নৃত্য

চর্যানৃত্যের খোঁজে

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০১৪, ১৫:৪৬
বাংলা সাহিত্য শিক্ষার্থী হবার আগেই জানতে পেরেছিলাম চর্যার গীতি-নৃত্য একসময় বাংলাদেশের নিজস্ব সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পদ ছিল। এরপর বাংলা সাহিত্যের অধ্যয়নের মাঝে চর্যা-র গীত-বাণীকে নিজের সৃজনশীলতার সাথে যুক্ত করতে বুঝতে পারি, আজ থেকে প্রায় বারো-তেরো শত বছর আগে এদেশের বৌদ্ধ সাধক-কবি, গায়ক ও নৃত্যশিল্পীরা ছিল চর্যার গীতি-নৃত্যের ধারক ও বাহক। ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দের আগে এই তথ্য বাংলাদেশের কেউ জানতেন না। ওই বছর নেপালের রাজদরবার গ্রন্থাগার (বর্তমান ন্যাশনাল আর্কাইভ) হতে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাগীতির পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করেন। চর্যাগীতির সেই পাণ্ডুলিপির সাথে আরো তিনটি পুঁথি একত্রে ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা’ নামে এর আবিষ্কারক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী-ই বিস্তৃত ভূমিকাসহ ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন। গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন—‘১৯০৭ সালে আবার নেপালে গিয়া আমি কয়েকখানি পুঁথি দেখিতে পাইলাম। একখানির নাম ‘চর্য্যাচর্য্য-বিনিশ্চয়’, উহাতে কতকগুলি কীর্তনের গান আছে... গানগুলি বৈষ্ণবদের কীর্তনের মত, নাম ‘চর্য্যাপদ’।... আমার বিশ্বাস, যাঁরা এই ভাষা লিখিয়াছেন, তাঁরা বাঙ্গালা ও তন্নিকটবর্তী দেশের লোক। অনেকে যে বাঙ্গালী, তাহার প্রমাণও পাওয়া গিয়াছে।” হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর শেষ কথাটির সুস্পষ্ট স্বীকৃতি মেলে চর্যাপদকর্তাদের জীবনীতে। যেমন, পদকর্তাদের জীবনীতে দেখা যায়—চর্যাগীতির সর্বাধিক পদের রচয়িতা কাহ্নপার বাড়ি ছিল সোমপুর, তথা বর্তমানে জয়পুরহাট জেলার পাহাড়পুরে। এই কাহ্নপা এবং চর্যাপদের অন্যান্য কবি-গায়ক ও নৃত্যশিল্পীরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজাদের শাসন আমলে নির্বিঘ্নে চর্যাগীতি-নৃত্য ও নাট্যের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা দিতেন বলে জানা যায়। কিন্তু অচিরেই বাংলায় সনাতন ধর্মাবলম্বী সেন রাজাদের রাজত্ব অধিগ্রহণের ফলে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী চর্যার কবিগণ বিপন্নতার মুখোমুখি হন। এ পরিস্থিতিতে একদিকে চর্যার ঐতিহ্য বাহকেরা চর্যার ঐতিহ্যকে কিছুটা বদলে নিয়ে ভিন্ন নাম-পরিচয়ে সাধারণ জনতার মধ্যে মিশে যান, অন্যদিকে চর্যার পাণ্ডুলিপিসহ চর্যাগীতি-নৃত্য ও নাট্যঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে বৌদ্ধ ধর্মানুসারী পার্শ্ববর্তী