প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ষড়যন্ত্র থেমে নেই। মাইনাস ওয়ানসহ দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। অনেক বড় বড় জায়গা থেকে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। কিন্তু সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করেই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবেই। বাংলাদেশকে বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করব। কোন অপশক্তিই দেশের এই অগ্রযাত্রাকে রুখতে পারবে না। জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনে বাবার (জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) মতো আমিও যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত রয়েছি। দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত সম্পর্কে দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
গতকাল রবিবার বিকালে ধানমন্ডিস্থ বঙ্গবন্ধু ভবন চত্বরে রক্তদান কর্মসূচি উদ্বোধন পূর্ব এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগের মাসব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসাবে কৃষক লীগ এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মহত্ অর্জনের জন্য মহান আত্মত্যাগের প্রয়োজন। এদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য বাবা-মাসহ আমার পুরো পরিবার রক্ত দিয়ে গেছে। আমি সব হারিয়ে দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই, হারাবারও কিছু নেই।
একাত্তরের পরাজিত শত্রু ও তাদের দোসররা ১৫ আগস্ট চরম প্রতিশোধ নেয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে স্বাধীন করাই ছিল যেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অপরাধ। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় ও বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচারের পথ বন্ধ করে দেন। ওই সময় ১৯টির মতো ক্যু হয়। আর এসব ক্যু’র মাধ্যমে জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীতে হাজার হাজার সেনা অফিসার ও জোয়ানকেও হত্যা করেন। এছাড়া জিয়াউর রহমান ১১ হাজারেরও বেশি যুদ্ধাপরাধীকে জেল থেকে মুক্তি দিয়ে পুনর্বাসন করেছিলেন। তবে বেঈমান-মোনাফেকরা কখনও বেশিদিন টিকে থাকতে পারেনি। মোশতাক-জিয়ারাও পারেনি। দেশ ও জনগণের সঙ্গে যারা বেঈমানী করেছে তাদের অনেকেরই পরে রক্ত দিতে হয়েছে। কারণ রক্ত দিয়ে যে দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে তাদের কেউ দাবায় রাখতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা দেশ পেয়েছি। এতো আত্মত্যাগ কখনোই বৃথা যাবে না। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা দূরে নয়, কাছেই থাকে। বেঈমান-মোনাফেক খুনি মোশতাকও কাছেই ছিল। তাই সবাইকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরীকে ‘বেঈমান’ হিসাবে আখ্যায়িত করে শেখ হাসিনা বলেন, শমসের মবিন চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের সময় পায়ে গুলি খেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুই তাকে জার্মানী পাঠিয়ে চিকিত্সা করিয়ে সুস্থ করেন। কিন্তু বেঈমান-বিশ্বাসঘাতকরা কখনো বদলায় না। বেঈমান চিরকালই বেঈমান। এটা হয়তো অনেকে জানেন না। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর এই বেঈমান শমসের মবিন চৌধুরীই জেনারেল জিয়ার নির্দেশে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের লিবিয়াসহ বিদেশে নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠান, বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেন। তিনি বলেন, তারা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল বলেই খুনিদের বিচার না করে পুরস্কৃত করে।
বাবা-মাসহ নিজ পরিবারের সদস্যদের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগ-আপ্লুত কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার মা, ছোট ভাই শিশু রাসেলের কী দোষ ছিল? একইসঙ্গে তিন পরিবারে হামলা চালিয়ে নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ চালায় খুনিরা। জার্মানীতে যাওয়ার আগে আমরা দু’বোন ভরাবাড়ি রেখে গেলাম, ফিরে এসে পেলাম শূন্যঘর। তিনি বলেন, পরিবারের সবাইকে হারিয়ে শুধু বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণের শপথ নিয়ে দেশে ফিরে আসি। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি এবং যাব। প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে অনেক ষড়যন্ত্র ছিল। সেটা অতিক্রম করে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।
দীর্ঘ ২১ বছর বঙ্গবন্ধুর খুনিরা নানা ষড়যন্ত্র করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর খুনিরা দম্ভভরে বলেছিল, তাদের কেউ বিচার করতে পারবে না। জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের প্রদেশ বানানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তারা সফল হতে পারেনি। খুনিদের রক্ষা করতে পারেনি।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে বলেন, তারা আমাদের নির্বাচন নিয়ে কথা বলেন। অথচ তাদের দেশে ভোটে জেতে আলগোর, আর ক্ষমতায় যায় জর্জবুশ। তারা সবসময় জঙ্গীবাদ, খুনি ও ষড়যন্ত্রকারীদের পক্ষ নেয়। তবে আগের মতো তাদের কথায় এখন আর সারাবিশ্ব চলে না। জাতীয় শোক দিবস ১৫ আগস্টে মিথ্যা জন্মদিন পালন করায় বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, বাবা-মা’র বৈধ সন্তান হলে একটিই জন্মদিন হয়। কিন্তু ডাস্টবিনে তোয়ালে জড়ানো কোন অবৈধ বাচ্চার সঠিক জন্মদিন জানা থাকে না।
কৃষক লীগ সভাপতি মোতাহার হোসেন মোল্লার সভাপতিত্বে আলোচনাসভায় আরো বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি, কৃষিবিদ ড. আবদুর রাজ্জাক, কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক রেজা, সহ-সভাপতি শেখ জাহাঙ্গীর আলম। সভা শেষে প্রায় শতাধিক কৃষক লীগ নেতা-কর্মী বঙ্গবন্ধুর স্মরণে নিজ দেহ থেকে এক ব্যাগ করে রক্তদান করেন। এ রক্তদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
