুসেন ব্যই অল...’ তিনি ফোনের লাইন কেটে দিলেন। অস্ফুট স্বরে বললেন, ‘অ্যা স্টুপিড মানি-মংগার!’ ফোন রাখার ফুরসত্ নেই তার। বোঝাই যায় ওষুধ কোম্পনির ঝানু এই পদস্থ কর্মকর্তা সব জেলার প্রতিনিধিদের সাথে ফোনালাপ সারবেন এই বাস-যাত্রাতেই।
‘অর্জুন সাহেব, কেমন আছেন? হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমিও ভালো, থ্যাঙ্ক ইউ। আপনি আমার সার্কুলারটা পেয়েছেন তো?... ইয়েস ইয়েস মেট্রিন আইভি ইনজেকশন নিয়ে? অলরেডি কাজও শুরু করে দিয়েছেন? দ্যাটস লাভলি। আপনার এই কোয়ালিটি আমার অসম্ভব পছন্দ, ইউ নো! সেদিন কথায় কথায় কাকে যেন আপনার কথা বলছিলাম যে অর্জুন সাহেবের মতো দশজন লোক পেলে আমি পুরো কোম্পানির গতি আরো বিশভাগ বাড়াতে পারতাম। রিয়েলি! ... কী বললেন? ... অন্য কোম্পানি ইনজেকশনটা বাজারে তিনশত তেত্রিশ টাকায় বিক্রির সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সেটা আমি জানি। কে কী করছে সে তথ্য জানার জন্য কি কম পয়সা খরচ করি, বলুন? সেজন্যই তো আপনাদের সার্কুলারটা দিলাম যেন আগেই আপনারা জোরেসোরে প্রচারণায় নামতে পারেন।’
এতক্ষণ বিভিন্ন জনের সাথে কথোপকথনের সূত্রে রাতুল কল্পনা করতে পারছে ফোনের অপর প্রান্তের কর্মকর্তা কী বলতে পারেন।
‘কিন্তু স্যার, মানুষ পঞ্চাশ টাকা বেশি দিয়ে কি আমাদের প্রোডাক্ট কিনতে চাইবে?’
‘আহা, অর্জুন সাহেব! শুনুন, মধ্যবিত্ত পরিবারের কেউ-ই আমাদের টার্গেট নয়। এটুকু বোঝেন তো অবৈধ পয়সার মালিক আর তাদের সন্তানরা এই প্রোডাক্টগুলো বেশি ব্যবহার করবে। এইসব মানুষদের মৃত্যুভয় আর পুলিশভয় দুটোই বেশি। সুতরাং দীর্ঘদিন বাঁচার আশাতে তারা কোয়ালিটি-প্রোডাক্ট প্রেফার করবে।’
‘আমাদের প্রোডাক্ট আর তাদের প্রোডাক্টের ম্যাটেরিয়াল তো একই!’
‘হ্যাঁ, একই। কিন্তু আমরা তো কাচের বোতল ব্যবহার করছি। এজন্যই আমাদের অন্তত পনের টাকা বেশি খরচ হচ্ছে। আর প্রোডাক্ট-কস্টের চার গুণ লাভ না করলে আপনি তো টিকতে পারবেন না।’
‘রাইট, রাইট স্যার।’ ভদ্রলোক ফোনের লাইন কেটে দিলেন এবং অর্জুন সাহেবের উদ্দেশে অস্ফুটস্বরে বললেন, ‘অ্যা কমপ্লিট অ্যারোগেন্ট... স্কাউন্ড্রেল!’
ভদ্রলোক ফোনে অনবরত কথা বলে যাচ্ছেন। রাতুলের মনে হলো, তার কানের পাশে এক ঝিঁঝিঁ পোকা প্রাণান্ত স্বরে ‘মেট্রিয়ন আইভি’ ‘মেট্রিয়ন আইভি’ বাজারজাতকরণের কলাকৌশল বর্ণনা করছেন। সবাইকে প্রশংসা বাক্য শুনিয়ে তার কথা শুরু হলেও, কথা বলা শেষে তিনি সবার উদ্দেশে বাজে বিশেষণ জুড়ে দিচ্ছেন। তার মাঝে সবচেয়ে জোড়ালো বিশেষণ ‘ব্লাডি ইডিয়েট’।
দুই
বাসটা ভৈরব অতিক্রম করল। বাইরে বৃষ্টিফোঁটারা ঘন হচ্ছে। কার্তিকের শুকিয়ে আসা হাওড়-বিল আর নিম্নাঞ্চলে এই আবহাওয়াতেও জেলেরা আকুল হয়ে খুঁজে ফিরছে মাছদের জ্ঞাতি-গোষ্ঠী। পাশের ভদ্রলোকের ‘মেট্রিয়ন আইভি’ নামের প্যাঁচাল থেকে বাঁচার জন্য রাতুল এই দৃশ্যকল্পের ভেতর ডুব দিতে চাইছিল। নীলার ‘হেমন্তের-কুয়াশা’র ভেতরে সে মগ্ন হতে চাইছিল। কিন্তু পাশের সিটের ভদ্রলোকের মুখ-নিঃসৃত ‘ইরেকটাইল ডিশফাংশন’ শব্দটা ওর মগ্নতায় যেন ককটেল ছুড়ল। ভদ্রলোকের বিভিন্ন জনের সাথে দীর্ঘক্ষণ কথোপকথন শুনে রাতুল ধরেই নিয়েছিল, মেট্রিয়ন আইভি ইনজেকশনটা মাদকাসক্তি নিরাময়ের কোনো ওষুধ। মেট্রিয়ন আইভি ইনজেকশনটা তাহলে মাদকাসক্তি নিরাময়ের কোনো ওষুধ নয়! রাতুলের কানের ভেতরের কোনো এক উত্সাহী ইন্দ্রিলার জন্য তোলপাড় হওয়া হূদয়ের আবেগকে চাপা দিল। রাতুল এবার তার কথোপকথন শুনে বুঝল, তিনি মাহবুব নামের শরীয়তপুর জেলা-প্রতিনিধির সাথে কথা বলছেন—‘হ্যাঁ, তা ঠিক ইডি (ইরেকটাইল ডিশফাংশন) সমস্যা সমাধানে আমাদের চেয়ে হার্বাল-মেডিসিন এগিয়ে। কিন্তু মাহবুব সাহেব, ওরা ভালো করছে আমরা এতদিন মাঠে সেভাবে নামিনি বলে। এটাই হয়; এসব হার্বাল-বৈদ্যরা প্রথম গাছ-গাছড়ার পাতা-লতা দিয়ে কোনো কোনো ওষুধ তৈরি করে আর সেটা উত্পাদন এবং তার প্রচারের ম্যাসিভ ম্যাকানিজম আমরাই শেষমেষ আয়ত্ত করি। কর্পোরেট শাখাগুলোর বিস্তৃতি এভাবেই করতে হয়।’ রাতুল কল্পনা করল, অন্যপাশ থেকে মাহবুব সাহেব প্রত্যুত্তর করছেন—‘কিন্তু স্যার, হার্বালের কর্তাব্যক্তিরা এই কর্পোরেটনীতি শিখে গিয়েছে।’
‘যেমন?’
