জবানবন্দিতে ডিসি-ওসির নাম বাদ দিতে চাপ

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০১৪, ২২:৪৬
রাজধানীর মিরপুর থানার ভিতর ব্যবসায়ী মাহবুবর রহমান সুজনকে পিটিয়ে হত্যার সঙ্গে ডিসি ও ওসি’র সংশ্লিষ্টতা জানিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে চেয়েছিলেন এসআই জাহিদুর রহমান। মামলার তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ এই হত্যার সঙ্গে শুধু এসআই জাহিদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য দিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার চাপ দিয়েছিল। প্রতিবার রিমান্ড শেষে এসআই জাহিদকে আদালতে পাঠানো হলে সেখানে পুলিশের দুই কর্মকর্তাকে জড়িয়ে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হন। ফলে মামলা তদন্তকারী সংস্থা ডিবি তাকে পুনরায় আবেদন করে রিমান্ডে নেয়। এভাবে চার দফায় ১৫ দিন রিমান্ড নিয়েও এসআই জাহিদ শুধু নিজেকে জড়িয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হননি। চতুর্থ দফায় দুই দিনের রিমান্ড শেষে গতকাল শনিবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির ইন্সপেক্টর নিবারণ চন্দ বর্মন এসআই জাহিদকে ঢাকার আদালতে হাজির করে এক আবেদনে স্বীকারোক্তি রেকর্ড করার আবেদন করেন। প্রথমে স্বীকারোক্তি দিতে চেয়ে পরে জাহিদ কোন জবানবন্দি দিতে রাজি না হওয়ায় ঢাকা মেট্রোপলিটন মহানগর হাকিম মো. নূরু মিয়া তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। গত ১২ জুলাই রাতে ঝুট ব্যবসায়ী মাহবুবর রহমান সুজন, তার স্ত্রী মমতাজ সুলতানা লুসি, সন্তান মোশারফকে ধানমন্ডির শংকরের বাসা থেকে আটক করে মিরপুর থানায় নেয়া হয়। থানার একটি কক্ষে সুজনকে আটকে রেখে বেধড়ক পেটানো হয়। এরপর ভোরে হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ময়না তদন্ত প্রতিবেদনে নির্যাতনেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এ ঘটনায় ১৬ জুলাই এসআই জাহিদুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। ১৭ জুলাই মিরপুর থানায় পুলিশ বাদী হয়ে ৮ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। এই মামলাটি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি) স্থানান্তর করা হয়। এ ঘটনায় জাহিদের সঙ্গে গ্রেফতারকৃত সোর্স নাসিম শেখ তৃতীয় দফায় ১৩ দিন রিমান্ড শেষে গত বুধবার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। ডিবি’র জিজ্ঞাসাবাদে এসআই জাহিদুর রহমান খান জানিয়েছেন, তিনি পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনারের (ডিসি) অধীনে ডিসি ফোর্সের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালে পুলিশের মিরপুর বিভাগে উপ-কমিশনার ইমতিয়াজ আহমেদ যোগ দেয়ার পর থেকে তিনি ঐ বিভাগের বিভিন্ন থানায় দায়িত্ব পালন করেন। পল্লবীতে চাঁদার টাকা না দেয়ায় জনি নামে এক বিহারী যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ঐ সময় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও পরে মিরপুরের উপ-কমিশনারের তদবিরে আবার শাহআলী থানায় দায়িত্ব পালন শুরু করেন। শাহআলী এলাকায় রিপন নামে চা দোকানীকে তার সোর্স দিয়ে চোর সাজিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে শাহ আলী থেকে তাকে মিরপুর থানায় বদলি করা হয়। মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনারের সুদৃষ্টির কারণে তিনি বিভিন্ন সময়ে কাফরুল, মিরপুর, পল্লবী ও শাহ আলী থানায় দায়িত্ব পালন করেছেন। ডিবি’র জিজ্ঞাসাবাদে এসআই জাহিদুর রহমান আরো জানান, ঘটনার দিন ১২ জুলাই রাতে ধানমন্ডির শংকর এলাকা থেকে সুজন, তার স্ত্রী মমতাজ সুলতানা লুসি ও সন্তান মোশারফকে আটক করে মিরপুর থানায় নেয়ার বিষয়টি ওসি সালাউদ্দিন খান জানতেন। অভিযানে যাওয়ার আগে ওসিকে বিষয়টি অবগত করেছিলেন। ঐ দিন ১ লাখ টাকা চাঁদার দাবিতে রাতভর সুজনকে পেটানো হয়। বিষয়টি ওসিও জানতেন। নির্যাতনের এক পর্যায়ে তার হাত-পা বেঁধে নাক দিয়ে গরম পানি ঢেলে দিলে থানার ভিতরেই সুজনের মৃত্যু হয়। পরে বিষয়টি ওসিকে জানানো হলে, তিনি মিরপুরের লতিফ ক্লিনিকে সুজনকে ভর্তি করার নির্দেশ দেন। ভোরে সুজনকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিত্সকরা মৃত ঘোষণা করলে, বিষয়টি মিরপুরের উপ-কমিশনার ইমতিয়াজ আহমেদকে অবগত করেন ওসি। এমনকি তিনি নিজেই ডিসি’র সাথে মোবাইল কথা বলেন। ডিসিই সুজনকে সন্ত্রাসী সাজিয়ে এ ঘটনায় সুজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার নির্দেশ দেন। পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার ইমতিয়াজ আহমেদ ঐ দিন সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, মিরপুর এলাকা থেকে ১৪৫ পিস ইয়াবাসহ জাকির ও মিঠুন নামে দুই যুবককে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, উদ্ধারকৃত ইয়াবা তারা বাঙ্কু সুজনের কাছ থেকে সংগ্রহ করে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করে থাকে। এরপর তাদের দেয়া তথ্যমতে রাতেই হাজারীবাগ থানা পুলিশের সহায়তায় শংকরের জাফরাবাদের বাসা থেকে সুজনকে গ্রেফতার করা হয়। এসময় তার বাসা তল্লাশি করে দুইটি ম্যাগজিনও ১০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। আর বাসা থেকে গুলি উদ্ধারের ঘটনায় সুজনের সঙ্গে তার স্ত্রী মমতাজ সুলতানা লুসিকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় আনা হয়। গ্রেফতার করে থানায় আনার পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সুজন জানায়, সাদা বাবু নামে তার এক সহযোগীর কাছে অস্ত্র রয়েছে। ওই অস্ত্র উদ্ধারের জন্য রাত পৌনে চারটার দিকে মিরপুর এলাকায় অভিযানে বের হয় পুলিশ। এসময় পুলিশ ভ্যানে থানা সুজন অসুস্থ হয়ে পড়লে (শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা দেয়) তাকে স্থানীয় লতিফ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে স্থানান্তর করা হয় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। সেখানে নেয়ার পর কর্তব্যরত চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে লাশ ময়না তদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়েছে। কোর্ট রিপোর্টার জানান, ঝুট ব্যবসায়ী মাহবুবর রহমান সুজন হত্যা মামলায় মিরপুর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক জাহিদুর রহমান জাহিদকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এদিকে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু আইন-২০১৩ এর ১৫ ধারার অভিযোগ এনে মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাউদ্দিনসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতে গত ২০ জুলাই একটি মামলা করেন নিহতের স্ত্রী মমতাজ সুলতানা লুসি। দায়রা জজের নির্দেশে বর্তমানে মামলাটির বিচার বিভাগীয় তদন্ত চলছে।