দেশ নেপাল ও তিব্বতে গমন করেন। সম্ভবত সেই সূত্রেই নেপালের রাজদার গ্রন্থাগারে স্থান পায় বাংলাদেশের প্রাচীনতম সাহিত্য-সাংস্কৃতিক নির্দশন চর্যাগীতির পাণ্ডুলিপি। আর আমরা প্রায় একশত বছর আগে সেই পাণ্ডুলিপি আবিষ্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রাচীনকালের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক পরিচয় লাভ করতে সক্ষম হয়েছি। অবশ্য সেই পরিচয় প্রথম থেকেই ছিল মূলত গ্রন্থকেন্দ্রিক। কিন্তু আমাদের আগ্রহ ছিল ভিন্ন ধরনের, কেননা আমাদের মনে হয়েছিল—যে দেশের রাজদরবার গ্রন্থাগার থেকে চর্যাগীতির পাণ্ডুলিপি আবিষ্কৃত হতে পারে নিশ্চয় সে দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভেতর দিয়ে চর্যাগীতির পরিবেশনারীতিরও সন্ধান মিলতে পারে বৈকি। সেই আগ্রহ থেকেই কয়েক বছর ধরে ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিভিন্ন সময়ে নেপালের অধ্যাপক-গবেষকদের সাথে মতবিনিময় করি, এমনকি লাইব্রেরির বই-পুস্তক ও ইন্টারনেটে অনুসন্ধান করি। জানতে পারি, নেপালে অদ্যাবধি বৌদ্ধ-তান্ত্রিক মন্দিরগুলোতে চর্যাগীতি-নৃত্যের কৃত্যাচার মূলক পরিবেশনার অস্তিত্ব যেমন রয়েছে তেমনি সাধারণ মানের মন্দিরেও চর্যাগীতির পাঠাভিনয়ের অস্তিত্বও রয়েছে। এর পাশাপাশি নেপালের বিভিন্ন হোটেলে পর্যটকদের জন্য চর্যানৃত্য-গীতি পরিবেশনা করে থাকে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন। এ সকল তথ্যপ্রাপ্তির মধ্যে উপমহাদেশীয় সংগীত ও নৃত্য প্রসার কেন্দ্র সাধনা-র সাধারণ সম্পাদক ও বিশিষ্ট গবেষক-নৃত্যশিল্পী লুবনা মারিয়ামের কাছ থেকে চর্যাগীতি অবলম্বনে আমার রচিত ‘বোধিদ্রুম’ নৃত্যনাট্য হিসেবে মঞ্চস্থ করার প্রস্তাব পাই। এ পরিস্থিতিতে আমি সাধনা-র সাধারণ সম্পাদককে অনুরোধ করি নৃত্যপরিচালক, সঙ্গীতপরিচালকসহ নেপালে গিয়ে চর্যানৃত্য প্রত্যক্ষ করার জন্য। তিনি আমার অনুরোধ রাখেন এবং সেই সূত্রে আমরা ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে চর্যাগীতি-নৃত্যের সন্ধানে নেপালের রাজধানী কাঠমন্ডুতে গমন করি। আমাদের একটাই আনন্দ ছিল, যে শহর থেকে আজ থেকে প্রায় একশত বছর আগে চর্যাগীতির পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করা হয়েছিল, একশত বছর পরে আমরা সেই শহরে যাচ্ছি চর্যাগীতি-নৃত্যের পরিবেশনারীতি পর্যবেক্ষণে। চর্যার সন্ধানে নেপাল ভ্রমণ : আমরা অর্থাত্ নৃত্যশিল্পী ওয়ার্দা রিহাব, সংগীত পরিচালক সাইম রানা ও আমি ২৫ অক্টোবর ২০০৯ তারিখ আমরা নেপালের কাঠমন্ডু পৌঁছাই। অবশ্য আমাদের কয়েকদিন আগেই সাধনা-র সাধারণ সম্পাদক ও নৃত্যশিল্পী-গবেষক লুবনা মারিয়াম কাঠমন্ডু গিয়ে হোটেল বজ াতে আমাদের জন্য থাকার ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি চর্যানৃত্য