‘যেমন মডার্ন হার্বাল গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেবের বাড়ি আমাদের শরীয়তপুরে। তিনি বৈদ্য-পথ্য বিক্রি করে কি এতবড় হাসপাতাল, বাড়ির সাথে চিড়িয়াখানা, আর ঢাকায় বড় বড় দুটি এতিমখানা চালাচ্ছেন? তার প্রোডাক্টগুলো এমএলএম-চক্র অনুসরণ করে ভোক্তার হাতে পৌঁছায়। কর্পোরেট নীতির চেয়েও তিনি আরো এক ধাপ অগ্রসর। জিনসেং, হার্বস-জুস, হালুয়ায়ে মর্দ এই নামগুলোর মতো শক্তিবর্ধক তথা উত্তেজক ট্যাবলেটগুলোকে তিনি ওষুধ নাম না দিয়ে বলছেন, এগুলো সম্পূরক খাদ্য!’
‘হ্যাঁ, চিপ সেন্টিমেন্ট আর চিপ-ম্যাটারিয়াল দিয়ে তারা দেশের মার্কেটগুলো দখল করেছে।’
‘স্যার, সস্তা হলেও মনে হয় ওগুলো কাজ করে...’
‘আরে ধুর! তবে শুধু ই ডি সমস্যার মেডিসিন দিয়ে আমরা মার্কেট ধরতে পারব না। আমাদের দেশে প্রিচম্যাচুউর ইজাকুলেশনের সমস্যা ই ডি’র চেয়ে বেশি। এটা ঠিক, এই পি ই’র ট্রিটমেন্ট ওরা আমাদের চেয়ে ভালো করে। চিন্তার কারণ নেই পি ই’র জন্য আমরা আরো দুটা ট্যাবলেট অচিরেই বাজারে আনার প্ল্যান করছি। এর জন্য আমরা সস্তা উপকরণ ব্যবহার করব। কমদামে ট্যাবলেটগুলো বাজারে ছেড়ে আমরা প্রাথমিক পর্যায়ের কম্পিটিশান সেরে ফেলব...’
রাতুলের আর শুনতে ইচ্ছা করছিল না। জীবনে ভুল করেও কাউকে গালি দেওয়ার স্মৃতি না থাকলেও পাশের লোকটির প্রতি সে অস্ফুটস্বরে উচ্চারণ করল ‘ব্লাডি ইডিয়েট’। শীত শীত অনুভব জেঁকে ধরেছিল ওকে। বাস কর্তৃপক্ষের সরবরাহ করা কম্বলটা শরীরে জড়িয়ে সে মনে মনে নীলার শরীরের উষ্ণতা খুঁজে ফিরল। হারিয়ে গেল সে নীলার মৃদু-কম্পিত ছোট-ছোট স্বপ্নলোকের ঘোরে।
একটা শরীর বাঁক খেয়ে কেঁপে কেঁপে উঠছে রাতুলের বুকের ভেতর। যন্ত্রণায় গোঙ্গানির মতো শব্দগুলো মিলিয়ে যায় নীলার। হূদয়ের যে স্বপ্নলোক ঢেকে গিয়েছিল ভয়ার্ত আঁধারে, নীলার অন্তর্লোকের সেই মায়াবী হূদ-কোঠায় প্রতিদিন ভালোবাসার জল-সিঞ্চন করে, মমতা দিয়ে তার হূদয়ে জ্বেলে দিয়েছিল এক আশার প্রদীপ। যন্ত্রণাময় লাঞ্ছনার স্মৃতি থেকে তাকে প্রতিদিন একটু একটু ফেরানোর রাতুলের সাধনা সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। স্বপ্নে গড়া এক পৃথিবী একবার হারিয়ে গেলে তা কি আর ফিরে পাওয়া যায়!
তিন
মা এসে দাঁড়িয়ে আছেন দরজার চৌকাঠে। শুক্রবারের এই ভোরে তিনি মাত্র পার্ক থেকে হাঁটা শেষ করে এসেছেন। মা বলছেন, ‘আজ তোর নাজরীন আন্টির বাসায় আমাদের লাঞ্চের নিমন্ত্রণ। তোকে নিয়ে যেতে বলেছে। আর তোর সাথে কথা না বলেই আমি বলেছি যে তোকে নিয়েই আজ আমি তার বাসায় যাচ্ছি।’
এবং সত্যি সত্যি রাতুল নিজেকে নীলাদের ড্রয়িংরুমে আবিষ্কার করল। ওর সামনে নাস্তার ট্রে নিয়ে উপস্থিত হওয়া ঋজু শরীরের প্রায় নারী হয়ে ওঠা মেয়েটা রাতুলকে তার অন্তর্লোকের ভেতর থেকে একটানে বের করে আনল আলো-বাতাসের সাথে ধূলির খেলাময় এক বাস্তব পৃথিবীতে। যে পৃথিবী এক তরুণীর মায়াবী তবু যেন ছলনার হাসিতে গতিময়। নীলার মুখটা যেন জ্বলছে জ্বলজ্বল। সেই জ্বলজ্বলে জ্বলা অংশটায় বাম ঠোঁটের শেষপ্রান্তের একটু ওপরে একটা লাল তিল।
‘আমি নীলা। মা’র কাছ থেকে আপনার এত গল্প শুনেছি! যাক শেষে তবে এলেন; আমি তো ধরেই নিয়েছিলাম আপনার পায়ের ধুলো আর এ বাড়িতে পড়বে না!’ যেটুকু কথা রাতুল মনে মনে সাজিয়ে নিয়েছিল, নীলার কথায় সেটুকু হারিয়ে গেল। নীলা ওকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে অস্বস্তি কাটাতেই সে বলল, ‘আমি আসলে...’ আসলে রাতুল যা বলতে চাইল তা সে নিজে বুঝতে না পারলেও নীলা যেন তা জানেই—
‘আপনার সবগুলো উপন্যাস আর সেদিন পত্রিকায় প্রকাশিত গল্পটা পড়ে ভেবেছিলাম, আপনার চোখে ভারী চশমা থাকবে। কেন ভেবেছিলাম জানি না, তবে গল্পটা পড়ে আমি কেঁদেছিলাম।’
জলজ্যান্ত এক রূপসী, যার রূপের আগুনে ঝলসে উঠছে এই ঘর, তার মুখে প্রশংসা শুনে বাঁচতে বাঁচতে মরে যাওয়ার এমন অনন্য আর মহিমান্বিত অনুভূতিতে ডুবে গিয়ে লাজুক হয়ে উঠল রাতুলের চাহনি। নীলাই আবার বলল, ‘যারা মানুষের ভেতরের অনুভবকে এমন মোচড় দিয়ে জাগাতে পারে, তাদের মুখে আসলে কথা মানায় না। আপনাকে দেখে আমি তা-ই বুঝলাম। আর...যার উপন্যাস পড়ে কেঁদেছিলাম, সামনে পেয়ে তাকে মন ভরে দেখলাম। আপনার গল্পের মতোই আপনি সুন্দর...’
