বর্ষায় উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচে হাওরের মানুষ

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০১৪, ২২:২৪
স্বাধীনতার ৪৩ বছর পার হয়ে গেলেও হাওর অঞ্চলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে বাস্তবায়ন হয়নি। ছিটেফোঁটাভাবে কিছু কাজ হয়েছে তার সবই ক্ষণস্থায়ী। আর এজন্যই হাওর অঞ্চলের মানুষ অস্তিত্ব রক্ষায় নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। ‘হাওর জঙ্গল-মোষের সিং এই তিনে ময়মনসিং’ এমন ছড়ার রেশ আজও হারিয়ে যায়নি। ময়মনসিংহ জেলা ভাগ হওয়াতে হাওর এলাকা ময়মনসিংহ থেকে বাদ পড়ে গেছে। এখন হাওর অঞ্চল বলতে নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ আর হবিগঞ্জ জেলাকেই বোঝায়। অসংখ্য নদ-নদী, খাল-বিল আর হাওর পরিবেষ্টিত এই বিশাল এলাকায় বাস করে প্রায় দেড় কোটি মানুষ। বর্ষায় হাওরের উত্তাল তরঙ্গের সাথে যুদ্ধ করে হাওরের মানুষ বাঁচে। মনে হয় যেন এক বিশাল সাগরের মধ্যে ছোট ছোট গ্রাম বিচ্ছিন্ন কচুরিপানার মত ভাসছে। নেত্রকোনা জেলা এলজিইডি অফিস সূত্রে জানা গেছে, দেশের হাওরের জেলা হিসাবে পরিচিত নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং সুনামগঞ্জের জনগণের উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ) এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে ৯৪৫ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। হাওর অঞ্চলের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। এই অঞ্চলের একমাত্র ফসল বোরো ধান। আর সম্পদের মধ্যে রয়েছে মাছ। যদি বোরো ধান একবার বন্যায় মার খায় তবে ধনী-গরীব সবারই এক দশা হয়। আগাম বন্যার ভয়ে অস্থির থাকে হাওর অঞ্চলের লোকজন। অবশ্য সরকার আগাম বন্যার হাত থেকে ফসল রক্ষার জন্য কোনো কোনো হাওরে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করলেও দুর্নীতির কারণে সেই সমস্ত বাঁধ প্রতিবছরই ধসে পড়ে। এছাড়া পানি আসার আগে আগে বাঁধ নির্মাণ করা হয় বলে মাটির বাঁধ টেকে না। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এ সমস্ত কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকে বলে কোনো সরকারই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না। হাওরের অপর সম্পদ মাছ। কিন্তু সেই সম্পদও এখন আর আগের মত নেই। ব্যাপক হারে মাছ চাষ আর হয় না। প্রভাবশালীরা জলমহাল জবরদখল করে নেয়। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে জলমহালগুলোও তাদের দখলে চলে যায়। জেলে সমপ্রদায় এখন তাদের পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে মত্স্য সম্পদ বৃদ্ধিও প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এই হাওর অঞ্চলে কোনো শিল্প কারখানা নেই। ৭/৮ মাস এলাকাগুলো থাকে পানির নিচে। পাকা সড়ক বলতে তেমন কিছু নেই। অথচ এই হাওরেই উত্পাদিত হয় কোটি কোটি টাকার ফসল। নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ আর সুনামগঞ্জ এই ৪টি জেলার ৩০টি উপজেলা বোরো এলাকা। ৩০টি জেলায় উত্পন্ন হয় লাখ লাখ মণ বোরো ধান। যারা এই ধান উত্পন্ন করে তাদের কাহিনী ভিন্ন। তাদের জীবন-যাপন অন্যরকম। ধান উত্পাদনকারীরা দিন দিনই গরীব হচ্ছে, হচ্ছে ভূমিহীন। এলাকার কৃষি ব্যবস্থা সেই পুরনো যুগের। সিস্টেম লসের মতো হাওরেও প্রতি বছর লাখ লাখ মণ ধান নষ্ট হয়। অধিক উত্পন্ন এলাকাগুলোতে আগাম বন্যার কবল থেকে উঠতি ফসল রক্ষার জন্য বেড়িবাঁধ প্রয়োজন। অথচ এর কোনো ব্যবস্থা নেই। কিন্তু একবার যদি কোনো কারণে ফসল মার খায় বা নষ্ট হয়ে যায় তাহলে কৃষকরা অবর্ণনীয় দুরবস্থার মধ্যে পড়ে। পরিবার পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকা তাদের জন্য দায় হয়ে দাঁড়ায়। অনন্যোপায় হয়ে তাদের তখন পরবর্তী বছরের ফসল আবাদের জন্য মহাজনের কাছ হতে চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়। তবে যদি ঋণ করতে না পারে তাহলে জমিসহ বাড়ি-ঘর মহাজনের হাতে তুলে দিতে হয়। এই কাজে সহায়তা করে এলাকার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি, টাউট আর দালাল। এই পরিপ্রেক্ষিতে হাওর অঞ্চলে প্রতি বছর শত শত কৃষক জমি-জমা খুইয়ে ভূমিহীন হয়ে পড়ছে। দিনে দিনে বাড়ছে ভূমিহীনের সংখ্যা। খালিয়াজুরিতে একটি উন্নতমানের হাসপাতাল থাকলেও সেখানে থাকেন না কোনো চিকিত্সক। কোনো কোনো সময় নার্সই চালান চিকিত্সার কাজ। ফলে একান্ত দায় না ঠেকলে এই হাসপাতালে কোনো রোগী আসতে চান না। একজন মাত্র নার্স দিয়ে চলছে এই হাসপাতাল। জরুরি রোগীদের পার্শ্ববর্তী মদন উপজেলায় চিকিত্সার জন্য পাঠাতে হয়। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষকে বার বার বলা হলেও কোনো কাজ হচ্ছে না বলে জানান এলাকাবাসী। এই অঞ্চলে পাকা রাস্তা খুবই কম। বর্ষাকালে নৌপথই যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম। আর নৌকা বা ট্রলার হল বাহন। চারিদিকে শুধু পানি আর পানি। নৌকায় বসবাস, নৌকাতেই চলাচল। প্রায় ৬/৭ মাস বন্ধ থাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। অভিভাবকরা হাওরে নৌকাডুবির ভয়ে সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে চান না। ফলে হাওর অঞ্চলে লেখাপড়া বিঘ্নিত হয়। অঘোষিতভাবে বন্ধ থাকে বিদ্যালয়গুলো। হাওর অঞ্চলের অফিসগুলোর অবস্থাও একইরকম। সুযোগ-সুবিধার অভাবে কর্মকর্তারা হাওর এলাকায় থাকতে চান না। হাওরের গভীর পানির নিচে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে সড়ক নির্মাণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দাবি জানানো হয়েছে। কোনো কোনো হাওর এলাকায় এ ধরনের সড়কও নির্মাণ করা হয়েছে। এই সমস্ত সড়কে শুষ্ক মৌসুমে ছোট ছোট যানবাহন চলাচল করবে। আর বর্ষকালে সড়কগুলো থাকবে পানির নিচে। হাওর অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে এখনও বিদ্যুত্ পৌঁছায়নি। সংবাদপত্র পৌঁছায় ২/৩ দিন পর, ডাক পৌঁছাতে লাগে ৬ থেকে ৭ দিন। এই হল হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবনচিত্র। আর্থ-সামাজিক অবস্থা উন্নয়নের জন্য বেশকিছু এনজিও হাওর অঞ্চলে কাজ করলেও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর তেমন কোনো উন্নতি নেই। হাওর অঞ্চলের মত্স্য সম্পদের উন্নয়ন, মত্স্য সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন স্থানে কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন, উত্পাদিত ফসলের বাজারজাতকরণ, টেলি-যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, চিকিত্সা ব্যবস্থার উন্নয়ন সর্বোপরি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলেই কেবল চারটি জেলার প্রায় দেড় কোটি লোকের উন্নয়ন সম্ভব। তবে হাওর উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, দেশের সবকয়টি হাওর জেলার সার্বিক উন্নয়ন, হাওর অঞ্চলের অবকাঠামো ও জীবনমান উন্নয়নে সরকার প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হবার কথা ছিল বলে প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে। নেত্রকোনা জেলা এলজিইডি অফিস সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ) এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে ৯৪৫ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। যে সমস্ত হাওর জেলায় কাজ হবে সে জেলাগুলো হলো, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং সুনামগঞ্জ। প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে- হাওর অঞ্চলের সড়ক নির্মাণ, কালভার্ট সেতু নির্মাণ, হাট-বাজার স্থাপন, খাল-বিল খনন, আফাল (বড় বড় ঢেউ) থেকে গ্রাম রক্ষায় প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণ।