নিউইয়র্কে শাবানার এই অন্তরাল অবস্থানের মাঝে মাঝেই বাংলাদেশে এসেছেন তিনি। তবে গত ৩ বছরে ৩ বারের বাংলাদেশ সফরে খুব কম সময়ই ছিলেন ঢাকায়। দেশে নেমে চলে গিয়েছেন তার শ্বশুরবাড়ি। সেখানেও গুজব উঠেছিল—শাবানা নাকি রাজনীতিতে ফিরবেন তাঁর শ্বশুরালয় থেকে। সেই সফরগুলোয় শাবানার সান্নিধ্যে ছিলেন আমাদের যশোর প্রতিনিধি আহমেদ সাঈদ বুলবুল। তিনি লিখেছেন এই শাবানাকে নিয়ে—
রুপালি জগতে অনেকবার তিনি বধূ সেজেছেন। স্বামীর সাথে নতুন বধূর সাজে গেছেন শ্বশুরবাড়ি। কিন্তু বাস্তব জীবনের শ্বশুরবাড়ি? সেটা তার একটাই। শ্বশুরবাড়ির ঠিকানা যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার মঙ্গলকোট ইউনিয়নের বড়েঙ্গা গ্রাম। জেলা শহর যশোর থেকে ৩১ কিলোমিটার দক্ষিণের উপজেলা সদর কেশবপুর পেরিয়ে দক্ষিণ-পূর্বদিকে সাড়ে তিন কিলোমিটারের দূরত্বে অবস্থান বড়েঙ্গা গ্রামের। এই গ্রামেরই বধূ চিত্রনায়িকা শাবানা।
১৯৭৩ সালে ওয়াহিদ সাদিকের সাথে সাত পাকে বাঁধা পড়ার পর থেকে ৪ দশকেরও বেশি সময় সুখী দাম্পত্য জীবনের মধুময় দিন পার করেছেন এই দম্পতি। সিনে জগতে শাবানার মধ্যে অনেক জটিল রসায়নের দেখা মিললেও বাস্তব জীবনে তার ছিঁটেফোঁটাও ছিল না বা নেই ৪ দশকের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে। তবে বিস্ময়কর ঘটনা হলো—খোদ শ্বশুরবাড়ি বড়েঙ্গা গ্রামে দাম্পত্য জীবনের একটি রাতও কাটেনি শাবানা দম্পতির। আর শাবানা বড়েঙ্গা গাঁয়ের বধূ হলেও তাঁর দর্শন পেতে গ্রামবাসীদের অপেক্ষা করতে হয়েছে তিন দশকেরও বেশি সময়। শাবানার স্বামী ওয়াহিদ সাদিকের ভাষায় : ‘কবে তাকে নিয়ে বড়েঙ্গায় গিয়েছিলাম, ঠিক মনে করে বলতে পারব না। তবে তা ৮-১০ বছর আগে হবে।’ সাথে সাথে যোগ করলেন : ‘না বড়েঙ্গায় গ্রামের বাড়িতে তাকে নিয়ে কখনো থাকা হয়নি। দিনে দিনেই বড়েঙ্গা ঘুরে রাতে খুলনায় আমাদের যে বাড়ি আছে সেখানে ফিরে যেতাম।’
তবে রাতে থাকুক বা না থাকুক, যত বছর পার করেই হোক না কেন শাবানা তো এসেছেন বড়েঙ্গায়! এর চেয়ে আনন্দের, এর চেয়ে খুশির কথা আর কী-ই বা হতে পারে তাদের কাছে! তাই তো হূদয়ের সবটুকু আবেগ আর উজাড় করা ভালোবাসার ডালি মেলে ধরেই বরণ করেছেন গাঁয়ের বধূকে। ছেলে-বুড়ো, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে দলে দলে শাবানা-দর্শনে এসে তারা একটি বার্তাই দিতে চেয়েছেন তাঁকে : ‘তুমি যে আমাদের ওগো তুমি যে আমাদের।’ গাঁয়ের সোজাসরল লোকগুলোর ভালোবাসার কথা পড়তে এতটুকুও ভুল হয়নি রুপালি নায়িকার। কারণ, অভিনয়কে ছাপিয়ে কোনটা সত্যিকার ভালোবাসা, সেটা তো তাঁর বুঝতে পারা চোখের পলকের ব্যাপার।
শাবানা ভুল করলেন না মানুষের ভালোবাসার প্রতিদান দিতে। তিনিও ভালোবাসার সবটুকুই যেন উজাড় করে দিতে চাইলেন তাদের জন্য। গ্রামে তৈরি করে দিলেন মসজিদ। বাড়িও বানালেন নিজের জন্য। সেখানে তিনি মাঝেমধ্যেই থাকবেন। শ্বশুরবাড়ির ভিটে ঠিকানা তো তাঁর থাকা চাই-ই চাই। তা সে যত ছোট করেই হোক, আর তা রাত কাটানোর জন্য না হলেও—অন্তত শ্বশুরবাড়ি এসে নিজের ঘরে তো উঠতে পারবেন। এখানে থামলেও পারতেন। কিন্তু তিনি যে মানুষের ভালোবাসার প্রতিদান দিতে চান। যারা তাকে এত ভালোবাসে, তাদের তিনি খালিমুখে ফেরাবেন কী করে? তা তো হয় না। তাই তিনি তাদের জন্য আয়োজন করেন ভূঁড়িভোজের। দু-দশ গাঁয়ের মানুষ সারি বেঁধে বসে মাংস-ভাত খেয়েছে তৃপ্তির সাথে।
তবে এতসব কর্মযজ্ঞের মধ্যে সাধারণ মানুষ আলামত পান অন্যকিছুর। সেটা অবশ্যই রাজনীতির। তাদের মধ্যে কানাঘুষো হয় ‘না হলে সপরিবারে সেই মার্কিন মুল্লুকে পাড়ি জমানো শাবানা যিনি বিয়ের পর তিন দশক পা মাড়াননি বড়েঙ্গায়, তিনি কেন হঠাত্ এত তোড়জোড় শুরু করলেন গ্রামটিকে নিয়ে?’ তবে এ নিয়ে তাদের কোনো অভিযোগ-অনুযোগও নেই। বরং উত্সাহ জোগাতেই ভালোবাসেন তারা। তাদের চোখের চাহনি শাবানার হূদয়ে ঠিকঠিক বার্তাটিই পৌঁছে দেয় ‘শাবানা তুমি এগিয়ে চলো আমরা আছি তোমার সাথে।’ তবে এই একটা জায়গায় শাবানাকে নিরুত্তর থাকতে দেখা যায়। কে জানে কী হতে কী হয়ে যায়? তাই চুপচাপ থাকাই বুদ্ধিমতীর কাজ। নাকি পরিস্থিতি আঁচ করে সময়মতো সিদ্ধান্ত নেবেন শাবানা, সেটা সময়ই বলে দেবে।
