যে একটি মৃত্যুর জন্যে আমাকে অসংখ্যবার জন্ম নিতে হয়েছে
তুমি তার চাবিটা নিয়ে চলে গেলে এবং
আমাকে মরতেও দিলে না, রেখে গেলে
মৃত্যুর জীবনীগ্রন্থ লেখার জন্যে
অথচ কখনো আমি মৃত্যুকে দেখিনি— মরে যাওয়া দেখেছি অনেক।
যেদিন প্রথমবার কর্পূরের শাদা গন্ধ পেলাম
সেদিনই প্রথম মনে হয়েছিল— বেঁচে আছি
যেদিন প্রথমবার মনে হলো, বেঁচে আছি
সেদিন থেকেই বুঝি মরে যাওয়া শুরু। এবং এভাবে
বেঁচে থাকার প্রচলিত ছন্দ-সূত্রগুলো
আস্তে আস্তে বাকলের মতো আলগা হতে শুরু করেছে।
তোমার জানবার কথা নয়
তোমার জন্মের আগে কোনখানে ঝরেছিল রাত্রির আকাশ
নদীকে শিথানে রেখে কোনখানে প্রথম ক্রন্দন
শিকড় লুকিয়ে রেখে ডালপালা মেলেছিল নদী
এবং বিরতিহীন ঢেউ
সেই থেকে সারারাত সুন্দরের ভয়ে আমি জেগে থাকতাম।
তোমার দেখার কথা নয়
সেই দীর্ঘদেহী তামাদি ডাকাত, যার
রেঙ্গুন-যুদ্ধের কালে বোমার আঘাতে মুখ ঝলসে গিয়েছিল
মায়াবী জ্যোত্স্নার রাতে আমি তাকে ভিক্ষা করতে দেখেছি
সেই অন্ধ ঝলসে যাওয়া মুখ
জ্যোত্স্নার আলোর সঙ্গে দারুন মানিয়ে গিয়েছিল
তবুও সে কোনোদিন বাচ্চাদের ইস্কুলের সামনে যায়নি
অথচ আমিই কিনা তার অপেক্ষায়
চাঁদের মতন গিয়ে উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকতাম
সে প্রথম শুনিয়েছে উইয়ের ঢিবির কাছে তীরবিদ্ধ প্রথম কবিতা
আমি লাল চালের ভাতের গল্প তার মুখে প্রথম শুনেছি
সবুজ পালক ফেলে কোন পরী চলে গিয়েছিল।— এইসব গল্পরাজি আর
তার প্রতিটি গল্পের শেষে ডুবে যেত রেঙ্গুনের যুদ্ধের জাহাজ
তার হাতের লাঠিটা নাকি একদিন সরীসৃপ ছিল
সেও নাকি প্রধানত ইস্পাত কয়লা লোহা আর
একখন্ড হূিপন্ড নিয়ে
জন্ম নিয়েছিল
তার প্রতিটি গল্পের শেষে ডুবে যেত রেঙ্গুনের যুদ্ধের জাহাজ
এভাবে একের পরে এক
ডুবে যাওয়া শেষ হয়ে গেলে
কোনো এক অমাবস্যা - রাত
সেও ডুবে গেল
তারপর থেকে অন্য চাঁদ, কিংবা তুমি কিংবা তোমাদের মতো
আরও আরও যুদ্ধের জাহাজ
সে পর্যন্ত
চায়ের চামচ ছাড়া হাতে আর কোনো অস্ত্র ছিল না আমার
চামচ নাড়ার শব্দে খুলে যেত সকালের ডানা
ভোর মানে জেগে ওঠো ঘুমন্ত উনুন
শিউলির রক্তমাখা শিশিরের কান্না মানে ভোর
তবুও রাতের শেষে ভোর আসে পৃথিবীতে আজও
ভোর হলে দোর খোলে, জুতোমোজা নড়ে চড়ে ওঠে
হঠাত্ চায়ের কাপে খসে পড়ে ভেজা পাউরুটি; ব্যতিব্যস্ত চামচের মতো
নানান জামাকাপড় অথবা টিফিন-ক্যারিয়ার হেঁটে যায় নরম রোদ্দুরে
পূরণ চিহ্নের মতো ভেসে যায় কচিকথা সরল গণিত
তখন বৃত্তের কেন্দ্রে ক্রমশ নরম হয় আমাদের মায়েদের চোখ
সেখানে দাঁড়িয়ে যেত বাউল এক বালকের গল্পকাতরতা
মায়ের মুখের হাসি সুরভিত জর্দার পানে
তখনই পাশের বাসা বেজে ওঠে কালোশাদা গানে
