ঈদের ছুটিতে ভ্রমণ পিপাসুদের বিদেশ ভ্রমণের প্রবণতা বেড়েছে। ভ্রমণ পিপাসুদের মিছিল এতই বড় হচ্ছে যে ট্যুর অপারেটররা বাধ্য হয়ে অনেককেই ফিরিয়ে দিচ্ছেন। কারণ কোন কোন রুটে এক সপ্তাহেরও বেশি সময়ের মধ্যে টিকিট পাওয়া যায় না।
জানা গেছে, আগে একশ্রেণীর মানুষ শুধু ভ্রমণের উদ্দেশে ঈদে দেশ ছাড়লেও এখন ভ্রমণের সঙ্গে নানারকম অর্থনৈতিক কারণ যুক্ত হয়ে বিস্তৃত হয়েছে ঈদের ছুটিতে বিদেশ ভ্রমণ। আর গত দশ বছরে বিদেশে ঈদ করা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় পাঁচগুণ। এ বছর প্রায় নয় দিন ঈদের ছুটি হওয়ায় বিদেশে ঈদ করা মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় সাত লাখ। আর ২৫ জুলাই থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকা-ব্যাংকক রুটে বিভিন্ন ফ্লাইটের কোন টিকিট খালি ছিল না। ট্যুর অপারেটরদের বিশেষ ঈদ প্যাকেজ ছিল ভ্রমণ পিপাসুদের ঘিরে।
পরীবাগে থাকেন নাজমুন নাহার ডলি। স্বামী ব্যবসা করেন। ঈদের ছুটিতে ছেলে-মেয়ে আর স্বামীসহ বেড়াতে গেছেন মালয়েশিয়াতে। চার দিনের ট্যুর ছিল তাদের। এর আগেও ঈদের ছুটিতে তারা দেশের বাইরে বেড়াতে গেছেন। তিনি বলেন, বাচ্চাদের স্কুল এসময় বন্ধ থাকে। স্বামীরও থাকে লম্বা ছুটি। তাই এই সময়টাকেই আমরা নতুন একটি দেশ দেখতে বেড়িয়ে পড়ি। ডলির মতে, বলাইবাহুল্য এখন সময় বদলেছে। ছেলে-মেয়েরা বিদেশে পড়াশুনা করবে। বিদেশে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থাকলে পরে ওদের সুবিধা হবে। তারা গণমাধ্যম ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনেক দেশের দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে জানে। আমরা তাদের সেই স্থানগুলোকে চোখে দেখার সুযোগ করে দেয়ার চেষ্টা করি।
একটি বেসরকারি ব্যাংকে কাজ করেন মুজাহিদুল ইসলাম। এবছরই তিনি বিয়ে করেছেন। এবার ঈদের লম্বা ছুটিতে স্ত্রীসহ থাইল্যান্ড গেছেন। মুজাহিদ জানান, দেশের মধ্যে যখন তখন বেড়ানো যায়। কিন্তু দেশের বাইরে যেতে হলে বেশি প্রস্তুতি লাগে। বাড়তি টাকা যেমন লাগে তেমনি লাগে লম্বা ছুটি। সবমিলিয়ে ঈদের লম্বা ছুটিটাই আমাদের সেই সুযোগ এনে দিয়েছিল। সুযোগটা দুজনের কেউ তাই হাতছাড়া করলাম না।
বিয়ের পর হানিমুন হয়নি তিথির। তাই ঈদের ছুটিতে স্বামীসহ কাঠমান্ডু বেড়াতে যান গণমাধ্যম কর্মী তিথি। জানান এজন্য তিনি একটি ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠানের প্যাকেজ সুবিধা গ্রহণ করেন।
ট্যুরিজম ডেভেলপার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টিডাব) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জামিউল আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, দশ বছর আগে ঈদকে কেন্দ করে এক থেকে দেড় লাখ মানুষ বিদেশ ভ্রমণ করত। এখন তা বেড়ে হয়েছে প্রায় সাত লাখ। অধিকাংশ দেশে ট্যুরিজম স্যাটেলাইট একাউন্টের মাধ্যমে এ বিষয়ে সঠিক পরিসংখ্যান জানা গেলেও আমাদের তা না থাকায় আনুমানিক একটা সংখ্যা আমাদের বলতে হচ্ছে।
দুই শ্রেণীর মানুষ ঈদের ছুটিকে কেন্দ করে দেশের বাইরে ঈদ করে বলে জানান ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) প্রেসিডেন্ট তৌফিক উদ্দিন আহমেদ। এর মধ্যে একশ্রেণীর মানুষ যান ইউরোপ ও আমেরিকায়। আরেক শ্রেণীর টার্গেট থাকে পার্শ্ববর্তী নেপাল, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভারতসহ প্রভৃতি দেশ। কিছুদিন আগেও মানুষের মধ্যে ঈদের দিন দেশে থেকে পরের দিন দেশ ছাড়ার প্রবণতা থাকলেও এখন তা ঈদের দুই চার দিন আগেই শুরু হয়। তিনি জানান, তাই এমসয় অনেক ট্যুর এজেন্সি বিশেষ প্যাকেজ-ট্যুরেরও ব্যবস্থা করে। দেশের কিছু কিছু এয়ার লাইন্স বিদেশি কিছু হোটেলের সঙ্গে যৌথভাবে এসময় প্যাকেজ ট্যুরের ব্যবস্থা করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিমানের টিকিটের ব্যবস্থা, হোটেলে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা, হোটেলে দুই/তিন রাত্রি যাপন এবং সকালের নাস্তাটিও প্যাকেজ ট্যুরের আওতায় থাকে বলে জানান টিডাব চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জামিউল আহমেদ।
কোন কোন ক্ষেত্রে আধাবেলা নগর ভ্রমণও তারা অন্তর্ভুক্ত করেন। তবে এমন উন্নত সেবা শতকরা পাঁচ শতাংশের মতো প্যাকেজে থাকে বলে তিনি উল্লেখ করেন। দেশ ও সেবা ভেদে ৩০-৪০ হাজার টাকা থেকে ৩/৪ লাখ টাকা পর্যন্ত এসব প্যাকেজ ট্যুর আয়োজন করা হয় বলে জানান জামিউল আহমেদ।
টোয়াব’র প্রেসিডেন্ট তৌফিক উদ্দিন আহমেদ এ ব্যাপারে বলেন, ঢাকা-কলকাতার দুই দিনের প্যাকেজ জনপ্রতি ২৫ হাজার টাকা হলে ঢাকা-ব্যাংককের ক্ষেত্রে হবে ৪০ হাজার টাকা। তৌফিক জানান, তাদের ২৫০ সদস্য সংস্থার মধ্যে ৫০টি সংস্থা ঈদ উপলক্ষে প্যাকেজ ট্যুরের আয়োজন করছে।
মোহাম্মদ জামিউল আহমেদ আরো বলেন, এখন ঈদে মানুষ চিকিত্সার জন্য, বিদেশে ঘোরার সঙ্গে টাকা বাঁচাতে শপিং করতে বিদেশ যাচ্ছেন। কারণ দেশে কিছু পণ্যের দাম অনেক বেশি। তাছাড়া ব্যবসায়ীরা কোন পণ্যের ব্যবসা দেশে ভাল হলে বিদেশে মার্কেট যাচাই, হানিমুন, শিক্ষার সুযোগ কেমন তা দেখতে বিদেশ যান। তেমনই আবার কেউ কেউ নিটোল অবসর যাপনের জন্য বিদেশে ঈদ করেন।
