ঐতিহ্য

প্রাক মোগল ও মোগল আমলে ঢাকার কতিপয় খাবার-দাবার

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০১৪, ১৫:৪৫
প্রাচীন বাংলার খাবার-দাবারের মতো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবার-দাবারেও বহুমুখী সংস্কৃতির সংমিশ্রণ ঘটেছে। বাংলার জনস্রোতের ধারায় আর্য-অনার্য, ভোট চীনা, পাঠান, মোগল, ইরানি-তুরানি সংশ্রব এক ঐতিহাসিক সত্য। এক কথায়, পূর্ববঙ্গের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে রয়েছে এখানকার প্রাচীন জনগোষ্ঠী, ভোট চীনা বা মঙ্গোলয়েড, দ্রাবিড় ও সেমেটিক সভ্যতার ছাপ। বাস্তব সভ্যতার অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো, এখানকার খাদ্য-সংস্কৃতিতেও, এর প্রভাব লক্ষণীয়। খ্রিস্টীয় শতকের গোড়া থেকেই ঢাকা ও তার সন্নিহিত অঞ্চলসমূহ রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে বিবেচিত। গ্রিক ও রোমান বর্ণনায় ঢাকার প্রাচীন বাণিজ্যের ইঙ্গিত মেলে। সামপ্রতিককালের উয়ারী-বটেশ্বরের প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার ঢাকা অঞ্চলে একটি প্রাচীন সভ্যতার ধারণাকে সমর্থন করে। হিন্দু আমলে ঢাকার সন্নিকটে ও বৌদ্ধ আমলে সাভার, হিন্দু আমলে বিক্রমপুর ও সুলতানি আমলে সোনারগাঁও রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করায় এ অঞ্চলে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী বহিরাগতদের অভিবাসন ঘটেছিল। মোগলদের আসার বহু পূর্বেই, হিন্দু শাসনামলে শহর ঢাকার অস্তিত্ব মেলে। ঢাকার বর্তমান বাংলাবাজার এলাকা হিন্দু আমলে গড়ে উঠেছে বলে ধারণা করা হয়। গৌড়ের পতনের পর উত্তর ভারত থেকে বহু ব্রাহ্মণ ও সাহা ব্যবসায়ী ঢাকায় আসার তথ্য আমাদের জানা আছে। ঢাকায় সাহারা খাদ্যদ্রব্য, চিনি ও লবণের ব্যবসা করত। এ কথা সত্য যে, সপ্তগ্রাম বন্দরের পতনের পর ঢাকার গুরুত্ব বাড়তে থাকে। এসব বহিরাগত ভারতীয়দের দ্বারা ঢাকায় ‘উত্তর ভারতীয় খাদ্য সংস্কৃতি’ যুক্ত হতে থাকে। আফগান আমলে ঢাকা শহর সমপ্রসারিত হয় এবং ঢাকার পূর্বভাগ ‘পাঠান অঞ্চল’ হিসেবে পরিচিত হয়। ঢাকার পশ্চিমভাগ মোগল আমলে ‘মোগল যুগের ঢাকা’ নামে পরিচিত ছিল। ঢাকার এই স্পষ্ট বিভাজন ঢাকায় এসব জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্বের পাশাপাশি তাদের খাদ্যাভ্যাসের দিকটির কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। মোগল যুগে ঢাকা দিল্লির শাসনাধীনে ছিল। ফলে মোগল আমলে ঢাকা বাংলা সুবার রাজধানীর মর্যাদা লাভ করলে এখানে অনেক রাজকর্মচারী, দেওয়ান, বকশী, সেনা-সামন্ত ও অন্যান্য পেশাজীবি জনগোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটে। এসব পেশাজীবিরা আবার ছিল ভারতের