পরিবেশনকারী একটি সংগঠনের সাথে আগে থেকে যোগাযোগও করে রেখেছিলেন। মূলত তাঁরই নির্দেশনা অনুয়ায়ী, হোটেল বজ্রাতে পৌঁছেই আমরা চর্যাগীতি-নৃত্য পরিবেশনকারী সংস্থা ‘কলা-মণ্ডপ’ : দি ইনস্টিটিউট অব নেপালিজ পারফরমিং আর্টস-এর প্রধান কর্ণধার ও চর্যানৃত্যশিল্পী রাজেন্দ্র শ্রেষ্ঠ (Rajendra Shrestha)-র সাথে ফোনে যোগাযোগ করি। তিনি ছিলেন বহু দূর, তাই তিনি আমাদের পরামর্শ দিলেন আমরা যেন হোটেল বজ ার পার্শ্ববর্তী স্বয়ম্ভুনাথ মন্দির পর্যবেক্ষণ করে আসি। আর ওখানে গেলেই আমরা চর্যাগীতির সমকালীন মন্দিরভিত্তিক পরিবেশনার একটি চিত্র দেখতে পাব। আমরা হোটেল বজ্রা থেকে হেঁটে স্বয়ম্ভুনাথ মন্দিরের পথে রওনা দিই। পথের পাশে বিভিন্ন ধরনের হ্যান্ডিক্র্যাফেটর দোকান, সবখানেই বৌদ্ধের বিভিন্ন ধরনের মূর্তি প্রত্যক্ষ করি—কাঠ, ধাতু, পাথর, চামড়া, মাটি ইত্যাদি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের বৌদ্ধ মুদ্রা অঙ্কিত শোপিস, সাজ-পোশাক, ধর্ম-উপাসনার প্রয়োজনীয় উপাদানে ভর্তি দোকান দেখে আমাদের বিস্ময় কাটে না। তবে, আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় বিস্ময় অপেক্ষা করছিল, তা হলো বিশাল স্বয়ম্ভুনাথ মন্দিরের চূড়া। স্বয়ম্ভুনাথ মন্দিরটি বিশাল উঁচু একটি পাহাড়ের শীর্ষদেশে অবস্থিত। শতাধিক সিঁড়ি ভেঙে কী করে উঠব এই মন্দিরের চূড়ায়! বুকে সাহস এনে নৃত্যপরিচালক ওয়ার্দা রিহাব, সঙ্গীতপরিচালক-সুরকার সাইম রানা ও আমি সিঁড়িতে পা রাখলাম। একে একে সবগুলো সিঁড়ি পেরিয়ে যখন মন্দিরে পৌঁছালাম তখন আনন্দ আর বুকে ধরে না। মন্দিরের স্থানে স্থানে বৌদ্ধ ধর্ম-উপাসনা চলছে, আর তারই একপাশে একদল সংগীতরসিক মানুষ হারমোনিয়াম, তবলা, করতাল বাজিয়ে নেপালি ভাষায় সমকালীন চর্যাগান গেয়ে চলছে। আজ থেকে প্রায় একশত বছর আগে চর্যাগীতির পরিবেশনারীতি সম্পর্কে এর আবিষ্কারক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কল্পনা করে যা লিখেছিলেন তা অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায়। আসলে, চর্যার এই আসরটি ছিল একেবারে কীর্তনের আসরের মতোই। সেদিন সন্ধ্যায় চর্যানৃত্যশিল্পী ও পরিচালক রাজেন্দ্র শ্রেষ্ঠ-র সাথে সাক্ষাত্-আলাপের সুযোগ ঘটে। তার কাছ থেকে আমরা প্রথমেই জানতে পারি নেপালে চর্যানৃত্য চর্চা করেন প্রধানত বজ্রযানী বৌদ্ধরা, আর এই নাচের সঙ্গে মূলত তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম-সাধনা যুক্ত রয়েছে, তাই এই নৃত্য সচরাচর সাধারণের সামনে করার বিধান নেই। তিনি জানান, বজ্রযানী বৌদ্ধ-দর্শন গ্রন্থ হেবজ্রতন্ত্রে আছে—‘যদি তুমি সিদ্ধি লাভ করতে চাও তো নাচো।’ এদিক দিয়ে নেপালের বজ্রযানীরা তাদের তান্ত্রিক নাচ ও গানকে ধ্যানের সমকক্ষ জ্ঞান করেন। এসব আলোচনা ও পর্যবেক্ষণ ছিল চর্যানৃত্য দেখার পূর্বপ্রস্তুতি স্বরূপ। ২৭ অক্টোবর ২০০৯ হোটেল বজ্রাতে আমাদের জন্য সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এসে ধরা দেয়, কলামণ্ডপ তাদের নিয়মিত সাপ্তাহিক আয়োজনের অংশ হিসেবে সেদিন সন্ধ্যায় চর্যানৃত্য পরিবেশন করে। এতদিন প্রায় এক হাজার বছর আগের লেখা চর্যাগীতির চরণে পড়েছিলাম—‘একশো পদ্মা চৌষট্টি পাখুড়ি/ তহি চড়ই নাচই ডোম্বী বাপুড়ি\’ বা ‘নাচন্তি বাজিল গান্তি দেবী।’ এবার স্বচোখে সেই নাচ দেখার পালা। আসরের শুরুতেই পরিচালক রাজেন্দ্র শ্রেষ্ঠ এই নৃত্য প্রত্যক্ষ করার জন্য দর্শকদের কিছু নির্দেশনা দেন এই কারণে যে, এটা একধরনের তান্ত্রিক নৃত্য, এই নৃত্য দেখার জন্য দর্শককেও কিছু নিয়মের ভেতর দিয়ে দর্শক হয়ে উঠতে হবে। শুরুতে উপস্থিত দর্শকদের ধ্যান করিয়ে নেন পরিচালক রাজেন্দ্র শ্রেষ্ঠ, এরপর চর্যানৃত্যে হাতির মুখোশ পরে ‘গণেশ’ নামের এক ধরনের নৃত্য পরিবেশন করা হয়। সাদার ওপর খয়েরি রংয়ের পোশাক পরা গণেশের পায়ে নূপুর পরা থাকে, গলায় রুপালি ও সোনালি রংয়ের শিকল করা মালা থাকে। কোমরে সোনালি ধাতব বেল্ট, তার সঙ্গে রং মিলিয়ে হাতের ব্রেসলেটটিও হয় সোনালি। গণেশ নৃত্যের বিশেষত্ব হচ্ছে ঘন ঘন উল্লম্ফন, শূন্যে ঘূর্ণন এবং তাদের হাত চালনার কাজটিও হয় বেশ আকর্ষণীয়। গণেশের পর একে একে চর্যানৃত্যে বসুন্ধরা, বজ্র যোগিনী, বজ্রপাণী ইত্যাদি উপস্থাপিত হয়ে থাকে। নাচের সময় নেপালি ভাষায় চর্যাগীতি ও তালের বিভিন্ন ধরনের নেপালি বোল ব্যবহূত হয়ে থাকে। বাদ্যকর ও গায়কগণ আসরে এক পাশে বসে তত্ক্ষণিকভাবেই সংগীত বাদ্য পরিবেশন করে নৃত্যশিল্পীকে সাহায্য করে থাকেন। আমরা নেপালে প্রচলিত এই চর্যানৃত্য প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আত্মীকৃত করার পক্ষে। কেননা, এই প্রক্রিয়া এবং চর্যাগীতির পদের বিভিন্ন নৃত্য পরিবেশনার বিবরণ ও পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের মন্দিরগাত্রে উত্কীর্ণ টেরাকোটা দৃষ্টে বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন চর্যানৃত্য ধারার স্বরূপ সাম্প্রতিককালে নির্মাণ করা সম্ভব বৈকি। এই লক্ষ্যে বাংলাদেশের নৃত্যপরিচালক ওয়ার্দা রিহাব কলামণ্ডপের নিজস্ব ভবনে রাজেন্দ্র শ্রেষ্ঠ-র কাছ থেকে চর্যানৃত্যের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। আমরা রাজেন্দ্র শ্রেষ্ঠ-র কাছ থেকে চর্যা-গীতি-নৃত্যের প্রশিক্ষণ নিয়েছি বলে, একথা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, একমাত্র রাজেন্দ্র শ্রেষ্ঠ বা তার সংগঠন কলামণ্ডপের শিল্পীরাই নেপালে চর্যানৃত্য পরিবেশন করেন, তাঁদের বাইরেও নেপালে অনেক সংগঠন ও শিল্পীরা পেশাগতভাবে পর্যটকদের জন্য যেমন চর্যানৃত্য পরিবেশন করেন, তেমনি নেপালের বৌদ্ধধর্মাবলম্বী জনগণের