ঢাকার রাস্তায় নামলেই একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে, শহরটাতে কোনো শৃঙ্খলা নেই। যে যার মতো গাড়ি পার্কিং করছে, মানুষের হাঁটার পথেই দোকান দিচ্ছে, রাস্তায় গাড়ি পার্কিং করছে। তাহলেতো যানজট হবেই। এ কথা সত্য, আমাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে; কিন্তু এই অর্থনৈতিক সাফল্যের সঙ্গে আমাদের নাগরিক অধিকার বোধ, বিশেষ করে নিয়ম-নীতি বোধের উন্মেষ ঘটেনি। আমরা বরং দিন দিন খুবই বিশৃঙ্খল হয়ে উঠেছি! আমাদের চিন্তায় ট্রাফিক আইন না মানার একটি ব্যাধি ঢুকে পড়েছে। এ ব্যাধিটার জন্য আমরা জনগণই দায়ী তা বলা ভুল হবে। সমস্যাটা এখানে যে, এদেশে আইন মানানো হয় না। রাজধানীতে যখন পড়ালেখা করি তখন ঢাকার পাশের নারায়ণগঞ্জ থেকেই প্রতিদিন ঢাকায় আসতাম। রাজধানীর গুলিস্থানে এসে প্রতিদিন যুদ্ধে নামতে হতো। গাড়ির তুলনায় মানুষ অনেক বেশি ছিল তাই ধাক্কাধাক্কি করে বাসে চড়তে হতো। কখনো কখনো শার্টের বোতাম, কাপড় পর্যন্ত ছিঁড়ে যেত। কেবল চুল ছিঁড়া বাকি থাকতো। সেই গুলিস্থানে এখন যাত্রীদের লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে শৃঙ্খলভাবে গাড়িতে উঠতে দেখি। আইন করে আইনের প্রয়োগ করছে বলে মানুষও আইন মানছে। আইন আসলে মানাতে হয়। কাজটা সরকারকেই করতে হয়। মানুষ আইন মানে না এটা বিশ্বাস করি না। আইন মানাতে বাধ্য করলে সবাই আইন মানে। রাস্তায় পার্কিংয়ের জন্য চাঁদা আদায়ের সুযোগ না দিলে, পুলিশ ঘুষ নিয়ে গাড়ি রাস্তায় দাঁড় করাতে না দিলে কেউ আর রাস্তায় গাড়ি রাখবে না। আসলে গোড়ায়ই সব গলদ। সব গলদ দূর হলে রাজধানীর সড়কগুলো অনেকটাই যানজট মুক্ত থাকবে।
প্রকৃতপক্ষে, রাজধানীতে গাড়ি পার্কিংয়ের পরিকল্পনার অভাবে এবং অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে রাজধানীতে বারো মাসই যানজট লেগে থাকে। কথা হলো রাজধানীতে যদি গাড়ি ঢুকে তাহলে এর পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও করা জরুরি। এটা সরকারকেই করে দিতে হবে। আসলে আমাদের সব কিছুতেই ভাবনা কম। পরিকল্পনার অভাব থাকে। সব জায়গাতেই ঘাপলা থাকে। অসত্ পয়সা কামাইয়ের ইচ্ছা থাকে তাই যানজটও নিরসন হয় না। এ কথা সত্য যে, যানজট নিরসন করতে হলে রাজধানীর অবৈধ পার্কিং বন্ধ করতে হবে। অবৈধ পার্কিং বন্ধ করতে হলে সরকারকে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় বৈধ পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। তা না হলে একদিকে যানজটের বিড়ম্বনা, অন্য দিকে রাজধানীতে আসা গাড়ি পার্কিংয়ে সমস্যা কখনই দূর হবে না। সে সঙ্গে চাঁদাবাজদের পার্কিংয়ের নামে চাঁদাবাজি আর পুলিশের ঘুষ বাণিজ্য বন্ধ হবে না। অবৈধ পার্কিং, চাঁদাবাজি আর ঘুষের মিশেল চলতেই থাকবে।
রাজধানীতে যানজটের অন্যতম কারণ যত্রতত্র পাকির্ং। নীতিমালা না থাকায় এটি নিয়ন্ত্রণও করা যাচ্ছে না। এ শহরে গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য নির্ধারিত জায়গা কখনোই রাখা হয়নি। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত ও মেগা শহরে এ ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। এতে শহরের ভেতরে পার্কিংয়ের জন্য গুণিতক হারে চার্জ আরোপ করা হয়। ঢাকা শহরেও চার্জ আরোপের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। নামমাত্র চার্জ ধার্য করা হলে নীতিমালা নিয়ে পার্কিং নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। ফুটপাথের জবরদখল যাতে মাথা ব্যথার কারণ না হয়ে ওঠে তাই সংকীর্ণ করা হয়েছে ফুটপাথ। রাজধানীর আধুনিক রাস্তার উপরে কীভাবে দিনের পর দিন ব্যবসার জন্য গাড়ি দাঁড় করানো থাকে? এমন অভিযোগ সবার। যারা নিয়ম ভাঙছেন তারাও এই বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করছেন, তবু পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হলো না। রাস্তার জায়গা দখল করে রাস্তা সরু করা হচ্ছে। তাহলে যানজট কেন হবে না? অভিযোগে লাভ হয় না। কেউ কথা শোনে না। ভাবেও না কেউ। সকলেরই অভিযোগের আঙুল সরাসরি ট্রাফিক বিভাগের উপরে। ট্রাফিক বিভাগ সচেতন হলে, তাদের সদিচ্ছা থাকলে রাজধানীর সড়ক, ফুটপথ এভাবে বেদখল থাকতো না। আর রাজধানী জুড়ে যানজটও কমে যেত। এ ক্ষেত্রে পুলিশের ঊর্ধ্বতনমহলকে উদ্যোগী হতে হবে।
অবৈধ পার্কিং এখন ঢাকা শহরে একটি সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি যে আইনের অমান্যতা তাই যেন সাধারণ মানুষ ভুলতে বসেছে। যেখানে সেখানে গাড়ি থামিয়ে তারা যে আইন অমান্য কারার পাশাপাশি অন্য মানুষের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তা নিয়ে নেই কোনো সচেতনতা। তাও আবার সময় বাঁচাতে, কিছু টাকার জন্য এবং নিজেদের সুবিধার জন্য তারা এই অনিয়ম করেই চলেছে। দায়িত্বরতদের সুনজরের অভাবে এই সমস্যাটি আজ বিশাল আকার ধারণ করেছে এবং সমাধানের কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হচ্ছে না। অবৈধ পার্কিং নিয়ে মানুষের অসচেতনতা, দুর্নীতি এবং সরকারের উদাসীনতা দূর করা গেলেই এই সমস্যা সমাধান করা যাবে বলে আশা করা যায়।
n লেখক :গবেষক