বিভিন্ন প্রদেশসহ আফগান, ইরাক, ইরান ও তুর্কিস্তান থেকে আগত। মোগল যুগ থেকেই রাজনৈতিক গুরুত্ব ছাড়াও ঢাকাই মসলিনের কারণে প্রাক-মোগল ঢাকার বাণিজ্যিক গুরুত্ব রয়েছে। ফলে এখানে গ্রিক, রোমান, চীনা, আরব, পারস্য, তুর্কি ব্যবসায়ী ছাড়াও বিভিন্ন সময়কালে গুজরাটি, মাড়োয়ারি কাশ্মীরি, পার্শি, জৈন, রাজপুত ও শিখ ব্যবসায়ীদের আগমন ঘটেছিল। তাছাড়া ১৫৫৪-৫৫ সালের আগ্রা ও দিল্লির দুর্ভিক্ষ, ১৫৭৪ ও ১৬৩০ সালের গুজরাটের মহা দুর্ভিক্ষ ও ১৬৩২ সালের কাশ্মীরের দুর্ভিক্ষ এসব অঞ্চল থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষকে ঢাকাসহ বাংলায় অভিবাসনে বাধ্য করেছিল। কোম্পানি আমলে এখানে আসে পর্তুগিজ, ইংরেজ, ডাচ ও ফরাসি ব্যবসায়ীরা। ঢাকার জীবনধারণের ক্ষেত্রে এসব বহিরাগত মানুষের সংস্কৃতির ছাপ স্পষ্ট। আবার উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চল ও এশিয়ার বহু দেশের সাথে এ অঞ্চলের খাদ্যাভ্যাসে অনেকটা মিল থাকায় এসব বহিরাগতদের অনেকেই এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। ঢাকার খাবার সংস্কৃতিতে তাই প্রাক-মোগল, মোগল ও মোগলপরবর্তী বহুমুখী ধারার সংমিশ্রণ রয়েছে। বক্ষমাণ প্রবন্ধে প্রাক-মোগল ও মোগলযুগের খাবার-দাবার নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। প্রাক মোগল যুগ : বৌদ্ধ আমল ঢাকা অঞ্চলে বৌদ্ধযুগের খাদ্যাভাসে নিরামিষের প্রভাব ছিল। ভাত প্রাচীন বাংলার মতো ঢাকাবাসীদেরও প্রধান খাদ্য। বৌদ্ধ আমলে ‘পানি তোয়া’ থেকে ‘পান্তাভাত’ শব্দটির উদ্ভব। তখনও তিন বেলা অর্থাত্ সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যে বেলা খাবারের কথা জানা যায়। রাতের খাবার তখন ছিল না। অপর্যাপ্ত আলো ও বণ্যপ্রাণীর ভয়ে সূর্য ডোবার পূর্বেই খেয়ে ঘুমিয়ে পড়া ছিল তখনকার রেওয়াজ। বৌদ্ধ আমলে ঢাকার বৌদ্ধ তীর্থ যাত্রীদের মাঝে প্রথম চা খাওয়ার প্রচলনের সন্ধান পাই। ঢাকার শ্রী জ্ঞান অতীশ দীপঙ্করকে তিব্বতে চা দ্বারা আপ্যায়ন করা হয়। এবং তিনি দেশে ফিরে না আসলেও তার সহচর বৌদ্ধ তীর্থ যাত্রীরা এদেশে ফেরত এসে চা পানের ধারণাটি চালু করেছিলেন। ‘রায়তা’ ছিল বৌদ্ধযুগের এক প্রকার খাবার। যা দাক্ষিণাত্য থেকে ঢাকায় এসেছে। হিন্দু আমল হিন্দু আমলে এখানকার ব্রাহ্মণরা নিরামিষভোজী ছিল। পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতক থেকে বৌদ্ধ, জৈন ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মে প্রাণী হত্যার বিরুদ্ধে আপত্তি ওঠে। ফলে আর্য ও ব্রাহ্মণ্য ভারত নিরামিষভোজী হয়ে পড়ে। ভাতের সাথে বেগুন ভাজা, মুগের ডালসহ নানা তরকারির ব্যাঞ্জন ছিল হিন্দুদের সাধারণ খাবার। ঢাকার রাজপুতদের বিশেষ তরকারির নাম