রাজশাহীর ছয় উপজেলার বিস্তৃর্ণ এলাকাজুড়ে পান বরজে অজ্ঞাত পচন রোগ দেখা দিয়েছে। প্রতিরোধ ব্যবস্থা না থাকায় পান চাষী পরিবারে হাহাকার উঠেছে। কৃষক ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, দু’মাসের পচনে রাজশাহীর কৃষকদের প্রায় ১২০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল কাফি বলেন, রাজশাহীর দুর্গাপুর, পবা, মোহনপুর, বাগমারা, পুঠিয়া ও চারঘাট উপজেলায় চলতি মৌসুমে প্রায় ১ হাজার ৮৩৪ হেক্টর জমিতে পান বরজ রয়েছে। উত্তরাঞ্চলের মধ্যে এই ছয় উপজেলার কৃষকদের অন্যতম প্রধান অর্থকারী ফসল পান।
কৃষকদের অভিযোগ, রাজশাহী অঞ্চলের পান বরজে দীর্ঘদিন থেকে পচন রোগ দেখা দিলেও কৃষি বিভাগ রয়েছে উদাসীন। কৃষি বিভাগ কোন পরামর্শ না দেয়ায় বাধ্য হয়ে কৃষকরা পান বরজ রক্ষায় কীটনাশক ডিলারদের পরামর্শে অটো ইকুইপমেন্ট কোম্পানির ‘ট্রুপার, মেটাটাপ’; বিএসএফ কোম্পানির ‘ব্যাবিস্টান, ক্যালিকসিন’; হেকেম কোম্পানির ‘হেমোজ্রিল, কার্বান্ডাজিম’; সিনজেনটা কোম্পানির ‘রিডোমিল, টিল্ট, স্কোরসহ বিভিন্ন ছত্রাকনাশক, বালাইনাশক ও মাকড়নাশক ঔষধ স্প্রে করছে কিন্তু কোন প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে পানচাষী পরিবারে হাহাকার উঠেছে।
জানা গেছে, দুর্গাপুর উপজেলার বারণাই নদী বিধৌত সুখানদিঘি, আনোলিয়া, ব্রহ্মপুর, কালিগঞ্জ, দাউকান্দি, হরিরামপুর, মাড়িয়া, রসুলপুর; পবার, কালুপাড়া, তেকাটাপাড়া, মৌপাড়া, তালগাছি, কালুপাড়া; মোহনপুরের ধোপাঘাটা, মৌগাছি, কালিগঞ্জ, সইপাড়া, কেশরহাট, একদিলতলা; বাগমারার একডালা, মচমইল, গণিপুর, মোহনগঞ্জ; পুঠিয়ার ভাল্লুকগাছী, নওপাড়া, বিরলদহ, দমদমা, জামিরা, ধাধাশ, জিউপাড়া; চারঘাটের নিমপাড়া, মালেকার মোড়, নন্দনগাছীসহ বিভিন্ন গ্রামের প্রধান অর্থকরী ফসল পান। এসব গ্রামের শতকরা ৮৬ ভাগ মানুষের পান বরজ রয়েছে।
দুর্গাপুরের রৈপাড়ার কৃষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এ অঞ্চলের পান সমৃদ্ধ এলাকার শতকরা ৭৫ ভাগ কৃষকের পান বরজে পচন রোগ দেখা দিয়েছে। এতে পানচাষীরা পথে বসার উপক্রম হয়েছে। পবার কালুপাড়ার কৃষক শমসের আলী বলেন, পচন রোগে পান চাষীদের সর্বনাশ হলেও কৃষি বিভাগের কোন মাথা ব্যথা নেই। পরামর্শের জন্য উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাঠে দেখা যাওয়া দূরে থাক অফিসে গিয়েও তাদের কাউকে পাওয়া না।
পান চাষীদের দেয়া তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, এ অঞ্চলের ১৮৩৪ হেক্টর জমির মধ্যে প্রায় ১৩৭৫ হেক্টর জমির পান বরজ পচনে আক্রান্ত হয়েছে। পান পচনের ফলে চাষীদের হেক্টর প্রতি ৮ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকার ক্ষতি হচ্ছে। এ হিসেবে রাজশাহীর পান চাষীদের মোট আর্থিক ক্ষতি প্রায় ১২০ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।
রাজশাহীর সুস্বাদু মিষ্টি পান দিনাজপুর, সৈয়দপুর, নীলফামারী, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁওসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এমনকি দেশের বাইরে সৌদি আরবে রপ্তানি হতো। কিন্তু ৬/৭ বছর ধরে ধারাবাহিক পচন রোগ প্রতিরোধ না হওয়ায় পানের উত্পাদন আশঙ্কাজনক কমেছে। দাউকান্দি তেকাটাপাড়া গ্রামের পানচাষী ইয়ানুচ আলী জানান, প্রথমে পান গাছের ডগায় ছত্রাক জাতীয় কালো দাগ পড়ে। পরে ওই কালো দাগে পচন ধরে এবং পর্যায়ক্রমে পান গাছ মরে যায়।
গত দু’মাসের পচনে রাজশাহীর ৬০ ভাগ বরজের পান গাছ মরে গেছে। তাদের গ্রামের প্রতিটি পান বরজে পচন দেখা দিয়েছে। দু’সপ্তাহ আগের টানা বর্ষণে পচন আরো বেড়েছে। প্রতিদিন ভোরে পানচাষীরা তাদের বরজে গিয়ে মরে যাওয়া পান গাছ দেখে ডুকরে কেঁদে উঠেন। অনেকে সংসার বাঁচাতে পান বরজ ভেঙ্গে অন্য ফসলের আবাদ শুরু করেছেন।
এ বিষয়ে কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, দীর্ঘদিন একই জমিতে পান বরজ থাকার কারণে পচন রোগের সৃষ্টি হয়েছে। প্রত্যেক উপজেলায় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাঠ পর্যায়ে গিয়ে কৃষকদের ফসলের রোগ সনাক্ত ও মাটি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রতিষেধক ব্যবহারে সঠিক পরামর্শ প্রদানে নিয়োজিত রয়েছেন। কিন্তু তারা মাঠে গিয়ে কৃষকদের পরামর্শ ও সহযোগিতা না করলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিধি অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