মাঝেও চর্যানৃত্যের কৃত্যমূলক একটি ধারা প্রচলিত রয়েছে। সে যা-ই হোক, পরদিন আমরা নেপালের প্রাক্তন সেই রাজদরবার গ্রন্থাগারে যাই চর্যাগীতির মূল পাণ্ডুলিপিটি স্বচোখে দেখার জন্য। গ্রন্থাগারের নতুন ক্যাটালগে অনেক খোঁজাখুঁজির পরও পাণ্ডুলিপির হদিস পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে, গ্রন্থাগারে প্রায় বারোটির মতো বাংলা বইয়ের সন্ধান পেয়েছি। এছাড়া, চর্যাগীতির পুঁথিপাঠক নেপালের সুপ্রিম কোর্টের কর্মচারী নরেন্দ্রমুণি বজ্রাচার্য (৪৮)-এর ১৭০টি চর্যাগীতির হাতে লেখা পুঁথি প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য হয়, তার একটি ফটোকপি বর্তমানে আমার সংগ্রহে আছে। মজার ব্যাপার হলো, নরেন্দ্রমুণি বজ্রচার্যের কাছ থেকে সংগৃহীত ১৭০টি চর্যাগীতির পুঁথির বেশ কয়েকটি চর্যাগীতির সঙ্গে প্রাচীন বাংলার চর্যাপদের হুবহু সাদৃশ্য রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী সংগৃহীত চর্যাগীতির পদসমূহের ওউপরে রাগ-রাগিনীর উল্লেখ থাকলেও গীত-তালের উল্লেখ নেই। কিন্তু আমাদের সংগৃহীত চর্যাগীতির পাণ্ডুলিপিতে প্রতিটি চর্যাগীতির ওপরে সুর ও তালের উল্লেখ রয়েছে, যাকে আশ্রয় করে বিস্তৃত গবেষণার সুযোগ রয়েছে। আমি তাই সেই চর্যাগীতির পাণ্ডুলিপির একটি ফটোকপি সংগ্রহ করি। কাঠমন্ডুর পথে পথে, মন্দিরে মন্দিরে ঘুরে, এমনকি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে আলাপে আমরা যখন চর্যার পরিবেশনারীতির সমকালীন চালচিত্র নিয়ে ব্যস্ত, তখন আমাদের মনে একটা অতৃপ্ত ছিল যে, কাঠমন্ডুর পথে কোনো বৌদ্ধ-ভিক্ষুকের দেখা পেলাম না! সহসা ডমরু ও ঘণ্টা বাজিয়ে আমাদের সামনে হাজির হন একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু। তিনি তার দুই হাতে ডমরুর চামড়ায় ও ঘণ্টার কাঁসায় তাল ঠুকে অপূর্ব একটি ধ্বনি তুলে বৌদ্ধমন্ত্রের মতো সুরে ভিক্ষা চেয়ে ফেরেন, তার ঝুলিতে কিছু অর্থ দিয়ে আমরা কাঠমন্ডু থেকে দেশে ফিরে আসি, কিন্তু সঙ্গে বয়ে আনি প্রাচীন বাংলার হারিয়ে যাওয়া নৃত্য-গীতির আয়োজন। নেপালে চর্যানৃত্য পরিবেশনার ইতিহাস : নেপাল-তিব্বতের বৌদ্ধমঠে চর্যা গীতি-নৃত্যের ধারাবাহিক চর্চা যে অবিচ্ছিন্ন ছিল তাহার প্রমাণ হরপ্রসাদ শাস্ত্রী দিয়েছেন। আমরা এ পর্যায়ে নেপালে চর্যা গীতি-নৃত্যের উদ্ভব ও চর্চার ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করব। বাংলাদেশের মতো নেপালেও চর্যা গীতি-নৃত্য প্রচলিত হয় ৭০০ থেকে ৮০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে। নেপালে প্রচলিত চর্যা গীতি-নৃত্যও মূলত বৌদ্ধতান্ত্রিকদের ঐতিহ্য। সেখানে এই নৃত্যের চর্চা ছিল অতিগোপনীয়, সুুনির্দিষ্ট কিছু সাধন-তান্ত্রিক মানুষই এই নৃত্য চর্চা ও দেখার অধিকার রাখত। আধুনিককালে ১৯৫৭ সালে