ছিল////—-//// যা বেগুন সহকারে রান্না করা হতো। ব্রাহ্মণদের অন্য হাতে পাক চলত না। তারা স্ব-পাকে আহার করতেন। যাত্রাপথে খই, চিড়া-মুড়ি, মুড়কি ছিল ব্রাহ্মণের খাবার। ক্রমাগত আমিষবঞ্চিত হওয়ার কারণে ব্রাহ্মণদের জন্য পরে শাস্ত্রকারেরা নতুন করে পাতি দেন যে, সপ্তাহের কোনো এক দিন তারা ‘আমিষ’ অর্থাত্ মাছ-মাংস খেতে পারবেন। হিন্দু যুগে বাংলার অন্যান্য অঞ্চলের মতো ঢাকার উচ্চবর্ণের হিন্দুরা পাখির মাংস ও মুরগি খেত না। এমন কি মুখে মুরগির নামও নিত না। বলা হতো ‘রামপাখি’। তবে হাঁস ও রাজহাঁস খাওয়া হতো। মাছ ও শুঁটকি মাছও খেত না। তবে ঢাকার ব্রাহ্মণরা সেকালে রসুন খেতে অভ্যস্ত ছিল। পূর্ববাংলায় আর্য আগমনের আগে পোষা জন্তুর মাংস খাওয়া হতো না। রাজা বল্লালসেনের আমলে বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণদের মধ্যে জাতি-বিদ্বেষ দেখা দেয়। আগে ঢাকাসহ পূর্ববাংলায় বৈদ্যদের তৈরি ঘি ও দুধের তৈরি জিনিস ব্রাহ্মণেরা খেত। কিন্তু এ বিরোধের ফলে তা অচল হয়ে পড়ে। ব্রাহ্মণেরা এমন জাতিবিদ্বেষী হয়ে পড়েছিল যে, স্নানের পরে বৌদ্ধ দেখলে আবার স্নান না করে খাবার খেত না। ঢাকায় মৈথিলী, কনৌজ ও ছত্রী ব্রাহ্মণদের প্রাধান্য ছিল। ঢাকার বিভিন্ন শ্রেণি ও গোত্রের খাদ্যাভ্যাসে বহুমুখিতা, প্রথা ও সংস্কারগত প্রভাব ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। ঢাকায় একসময় ছিল প্রচুর আহির গোয়ালাদের বাস। এসব গোয়ালরা ছিল মুঙ্গের, কনৌজ ও বিহার থেকে আগত। তাছাড়া লাল চাঁদ মকিম লেন, মির্জা মান্নার দেউড়ি ছিল নবাবী আমলে কারবারি গোয়ালাদের বাসস্থান। ঢাকার গোয়ালনগর, গোয়ালপাড়া, গোয়ালঘাট এখনো সেসব গোয়ালাদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ঢাকার আহির গোয়ালারা গাভী পালন করত। তারা দুধ বিক্রিও করত কিন্তু কখনো মাখন, দই ও ছানা বানাত না। এটা ক্ষতিকর মনে করত। গরুর মাংস না খেলেও তাদের খাদ্য তালিকায় শুকরের মাংস ছিল। তারা ‘গো-উত্সব’ করত। এসময় একটি গরু ও শুয়োর একত্রে বেঁধে জোরে উচ্চশব্দ তৈরি করত। ফলে গরুটি দিশেহারা হয়ে শুয়োরটিকে গুঁতিয়ে মেরে ফেলত। এই শুয়োরের মাংস ছিল তাদের কাছে খুবই প্রিয়। ঢাকার মহিষা গোয়ালরাও এসেছিল মুঙ্গের ও পাটনা থেকে। তারা মিরপুর বাথানে সাহাদের মহিষ পালন করত এবং মহিষের ঘি তৈরি করত। ঢাকায় গরুর চেয়ে মহিষের দুধ ও ঘি ছিল বেশি দামি ও প্রিয়। সম্ভবত সে-সময় উত্তরভারতীয় লোকদের সংখ্যাধিক্য থাকায় ঢাকায় মহিষের ঘি ও দুধ বেশি সমাদৃত হয়ে থাকবে। কিন্তু পরবর্তীকালে মাড়োয়ারিরা এসে ঘিতে প্রথম ভেজাল দিতে শুরু করায় ঢাকার মহিষের ঘি এই জনপ্রিয়তা হারায়। শায়েস্তা খান ঢাকায় পশ্চিমভারত থেকে ‘দেশওয়ালী’ গরুর আমদানি