বলেই প্রজাপতির মতো হারিয়ে গিয়েছিল নীলা। সারাজীবন প্রশংসা শুনে অভ্যস্ত রাতুল নীলার প্রশংসায় কেন ওমন অসাড় বসে রইল তার কারণ ক্রমশ ওর কাছে স্পষ্ট হচ্ছিল। তার অন্তর নীলার প্রশংসায় ফিসফিস করছিল ‘আর আমার গল্পের ভাঁজে লুকানো গল্পের চেয়েও তুমি শিল্পময়। গদ্যের ছন্দে বসানো সুরের চেয়েও তুমি গতিময়। উপন্যাস সৃষ্টির জন্য যেটুকু প্রেরণা প্রয়োজন তুমি তার চেয়েও প্রেরণাময়ী-প্রতিভাময়।’
অদ্ভুত এক ভালোলাগায় স্বভাব-বিরুদ্ধ তবু মায়াময় এক অন্তর্জালে আটকে গেল রাতুল। অজান্তেই সেদিন হূদয় সমর্পণ! তারপর তাদের জোছনায় ভেসে যাওয়া রাত-দিন। রাতে ছাদের টবের গাছগুলোর পাশে একে অন্যের পাশাপাশি বসে স্বপ্নবোনা দিন-রাত।
‘আমাদের একটা ঘর থাকবে... প্রিয় সব বই দিয়ে আর তোমার লেখার সরঞ্জামাদি দিয়ে পরিপাটি করে সাজানো। আমার জন্য থাকবে একটা রোলিং চেয়ার, তুমি লিখবে। দোল খেতে খেতে আমি পড়ব। ঘরটার কী নাম দেবো জানো?’
‘কী...?’
‘উপন্যাসালয়।’
‘এটা আমাদের ফ্লাটের নাম হলে কেমন হয়?’
অনেক কথা বলা নীলা রাতুলকে এত কাছে পেয়ে যেন কথা বলতে ভুলেই গেছে।
চার
দুপুর কখন গড়িয়ে গেছে মেঘের আড়ালে। শীত-শীত ভাবটা আরো বেড়েছে। গায়ে কম্বল জড়িয়ে রাতুল তার উষ্ণতার ভেতরে নিমগ্ন হওয়ার চেষ্টা করল। একটা দুর্ঘটনা-জট পার হয়ে গেল বাসটা। অনেকগুলো মানুষ নাকি মারা গেছে দুর্ঘটনায়। সেটা বাসযাত্রীদের আলোচনায় এল না। বরং সবাই সেই দুর্ঘটনা-জট অতিক্রম করায় সুখী মানুষের গুঞ্জন তুলে আবার কম্বল-উষ্ণতার ভেতরে তলিয়ে গেল তারা। হূদয় তোলপাড় করা কী এক চিনচিন ব্যথায় রাতুল ক্লান্তির তন্দ্রায় ডুবে গেল।
‘প্লিজ নীলা, ওটা নিছক একটা দুর্ঘটনামাত্র! দুর্ঘটনায় মানুষের অঙ্গহানিও হয়... তোমার তো...’ হিংস্র ভঙ্গিতে নীলা খামছে ধরছে রাতুলের মুখ... নগ্ন শরীরের নীলা আকুল হয়ে নিজেকে লুকিয়ে কাঁদছে...! মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বলছেন, ‘দ্যাট মিনস, ইট ওয়াজ নট এক্সাক্টলি অ্যা রেপ কেস, সি হ্যাড বীন ইন্টারেস্টেড ঠু...’
নীলা টলটল জলে ভরা চোখ দুটোতে আকুতি এনে বলছে, ‘ক্যান ইউ প্লিজ কিল দেম? সামান্য কিছু পয়সা খরচ করলেই হবে...’
পাঁচ
‘ব্লাডি ফাকার!’—পাশের ভদ্রলোকের হঠাত্ ছোড়া শব্দ দুটো রাতুলের তন্দ্রা কেড়ে নিল। কিন্তু আধো-জাগরণ আধো-স্বপ্নে দেখা নীলার মুখটা ওর চোখের সামনে এখনো এমন করে ভাসছে যেন হাত বাড়ালেই সে নীলাকে ধরে ফেলতে পারবে। নীলাহীনা এই পৃথিবীটা কেমন অচেনা! বিষণ্ন আকাশটার দিকে তাকাল রাতুল...
রাতুল চুপি চুপি মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে গিয়েছে। তিনি মনোযোগ দিয়ে রাতুলের কথা শুনলেন। তারপর ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলেন,
‘আপনার স্ত্রীকে যারা ধর্ষণ করল, ওরা সবাই কি...’
‘হ্যাঁ, ওরা সবাই ওর বন্ধু। সহপাঠি। একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ওরা একই ক্লাশে পড়ত।’
‘আপনার বিয়ের পরের ঘটনা?’
‘না, বিয়ের আগেই ঘটনা ঘটেছিল। তবে... আমাদের প্রেম হওয়ার অনেক পরে ঘটনাটা ঘটেছিল।’
‘আপনি জেনেই... মানে বলছি, মিসেস নীলা বিয়ের আগে বিষয়টা জানিয়েছিল?’
‘হ্যাঁ, জানিয়েছিল।’
‘আপনি মেনে নিতে পেরেছেন?’
‘আমি নীলাকে কোনো কিছুর বিনিময়ে হারাতে চাইনি। আমি ওকে ভালোবাসি।’
‘ভেরি প্লেটোনিক লাভ! এ যুগে আপনার মতো মানুষ পাওয়া মুশকিল। কিন্তু আপনি ঘটনাটা মেনে নিলে আপনার স্ত্রী কেন নিজের গন্ধ নিজেই ঘাঁটাচ্ছে বলুন তো?’
রাতুল ডাক্তারের এমন নির্মোহ নিসপৃহতায় বিরক্ত হলো। তবু ধৈর্য না হারিয়ে বলল, ‘বিয়ের আগে এক জোছনাভেজা রাতে আমি নীলাকে একান্তে পেয়ে সংযম হারাতে বসেছিলাম। নীলা আমাকে থামিয়েছিল। কিন্তু তার কয়েকদিন পরই ওর বন্ধুরা ওকে রেপ করে...’