কলেজ ভিতর থেকে ভেসে আসে অশ্বক্ষুরধ্বনি
আমিও ঘোড়ার মাতা কারো চুল ওড়াতে চেয়েছি
বাসন্তী রঙের চাকা ঘোরাতে চেয়েছি বহুবার
যদিও শুকিয়ে গেছে জলাভূমি প্রিয় নলাঘাস
ক্রমশ গুটিয়ে গেছে আস্তাবল গ্রীবার ঝালর,— এভাবে অনেক বারোমাস
এখন মানুষ যায় চিড়িয়াখানায়, সেইসব ঘোড়াদের সাক্ষাত্কার নিতে
— সেলাইকলের মতো নতমুখে মৃত সব ঘোড়া
তবুও অনেক রাতে জ্বলে ওঠে পরিত্যক্ত লণ্ঠনের আলো
এখনও ক্ষুরের শব্দে রোমান ঘড়ির কাঁটা কাঁপে
জল জঙ্গলের পথ ছাড়িয়ে কিছুটা আরও দূরে
চাঁদের বুড়ির বোন বিধবার শণের কুটিরে
কতোবার গিয়ে গিয়ে এক আনার দামে
এক-একটা আকাশ কিনেছি
তারপর রেলবিটে লাটাইয়ের সুতো বেঁধে আকাশে আকাশ উড়িয়েছি
হঠাত্ আকাশটাকে ফাল্লাফাল্লা করে দিয়ে উড়ে গেল শাদা এরোপ্লেন
মুহূর্তে পায়ের কাছে ছুটে আসে ডানাভাঙা ঘুড়ি
কিংবা নিহত সারস
যার জন্যে কতোবার আমরা বেঁধেছি গিঁট রঙিন ফ্রকের সঙ্গে জামা
এইভাবে গিঁট খুলে যায়, মরে যায় ঘুড়িপাখি এবং ঘুড়ির বুড়ি ঘরে যায়
ভূতেরাও মরে গিয়ে দাঁড়কাক হয়ে যায় দুপুরবেলায়
দুইবার ডাক দিয়ে ঠোঁট রাখে জলাধারে গাঢ় পিপাসায়
আমাদেরও গলা শুকিয়ে আসতে থাকে ভয়ে। তখন মায়ের ঘনচুলে
জবাকুসুমের গন্ধে লুকোতে পেরেছি ভীত মুখ
আবার কলের গানে ভেসে আসে শাদাকালো ঘোড়া
জবাকুসুমের গন্ধে জমাপড়া ছন্দগুলো একদিন তছনছ হয়ে যাবে
আমাদের ক্রমবর্ধমান বুদ্ধিবাহিনী এসে
এইসব তৃষ্ণাকাতর ভূতগুলোকে তাড়িয়ে দেওয়ার আগে
আমি দাঁড়কাক হতে চেয়েছিলাম, যাতে আমি
শ্যাওলাপড়া পাঁচিলের ওপর অনায়াসে দাঁড়িয়ে থাকতে পরি
যাতে, একই সঙ্গে দেখতে পারি আমার জন্মের আগে মরে যাওয়া
বোনের কবর, কবরের ওপর উঁকি দেওয়া ঘাস এবং
রান্নাঘরে লুকিয়ে লুকিয়ে মায়ের কান্না
কান্না থামাবার আগে বৃষ্টি নেমে আসে, বইয়ের পাতার থেকে নদী
আমাদের ছোট নদী আমাদের বিরাট উঠোনে
সেই ছোট ছোট ঢেউয়ে আমি প্রায় ডুবে যাচ্ছিলাম
অমনি আমার পাশে এসে গেল খাতা ছিঁড়ে এক কাগজের নৌকো
তখন জানতাম না যে, একদিন এও দেখতে হবে
বিরাট উঠোনগুলো ক্রমান্বয়ে ছোট হয়ে যাবে
সকালের ছায়ার মতন
আবার আকাশ ফেটে বৃষ্টি নামে, তরঙ্গিত স্রোতে
সেই নৌকো ভেসে গেলে আমি মাঝি হতে চেয়েছিলাম, যাতে
নদীর ওপারে গিয়ে একবার দেখে আসতে পারি
যে আমার দূরের মার্বেল লুকিয়ে রেখেছিল
বিবাহের পরে আর যাকে আমি কখনো দেখিনি
যদিও এখনও টানে পাতা পোড়া উঠোনের ঘ্রাণে
যেভাবে আগুনগুলো উড়ে যায় চোখের আড়ালে, সেইভাবে
টংপুকুরের কাছে পোনামাছগুলো ক্রমে গহনে লুকায়
যাতে, জালের বিস্তৃত অনুসন্ধিত্সার পরিচয় পাওয়া যেতে পারে
হারিকেনের গোলাকৃতি ভুতুড়ে ছায়ায়
মাছেদের এইসব নেপথ্যচারিতার ভাষা বুঝবার সাহস ছিল না