করেন। এসব গরু দেখাশোনার জন্য তিনি কিছু গোপ গোয়ালাও সাথে আনেন। এসব গরু তিন বেলা দুধ দিত। গোপ গোয়ালারা দৈ, ঘি, মাখন ও মাঠা তৈরি করে বিক্রি করত। ঢাকার মোগল রাজকর্মচারীদের মাঝে গোপ গোয়ালাদের তৈরি এসব জিনিস বেশ সমাদৃত হয়েছিল। ঢাকার গোয়ালরা দুধে বলক না দিয়ে মাখন বানাতে পারত। ঢাকার রবিদাস শ্রেণীর লোকেরা এসেছে বিহারের গাজীপুর থেকে। এদের মাঝে গোমাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ ছিল না। ঢাকার ভূইমালী ও ঋষিরা মহিষের মাংস পছন্দ করত। ঢাকার ডোমরা হাঁস-মুরগি ও শুকরের মাংস খেত, কিন্তু গোমাংস খেত না। আসাম থেকে আসা ডোমরা খেত না মহিষের মাংস। তবে ঢাকার কুমারদের মধ্যে খাবার-দাবারের জাত-পাত ভেদ তেমন প্রখর ছিল না। তাদের একত্রে পানাহার চলত। ঢাকার চণ্ডালেরা লোকালয় থেকে দূরে নৌকায় বসবাস করলেও তাদের নৌকার চুলার কাছে অন্য জাতির কোনো স্থান ছিল না। মতিচুরের বুন্দিয়া ছিল মাড়োয়ারিদের প্রিয়। হিন্দুরা প্রথম দিকে ছানার মিঠাই তৈরি করত না। মাওয়ার মিঠাই তৈরি করত। দুধ থেকে ছানা তৈরি করাকে তারা ‘দুধ নষ্ট হওয়া’ জ্ঞান করত এবং নষ্ট দুধের ব্যবহার করাকে ‘অশুদ্ধ’ মনে করত। ঢাকায় অমৃতি মানসিংহের আমলে জনপ্রিয় হয়। মোগল বাহিনীর শিখ সৈনিকদের মাঝে এটা ছিল প্রিয় জিনিস। লাড্ডুর প্রচলনও হয় হিন্দুযুগে। তিলের নাড়ু ও খাজা হিন্দু আমলের। মুসলমান ঘরে তৈরি হতো জাফরানি লাড্ডু। এ লাড্ডু কতক জাফরানি রংয়ের এবং কতক সাদা হতো। হিন্দু আমলে ঢাকার খাবারে নানা বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। হিন্দুদের বহুমুখী পেশা ও জাতপাত খাদ্য গ্রহণে যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছিল। একসময় গোমাংসের ব্যবহার নিম্নবর্ণের মাঝে ছিল। পূজায় ব্যবহূত পাঁঠার মাংস খাওয়ায় কোনো বাধা ছিল না। পুঁটি, রুই, শোল, মুরালা আর ইলিশ মাছের কথা হিন্দু যুগেও খাদ্যতালিকায় পাওয়া যায়। ঢাকা একসময় ছিল তাঁতিপ্রধান শহর। ঢাকার হিন্দু তাঁতিদের বড় অংশ ছিল বৈষ্ণবভক্ত। তারা আখড়ায় থাকতে পছন্দ করত এবং বৈষ্ণবমতে, ডাল-ভাত ছিল তাদের প্রিয় খাবার। মোগলযুগে ঢাকার তাঁতিদের একটা অংশ ছিল মুঙ্গের থেকে আগত। এদের মধ্যে মুসলমান তাঁতিদের খাদ্যাভ্যাসে ভাত স্থান করে নিয়েছিল কেবল খাওয়ার জন্য নয়, তৈরি কাপড়ে মাড় দেওয়ার জন্যও। হিন্দু তাঁতিরা খই পছন্দ করত এবং খইয়ের মাড় কাপড়ে ব্যবহার করত। ঢাকায় ধোপাদের কাপড়ে ভাতের মাড় দেওয়ায় ব্রাহ্মণেরা পুনরায় না ধুয়ে সে কাপড় ব্যবহার করত না। হিন্দু আমলে ঢাকার খাবারে যুক্ত হয় ‘মাহী’ বা মাছের পোলাও ও বুন্দিয়া পোলাও। বিভিন্ন পালা-পার্বণে রকমারি খাবারের কথা জানা যায়। মিষ্টান্নের মধ্যে