‘আপনি মিসেস নীলাকে তার বন্ধুদের সাথে একা ছেড়ে দিলেন?’
‘ওটা ছিল শিক্ষাসফর।’
হতাশ হয়ে রোলিং চেয়ারটা এপাশ ওপাশ করালেন তিনি। চশমার ফাঁক দিয়ে রাতুলকে মনোযোগ সহকারে দেখলেন। ‘কী দুর্ভাগ্য দেখুন। আপনার মতো একজন স্বনামধন্য রাইটারের ঘরে ...! আর শিক্ষাসফরে এমন ঘটনা! শিক্ষকরা ছিলেন না? অবশ্য এখন তো পুঁজিবাদী শিক্ষা, পুঁজিবাদী শিক্ষক! যে সমাজ নিজ ভাষা ছেড়ে অন্য ভাষায় বিদ্যার্জন করে, যেখানে সামাজিক শিক্ষা হারিয়ে যায়, যে সমাজের ইতিহাস এমনকি আপনার মতো একজন ঔপন্যাসিক পুঁজিবাদের খপ্পরে পড়ে, সেখানে ভোগবাদী এক উচ্ছৃঙ্খলতা তৈরি হয়।’
রাতুলের পাণ্ডিত্যপূর্ণ কোনো বিষয় এখন শুনতে ইচ্ছা করছে না। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আবার বললেন, ‘যাহোক, আমার একটা বিষয় জানা জরুরি। তারা কীভাবে আপনার স্ত্রীকে ধর্ষণ করেছিল? মানে সে কি তখন ঘুমাচ্ছিল? তার হাত-পা তারা কি বেঁধে ফেলেছিল? তার মুখ কালো টেপ দিয়ে কি তারা বন্ধ করে দিয়েছিল?’
‘তারা চা অথবা পানির সাথে কৌশলে নীলাকে উত্তেজক ওষুধ খাইয়েছিল।’
‘দ্যট মিনস, ইট ওয়াজ নট এক্সাক্টলি অ্যা রেপ, সি হ্যাড বিন ইন্টারেস্টেড ঠু অফ ডুয়িং সাচ অ্যান অ্যাক্ট...’
এই ডাক্তারকে সজোরে একটা চড় কষালে কেমন হয়? ভাবল রাতুল। একজন লেখক হিসেবে এখন তার এই মনোরোগ বিশেষজ্ঞের চরিত্রের আদ্যোপান্ত জানতে ইচ্ছা করছে। মুখ থেকে বাংলায় কথাগুলো আসে না যেন! তাই সে ইংরেজিতে বলল, ‘নো, সি হ্যাড বিন গাং রেপড...’
‘ওকে...’
‘ওর বন্ধুরা দোতলা থেকে পাহাড়ি-লেকটা দেখার প্রলোভন দেখিয়ে নীলাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল। ঘর বন্ধ করে হঠাত্ ছেলেগুলো নগ্ন হয়ে গেলে নীলা লজ্জায় মুখ ঢেকে বের হয়ে আসতে চেয়েছিল। হাত জোড় করে ওদের মিনতি করেছিল।’
‘তারপর?’ এই লোকটা কি আসলে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ? সন্দেহ হলো রাতুলের। দুর্বৃত্তগুলো কীভাবে স্ত্রীকে ধর্ষণ করেছিল তার বিবরণ কেউ কি জানতে চায়, না চাইতে পারে, তারই স্বামীর কাছে? তবু রাতুল ভদ্রতা করে বলল, ‘দুর্বৃত্তগুলো নীলার মিনতির প্রত্যুত্তরে ভদ্রতা করেছিল।’
‘মানে?’
‘ওরা নীলাকে বলেছিল যে, আমরা সবাই ইয়াবার সাথে একটা ‘ভি’ নামের পাওয়ারফুল ইনজেকশন নিয়েছি। তুমি রাজি না হলে আমাদের কিছুই করার নেই... ইউ বেটার এনজয় দ্য মোমেন্ট।’
‘হোয়াট অ্যা স্কাউন্ড্রেল, ব্লাডি ফাকার!’
ছয়
‘অল ব্লাডি ফাকার!’ শব্দগুলো রাতুলের পাশের সিটে বসা ভদ্রলোক চরম বিরক্তি নিয়েই বললেন। তাতে আশপাশের যাত্রীদের তন্দ্রা পালিয়েই ফিরে এল। আর রাতুলের কাছ থেকে নীলা-ঘোর হারানো বিবর্ণ সময় ফিরে এল। পাশের ভদ্রলোক প্রিম্যাচিউর ইজাকুলেশন নিয়ে যে দুটা ট্যাবলেটের নাম জেলা প্রতিনিধিদের জানাতে চেয়েছিলেন, সেই দুটা ট্যাবলেটের নাম জানতে চেয়ে একের পর এক ফোন আসছে। আর তিনি তন্দ্রা ভাঙার বিরক্তি নিয়ে বলছেন ‘আহ! পি ই সমস্যার জন্য ট্যাবলেটগুলো তো আমরা মার্কেটে আনিই-নি। এখনই এগুলোর নাম নিয়ে সবাই মেতে উঠলেন কেন?’
একটার পর একটা মেসেজ টোনের শব্দে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে ফোনটা বন্ধ করার জন্য উদ্যত হয়েও তিনি একটা মেসেজ খুলে পড়ার জন্য মোবাইল স্ক্রিনকে কিছুটা আলোর দিকে এমনভাবে মেলে ধরলেন যে রাতুল তা অনায়াসে পড়তে পারল। রাতুল পড়ছে—
‘স্যার, দয়া করে এখনই পি ই সমস্যা সমাধানের ট্যাবলেট দুটার নাম জানালে কৃতার্থ হই। মিটিংয়ে যেহেতু সবাইকে পেয়েছি, নামগুলো জানলে আমরা এখন থেকেই প্রচারণায় নামতে পারতাম। সবাই বলছে মেট্রিয়ন-আইভির চেয়ে এই ট্যাবলেটগুলো ভালো চলবে। পুরো দেশটাই প্রি-ম্যাচিউর ইজাকুলেশনের দেশ কিনা!’
মেসেজ পড়ার ফাঁকে আরো কয়েকটা মেসেজ এল। দ্রুত সুইচ-অফ বাটন চেপে মোবাইলটা বন্ধ করে তিনি গায়ে কম্বল জড়াতে জড়াতে বললেন, ‘অল আর ব্লাডি ইডিয়েট!’
