শেষ পর্যন্ত তোবা গ্রুপের পাঁচ কারখানার শ্রমিকরা বেতন বোনাস পেতে যাচ্ছেন। আর এ বেতন বোনাস পাওয়ার মাধ্যমে অবসান হবে তাদের মানবেতর জীবন-যাপনের। গত মে মাস থেকে তোবা গ্রুপের পাঁচ কারখানার ১৬০০ শ্রমিক বেতন-বোনাস পাচ্ছিল না। বেতন ও বোনাসের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন এবং ঈদের আগের দিন থেকে অনশন করছেন তারা। আগামী বুধবার প্রাথমিক পর্যায়ে দুই মাসের বেতন পাবেন তারা। পরবর্তীতে অন্য বেতনসহ সকল ভাতাও পাবেন শ্রমিকরা।
গতকাল বিকালে বিজিএমইএ-এর এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দিয়ে বলা হয়, আগামী বুধবার শ্রমিকদের মে ও জুন মাসের বেতন দিবে বিজিএমইএ। আর জুলাই মাসের বেতন দেয়া হবে ১০ তারিখ। অন্যান্য পাওনাদি অনতিবিলম্বে পরিশোধ করা হবে। সরকারের তিন মন্ত্রী, শ্রমিক নেতাদের একাংশের সঙ্গে আলাপ করে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিজিএমইএ।
এদিকে তোবা গ্রুপের অনশনরত শ্রমিকদের নেতৃত্বদানকারী নেত্রী মোশারেফা মিশু বলেছেন, তাদের কর্মসূচি চলতে থাকবে। বিজিএমইএ-এর ঘোষণা মেনে নেয়া শ্রমিক নেতা ও অনশনরত শ্রমিক নেতাদের মধ্যে একে অপরের দোষারোপ করতে শুরু করেছে। তবে ঐ গ্রুপের পাঁচ কারখানার সাধারণ শ্রমিকরা বলছেন, আমরা রাজনীতি বুঝি না। আমরা কাজ করেছি, বেতন চাই। শেষ পর্যন্ত বেতন-বোনাস হচ্ছে এ খবরে খুশি তারা। তবে যেহেতু আন্দোলন কর্মসূচি এখনো চলছে তাই প্রকাশ্যে আনন্দের বহি:প্রকাশ করেননি তারা।
গতকাল বিকালে বিজিএমইএ ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান বিজিএমইএ-এর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এসএম মান্নান কচি। এসময় নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান, শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু, বিজিএমইএ-এর অন্য নেতৃবৃন্দ ও শ্রমিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনের আগে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান, শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু ও শ্রমিক নেতাদের একাংশের সঙ্গে বৈঠক করে বিজিএমইএ-এর নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ত্রি-পক্ষীয় বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, বিজিএমইএ-এর মধ্যস্থতায় তোবা গ্রুপের ৫টি ইউনিটের শ্রমিক-কর্মচারীদের মে এবং জুন মাসের বকেয়া বেতন আগামী বুধবার দেয়া হবে। আর জুলাই মাসের বেতন দেয়া হবে আগামী ১০ তারিখ। বোনাস ও অন্যান্য পাওনাদি শিগগিরই পরিশোধ করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শ্রমিকদের অনশন কর্মসূচি প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার হওয়া থেকেও সতর্ক থাকার অনুরোধ জানান। বেতন-ভাতা পরিশোধের পর কারখানা চলবে না বন্ধ থাকবে এ বিষয়ে তিনি বলেন, তোবা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন জামিন পেয়েছেন। অনতিবিলম্বে তিনি মুক্তি পেয়ে বের হলে তিনিই সিদ্ধান্ত নিবেন কারখানা কীভাবে চালাবেন, নাকি বন্ধ রাখবেন।
শ্রম প্রতিমন্ত্রী বলেন, তোবা গ্রুপের সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রী আমাদের তিন মন্ত্রীকে দায়িত্ব দিয়েছেন। তার নির্দেশেই বিজিএমইএ ও শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি সমাধান করা হচ্ছে। শ্রমিকদের পাওনাদির বিষয়ে তিনি বলেন, আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি আপনারা সকল পাওনা পাবেন। টাকা সংস্থান কীভাবে হবে সে বিষয়ে বিজিএমইএ নেতারা বলেন, এখন টাকাটা আমরা জোগাড় করে দিচ্ছি। তবে এ টাকা মালিককেই দিতে হবে।