ক্ষীরপুলি, নারিকেল পুলি, বিভিন্ন প্রকার লাড্ডু, বুন্দিয়া, খাঁজা, নিমকি, শিঙ্গাড়া হিন্দু আমলের। বিন্দু বিন্দু আকারের বলে বুন্দিয়া, খাঁজ খাঁজ বলে খাঁজা, নিমোক যুক্ত বলে নিমকি এবং তিন শৃঙ্গের আকার বলে নাম হয়েছিল শিঙ্গাড়া। ঢাকায় দেলখোস মিঠাই ও মতিচুরের বুন্দিয়া মাড়োয়ারিদের মধ্যে প্রিয় ছিল। পীর-দরবেশ ও ঢাকার খাজাদের নামের সাথে মিল থাকায় মোগল ও কোম্পানি আমলে হিন্দুরা খাজাকে বলত ‘খাজলা’। মিশ্রির মধ্যে সীতামিস্ত্রী ও সীতাভোগ মিষ্টি হিন্দুযুগে প্রচলিত বলে ধারণা। হিন্দু মাড়োয়ারিদের প্রিয় ছিল ‘ছাতু’। ঢাকায় আগত গুজরাটিরাও ছাতু পছন্দ করত। শস্যদানা পেষাই করে যারা ছাতু ও ময়দা বানাত তাদেরকে ঢাকায় ‘ভরভুঞ্জা’ বলা হতো। এরা মানসিংহের আমলে পুর্নিয়া থেকে ঢাকায় আসে। মানসিংহ ১৫৯৫ সালে মোগল বাহিনী নিয়ে ঢাকা দখল করেন এবং জঙ্গল সাফ করে বর্তমান ঊর্দ্দু রোডে সেনা ছাউনি স্থাপন করেন। খিচুরি ছিল প্রায় ঢাকার সকল শ্রেণির মানুষের প্রিয় খাদ্য। দক্ষিণ ভারতীয় হিন্দুদের দ্বারা সম্ভবত এ অঞ্চলে খিচুরির প্রথম প্রচলন ঘটে। গোরখপুর আগত ভুইহার ব্রাহ্মণরা খিচুরি ও পুরি তৈরিতে সিদ্ধহস্ত ছিল। মোগল সেনাছাউনিগুলোতে ‘জাহাঙ্গীরি খিচুরি’ প্রচলিত ছিল। অন্যদিকে এটা ছিল প্রসূতির খাবার। ষষ্ঠ দিনে প্রসূতিকে এ খাবার দেওয়া হতো। ঢাকায় রুটি ও পুরির ব্যবহারও প্রথম শুরু করে গুজরাটি ও ‘শেঠ’ ব্যবসায়ীরা। আগে এটা ছিল রোগীর খাবার। বলা হতো ‘রোটিকা’। ঢাকার রোগ-ব্যাধি খাবারে প্রভাব ফেলত। বসন্ত দেখা দিলে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বাড়িতে গোমাংস রান্না হতো না। তৈল ও মসলা জাতীয় রান্নাও বারণ ছিল। জাহাঙ্গীরের আমলে বৈষ্ণব মালাকারেরা বসন্ত রোগীর পথ্য তৈরি ও সেবা শুশ্রূষার দায়িত্ব পায়। ছাগদুগ্ধ, মধু ও পুরাতন ঘিয়ের ব্যবহার ছিল ওষুধে। ঢাকায় ‘খাট্টা’র প্রচলন হয় সেন আমলে। সুলতানি ও মোগল আমল ঢাকায় মুসলমান আমলে খাবার-সংস্কৃতিতে আমূল পরিবর্তন ঘটে। এ সময় ঢাকার খাদ্য-সংস্কৃতিতে তুর্কি, আফগান ও মোগল প্রভাব যুক্ত হতে শুরু করে। মুসলিম আমলে ভাত-মাছের পাশাপাশি খাদ্য তালিকায় পরাটা কাবাবের প্রচলন ঘটে। এ ক্ষেত্রে তুর্কিদের অবদান রয়েছে। প্রথমে আরব ও পরে গুজরাটি বণিকদের দ্বারা ঢাকায় ভেড়ার মাংস জনপ্রিয়তা লাভ করে। আরব ফেরত হাজিরাও এর প্রচলনে ভূমিকা রাখেন। পশ্চিম ও উত্তরভারতীয় মুসলমানেরা ঢাকায় গরু-খাসির মাংসকে জনপ্রিয় করে তোলে। এ ব্যাপারে মুসলমানদের কিছু ধর্মীয় রীতি গরু ও খাসির মাংসকে ব্যাপক জনপ্রিয় করে। মোগল আমলে ঢাকার খাদ্য তালিকায় যুক্ত হয় ‘মোগল ডিশ’ বা ‘মোগল খাবার’ বলে পরিচিত কিছু সুস্বাদু ও মুখরোচক খাবার। এগুলোর মধ্যে