সাত
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বললেন, ‘স্ত্রীকে সময় দিন। ওর ভেতরের জৈবিক প্রবৃত্তি নিজ থেকে জেগে না উঠলে, আপনার উচিত হবে না তাকে বিছানায় নেওয়া।’ বিশেষজ্ঞের কথায় রাতুল শূন্য আর হতাশ দৃষ্টি মেলে তাকাল। রাতুলের বড় বড় মায়াবী চোখের ভাষা বিশেষজ্ঞ পড়তে পারলেন—‘আমি ভিন্ন বিছানার কথা বলিনি। শুধু শারীরিক মিলন...। এটুকু বাদ দিয়ে আপনি তার সাথে যত নিবিড় হবেন ততই মঙ্গল। তবু শুধু বইয়ের ভেতর এই মুহূর্তে চিত্তবিনোদন না খোঁজাই ভালো। আমি আপাতত কিছু হার্বাল ট্যাবলেট দিচ্ছি। এগুলো আপনার স্ত্রীর জৈবিক-চাহিদা বাড়িয়ে দেবে।’
রাতুল ফিরে আসার পথে বিশেষজ্ঞের প্রেসক্রিপশনে চোখ রাখল। ‘জৈবিক-চাহিদা’! তাহলে সে আর নীলা তাদের স্বপ্নের মতো করে পৃথিবীর সেরা সব গ্রন্থ দিয়ে উপন্যাসালয় বানিয়ে ভুল করেছে কি? সেই উপন্যাসালয় মননে এক আলো জ্বালিয়ে তাদের এই সমাজে এতটাই ডুবিয়ে দিয়েছে যে উত্থানের জন্য নীলার এখন উত্তেজক ট্যাবলেট প্রয়োজন! না, সে তার নীলাকে পশু-প্রবৃত্তির মন্ত্র আবিষ্কারে পারঙ্গম এই সমাজের গবেষণালব্ধ বাসি আর আদিম ধারণার সাথে মিশতে দেবে না। নীলা তার মাত্র চলে যাওয়া এক-একটি মুহূর্ত। তার নীলা নির্জন ভোরের শিশিরভেজা অনুভূতি। নীলা তার আত্মার উন্মেষের প্রথম আলোকবর্তিকা। মনোরোগ বিশেষজ্ঞের প্রেসক্রিপশন সে ফেলে দিল খালে।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের একটা পরামর্শ আপাতত খুব কাজে দিলো। নীলার সাথে তার শারীরিক সম্পর্ক যতই কমতে থাকল, ভয়াবহ সেই স্মৃতি নীলাকে ততই কম তাড়া করে ফিরল। কৌশল করে রাতুল আবার পড়ার টেবিলে মগ্ন হলো। কাটতে থাকল সপ্তাহ, মাস, বছর। রাতুল-নীলার শারীরিক সম্পর্ক যখন নিভু নিভু; তখন একরাতে রাতুল অবাক হয়ে লক্ষ করল নীলাকে। রাত প্রায় তিনটা। নীলা রাতুলের পড়ার টেবিলের পেছনে রোলিং চেয়ারটায় মাথা এলিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। নীলার শরীরে পাতলা গোলাপি রঙের রাতের গাউন যার ভেতর দিয়ে তার শরীরের অন্তর্বাস স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আগের চেয়ে কখন যে ওর মুখটা শুকিয়ে গেছে। চোখের কোণের ভরাট লাবণ্য কোটরাগত। তার কণ্ঠের কাছ থেকে কাঁধ বরাবর বিউটি-বোন পুরোটাই বেরিয়ে এসেছে এবং বুকের যে অন্তর্বাস নীলার ছলছল যৌবনকে ধরে রাখতে প্রায় হিমশিম খেত, সেই অন্তর্বাসটুকুই তার ভেতরের সৌন্দর্য শুষে নিয়ে সদর্পে নিজের সৌন্দর্য আর রঙ ছড়াচ্ছে! রাতুল আশ্চর্য হয়ে আরো খেয়াল করল, নীলার চোখের কোল বেয়ে একটু আগেই অশ্রু গড়িয়েছে। রাতুলের জন্য সাজতে গিয়ে নীলার প্রসাধন ব্যবহার করা গালে শুকিয়ে যাওয়া সেই অশ্রুকণাগুলো পথ তৈরি করে রেখেছে। এই নীলাকে তার বড় অচেনা মনে হলো। প্রতিরাতে রাতুলের জন্য অপেক্ষায় থেকে থেকে কখন সে এ ঘর থেকে চুপ করে নিজের দুঃখের কাছে ফিরে যাওয়ার সাধনা রপ্ত করেছে! নীলাকে সে শক্ত করে বুকের সাথে জাপটে ধরতেই নীলার ঘুম ভাঙল। লজ্জা পাওয়া নির্মোহ কণ্ঠে নীলা বলল, ‘দুঃখিত!’
রাতুল বিস্ময়মাখা স্বরে প্রশ্ন করল, ‘দুঃখিত কেন?’
‘তোমার লেখার ডিস্টার্ব করলাম...’ রাতুল ওকে বিছানায় শুইয়ে দিল এবং নীলার সাথে অভিমান করে বলল—
‘কেন তুমি ওভাবে আমার জন্য অপেক্ষা করে শেষে চুপি চুপি চলে এসেছ? কেন তুমি বিছানায় আসার সময় আমাকে জোড় করে টেনে আনোনি?’
‘এতবড় ঔপন্যাসিককে ডাকার কী এমন যোগ্যতা আমার আছে বলো? এই নোংরা শরীরের সামান্য প্রলোভন! আমি তো জানি আমার এই নষ্ট শরীরটা তোমাকে আর টানে না।’
নীলাকে সুস্থ করার ভাবনায় তার দৈহিক আকর্ষণকে অতিক্রম করতে গিয়ে সে কি তাকে আরো অসুস্থ করে ফেলেছে? নীলাকে বাদ দিয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ আর উপন্যাস-জগত্ এতটাই জরুরি হলো যে, সে নীলার ক্ষয়ে ক্ষয়ে নিঃশেষ হয়ে যাওয়াটা খেয়াল করল না। নিজের ওপর রাগ থাকলে মানুষ মনে হয় সেই রাগেরই পক্ষে প্রিয় মানুষের সমর্থন চায়। ‘এই-ই চিনেছে তবে নীলা তাকে!’ —এমন ভাবনায় সে নীলাকেই আসামী করল—‘যখন অনুভব করো, আমার আকর্ষণ কমে যাচ্ছে; তখন তুমি তা জাগিয়ে দাওনি কেন?’ কোনোদিন রাগ করতে না জানা নীলা রাতুলের এই প্রশ্নে বড় অসহায় বোধ করল। অন্ধকারে নীলার দুই ঠোঁটে থরথর কাঁপন বয়ে গেল। জীবনে এই প্রথম ওর নিজের জন্য বড় মায়া হলো। যে মায়া নামের শব্দকে রাতুলের কাছে পরম নির্ভরতায় গচ্ছিত রেখেছিল বলে সে প্রতিরাত, প্রতিটি ক্ষণ রাতুলের সান্নিধ্যের জন্য প্রতীক্ষায় থেকেছে। আকুল কামনায় চেয়েছে তার ভালোবাসার মানুষ তার শরীর নিয়ে খেলায় মেতে উঠুক... তার মনটা নিয়ে পানসিভেড়া নদীতে পাল উড়াক। কিন্তু আজকাল রাতুল সেই মনটা নিয়ে দিগন্ত পাড়ি দিতে গিয়েও কেন নিঃসীমে আর হারিয়ে যায় না—নীলা প্রথমে তা না বুঝলেও; এখন অনুভব করে, তার নষ্ট শরীরে উত্সবমুখরতা মানে হয়তো রাতুলের কাছে নিছক বাড়াবাড়ি।
অথচ নীলা কোনোদিন বোঝেনি; কোনো এক মনোরোগ বিশেষজ্ঞের ব্যবসার থলির ভেতর থেকে তার প্রিয় ঔপন্যাসিক ধার করে এনেছে জীবনের উত্থান-সূত্র!
