মঙ্গলবার পরমানন্দে মানুষ উদযাপন করেছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। ধনী-গরিব সকলেই ঈদের খুশিতে ছিলেন একাকার। এই মহা উত্সবের পূর্বদিন সোমবার ২৯ রোজার দিন সন্ধ্যার পশ্চিমাকাশে ঈদের এক ফালি বাঁকা চাঁদ দেখে আনন্দে মেতে ওঠে গোটা দেশ। অগনন কণ্ঠ হয়ে ইথারে ভাসতে থাকে “রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ.....।”
এসাম্যের ঈদে সকলেই এক কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেছেন ঈদের জামাতে। ঘরে ঘরে ছিল আনন্দের ঝর্নাধারা। নতুন পোশাক পরে খোশ মেজাজে ঘুরে বেড়িয়েছে শিশু-কিশোর-কিশোরীরা। বড়দের কাছ থেকে সালামি পেয়ে তাদের আনন্দ বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ।
ঈদ উপলক্ষে সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্বশাসিত ভবনগুলোতে আলোকসজ্জা করা হয়। সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। দৈনিকগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করে। হাসপাতাল এবং এতিমখানা ও বন্দিদের জন্য জেলখানায় বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। সরকারি শিশু সদন, ছোটমণি নিবাস, সামাজিক প্রতিবন্ধী কেন্দ্রে, বৃদ্ধাশ্রম, ভবঘুরে কল্যাণ এবং দুঃস্থ কল্যাণ কেন্দ্রে উন্নতমানের খাবার বিতরণ করা হয়। এছাড়া দেশের সব কারাগারেও পরিবেশন করা হয় উন্নতমানের খাবার।
গণভবনে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে রাজনীতিক, কবি, সাহিত্যিক, লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে এবং বেলা সাড়ে ১১টায় কূটনীতিক ও বিচারপতিদের সঙ্গে শুভেচ্ছাবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ বেলা ১১টায় দলীয় কার্যালয়ে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বেলা ১১টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
রাজধানীতে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয় সকাল সাড়ে ৮টায় জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে। জামাতে ইমামতি করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব প্রফেসর মাওলানা মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন। এছাড়া জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে সকাল ৭টা থেকে ১১টা পর্যন্ত পর পর ৫টি ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় মহানগরীর ৯০টি ওয়ার্ডে মোট ৩৬৬টি ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ শেষে মুসল্লিরা কোলাকুলি করেন একে অপরের সঙ্গে। দোয়া ও মোনাজাত করেন বিশ্ব মুসলিমের ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিম জাহানের উন্নতি ও সমৃদ্ধি কামনার অঙ্গীকারে।
ঈদের প্রধান জামাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে র্যাব ও পুলিশসহ আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক নজরদারি বজায় রাখে। সাদা পোশাকেও র্যাব এবং পুলিশ সদস্যরা তত্পর ছিল।
প্রতিবারের মতো এবারও দেশের ঈদুল ফিতরের বৃহত্তম জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে। সেখানে গাজায় ইসরায়েলি হামলার নিন্দা জানিয়ে মুসলিম সমপ্রদায়কে এ হত্যাকাণ্ড ঠেকাতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়।
এবার টানা নয় দিনের ছুটি থাকায় অনেকেই গ্রামের বাড়ি চলে গেছেন। ফলে এবার রাজধানী ঢাকা একটু বেশি ফাঁকা। জন সমাগমপূর্ণ ঢাকার চিরচেনা সেই রূপ এখন অন্যরকম।
রাজশাহীতে ঈদ
রাজশাহী অফিস: মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টায় হযরত শাহ্ মখদুম (রহ.) কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এখানে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের (রাসিক) মেয়র মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল ও সদর আসনের সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশা, সাবেক মেয়র ও সাংসদ মেয়র মিজানুর রহমান মিনুসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ প্রায় ২৫ হাজার মানুষ ঈদের জামাতে শরিক হন। একই সময়ে দ্বিতীয় প্রধান ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয় সাহেব বাজার বড়রাস্তায়। এখানে মহিলাদের একমাত্র জামাত অনুষ্ঠিত হয়। তৃতীয় বৃহত্তম ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয় টিকাপাড়া মহানগর ঈদগাহ ময়দানে। এছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রুয়েট, বিভাগীয় ও জেলা স্টেডিয়াম, কাদিরগঞ্জ হাজী লাল মোহাম্মদ ঈদগাহ্, শালবাগান, উপশহর হাউজিং এস্টেট বালিকা বিদ্যালয়সহ নগরীর শতাধিক মাঠে এবারের ঈদ জামাত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ঈদ উপলক্ষে নগরীর সড়কে আলোকসজ্জা করা হয়। প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপসমূহ জাতীয় পতাকা ও ঈদ মোবারক এবং লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ খচিত রং বেরংয়ের পতাকা দিয়ে সাজানো হয়। আনন্দঘন ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ঈদ-উল-ফিতর উদযাপন এবং যে কোন ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে রাজশাহী মহানগর পুলিশ বিশেষ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