কোর্মা, পোলাও, বিরিয়ানি অন্যতম। কাচ্চি বিরিয়ানি সম্ভবত শেষ মোগল যুগের খাবার। শাহী মোরগপোলাও ঢাকায় মোগল যুগে প্রচলিত হয়েছে। কথিত আছে যে, মোগল খাবারের জন্ম সম্রাট আকবরের রসুই ঘরে। তাঁর শাহী পাকশালায় নানা দেশের নানা জাতের বাবুর্চি ছিল। পরে মোগল শাসনকেন্দ্র ও সেনাছাউনিতে এ মুখরোচক খাবার স্থান পায়। মোগল যুগে ঢাকার বাবুর্চিদের উপাধি ছিল ‘বাত্তীসা’। তারা সাত প্রকার লবণ ও আচারের তেল দিয়ে খাদ্য সংরক্ষণ করার রীতি আয়ত্ত্ব করেছিল। অপরদিকে, নবাব রেজিমেন্টের বাবুর্চিদের উপাধি ছিল ‘লালবেগী’। উপমহাদেশে চাটনির আবিষ্কারক মুসলমানেরা। ঢাকায় শাহজাহানী চাটনি ও কাশ্মীরি চাটনি জনপ্রিয় ছিল। শেষ নবাবী আমলে দুজন পাঠান নজুখাঁ ও গজুখাঁ চাটনি তৈরিতে ঢাকা ও কলকাতায় প্রসিদ্ধি লাভ করে। আমের কাশ্মীরি আচার, মলগুবা বা মিশ্র আচার, আমড়ার আচার ঢাকায় অবস্থানরত উত্তর ভারতীয়দের প্রিয় ছিল। মোগল আমলে ঢাকায় যবের মণ্ড পাওয়া যেত। ক্রেতা-বিক্রেতা ছিল বহিরাগত মুসলমান। গুজরাটিরা আসার পরে ঢাকায় ঘানির তেল এবং মোগলেরা আসার পরে রান্নায় ঘৃতের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। এর আগে ঢাকায় তিসি, তিলের তেল, ভেরণ তেল ও কুসুমফুলের তেলের ব্যবহারে প্রাধান্য ছিল। ঢাকায় ঘি আসত মাড়োয়ারিদের মাধ্যমে মুঙ্গের থেকে। পরে গজারিয়ার সোন্দা ঘি, নোয়াখালী ও দক্ষিণ শাহবাজপুরের ভয়সা বা মহিষা ঘি জনপ্রিয় হয়। ঢাকার রসনা শিল্পের ইতিহাসে ‘বাখরখানি’ মোগল যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান। সম্ভবত মোগল যুগে ঢাকায় আগত কাশ্মীরিদের দ্বারা এর প্রথম প্রচলন ঘটে। ঢাকায় পাঠানদের কাছে এটা ছিল খুবই প্রিয়। দিল্লির মোগল দরবারেও ঢাকার বাখরখানির কদর ছিল। অষ্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা ঢাকা ও সিলেটে পণির বিক্রি করত। বাখরখানি তৈরি করতে পণিরের প্রয়োজন হতো। শেষ মোগল যুগে ও নবাবী আমলে কোম্পানি কর্মচারীরা ঢাকাই পণির রফতানি করত এবং ঢাকা ছাড়িয়ে পণির ইউরোপীয় খাদ্যতালিকায় স্থান পেয়েছিল। একসময় ঢাকার বাখরখানি লক্ষ্মৌ ও মুর্শিদাবাদে ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকাই পণির ও নান ছাড়াও অনেকগুলো নানের সন্ধান আমরা পাই। এর মধ্যে নান সুলতানি ছিল সুলতানি আমলের। নান কুলিচা দিল্লির বাদশা বাহাদুর শাহের আমলের। নান খুরমা, নান রওগনী ও বদর কমাচ রুটি পারস্যবাসীরা আমদানি করেছিল। এছাড়া জাফরশাহী রওগনী রুটিরও প্রচলনের কথা জানা যায়। আকবরী নান খাতাই, খাজ নান খাতাই, ও যাওয়ারী রুটির প্রচলন ছিল। শেষোক্তটি বিহার ও পাটনা থেকে আগত। ঢাকার ‘কান্দুরা’ নামক এক শ্রেণীর লোক ছিল যারা রুটি-বিস্কুট বানাত। নানক শা ছিল তাদের