সেই শীতলতা একদিন কেটে গেল। রাতুলের এক উপন্যাসের অনুবাদ তাকে আন্তর্জাতিক এক পুরস্কার এনে দিল। সাংবাদিক, পত্রিকা, টিভি সব এড়িয়ে রাতুল মেতে উঠল নীলা-সাধনায়। কিন্তু তবু খ্যাতি যেন কেড়ে নেয় প্রিয় মানুষকে। নীলাও চাইল না, রাতুল শুধু তার দু’বাহুর মাঝখানে বন্দি হয়ে থাকুক। প্রয়োজন এখন স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া এমন এক উপহার, যাকে নিয়ে কেটে যাবে তার রাত-দিন। সেই চাওয়া একদিন সত্যি হলো। গর্ভে সন্তান আসায় নীলা নতুন করে ফিরে পেল তার উচ্ছলতা। আর ঠিক তখনই নীলাকে নিয়ে ছড়িয়ে পড়ল রসালো গল্প। এই গল্প ছড়িয়ে পড়ল রাতুলের ঔপন্যাসিক হিসেবে বিস্ময়কর উত্থানের সূত্রে। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারই পয়সার বিনিময়ে একজন ঈর্ষাকাতর লেখকের কাছে বিক্রি করে দিলেন রাতুলের ঘরের গল্প। সহপাঠী দ্বারা নীলার ধর্ষিত হওয়ার গল্প কৌশলে ছাপানো হলো অপরাধ বিচিত্রায়। এরপর তা বিস্তৃত হতে থাকল। ভয়াবহ এই মানসিক চাপ সহ্য করার ক্ষমতা নীলার ছিল না। একদিন সে অজ্ঞান হয়ে পড়ল। অজ্ঞান নীলাকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে পাগল হওয়ার যোগাড় হলো রাতুলের। টিভি ক্যামেরাগুলো তাকে সারাক্ষণ ঘিরে থাকল। সে তাদের একটাও প্রশ্নের উত্তর দিল না। কয়েকদিনের অসংখ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ডাক্তার একদিন দুঃখিত কণ্ঠে জানালেন,‘আমরা খুবই দুঃখিত। মিসেস রাতুল ব্রেন-ক্যান্সারে আক্রান্ত। তার ভেতরে চরম এক দুঃখবোধ ব্র্রেন-টিউমারটাকে ক্যান্সারে ছড়িয়ে দিয়েছে!’
অবশ দু’পায়ে রাতুল নীলার শ্বেত-শুভ্র বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। শুকিয়ে আসা শরীরেও গর্ভবতী স্ত্রীর সামান্য পুষ্ট আর স্ফীত তলপেটটায় আলতো মাথা রেখে টলটল চোখে নীলাকে বলল, ‘আমাদের বেবির কী নাম রাখবে?’ নীলা আবেগী রাতুলের মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বলল—
‘আমার সারাটা দিন যায় আমার বেবির কথা ভেবে ভেবে! জানো রাতুল, আমার হূদয় অনেক অহংকারী হতে যখন শিখল, ঠিক তখন... তবু আমি শক্ত আছি। শুধু তোমার জন্য...’
‘শুধু আমার জন্য? কী...’
‘নাহ... কিছু না। জানো এত অসংখ্য নাম আসে মনে। নীরা, রায়ান, নীরব, নীড়... কিন্তু কোনোটাই চূড়ান্ত করতে পারি না। এতবড় এক মানুষের সন্তান আমার গর্ভে, যে-সে নামে কি আর হবে বলো!’
হাসপাতাল থেকে বাসায় এলে রাতুলের সব এলোমেলো লাগে। কলমটা টেবিলের একপাশে পড়েই থাকে। পড়ে থাকে মার্কেজ অথবা ভি এস নাইপল। লেখা পাতাগুলো উড়ে বেড়ায় সারা ঘরময়! দিনগুলো কেটে যায় ঘোর-ঘোর শয়ন আর স্বপনের ভেতর। তারপর একদিন ড্রাইভার ছুটে আসে। কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘স্যার আপনাকে এক্ষুনি হাসপাতালে যেতে হবে। ম্যাডাম... আর নেই!’
গর্ভবতী মৃত স্ত্রীর গর্ভে সন্তান রেখেই তাকে কবরস্থ করতে হয়েছে রাতুলকে। নীলার স্মৃতিঘেরা ফ্লাটটা বিক্রি করে ‘উপন্যাসালয়ে’ বসে অস্থির এক রাতে রাতুল লিখল তার জীবনের শেষ লেখা, শেষ কবিতা।
আট
বাংলাদেশ চা গবেষণা ইন্সটিটিউশনের ড.মাইন ফোন করছেন। রাতুল ফোন ধরে নিচু স্বরে বলল, ‘জি, বলুন।’
‘গ্রীনলাইন বাইপাস হয়ে সিলেটে যাবে। ওরা শ্রীমঙ্গল হয়ে যায় না।’
‘তাহলে?’
