এবছর বর্ষাকালে ভারি বৃষ্টি না হলেও বানের পানিতে উত্তাল হতে শুরু করেছে পদ্মা। স্রোতের তীব্রতায় নগরীর জিয়ানগর এবং বসুয়ার অনেক স্থানে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। গত চার দিনে পদ্মার ভাঙ্গনে এসব এলাকার প্রায় ২শ’ মিটার ভেতরে বাঁধের দিকে ধেয়ে এসেছে। পবার সোনাইকান্দি, নবগঙ্গা ও বুলনপুরে ভাঙ্গন অব্যাহত রয়েছে। এনিয়ে পদ্মা বাম তীরের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙ্গন প্রতিরোধে এ পর্যন্ত কোন পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে শহর রক্ষা বাঁধ।
হঠাত্ করে গত বর্ষা থেকে পদ্মা স্বরূপে ফিরেছে। ভাঙ্গনে বিলীন হয়েছে অনেক কিছু। দুই পাড়ের অগণিত মানুষ হয়েছে বাস্তুহারা। ভেঙ্গেছে অনেক স্বপ্ন। ফসলের জমি, ফলের বাগান পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়েছে। নদী ভাঙ্গা মানুষ আশ্রয় নিয়েছে রাজশাহী শহরের বিভিন্ন স্থানে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নগরীর জিয়ানগরের শহর রক্ষা ব্াধের দু’পাশের ব্যাপক এলাকা ইতিমধ্যে পদ্মাগর্ভে বিলীন হয়েছে। বুধ ও বৃহস্পতিবার বাঁধের দিকের প্রায় ৫০ মিটার এলাকা পদ্মাগর্ভে বিলীন হয়েছে। জিয়া নগর এলাকার বাদাম বিক্রেতা মঈন উদ্দিন বলেন, চার দিন ধরে ভাঙ্গন তীব্র হয়েছে। এখনো তা ভাঙ্গছেই।
হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য সাইদুর রহমান বাদল বলেন, সোনাইকান্দি, বুলনপুর ও নবগঙ্গায় ব্যাপক ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। এখনই এসব গ্রামকে রক্ষায় পদক্ষেপ না নিলে অচিরেই তা পদ্মাগর্ভে বিলীন হবে। পদ্মার ওপারে পাউবো কিছু পদক্ষেপ নিলেও এপারে কার্যকর কোন উদ্যোগ নেয়নি।
এ ব্যাপারে রাজশাহী পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ বলেন, এখনো বাম তীরের ভাঙ্গন প্রতিরোধে তেমন কিছু করা হয়নি। তবে জিও ব্যাগ ফেলার টেন্ডার দেয়া আছে। শুক্রবার থেকে ঠিকাদার জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙ্গন রোধের ব্যবস্থা নিচ্ছে। তিনি আরো বলেন, এপারে থেকে ওপারের অবস্থা আরো খারাপ। গত বর্ষায় পদ্মার দক্ষিণ সীমান্তের ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ এবং পাঁচশ’ মিটার প্রস্থ ভূখণ্ড হারিয়েছে বাংলাদেশ। ওই ভাঙ্গনে চরমাঝারদিয়ার ও চরখানপুরের মধ্যবর্তী কলাবাগান এলাকার ১৬৪ নম্বর মেইন পিলার থেকে ১৬৫ নম্বর মেইন পিলার পর্যন্ত বাংলাদেশের ভূখণ্ড নদীতে বিলীন হয়ে ভারতীয় সীমানা স্পর্শ করেছে পদ্মার পানি। এরপর থেকেই পদ্মার ওই অংশে বিএসএফ ভারতীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করতে তত্পর হয়ে ওঠে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরের মোহনগঞ্জ থেকে বিএসএফ ক্যাম্প এনে নদীর তীরে স্থাপন করেছে। এরপর থেকে বিএসএফ সাধারণ মানুষ ও বিজিবি সদস্যদের নদীপথে ওই এলাকায় চলাচলে বাধা দিচ্ছে। ওই এলাকায় পদ্মার একাংশের নিয়ন্ত্রণ হারাতে বসেছে বাংলাদেশ। এবারের বর্ষায় ওই জায়গা ভারতের সীমান্তে গিয়ে ঠেকবে বলে আশঙ্কা করছেন চরের অধিবাসীরা।
রাজশাহী বিজিবির পক্ষ থেকে পদ্মায় একক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে নদীভাঙ্গন প্রতিরোধে শুষ্ক মৌসুমেই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার জোর দাবি জানিয়ে আসছে। নইলে ভূখণ্ড হারানোর পাশাপাশি সীমান্ত নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়ার আশঙ্কার কথা বলছে। কিন্তু বিজিবি’র কথায় পানি উন্নয়ন বোর্ড এমনকি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্ণপাত করেনি।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সুধাংশু কুমার সরকার বলেন, পদ্মার গতি পরিবর্তন হচ্ছে এটা সত্য। পদ্মার ভাঙ্গন এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে আর অল্প জায়গা বাকি আছে। ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে পদ্মা যদি সীমান্তের জিরোলাইন অতিক্রম করে, তাহলে পদ্মার ওই অংশে বাংলাদেশ একক নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। তাই ওপারে পদ্মার ভাঙ্গন প্রতিরোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড ১৭৪ কোটি টাকার একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে দাখিল করেছে।
এ বিষয়ে রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশীদ বলেন, ১৭৪ কোটি টাকায় সাড়ে ৪ কিলোমিটার নদীর তীর প্রতিরক্ষা কাজের জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে প্রকল্প পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদনের শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