মোহন্ত। মানসিংহের সাথে লালা এবং কেওয়াটরা এসেছিল বিহার থেকে। তারা পৌষ মাসের নবম দিনে সুজাতপুরের আখড়ায় মিলিত হতো এবং বিশেষভাবে তৈরি মোহনভোগের স্বাদ গ্রহণ করত। হিন্দু পর্বের মতো মুসলমান পর্বেও নানা প্রকার খাদ্য সামগ্রীর আয়োজন হতো। আশ্বিনী পূজায় নাড়ু, চিড়া, গজা, নারকেলের তৈরি সন্দেশ খাওয়া হতো। ঢাকায় চিড়া-খইয়ের নাম ছিল—‘চিপিটক’ ও ‘লাজ’। খই পানিতে দিলে বুজে যায় বলে এই নাম। চণ্ডি পূজায় ছাগল, মহিষ ও মেষ বলি দেওয়া হতো এবং মাংস নৈবেদ্য হিসেবে ভক্তদের খাওয়ানো হতো। মহরম, শবেবরাত, রোজা, ইফতারি ও ঈদ উপলক্ষে নানা আয়োজন হতো। শবেবরাত উপলক্ষে নানারকম হালুয়া ও পিঠা তৈরি হতো। বরফী ও পায়েস মসজিদে মসজিদে পাঠানোর রেওয়াজ ছিল। তবে কে পাঠাতেন, তা প্রায়শই জানা যেত না। রোজাদারদের জন্য হরেকরকম খাবার তৈরি হতো। তবে চালের মলিদা, শরবত ও মাটির সরাইয়ে ঠাণ্ডা পানি ছিল সাধারণ পরিবারের ইফতারির আয়োজন। চকবজারের মালাইসহ অনেক ইফতারি আইটেম সে আমলে খুব প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। নওরোজ অনুষ্ঠানটি ঢাকার ইরানি ও তুর্কিদের মাঝে জাঁকজমকভাবে পালন করা হতো। ঈদের খাবারে সাধারণত মোরগ পোলাও, শামী কাবাব, বোরহানি ও ফিরনি থাকত। বনেদি পরিবারে এ আয়োজন হতো আরও আড়ম্বর। কোরবানির মাংস দিয়ে তৈরি হতো কাবাব। আফগানিরা এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। বিশেষত ঢাকার চকবাজারের ঐতিহ্যবাহী ‘ইফতারির’ নানাপদ এখনো মোগল ঐতিহ্যকে কিছুটা ধরে রেখেছে। ‘নওরোজ’ ও ‘নবান্ন’ হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকলের জন্য আনন্দের পর্ব। এ উপলক্ষে খাবারে বৈচিত্র্য আনা হতো। উত্স নিম্নরূপ— খাদ্য সামগ্রী উত্স স্থান যে সময় এসেছে বনরুটি বাগদাদ মোগল আমলে নানখাতি আফগানিস্তান পাঠান আমলে শিরমল আগ্রা মোগল আমল কাকচা (বিস্কুট) পার্সিয়ান মোগল আমল কুলিচা পার্সিয়ান মোগল আমল সোহালি রুটি কাশ্মীর মোগল আমল সুহান হালুয়া কাশ্মীর মোগল আমল পোলাও তুর্কী/আগ্রা মোগল আমল কোর্মা তুর্কী/আগ্রা — — মোরগ পোলাও স্থানীয় প্রাক-মোগল খিচুরি কাবুল/দক্ষিণভারত শেষ মোগল কাবলি পোলাও কাবুল মোগল তেহারি স্থানীয় প্রাক-মোগল শাহজানী পেলাও স্থানীয় মোগল আমল নারিষী পোলাও আর্মেনিয়ান নবাবী সিরাজী পোলাও ইরান মোগল রায়দা পোলাও ইরান মোগল কাশ্মিরী চা কাশ্মীর নবাবী হাবসী পোলাও তুর্কী সুলতানি লোটা চা কাশ্মীর নবাবী লাড্ডু বোম্মে মোগল পরবর্তীকালে ডিমের মোগলাই/কোপতা উত্তরভারত মোগল আমল বাদাম হালুয়া বোম্বে মোগল পরবর্তী আমল নানক মোরব্বা স্থানীয় মোগল পরবর্তী শালগম কালিয়া স্থানীয় মোগলপরবর্তী দোপায়েজা স্থানীয় সুলতানি আমল হায়দারাবাদী কালিয়া