রোজার ঈদ চলে গেছে। কর্মজীবী মানুষ ধীরে ধীরে শহরে ফিরতে শুরু করেছে। সড়ক-মহাসড়কগুলো আবার ব্যস্ত হয়ে উঠবে। আবারও জ্যাম আর ভোগান্তিতে নাকাল হবে মানুষ। ক’টা দিন বেশ আরামেই কাটলো। আবার শুরু হবে পুরোনো কাসুন্দি। ভাবতেই কপালের চামড়ায় ভাঁজ পড়লো।
গত কয়েকদিন ধরে খবরের কাগজে এবং টিভি চ্যানেলগুলোয় দুটো খবর বেশ ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছিলো। তার একটা হলো ঈদকে সামনে রেখে গ্রামের দিকে ছুটে চলা মানুষের যাত্রা নির্বিঘ্ন করার জন্য ভাঙাচোরা মহাসড়কগুলোতে ইট-বালি দিয়ে সাময়িক মেরামত করার ধুম পড়ে গেছে। এ কাজ তদারকির জন্য যোগাযোগমন্ত্রী ছুটতে ছুটতে গলদঘর্ম হচ্ছেন। কাড়ি কাড়ি টাকাও খরচ হচ্ছে এ কাজে। কিন্তু এক পশলা বৃষ্টিতেই সেই মেরামত করা স্থান ধুয়ে যাচ্ছে। ফলে এত সব করেও মানুষের পেরেশানি কমছে না। এই যে অহেতুক সময় এবং অর্থ অপচয় হচ্ছে তাতে কার কী লাভ হচ্ছে তা বোধগম্য নয়।
আর দ্বিতীয় খবরটি হলো, অস্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে দক্ষিণাঞ্চলের অনেক জেলায় বেড়ি বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে ব্যাপক এলাকা তলিয়ে গেছে। অনেক জেলায় বিশাল এলাকা ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বেশ কয়েকটি দৈনিকের লিড নিউজ দেখেছি—বেড়ি বাঁধ নির্মাণ করার কয়েক মাসের মধ্যেই সে বাঁধ জোয়ারে ভেসে যাবার খবর। আমাদের দেশে অধিকাংশ বেড়ি বাঁধ নির্মিত হয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড বা পাউবো-র তত্ত্বাবধানে। পাউবো যুগ যুগ ধরে আরো একটা কাজ করে আসছে। আর তা হলো ড্রেজিং। পাউবো-র অধীনে বেড়া উপজেলায় নির্মিত ‘ফ্লাড প্রোটেকশন অ্যান্ড ইরিগেশন প্রজেক্ট’-এ একটি কোরিয়ান কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার সময় পাউবো-র ড্রেজিং সম্পর্কে বেশ পরিষ্কার একটা ধারণা পেয়েছিলাম। সে কাহিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা নিষপ্রয়োজন। আমাদের নদীগুলোর স্বাস্থ্য দেখেই পাউবো-র ড্রেজিং-এর মান সম্পর্কে সাধারণ মানুষ পরিষ্কার ধারণা করতে পারছেন।
হল্যান্ড নামের ইউরোপিয়ান দেশটির ভৌগোলিক অবকাঠামো সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক নিচে। ফলে সারা বছর ওখানে বন্যা লেগে থাকতো। সে ইতিহাস এখন অতীত। কারণ ইতোমধ্যে তারা পুরো কোস্টাল বেল্টে বাঁধ নির্মাণ করে ফেলেছে। আর তা করেছে সঠিক পদ্ধতিতে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় (প্রচলিত ভাষায় ১৫নম্বর) যে পদ্ধতিতে রিটেইনিং ওয়াল এবং আরসিসি ঢালাই করে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে সেভাবে কেন সবগুলো বাঁধ নির্মাণ করা হয় না? এর একটাই উত্তর—সেভাবে বাঁধ নির্মিত হলে চৌর্যবৃত্তি বন্ধ হয়ে যাবে। মাটির বাঁধ তৈরি হলে তা সহজেই জোয়ারে ভেসে যাবে, ফলে আবার তা নতুনভাবে নির্মাণের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ঢালাই বাঁধ নির্মিত হলে তো বিশ-ত্রিশ বছর তা টিকে যাবে। চুরির সুযোগ থাকবে না। সেজন্যই বেড়ি বাঁধগুলো সব সময়ই মাটি দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। একই কথা প্রযোজ্য সড়ক-মহাসড়কগুলোর ক্ষেত্রে। চৌর্যবৃত্তিকে পাকাপোক্ত করার জন্যই আরসিসি ঢালাই-র পরিবর্তে বিটুমিন দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে সড়কগুলো। এই যে বৃষ্টি হলেই আমাদের রাস্তাগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আর জোয়ারে বেড়ি বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। তাহলে কেন চল্লিশ বছর ধরে এই ধরনের রাস্তা আর বেড়ি বাঁধ বানানো হচ্ছে? যেভাবে বানালে বৃষ্টিতে রাস্তা নষ্ট হবে না, বেড়ি বাঁধ ভাঙবে না, সেভাবে কেন বানানো হচ্ছে না? কারা এইসব রাস্তা, বেড়ি বাঁধের প্ল্যান করছে? সব সরকারের আমলেই এইসব রাস্তা, বেড়ি বাঁধ তৈরি করতে সরকারকে বাধ্য করা হয় কেন? বাংলার মানুষ এগুলো জানতে চায়। জানাটা খুবই জরুরি। কারণ জনগণের ট্যাক্সের টাকায় উন্নয়নের নামে এইসব অনিয়ম চলতে পারে না।
ঢাকা
