গত কয়েক দশকে বরিশাল বিভাগে বিভিন্ন স্তরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা যেভাবে বেড়েছে, পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে পাসের হারও বেড়েছে একইভাবে। কিন্তু নিম্ন মাধ্যমিক থেকে উচ্চ শিক্ষা স্তর পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সেভাবে না বাড়ায় শিক্ষা ক্ষেত্রে কার্যত পিছিয়ে পড়ছে বরিশাল বিভাগ। পর্যাপ্তসংখ্যক ভালো মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাবে শিক্ষার্থীরা পাড়ি জমাচ্ছে অন্য বিভাগীয় শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে।
গত তিন বছরে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় টানা পাসের হারে প্রথম ছিল বরিশাল বোর্ড। এসএসসি ও এইচএসসির চিত্রও প্রায় একই। ক্রমান্বয়ে পাসের হার বেড়েছে। সাক্ষরতার হারেও এগিয়ে বরিশাল বিভাগ। ২০১১ সালে সাক্ষরতার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে যেখানে গড় সাক্ষরতার হার (১১ থেকে ৪৫ বছর) ৫৩ দশমিক ৭ শতাংশ। সেখানে বরিশাল বিভাগের সাক্ষরতার হার প্রায় ৬২ শতাংশ। এত ইতিবাচক দিক থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাব ও শিক্ষক সংকটই এ অঞ্চলের মেধা ও শিক্ষার বিকাশে প্রধান অন্তরায় বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।
দেশের তিনটি কৃষি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের অংশ হিসাবে ২০০২ সালে পটুয়াখালি কৃষি কলেজকে পটুয়াখালি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে বরিশাল বিভাগে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬টি অনুষদে অনার্স কোর্স রয়েছে। যার আসন সংখ্যাও কম।
২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। ৩২ বছর আন্দোলন সংগ্রাম করে দেশের ৩৩তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সাইনবোর্ড মিলেছে তাও চলছে জিলা স্কুলের একটি ভবনে। ২০১২ সালের ২৪ জানুয়ারি অস্থায়ী ক্যাম্পাস হিসাবে এখানেই শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তারও এক বছর আগে দপদপিয়া এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ৬টি বিষয় নিয়ে চালু হওয়া এ বিশ্ববিদ্যালয় এ বছর ১৮টি বিষয়ে অনার্সে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে। স্থায়ী ক্যাম্পাসে এখনো বিশ্ববিদ্যালয় স্থানান্তর করা সম্ভব হয়নি। সারা দেশে ৩৪টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বরিশালে বিশ্ববিদ্যালয় মাত্র ২টি।
বরিশাল নগর সংলগ্ন রহমতপুরে কৃষি কলেজের পাশেই যে ভেটেরিনারি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের জন্য দীর্ঘদিন আন্দোলন সংগ্রাম চললেও শেষ পর্যন্ত ভেটেরিনারি কলেজটি পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধীনে দেয়া হয়েছে। বরিশালবাসীর বক্তব্য, সরকার আসে সরকার যায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে এ অঞ্চলের নানামুখী সংকট মোকাবেলার প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়। বাস্তবে দেশের অন্যান্য স্থানের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে না পারায় পিছিয়ে পড়ছে এ অঞ্চলের শিক্ষা কার্যক্রম।
খোদ বরিশাল নগরীতে মাধ্যমিক পর্যায়ে সরকারি স্কুল আছে মাত্র দু’টি। এ স্কুল দু’টিতে জানুয়ারি মাসে তৃতীয় শ্রেণী ও ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করা হয়ে থাকে। তাও ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে চাহিদা অনুযায়ী বছরে ১৫ থেকে ৩০ জনের বেশি ভর্তি হওয়ার কোন সুযোগ নেই। বিদ্যালয় দু’টি সভাপতি পদাধিকার বলে জেলা প্রশাসক। বর্তমানে সভাপতির দায়িত্বে থাকা জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল আলম ইত্তেফাককে জানান, বিদ্যালয় সংকটের কারণে দ্বিতীয় সারির কোন মেধাবী শিক্ষার্থী সরকারি স্কুলে পড়তে পারে না।
সারাদেশে ১৯ হাজার ২০৮টি জুনিয়র ও মাধ্যমিক স্কুলের মধ্যে বরিশাল বিভাগে স্কুল মাত্র ১ হাজার ৬২৩টি। সরকারি জুনিয়র ও মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা বিশ্লেষণে দেখা যায়, সারাদেশে ৩১৮ টি সরকারি স্কুলের মধ্যে বরিশালে রয়েছে মাত্র ২০টি সরকারি স্কুল। অন্যান্য বিভাগের মধ্যে চট্টগ্রামে ৭৭টি, ঢাকায় ৯০টি, খুলনায় ৩৫টি, রাজশাহীতে ৩৭টি, রংপুরে ৩৯টি, সিলেটে ২০টি।
বরিশাল নগরীতে সরকারি স্কুলের সংকটের কথা প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করার পর ২০১২ সালে ২১ মার্চ তিনি নগরীতে সদর গার্লস ও জিলা স্কুলের আদলে আরো দু’টি সরকারি বালক-বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। সে অনুযায়ী স্থান নির্ধারণ আর চিঠি চালাচালিতে প্রায় আড়াই বছর পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত স্কুল নির্মাণের কাজ শুরু হয়নি।
মাধ্যমিক পর্যায়ে যখন এ বেহাল দশা তখন উচ্চ মাধ্যমিক ও অর্নাস কোর্স নিয়েও সীমাবদ্ধতার শেষ নেই। দক্ষিণ বাংলার সর্ববৃহত্ বিদ্যাপীঠ বিএম (ব্রজমোহন) কলেজ ও সরকারি মহিলা কলেজের বাইরে নগরীর আরো দু’টি কলেজকে ৮০’দশকে একদিনে জাতীয় করণ করা হয়েছিল। তারপর গত দুইযুগে নতুন করে আর কোন কলেজ জাতীয় করণ করা হয়নি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংকটের কারণে এখানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কয়েকটি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নগরীতে বর্তমানে বেসরকারি কলেজ ১৬টি।
সারাদেশে ২৮৮ টি সরকারি কলেজের মধ্যে বরিশাল বিভাগে মাত্র ২২ টি। যেখানে ঢাকায় ৮৪টি, চট্টগ্রামে ৫৭টি, খুলনায় ৪২টি, রাজশাহীতে ৪১টি, রংপুরে ২৭টি এবং সিলেটে ১৫টি সরকারি কলেজ রয়েছে।
বরিশালের সরকারি কলেজগুলোতে শিক্ষক সংকট থাকার কারণে নিয়মিত ক্লাস হয় না, বিপাকে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের।
এ ব্যাপারে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মো. হানিফ ইত্তেফাককে জানান, দক্ষিনাঞ্চলের মানুষ দারিদ্র্যপীড়িত। এখানকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে অধিকাংশেরই দূরে গিয়ে কোথাও পড়াশোনা করার মত স্বচ্ছলতা নেই। এ কারণেই টানা ৩২ বছর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আন্দোলন করতে হয়েছে। সরকারি দু’টি স্কুল প্রতিষ্ঠা নিয়ে দীর্ঘসূত্রতার প্রসঙ্গ তুলে প্রবীণ এ শিক্ষাবিদ বলেন, বরিশাল হচ্ছে শিক্ষার নগরী অথচ এ অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা আজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ভাল শিক্ষকের অভাব এবং শিক্ষা ব্যবস্থার অচল অবস্থার কারণে পিছিয়ে যাচ্ছে। তিনি প্রয়োজনীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি স্কুল-কলেজগুলোর মনিটরিং জোরদার করার আহবান জানান।