কাঠমন্ডুতে অনুষ্ঠিত বৌদ্ধদের আন্তর্জাতিক সন্মেলনে প্রথম এই চর্যা গীতি-নৃত্য জনসমক্ষে প্রদর্শিত হয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত চর্যানৃত্য নাগরিক পরিমণ্ডলের নেপালি সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত হয়ে আছে। কিন্তু চর্যানৃত্যের আসল তাত্পর্য বুঝতে হলে বৌদ্ধ-বজ্রাচার্যদের ধর্মীয় কৃত্যকে অবলোকন করার কোনো বিকল্প নেই। সামপ্রতিককালে নেপালের বৌদ্ধ-তান্ত্রিকদের প্রধান উত্সব ও পূজা উপলক্ষে চর্যানৃত্য পরিবেশিত হয়ে থাকে। চর্যাপদ পরিবেশনার বর্তমান অবস্থা : নেপালে এখনো চর্যাপদের গান লেখা হয় এবং সুর করে কখনো তা সুরবাদ্যসহ গীত করা হয়, কখনো বা আবার সুরবাদ্যসহ গীতের পাশাপাশি চর্যানৃত্য পরিবেশিত হয়ে থাকে। সাধারণত বজ্রাচার্য অনুসারী বৌদ্ধরা মন্দিরে ও বিভিন্ন নাগরিক অভিনয়মঞ্চে বা পর্যটকদের সামনে চর্যার গীত-নৃত্য পেশাগতভাবে পরিবেশন করে থাকে। নেপালের কাঠমন্ডুর কিছু হোটেল, গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন নিয়মিতভাবে বিদেশি পর্যটকদের সামনে এ ধরনের চর্যানৃত্য গীত পরিবেশন করে। নেপালে প্রচলিত চর্যা নৃত্য-গীতে সাধারণত রাগ নাট, ললিত, গুমজলি’র সাথে জটি তাল; রাগ ধানাশ্রির সাথে কাস্পাতি তাল; রাগ মামগালা বাস্মতা’র সাথে সাতামকারা তাল; রাগ কামোধ-এর সাতামকারা তাল; রাগ হিমদোলা’র সাথে সাতামকারা; রাগ ভাইরাভা’র সাথে এক তাল; রাগ তারভালি’র সাথে ত্রিহুরা তাল ব্যবহূত হয়। নেপালে চর্যা নৃত্যগীত পরিবেশনে বজ্রযোগিনী, বজ্রপাণী, পঞ্চবুদ্ধ ইত্যাদির নৃত্য অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ও জনপ্রিয়। উপসংহার : বাংলাদেশে চর্যার গীতি-নৃত্যের স্বরূপ উপস্থাপনের লক্ষ্যে এতদিন আমরা যে গবেষণা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছি, তা সর্বাংশে সঠিক—একথা মনে করা অনুচিত হবে। কেননা, বৃহত্তর অর্থে একদিকে যেমন নেপালে প্রচলিত বিচিত্র ধারার চর্যার গীতি-নৃত্য পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন, অন্যদিকে তেমনি বাংলাদেশে প্রচলিত বৌদ্ধ এবং হিন্দু-মুসলিম-নাথ ইত্যাদি ধর্মানুসারী মানুষের মধ্যে প্রচলিত নৃত্যধারাও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। কেননা, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ-র ভাষ্যমতে জানতে পারি, বাঙালি মুসলমানমাত্রেই আগে বৌদ্ধ, পরে হিন্দু এবং শেষে মুসলিম। তাই মুসলিমদের নৃত্যভঙ্গিমায় ও জীবনাচারের গভীরে প্রাচীনকালের বৌদ্ধ সংস্কৃতির অনেক পরিচয় সুপ্ত রয়েছে। এক্ষেত্রে নৃতাত্ত্বিক সাংস্কৃতি অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ ছাড়া প্রাচীন বাংলার নৃত্যধারার পরিচয় উদ্ঘাটন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। 