বরিশালে
বরিশাল অফিস:বরিশালে ঈদের প্রধান জামাত কেন্দ্রীয় হেমায়েতউদ্দিন ঈদগাহ ময়দানে সকাল সাড়ে ৮টায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। জামাতে সিটি মেয়র আহসান হাবিব কামাল, সাবেক মেয়র মজিবর রহমান সরোয়ার, বিভাগীয় কমিশনার মো. গাউস, জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল আলম, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান রিন্টুসহ বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামজিক সংগঠনের নেতা এবং এবং বিপুল সংখ্যক সাধারণ মুসল্লি নামাজ আদায় করেন। জামাত শেষে নেতৃবৃন্দ বরিশালবাসীকে ঈদ শুভেচ্ছা জানান।
বরিশালে দুটি করে ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয় জামে কসাই মসজিদে, বায়তুল মোকাররম জামে মসজিদে, এবায়দুল্লাহ জামে মসজিদে, পুলিশ লাইনস্ জামে মসজিদে এবং সাগরদী মাদ্রাসা ময়দানে।
এখানকার সর্ববৃহত্ ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে বরিশাল সদর উপজেলার চরমোনাই দরবার শরীফ মাঠে। এখানে অন্তত ৩০ হাজার মুসল্লি একত্রে ঈদের নামাজ আদায় করেন। বিভাগের দ্বিতীয় বৃহত্ ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে পিরোজপুরের ছারছিনা দরবার শরীফ মাঠে।
চট্টগ্রামে
চট্টগ্রাম অফিস:চট্টগ্রামে আনন্দমুখর পরিবেশে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়েছে। সকালে নগরীর বিভিন্ন মসজিদ, মাজার ও ঈদগাহে পবিত্র ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। নামাজ আদায় করেন লাখ লাখ মুসল্লি। নিজের সাধ্যের মধ্যে কেনা নতুন পাঞ্জাবী-পায়জামা ও টুপি পরে সবাই জামাতে শরীক হন। বর্ষাকাল হলেও বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ঈদগা ময়দানগুলো সর্বস্তরের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়। সকাল সোয়া ৮টায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে ঈদের প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত হয় নগরীর জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ প্রাঙ্গণে। জামাতে ইমামতি করেন জমিয়তুল ফালাহ মসজিদের খতিব মাওলানা জালালউদ্দিন আল কাদেরী। নামাজে নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, বিএনপি নেতা মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, সিটি মেয়র এম মনজুর আলমসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিপুলসংখ্যক মুসল্লি অংশ নেন। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নগরীতে ১৫০টির বেশি স্থানে ঈদ জামাত আয়োজন করে। এছাড়া চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় ঈদ জামাত কমিটির আয়োজনে এমএ আজিজ স্টেডিয়ামসহ নগরীর শতাধিক স্থানে জামাত অনুষ্ঠিত হয়। নগরীর ফয়স লেক আনসার মাঠে অনুষ্ঠিত জামাতে ইমামতি করেন বিশিষ্ট আলেম মাওলানা নুরুল আমিন মাহাদী। নামাজ শেষে দেশ ও জাতির সমৃদ্ধি কামনা করে মুনাজাত করা হয়।
সিলেটে
সিলেট অফিস:সিলেটের বৃহত্তম ঈদগাহ ময়দান শাহী ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায় হয় প্রায় লাখো মুসল্লির উপস্থিতিতে। ময়দানে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না।
মঙ্গলবার ঈদ জামাতের নির্ধারিত সময় সাড়ে ৮টায় থাকলেও, তার আগেই সাতসকাল থেকেই মুসল্লি¬দের ঢল নামে ঐতিহ্যবাহী সিলেট শাহী ঈদগাহ মাঠে। সকাল সাড়ে ৮টার অনেক আগেই তাই কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে যায় ঈদগাহ ময়দান। একপর্যায়ে মূল ঈদগাহ মাঠের বাইরেও অসংখ্য মুসল্লি¬ নামাজ আদায় করেন।
ঐতিহ্যবাহী শাহী ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায় করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, সিলেট-২ আসনের সংসদ সদস্য ইয়াহইয়া চৌধুরী, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সমপাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ও সমাজের বিভিন্ন স্তরের লোকজন ।
জামাতে আত্মসমর্পণের কণ্ঠে, বিনম্রচিত্তে গুণাহ মাফের জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করা হয়। একইসাথে বাংলাদেশের উন্নতি, অগ্রগতি, সমৃদ্ধি কামনা, বিশ্বের মুসলমানদের জন্য সাহায্য প্রার্থনা, বিশেষ করে ফিলিস্তিনের মুসলমানদের উপর ইসরায়েলি বর্বর হায়েনাদের কাপুরুষোচিত জঘন্য হামলার হাত থেকে মুসলমানদের রক্ষা করার জন্য প্রার্থনা করা হয়। প্রার্থনার সময় পুরো ঈদগাহ ময়দানে কান্নার রোল ওঠে। ঈদের জামায়াতকে কেন্দ্র করে শাহী ঈদগাহসহ শহর জুড়ে ছিল কঠোর নিরাপত্তা।