উত্তরভারত মোগল ডালসা তুর্কী মোগলপূর্ব কিমা আপার ইন্ডিয়া প্রাক-মোগল মাছের নূরজাহানী কাবাব আগ্রা মোগল শেরেএখানি স্থানীয় মোগল জাহাজি কানিয়া স্থানীয় কোম্পানি/ব্রিটিশ তেহারি স্থানীয় মোগল জাহাঙ্গীরী খিচুরি আগ্রা মোগল কাবুলী খিচুরি কাবুল পাঠান আমল মোগলাই খিচুরি — — গুজরাটি খিচুরি আগ্রা/দিল্লি, গুজরাট মোগল আমল আফগানী খিচুরি — — আলুপুরি বিহার কোম্পানি আমল শিখ কাবাব বিহার মোগল মোসতের সমরকান্দি সমরকন্দ মোগল জালি কাবাব উত্তর ভারত মোগলপরবর্তী ঢাকার মিষ্টান্নের সেকাল শ্রী চৈতন্য নাকি দুজনকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন নিজের মিষ্টি বানাতে। এরাই বর্তমান ময়রাদের পূর্বপুরুষ। মোগল আমলে ঢাকায় তাদের উপাধি ছিল শাহজী। এরা ঢাকায় জিলাপি, অমৃতি, খাজা, লাড্ডু, গজা ও শিলভুজা তৈরি করত। ঢাকায় ‘পাসি’ নামক এক শ্রেণীর লোক ছিল, যারা তাল ও খেজুরের রস সংগ্রহ করত। তালের রস দিয়ে উত্তম তালমিশ্রি তৈরি হতো। খেজুরের রস দিয়ে তৈরি হতো চিনি। খেজুরের রস খাওয়া তেমন হতো না। কারণ, তাতে বাত-ব্যাথা হতো বলে ধারণা করা হতো। সে আমলে চিনির নানারকম নাম পাওয়া যায়। লাল চিনি, দোবারা, গুঁড়ো চিনি ও বাংলা চিনি। বাংলা চিনি স্থানীয়ভাবে ব্যবহারেরও পরে গোলকুণ্ডা ও কর্নাটকে রফতানি হতো। মিঠাইয়ের মধ্যে দরবেশ মিঠাই ঢাকার বিভিন্ন দরগা ও মাজারে সিন্নি হিসেবে বিতরণ হতো। মোগল যুগের ঢাকায় চায়ের ব্যবহারের কথা জানা যায়। মিষ্টি চায়ের নাম শিরিন চা, লবণাক্ত চায়ের নাম ছিল নমকিন চা। মোগল আমলে ঢাকায় দুগ্ধজাত মিষ্টান্নের সুনাম ছিল। মিষ্টান্নের মধ্যে লালমোহন, ছানার সন্দেশ, কালোজাম, রস কদম, পাতক্ষীর, খিরসা দই জনপ্রিয় ছিল। বিক্রমপুরের গাওয়া ঘি, পাটালি গুড়, ধামড়াইয়ের পাতক্ষীর ঢাকায় বেশ বেচা-কেনা হতো। ঢাকার সন্নিকটে অবস্থিত সাভারের ‘রাজভোগ’ মিষ্টি ছিল অনন্য। ঢাকায় প্রাক-মোগল ও মোগল যুগের প্রধান প্রধান খাদ্য সামগ্রীর নাম ও শেষ মোগল যুগে ঢাকায় ইউরোপীয়দের আগমন ঢাকার খাদ্য সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত করে। ইউরোপীয়রা প্রথম ঢাকায় গমের ব্যবহার শুরু করে। পর্তুগীজরা নিয়ে আসে পেঁপে, আনারস, কমলালেবু, মর্তমান কলা, বেগুন, আমড়া, আলু ও কাঁচা মরিচ। ঢাকায় বেকারি শিল্পের আমদানিও পর্তুগীজ তথা ইউরোপীয়দের অবদান। পান্তুয়া ও রসগোল্লা এদেশে পর্তুগীজরা চালু করেছে। ঢাকায় কিছু কিছু আরমেনীয় খাবারের কথাও জানা যায়। এর মধ্যে নারিষী পোলাও এবং গুলাব নাবিত নামের শরত্বও অন্যতম। পরিশেষে বলা চলে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবার-দাবার মূলত এ অঞ্চলে আগত নানাগোষ্ঠীর জনস্রোতের নানামুখী খাদ্য সংস্কৃতির সংমিশ্রণ। 