তখন পর্যন্ত আমি
জোয়ারের জলে পোনামাছের মতো ভেসে থাকতে চেয়েছি
জোয়ারের মানে শুধু জল নয়, আমরা সেটা বুঝতে পারবো পরে
আরও অনেক পরে, যখন
প্রতিটি সেলাই থেকে আলগা হয়ে দৃশ্য ঝরে যাবে, যখন
সেগুলোকে রেখে আসা হবে শাদা স্তব্ধতার কাছে
তখন আমাদের মনে পড়বে
কেন লতানো পাড়ার মধ্যে রঙিন ফ্রকেরা
বিকেলে ফড়িং হয়ে যেত
আমরা এও বুঝতে পারবো
ফড়িং ধরতে গেলে সমস্ত আঙুল জুড়ে সতর্কতা ভর কেন।
যখন সতর্কভাবে জাল থেকে সীসা খুলে গলাতে শিখেছি
তখন উদীয়মান এরোপ্লেন উড়ে গেছে দূরে
আমি চিত্কার করে থামাতে চেয়েছি সেই উড়ে যাওয়া
তারপর ফিরে গিয়ে কলের গানের মধ্যে ঘোড়াকে পেলাম
তখনও তোমার দেখা নেই
যেন জাদুকর—একবার
কলের গানের সব পিনগুলো আমি গিলে ফেলতে চেয়েছি
কিন্তু তার আগেই
সুস্বাদু ঘন্টার ধ্বনি এক টুকরো শনপাপড়ি রেখে যেত হাতের তালুতে
সে হাত তোমার হাত নয়
যেদিন বালিশ ছিঁড়ে মেঘ উড়তে আরম্ভ করেছে
উড়ন্ত তুলোর পিছে ছুটতে ছুটতে পরীর পাহাড়
যেদিন পাহাড় থেকে দেখা গেল জরির ফিতার মতো নদী
সে-নদীতে ডুবে যাওয়া কাগজের নৌকা আমার
আবার উঠেছে ভেসে গাঁদারং ফ্রকের আভাসে
তখন বুঝে গেলাম সবগুলো মৃত্যুর সারমর্ম নিয়ে
তুমি এসে গেছ
যাবতীয় পাণ্ডুলিপি মুহূর্তে লেবুর গন্ধে অন্ধ হয়ে গেল
সজারুর মতো অন্ধকারে
যেন কেউ বলেছিল—‘আমাকে প্রস্তুত হতে দাও’
আমি দিয়েছি
আমি সময় দিয়েছি
ধুতুরাফুলের পরিবর্তে ক্যাসেট-প্লেয়ার বেজে উঠবার
যার পরিত্যক্ত ফিতা দিয়ে চুল বাঁধতে দেখবো পাগলিকে
আমি সময় দিয়েছি
পৃথিবীর সবগুলো পাখিকে খড়কুটো জোগাড় করবার
৩৫০০ প্রজাতির সাপকে আমি খোলস পাল্টাবার জন্যে
পর্যাপ্ত সময় দিয়েছি, এবং মনুষ্যজাতিকেও
যাদের স্পর্শে গুটিপোকার বস্তুও শিউরে ওঠে
আমি সময় দিয়েছি
দরজার পরিবর্তে জানালাকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবার
দু’দুটো আলাদা শতাব্দীকে আমি হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে থাকতে বলেছি
সবুজ পাতার অন্ধকারে
সন্ধ্যাতারাকে আমি তার স্থায়ী নিবাস চিনিয়ে দিয়েছি
ইতোমধ্যে ফেলে আসা পথের দূরত্বটুকু মেপে আসতে পারতাম
দেখে আসা যেত— অ্যাকোয়েরিয়ামের মধ্যে জেগে ওঠা নপুংসক মাছের সংসার
তুমি কুচি কুচি করা লেবুপাতা
আমার তালুতে রেখে মেহেদির পাতা আনতে গেছ
পাতা আনতে গিয়ে কোথায় গিয়েছ
অথচ সবুজ গন্ধে আমার বয়স আজও স্তব্ধ হয়ে আছে
ইতোমধ্যে লেবুগাছতলে
এসেছে অনেক ট্রেন, থেমেছে, আবার চলে গেছে
কেননা আমার হাতে টিকিটের পরিবর্তে ছিল লেবুপাতা
সবুজপাতার গন্ধে তামাদি ঘোড়ার মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছি
লেবুর কাঁটার সঙ্গে ঘড়ির কাঁটার কোনো তফাত্ দেখি না
আর, তুমি কিনা
জোনাকীর চক্ষু নিয়ে মাঝেমধ্যে তামাশা দেখছো
কিংবা সত্যিকার অর্থে দেখতে চাইছ
একজন মানুষ কতো বছর দাঁড়িয়ে থাকলে
লাইটপোস্টের মতো জ্বলে উঠতে পারে
কিংবা একটা লাইটপোস্টে কতোদিনে শিকড় গজায়
তুমি কি মনে করো যে
আমি একশ’ দুশ তিন শ’ বছর বেঁচে থাকার জন্যে এসেছি
আমি তো জানি
চারশ’ বছর বাঁচতে গেলে অন্তত চার হাজার বার মরে যেতে হবে
তদুপরি পৃথিবীর সব লেবুপাতা কর্পুরের গন্ধ এসে দখল করে নেবে
কেননা ইতোমধ্যে অসংখ্য লোবানের সবুজ মাংসকে আমি উড়ে যেতে দেখেছি
আমি সময় দিয়েছি
মেহেদিপাতার রঙে দাউদাউ জ্বলে উঠবার
শীতের জটিল রাতে পরিশ্রান্ত অশ্বদের তরে
গরম জলের ব্যবহার
আমি প্রতিষ্ঠিত আঙুরের ব্যথা নামাবার
সময় দিয়েছি
দোলনা-চেয়ারে বসে বাবুই পাখির মতো গরম উলের সোয়েটার
বুনবার সময় দিয়েছি
মোটকথা আমি আয়নাকে সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে ওঠার সময় দিয়েছি
অন্ধ ভিখারির ঝলসে যাওয়া মুখ থেকে জ্যোত্স্নার উত্স যতো দূর
কিংবা জ্যোত্স্না থেকে ভুতুড়ে লণ্ঠন
কিংবা দাঁড়কাক থেকে জবাকুসুমের খালি শিশি
ঘোড়ার গাড়ির থেকে দৈত্যের মতন কালো কয়লার ইঞ্জিন
মার্বেলের চোখ থেকে ঘুড়ির বুড়ির বাড়ি যতোদূর
গণিতের খাতা থেকে বর্ষার উঠোন কিংবা কাগজের নৌকো যতো দূর
কাগজের নৌকো থেকে জোহরা খালার বাড়িনদীর ওপারে
অথবা আঙুল থেকে ফড়িঙেরা, ফড়িঙের থেকে এরোপ্লেন
জলের প্রচ্ছদ থেকে এক আনার উড়ন্ত আকাশ
তার চেয়ে আরও বেশি দূরে
ফ্রক
থেকে
শাড়ির দোকান
হাঁ-এ না-এ দোলাচল এই বুঝি সরল দোলক
এই বুঝি প্রস্তুতির ভাষা
ঐ দ্যাখো, কী কারণে উল্কারা লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে
নিহত মাটির সিরামিকে
পিষ্ট হয়ে যাচ্ছে লাল পিঁপড়ার সারি
আবার, রেঙ্গুন-যুদ্ধে ডুবে যাওয়া জাহাজের ক্ষুধার্ত মাস্তুল
জেগে উঠতে শুরু করেছে
আবার ডাকাতি শুরু জ্যোত্স্নার ঘরে
অন্ধের হাতের লাঠি সাপ হয়ে ঢুকে যাচ্ছে ইঁদুরের গর্তের ভিতর
শিউলিফুলের রক্তে ভেসে যাচ্ছে ভোরের উঠোন
প্রতিটি ঘুড়ির সঙ্গে ছিঁড়ে যাচ্ছে বিধবার শাড়ি
প্রতিটি মার্বেল থেকে জন্ম নিচ্ছে বিষন্ন কর্পূর
কলের গানের থেকে বেগুনি রশ্মির মতো ছুটে আসছে যুদ্ধের সাইরেন
আমি আর পারছি না, মুঠোর ভিতরে ধরে রাখা
ঘাসে ভেজা লেবুপাতাগুলোর জন্যে
ঘড়ির কাঁটা ভয়ানক ক্ষুধার্ত হয়ে উঠেছে
কাগজের নৌকোর ওপর
আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না
পৃথিবীর জরায়ু ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে
লক্ষ লক্ষ
কোটি কোটি
দাঁড়কাক
অথবা আমি
যেহেতু, তুমি আমাকে মরতেও দিলে না।
