দুর্গম মরুপথ। দূর কোনো এক নগরের দিকে এগিয়ে চলেছে উটের কারাভান। অভিজাত উষ্ট্রপৃষ্ঠে সুন্দরী সম্রাজ্ঞী সমাসীন। যেতে যেতে দূরে হঠাত্ চোখে পড়লো একটা তাঁবু। সম্রাজ্ঞীর অঙ্গুলী নির্দেশে সেই দিকে কারাভান ঘুরে গেল। কাছাকাছি এলে বয়োঃবৃদ্ধ পারিষদ বললেন, তাঁবুর ভেতরে জীর্ণবস্ত্র শ্মশ্রুমণ্ডিত শীর্ণকায় এক যুবাপুরুষ বালুশয্যায় শুয়ে আছেন। পাশেই পরে আছে পানপাত্র। সম্রাজ্ঞী চোখের ইশারায় তাকে হাজির করতে বললেন। যুবা পুরুষটি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সামনে এসে দাঁড়াতেই সম্রাজ্ঞী জিজ্ঞেস করলেন : কে তুমি? ঢুলুঢুলু মদালসা অর্ধনিমীলিত চোখে পুরুষটি বললেন : ‘আমি কবি।’ ‘কবি? কিন্তু এইখানে কেন?’ কবি বললেন : ‘ক্ষুত্কাতর আমি। চেয়েছিলাম সূর্যের আলোয় রুটি সেঁকে মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেব। মানুষ তাহলে চিরজীবী হতে পারতো। ঈশ্বরের কাছ থেকে এমনই এক দৈববাণী পেয়েছিলাম আমি। কিন্তু মানুষ এতই অর্বাচীন যে আমাকেই তারা উন্মাদ ভেবে নির্বাসনে দিল। এই বিজন মরুতে ফেলে রেখে গেল।’ সম্রাজ্ঞী বললেন : ‘এসো তুমি, রাজপ্রাসাদে চলো। আমিই তোমাকে সূর্যোদয় দেখাবো। সূর্যালোকে রুটি সেঁকে তুমি মানুষকে অমর করে দেবে।’ কবি এসে পৌঁছুলেন রাজপ্রাসাদে। এরপর কেটে গেল বেশ কয়েকটি দিন। রাজকর্মে সম্রাট যখন প্রাসাদের বাইরে, সেকরম এক নিশুতি রাতে সম্রাজ্ঞীমহলে ডাক পড়লো তার। শীর্ণকায় কবি ততদিনে উঠে দাঁড়াতে পারছেন। শরীরে ফিরে এসেছে কান্তি ও বল। কবি ভাবলেন, ভালোই হলো, রাজপ্রাসাদ থেকেই শুরু হবে তার অমরাভিযান। তখন শেষরাত। দুগ্ধফেননিভ একটা শয্যায় কবিকে এনে বসানো হলো। চোখ বুজে ধ্যানমগ্ন কবি, স্ত্রোত্র পাঠ করা শুরু করলেন, অপেক্ষা শুধু সূর্যোদয়ের। একটু পরে চন্দনগন্ধে ভরে গেল ওই বিলাসবহুল ঘর, পুষ্পশয্যা। চক্ষু নিমীলিত কবি ভাবলেন, মাহেন্দ্রক্ষণ বুঝি উপস্থিত। আরও ধ্যানমগ্ন হলেন তিনি। অকস্মাত্ কার যেন ঘন তপ্ত নিঃশ্বাস এসে পড়লো তার মুখে, স্কন্ধে, বাহুতে। কবি এবার চোখ মেলে তাকালেন। সৌন্দর্যের বিভায় ঝলসে গেল তার দৃষ্টি। বস্ত্রহীন, অলঙ্কারহীন অনিন্দ্যসুন্দর নগ্ন নিরাভরণ সম্রাজ্ঞী তার শরীরসীমায় দাঁড়িয়ে। শঙ্খিনী সাপের মতো কবির বাহুলগ্না হয়ে তিনি বললেন, ‘নগরবাসীকে অমর করার আগে আমাকে অমর করো তুমি।’ চমকে উঠলেন কবি। সম্রাজ্ঞীর রূপে মোহমুগ্ধ সে। সম্রাজ্ঞী কবির দিকে একটা আপেল এগিয়ে দিলেন। ওই আপেলে কামড় বসাতেই সম্রাজ্ঞী আরও নিবিড় হয়ে কবিকে কাছে টেনে নিলেন। তারপর সমুদ্রতরঙ্গে মোথিত হলো সমস্ত বিছানা, গৃহ। কিছুক্ষণ পর দুজনেই ঘুমিয়ে পড়লেন। ইতিমধ্যে সূর্যোদয় হয়েছে। ক্লান্ত, ধ্বস্ত কবি উদ্যানে এসে দাঁড়ালেন। কিন্তু তখনই বাতাসে ভেসে এল সেই দৈববাণী : ‘যে-বর তুমি পেয়েছিলে, নিজেই তা ভঙ্গ করেছো। তোমাকে বলা হয়েছিল সূর্যোদয়ের আগে নারীসংসর্গ ঘটলে পৃথিবীর কেউ অমরত্ব পাবে না। কিন্তু তুমি সেই শর্ত ভঙ্গ করেছো। ফিরে যাও তুমি।’ কবি উত্তর করলেন : ‘কী বলছো হে আমার মহান ঈশ্বর। আমি তো ক্ষুত্কাতর। আমার অন্ন নেই, বস্ত্র নেই, বসবাসের সামান্য সংস্থানও নেই। নারীস্পর্শ তো ছিল কল্পনারও অতীত।’ দৈববাণী আরও তীক্ষ হয়ে বেজে উঠলো : ‘ফিরে যাও তুমি।’ বিষণ্ন কবি মুখ ফিরিয়ে পা বাড়াতেই দেখেন, ভোরের শ্বেতশুভ্র পোশাকে সম্রাজ্ঞী পেছনেই দাঁড়িয়ে। তার হাতে একটা স্বর্ণথালা। থালার ওপরে অজস্র স্বর্ণমুদ্রা, চীবর। স্মিতহাস্য সম্রাজ্ঞী কবিকে কাছে ডাকলেন। বললেন, ‘এই নাও তোমার পারিতোষিক।’ এরপর ইশারায় ওই মুদ্রা আর কৌপিন নিয়ে রাজপ্রাসাদ থেকে বেরিয়ে যেতে বললেন। একমুহূর্ত মাত্র। থমকে দাঁড়ালেন কবি। এরপর ধীরে ধীরে মাথা উঁচু করে সম্রাজ্ঞীকে দৃষ্টি দিয়ে ভস্ম করে সেই সোনার থালা এবং রাজপ্রাসাদকে পেছনে ফেলে অবজ্ঞার অগ্নস্ফুিলিঙ্গ ছড়াতে ছড়াতে মূল ফটকের সামনে এসে দাঁড়ালেন। সূর্যালোক এসে গায়ে পড়তেই অনিঃশেষ পথের দিকে আবার পা বাড়ালেন তিনি।