‘আপনাকে শায়েস্তাগঞ্জের চারমাথার মোড়ে নামতে হবে। আমি জিপ পাঠিয়ে দিয়েছি। ড্রাইভার আপনাকে নিয়ে আসবে।’
রাতুল নামার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিতে গিয়ে আবার পাশের ভদ্রলোকের দিকে ফিরে তাকাল। ভদ্রলোক কবিতা পড়ছেন? হ্যাঁ, কবিতাই পড়ছেন তিনি। কোন কবির জীবন ধন্য হলো দেখতে গিয়ে রাতুল দেখল, তিনি অমিতাভ বচ্চনের লেখা কবিতার অনুবাদ পড়ছেন। ধর্ষিতা দামিনীর মৃত্যুতে ভারতবাসীর উন্মাতাল এবং দুঃখভারাক্রান্ত হূদয়ের সাথে অমিতাভ বচ্চনের হূদয়ও ভারাক্রান্ত। আড়চোখে কবিতার কিছু অংশে চোখ বুলিয়ে নিল রাতুল। কবিতায় তিনি দামিনীর কবরের প্রতি হাজার মোম-আলোক উত্সর্গ করেছেন। ভদ্রলোক ফোনে কাউকে এবার বললেন, ‘দামিনীর মৃত্যুর জন্য তারাও কি কম দায়ী? কবিতার প্যাঁচাল দিয়ে জনগণের কাছে আরো জনপ্রিয় হওয়ার অভিনয় ছেড়ে তার দেশের দেব-দেবীর আইটেম-সং নামের যৌন-উত্তেজক গানের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হলেই সঠিক কাজটি করতেন। পর্নো অভিনেত্রী এনে ভারতীয় মহান ঐতিহ্যের সুমহান সিনেমা তৈরি হচ্ছে! সুড়সুড়ি দিয়ে মোমবাতি জ্বালানো... যত্তসব!’
শায়েস্তাগঞ্জ পৌঁছে ছিপছিপে বৃষ্টি থেকে বাঁচতেই একটা ঔষধের দোকানের ছাপড়ার নিচে আশ্রয় নিল রাতুল। গ্রীনলাইনে পাশের সিটে বসা ভদ্রলোক স্যুটকেস নিয়ে রাতুলের পাশে এসে দাঁড়ালেন এবং দীর্ঘযাত্রায় পাশে বসা রাতুলকে খুব চেনা চেনা লাগায় উল্টা মুখে গাম্ভীর্য আনলেন যেন এক ঝলক দেখার এই কর্মে তিনি তার মূল্যবান সময় অপচয়ে বেদনার্ত। রাতুল জিপটার খোঁজ নিতে যাবে এমন সময় ড. মাঈন আবার ফোন করলেন, ‘সরি মি. রাতুল। আমি খুবই লজ্জিত যে জিপটা এখনো আপনার কাছে পৌঁছায়নি। আমাদের জিপটা জনগণ আক্রমণ করায় সে ওটা ফেলে পালিয়েছে।’
‘আজ কি এদিকে হরতাল?’
‘না, কী আর বলব... একটা প্রাইভেট কার ধাক্কা দিয়েছিল এক রিকশাকে। রিকশার আরোহী কিশোর মারা যাওয়ায় গ্রামবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে সব প্রাইভেট গাড়ি ভাংচুর করছে। কিছু মনে না করলে আপনি যদি হবিগঞ্জের বিরতিহীন পরিবহনে...’
বৃষ্টির ফোঁটাগুলো এখন ওজনহীন। পাশের ভদ্রলোক পাওয়ার-৩০, ফ্রোডেক্স, ইনডিইরেক্স এসব ট্যাবলেট আর সিরাপের বোতল দেখিয়ে ওষুধের দোকানিকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এই হার্বাল প্রোডাক্টগুলো কেমন চলে?’
‘খুব চলে। এই প্রোডাক্টগুলো না থাকলে এই গ্রামে কি এতগুলো ঔষধের দোকান ব্যবসা করতে পারত?’ দোকানির কথায় প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারলেন না ভদ্রলোক। একটা ফোন পেয়ে তিনি ঘামতে থাকলেন। প্রায় চিত্কার করে বললেন, ‘কী বললি, আমার ব্রান্ড নিউ এলিয়নটা মাদারচুতরা ভেঙে ফেলেছে? আগুন দিচ্ছে? উফ!... শুয়োয়ের বাচ্চা, সাবধানে গাড়ি চালাতে পারিস না...’
আশ্চর্য! এমনি এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় নীলা বলেছিল, ‘সব উত্থানের সাথে নিবিড়ভাবে এক পতন লুকিয়ে থাকে। আমাদের ভালোবাসা দিয়ে পতনটাকে আমরা পায়ে ঠেলব।’
মানুষ মনে হয় পতনের ক্ষণটাতেই পাশের মানুষদের পতন-ক্ষত খুঁজে বেড়ায়। সুদর্শন রাতুলের দিকে তাকিয়ে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার গাড়ি...?’ রাতুল নির্মোহ কণ্ঠে বলল—
‘চলুন হবিগঞ্জের বিরতিহীন পরিবহনে উঠতে হবে।’ নিজের স্যুটকেসটি তিনি এক কিশোরের মাথায় উঠিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে বিষোদ্গার করলেন—
‘এই বাস্টার্ডগুলো সস্তা হার্বাল-প্রোডাক্ট খেয়ে উত্তেজনা আর কোথায় ঢালবে বলুন? আমার এলিয়ন কারটা ভেঙে দিয়েছে। মাত্র সেদিন চল্লিশ লাখে গাড়িটা কিনলাম... আচ্ছা, আপনি তো বিখ্যাত মানুষ... আপনার স্ত্রীর গল্পটা...’ রাতুলের ভেতরের লেখকসত্তায় জ্বলা আলোকিত আগুনটুকু এবার জ্বলে উঠল দাউ দাউ। গম্ভীর দৃষ্টিতে রাতুল ভদ্রলোকের দিকে তাকাল।
বিরতিহীন বাসটা ভরে আছে মেহনতি মানুষের ঘাম-শ্রম আর তাদের জীবন সংগ্রামের সাথে মেশানো বারোয়ারি দ্রব্যাদির গন্ধে। লেখকসত্তার কারণেই মানুষ পর্যবেক্ষণের নিরন্তর মানসিকতা থেকে ডানপাশের দুই সিট সামনে বসা ভদ্রলোকটির দিকে রাতুল আবার তাকাল। তিনি নাকে রুমাল দিয়ে কিছুই মেনে নিতে না পারার ভঙ্গিতে বসে আছেন।
সামনের অদ্ভুত এক দৃশ্যে রাতুলের চোখ থমকে গেল। মাত্র পাঁচ-ছয় বছরের এক শিশু ফ্যালফ্যাল চোখে হাত পেতে আছে এমন এক মানুষের কাছে, যার হয়তো কিছুই দেওয়ার সামর্থ্য নেই। মেয়েটি তার শিশু হাতকে এখনো শেখাতে পারেনি কার কাছে হাত পাততে হয়। পরনে তার পুরোনো এক ফ্রক। নাভির ওপর থেকে নিচের দিকে ছেঁড়া। শুকনো মুখের মলিনতায় তার চোখ দুটো ভাষা হারানো ভাষায় ভাষাময়। বোঝা যায় তার উজ্জ্বলতা ঢেকে গেছে অযত্ন আর হয়তো ময়লা পরিবেশে বসবাসের কারণে। মুখের ভেতর ঠোঁটের আশপাশটুকু কেউ হয়তো ধুয়ে দিয়েছে একটু আগে। সেজন্যই মুখের সেই অংশটুকু জ্বলছে জ্বলজ্বল। সেই জ্বলজ্বলে জ্বলা অংশটায় বাম ঠোঁটের শেষপ্রান্তের একটু ওপরে একটা লাল তিল!