এদিকে বিজিএমইএ-এর সিদ্ধান্তের বিষয়ে ‘তোবা গ্রুপ শ্রমিক সংগ্রাম কমিটি’ বলছে, তাদের অনশন কর্মসূচি বেতন-বোনাস না পাওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। এর বাইরে আরো তিনদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ওই কমিটি। সংগ্রাম কমিটির নেতৃত্ব দানকারী শ্রমিক নেত্রী মোশরেফা মিশু গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, শ্রমিকদের সকল বেতন-বোনাস পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত তাদের কর্মসূচি চলতে থাকবে। এর আগে বেলা তিনটার দিকে বাড্ডার হোসেন সুপার মার্কেটে এক সংবাদ সম্মেলন করে সংগ্রাম কমিটি। সেখানে তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ঐ কর্মসূচির মধ্যে ছিল শুক্রবার সংগ্রাম কমিটি যে পাঁচ দফা দাবি দিয়েছে তা বাস্তবায়ন না হলে আগামীকাল মঙ্গলবার বিজিএমইএ ভবন ঘেরাও করা হবে। আর পরের দিন বুধবার দেশের সকল শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করা হবে। এছাড়া সিপিবি, বাসদ ও বামমোর্চা আজ সোমবার শ্রম মন্ত্রণালয় ঘেরাওয়ের যে ঘোষণা দিয়েছে সে কর্মসূচিকে সমর্থন দিয়েছে সংগ্রাম কমিটি।
সংবাদ সম্মেলনের আগে গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু বলেন, আর কোনো আশ্বাস শ্রমিকেরা মেনে নেবে না। বকেয়া বেতন, ভাতা অবিলম্বে পরিশোধ করার দাবি জানান তিনি।
শ্রমিক নেতাদের দ্বিধাবিভক্তি
বিজিএমইএর সঙ্গে গতকাল বৈঠক করেছেন সম্মিলিত গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশন, জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক লীগ, টেক্সটাইল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনসহ বেশ কিছু শ্রমিক সংগঠন। তারাই মূলত বিজিএমইএর সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে। অন্যদিকে এখন যারা অনশন করছেন তারা বলছেন পাঁচ দফা দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের কর্মসূচি চলবে। অনশনকারী শ্রমিক নেতারা বলছেন নানাবিধ সুবিধা নিয়ে একশ্রেণীর শ্রমিক নেতারা বিজিএমইএ ও সরকারের কথা মেনে নিয়েছে। তবে একথার বিরোধিতা করেছেন অপর পক্ষের শ্রমিক নেতারা। তারা বলছেন, অনশন করলেই তো সমাধান হবে না। এজন্য বিজিএমইএ ও সরকারের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
২৪ বিশিষ্ট ব্যক্তির বিবৃতি
তোবা গ্রুপের পাঁচ পোশাক কারখানার শ্রমিকদের পাওনা বেতন-বোনাস পরিশোধ করে অবিলম্বে শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানের দাবি জানিয়ে দেশের ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি গতকাল বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, যথাসময়ে পাওনা পরিশোধ না করে শ্রমিকদের অনশন করতে বাধ্য করার দায় সরকার ও বিজিএমইএ এড়াতে পারে না। বিবৃতিতে বলা হয়, সমস্যা সমাধান না হলে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সমর্থনে আগামী বুধবার ঢাকায় ‘প্রতীক অনশন’ কর্মসূচি পালন করা হবে।
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক কে এম সাদ’উদ্দিন, প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, কামাল লোহানী, সৈয়দ আবুল মকসুদ, অধ্যাপক আকমল হোসেন, অধ্যাপক এমএম আকাশ, অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ, অধ্যাপক আ.ব.ম. ফারুক, অধ্যাপক শফিকুজ্জামান, অধ্যাপক আজিজুর রহমান, অধ্যাপক হারুন-উর-রশীদ, অধ্যাপক আবিদুর রেজা, অধ্যাপক শামসুল আলম, অধ্যাপক এ. এন রাশেদা, ড.আশরাফুজ্জামান সেলিম, ড. আবুল কাশেম, আকসাদুল আমীন, রুবাইয়াত ফেরদৌস, শান্তনু মজুমদার, ডা.আব্দুল মতিন, অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খান, ড. মোশাহিদা সুলতানা, অধ্যাপক এমএ জলিল।
এদিকে তোবা কারখানার শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধের দাবিতে গতকাল বিকালে শাহবাগে গণ অধিকার সংগ্রাম কমিটির সমাবেশ ও মশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
