সিলেটের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে প্রকৃতিপ্রেমীদের ভিড়

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০১৪, ২৩:১৮
অপার সৌন্দর্যের লীলা ভূমি সিলেট। প্রবাসী অধ্যুষিত এই সিলেটের চার জেলা সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে নয়ন জুড়ানো প্রাকৃতিক দৃশ্যপট। এখানে সাগর সদৃশ্য হাওর, নদী, খাল, পাহাড়, টিলা, ঝর্ণা, চা-বাগান, বালি পাথর, বন-বনানী আর লতাগুল্মে ভরা প্রকৃতির অপূর্ব নিদর্শন রয়েছে। তাই ঈদের ছুটিতে প্রতি বছরের মত এবারও প্রকৃতিপ্রেমীরা সিলেটের নানা প্রান্তের পর্যটন স্পটে ছুটে বেড়াচ্ছেন। বলতে গেলে নীরব-নিথর এসব অঞ্চল হাজার হাজার পর্যটকের পদচারণায় কোলাহলমুখর। সব বয়সের পর্যটকরাই রয়েছেন। তবে এবার নারী ও শিশুদের ভিড় বেশি বলেই মনে হচ্ছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকায় অনেকেই আসতে পেরেছেন বলে জানিয়েছেন পর্যটকরা। সিলেটের আকাশে এখন শ্রাবণের দলছুট মেঘরাজি। এগুলো কখনো খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড় বা লালাখালের বুকে আছড়ে পড়ে। তখনি এক খণ্ড বৃষ্টি নেমে তপ্ত হাওয়াকে সিক্ত করে দিয়ে যাচ্ছে। জাফলং-তামাবিল যাওয়ার পথে বিছনাকান্দির নিকট সর্পিল গতির পাহাড়ী সড়কে অনেক সময় সবাইকে তাক লাগিয়েই সাদা মেঘ ঢেকে দেয় গাড়ির সামনের গ্লাস। তখন এক অপূর্ব অনুভূতি আসে পর্যটকদের মনে। এসময় চোখে পড়বে ডানদিকের পাহাড়ের চূড়া থেকে নেমে আসা অপূর্ব দৃশ্যের ঝর্ণাধারা। এর অনেক নিচের পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জলে ভেসে উঠা প্রাকৃতিক জলছবি জানান দেয় ‘আমি বিছনাকান্দি’। এই পাথর কোয়ারিটি এক অপূর্ব দৃশ্যের। এখানে বড় বড় দৃশ্যমান পাথরের ফাঁকে পাহাড়ী জলের স্রোতধারা মানুষের মন-প্রাণ জুড়ায়। বিশাল সিলেটের সীমান্ত এলাকা, হাওর জনপদ এক মায়াবী সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি। বিশেষ করে সুনামগঞ্জের বিশাল হাওর টাংগুয়া, মৌলভীবাজারে মাধবকুন্ড জলপ্রপাত, দিগন্ত বিস্তৃত গাড় সবুজ চা বাগান, পাহাড়ী আদিবাসীদের জীবনধারা, জাফলং-এ পাহাড়ী ঝর্ণা ও হাকালুকি হাওরের এক মোহনীয় পরিবেশ। প্রকৃতির আকর্ষণে দর্শনার্থীরা মুগ্ধ। ‘‘বিশাল টাংগুয়ার হাওরে নিথর জলরাশিতে হিজল-করছ গাছগুলোর গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য সত্যিই মনোমুগ্ধকর,’’ এই মন্তব্য করে ঢাকায় বসবাসকারী গৃহিণী আলেয়া ফেরদৌসী বলেন ,‘‘শীতে আবার আসবো টাংগুয়ায় আকাশ ঢাকা পাখি আর পানির নিচের ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ দেখতে।’’ পরিবার-পরিজন নিয়ে আলেয়া এসেছিলেন ঈদের ছুটিতে টাংগুয়াসহ সিলেট দেখতে। হাওর দেখা শেষে এখন তিনি সিলেটের চা বাগান, ঝর্ণা, আর বন-বনানী ঘুরে বেড়াবেন। প্রকৃতি কন্যা জাফলং ও ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারিতে দাঁড়িয়ে দেখা যায় এপাড়ের প্রকৃতি যেন ওপাড়ের পাহাড়ের সাথে মিতালী করছে। স্থানে স্থানে পাথর আহরণের সারি সারি নৌকার ঝাঁক, সে আরেক দৃশ্য। সীমান্তবাসীরা নদীর তলদেশ থেকেই পাথর তোলে জীবিকা আহরণ করেন সেই কবে থেকে। কিন্তু ইদানিং অবৈধ বোমা মেশিন দিয়ে নদীর তলদেশ বা পাহাড় ধসিয়ে পাথর উত্তোলন করে বিনাশ করে দেয়া হচ্ছে প্রাকৃতিক মায়াময় দৃশ্যাবলী। এদের কর্মকাণ্ড পর্যটকদেরও চরমভাবে বিরক্তির কারণ হয়ে আছে। পাথর ভাঙ্গার মেশিন আর বোমা মেশিনের কারণে এলাকাবাসী ও প্রশাসন অতিষ্ঠ। সৌন্দর্যময় সিলেটের পর্যটন স্পটের সংখ্যা বাড়লেও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি সেভাবে। তাই পর্যটকরা অনেক সময় সিলেটে এসে হতাশ হয়ে পড়েন। ‘‘এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য অতুলনীয়। কিন্তু অবকাঠামোগত উন্নয়ন সেভাবে হয়নি,’’ এই অনুভূতি ব্যক্ত করে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ডিএমডি আবুল কাশেম বলেন, হাওরের মধ্যখানে দ্বীপের মত গ্রামগুলো দেখতে খুবই সুন্দর। কিন্তু গ্রামবাসীর বেদনা আমরা অনেকেই বুঝি না।’’ তিনি বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন নেই বলে এরা এখনো পশ্চাদপদ।’’ তিনি বলেন ‘‘এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূলধারায় সংযুক্ত করে দেশকে আরো এগিয়ে নেয়ার বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। এবার ঈদের দিন থেকে সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন পর্যটন স্পটগুলোতে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় লেগেই আছে। বিশেষ করে সিলেটের জাফলং, রাতারগুল, লোভাছড়া, পান্তুমাই, সুনামগঞ্জের টেকেরঘাট, রামসার ভোক্ত টাংগুয়া, মৌলভীবাজার জেলার মাধবকুন্ড, শ্রীমঙ্গলের চা বাগান, হবিগঞ্জের সাতছড়িসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পটে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রকৃতিপ্রেমীরা ভিড় করছেন। এদিকে মায়াবী জাফলং এর অদূরে বিশাল খাসিয়া জৈন্তা পাহাড় থেকে নেমে আসা সফেদ ঝর্ণার দৃশ্য ও মাধবকুন্ড জলপ্রপাতের অবিরাম ধারা পতনের শব্দ আর বাতাসের ঝাপটায় ঝর্ণার পনির কণা যেন এক স্বর্গীয় পরশ। এসব দেখে মুগ্ধ হয়েছেন ময়মনসিংহের কামরুল দম্পতি। জাফলং এর জিরো পয়েন্ট ও ভারতের শিলং যেতে তামাবিল শুল্ক স্টেশন এলাকায় পর্যটকদের চোখে লাগার মত ভিড়। যেন সিলেটের পর্যটন এলাকাগুলো উত্সবে মেতে উঠেছে। হোটেল, রেস্তোরাঁয় যেন ঠাঁই নেই। কিন্তু মাঝে-মধ্যে এই মায়াময় পরিবেশ হয়ে উঠে বিষাদময়। পর্যটকদের আনন্দ হারিয়ে যায় কোনো কোনো দুর্ঘটনার কারণে। নিষেধ থাকা সত্ত্বেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বন্ধুদের সাথে সাঁতার কাটতে গিয়ে চোরাবালিতে আটকে ও মাধবকুন্ডের উঁচু চূড়া থেকে পড়ে লাশ হয়ে বাড়ি ফিরেন কেউ কেউ। গত বুধবার সাঁতার কাটতে গিয়ে জাফলংয়ে পিয়াইন নদীতে নিখোঁজ হন কামরুল ইসলাম (২০)। বৃহসপতিবার দুপুর ১২টার দিকে ডুবুরির সহায়তায় তার লাশ উদ্ধার করা হয়। গোয়াইনঘাট থানার ওসি জানান, কয়েকজন বন্ধুর সাথে সাঁতার কাটতে গিয়ে চোরাবালিতে আটকে সে মারা যায়। নিখোঁজ কামরুল সিলেট নগরীর শাহী ঈদগাহ হোসনাবাদ এলাকার বাসিন্দা। এই ঘটনার পর ক্ষণিকের জন্য হলেও পর্যটকদের বিষণ্ন করে তোলে গতকাল। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ২শ’ ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় জলপ্রপাতের উপরে ও উঁচু পাহাড়ে বিচরণ করতে গিয়ে অনেক তরুণ-তরুণী লাশ হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, গোপন কোনো স্পট দিয়ে উপরে উঠে যায় পর্যটকরা। আর মাঝে মাঝে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। অপরদিকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের হিসেব অনুযায়ী ঈদের দিন বিকাল থেকে শতাধিকগুণ পর্যটকদের আগমন ঘটে। এছাড়া মাধবপুর লেক, হামহাম জলপ্রপাত, বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক, মনুব্যারেজ পার্ক, নাজিমগড়, লালাখাল, জাকারিয়া রিসোর্ট ও শ্রীমঙ্গলে পাঁচ তারকা হোটেল গ্রান্ড সুলতানে পর্যটকরা সানন্দে ঘুরছেন। সিলেটের নামি-দামি হোটেলে এখন সিট সংকট চলছে পর্যটকদের আনাগোনায়।