নীলার শরীর কবরের ধুলায় এমনি ধূসরিত! তবু তার ঠোঁটের লালচে তিলটুকু কেমন উজ্জ্বল। নীলার গর্ভে তার মেয়েরও এমনি এক লাল তিল ছিল হয়তো!
সবার কাছে যাচ্ছে মেয়েটি। প্রথম জনের কাছে হাত পাতার পর সে ভুলেই গেছে কিছু চাইতে হাত পাততে হয়। সে বরং শিশুসুলভতায় আর দিনভর শিশুর মতো জীবন-যাপন না করার অপার ক্লান্তিতে কারো সিটের কাছে তার ছোট্ট শরীরটা এলিয়ে অবাক চোখে সেই মানুষটাকে দেখছে। একটু পর এলিয়ন-কার হারানোর বেদনায় মুহ্যমান ভদ্রলোকের জুতার দিকে তাকিয়ে মন্ত্রমুগ্ধ শিশুটি তার পা লক্ষ করে এগিয়ে গেল। ভদ্রলোকের জুতার ওপরে কাচের মতো কিছু না থেকেও কেন এত চকচক করছে—তা দেখার আগ্রহ ধরে না রাখতে পেরেই হয়তো সে এগিয়ে গেল। উত্থানরত মানুষদের পরম যত্নে পতনদেশ চকচকে রাখতে হয়—শিশু তো পরের কথা, বড়রাও অনেকেই এই উত্থানসূত্র জানে না। ভদ্রলোকের জুতায় আয়না এলো কোত্থেকে, ছোট্ট মেয়েটা মাথা নিচু করে কচি নখগুলো দিয়ে তা-ই যেন খুঁজতে গেল। শক্ত করে কান ধরে তিনি মেয়েটাকে পায়ের কাছ থেকে টেনে তুললেন। তার হাত বরাবর মেয়েটার মুখ এনে তিনি তার গালে কষে থাপ্পড় চড়িয়ে বললেন, ‘জোচ্চোরের বাচ্চা! কিছুই না চিনে এভাবে তোরা পথ চলিস আর গাড়ি চাপা পড়লে দোষ হয় আমার ইননোসেন্ট কারের... এই বয়সেই...’
রাতুল এসে মেয়েটাকে ভদ্রলোকের হাত থেকে কেড়ে নিল। তাকে কোলে তুলে চুপ করে বাস থেকে নেমে এল সে। ভয় পাওয়া হরিণীর মতো মেয়েটা পরম নির্ভরতায় রাতুলের কাঁধে মুখ লুকাল। বাস থেকে নেমে রাতুল কন্ডাকটরকে বক্স থেকে তার স্যুটকেস বের করে দিতে বলল। এক হাতে স্যুটকেস আর অন্যকাঁধে মেয়েটিকে নিয়ে সে ঔষধের দোকানে গিয়ে বলল, ‘এর মা-বাবা কোথায়, আপনারা জানেন?’ কিছু ঔষধ প্যাকেট করতে করতে বয়সে অপেক্ষাকৃত বড়জন উত্তর দিল—
‘ওর মা মারা যাওয়ার পর তার বাবাও উধাও।’
‘মা মারা গেছে?’
‘ওই যে পাটক্ষেত দেখছেন, ওখানেই ওর মা’র লাশটা পাওয়া গেছিল, তাও মরার কয়েকদিন পর।’
‘কিন্তু তিনি মারা গেলেন কীভাবে?’
‘কী আর বলব, ওর মাকে ধর্ষণ করে ওই পাটক্ষেতেই পোলাপান গলা টিপে মেরে ফেলেছিল।’
‘তা এই মেয়েটি থাকে কার কাছে?’
‘এখানেই থাকে,আমরা বিছনা দিয়েছি। রাতের বেলা এই দোকানের মেঝেতে সেটা বিছিয়ে সে থাকে।’
রাতুল দোকানে থরে থরে সাজানো ঔষধগুলোর দিকে তাকাল। আশ্চর্য, রাতুল অবাক হয়ে দেখল, ভারতীয় সিনেমায় অভিষিক্ত সানি লিওনের ছবি ঝুলিয়ে নারীদের বিশেষ অঙ্গের উত্থানে একটা প্রোডাক্ট ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কোনো এক দিন, কোনো এক কালে মানুষের প্রাণ রক্ষার কৌশল আয়ত্তের এই নিরন্তর সাধনায় মানবের উত্থান ইতিহাস বিস্ময়কর! এই উত্থান এতদূর এগিয়েছে যে চোখ তুলে তাকিয়ে তার উচ্চতা মাপা যায় না। চোখ ফিরিয়ে নিতে হয়। বিশ্বজিেকও চোখ ফিরিয়ে নিতে হয়েছিল। ক্যামেরা তাক করা, জীবনের উত্থান-সূত্র শেখা সাংবাদিক আর দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য মানুষের দৃষ্টির নির্মোহ-নিষ্ঠুরতা থেকে। জীবনে প্রথম আর শেষবার দেখা এই নিষ্ঠুরতা দেখা বিশ্বজিত্ পরজন্মে আর মানুষ হয়ে জন্মাতে চাইবে না। রাতুলের তার সহযাত্রী ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছা করছে, এইসব মানুষের চোখের দৃষ্টির ভেতর বিশ্বজিত্ যখন আকুল হয়ে সামান্য করুণা আর সাহায্য কামনা করছিল, তখন দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর মনে দয়ার সাগর না হোক, সবাই অন্তত সংঘবদ্ধ হয়ে তাকে বাঁচানোর মনটাও কেন জাগেনি? মন জাগানোর জন্য মেট্রিয়ন আইভি আবিষ্কার করা যায় না? নিম্নদেশ (জুতা) চকচক করলেই ঊর্ধ্বদেশ (মাথা) সমৃদ্ধ হয় না তাহলে! নাকি কোটি কোটি মেট্রিয়ন আইভি, হালুয়ায়ে মর্দ, ইনডিউরেক্স মানব সন্তানদের এতই উত্থান ঘটিয়েছে যে, তাদের হূদয়-প্রদেশ তলিয়ে গেছে উত্থানের সমৃদ্ধিতে! মানুষ এখন উত্থান আর পতনের দুই সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাণীমাত্র! রাতুল আর কিছু ভাবতে চাইল না। দোকানীকে সে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘আমি মেয়েটাকে দত্তক নিতে চাই...’
রাতুলের এমন প্রস্তাবে অপেক্ষাকৃত কম বয়সী এক তরুণ তেড়ে এল রাতুলের দিকে।
