‘টোকেন’ না পেলেই অপহরণ, নির্যাতন

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০১৪, ২২:৫২
সুন্দরবন সংলগ্ন সাগরে জলদস্যু বাহিনীর ফ্রি স্টাইল চাঁদাবাজি, অপহরণ, হত্যা ইত্যাদি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে। এ কারণে জলদস্যুদের হাতে মূলত: জিম্মি হয়ে পড়েছেন এই সাগর উপকূলের জেলেরা। জলদস্যুদের চাঁদা দিয়ে ‘টোকেন’ না নিয়ে এ অঞ্চলে কেউ মাছ ধরতে পারছেন না। আর ‘টোকেন’ না পেলে অপহরণ, হত্যাসহ জেলেদের উপর অকথ্য নির্যাতন চালাচ্ছে জলদস্যুরা। সাগর থেকে উপকূলের বিভিন্ন মত্স্য আড়তে ফিরে আসা জেলেরা জানান, এক দিকে সমুদ্রে ইলিশের দেখা মিলছে না, অন্যদিকে যেসব ট্রলার জলদস্যুদের চাঁদা দিচ্ছে না তাদের মাছ আহরণ করতে নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। চাঁদা পরিশোধের ‘টোকেন’ দেখাতে ব্যর্থ হলে, জলদস্যুরা ঐসব ট্রলারে হামলা করছে। জেলেদের ধরে নিয়ে গহীন অরণ্যে আটকে রাখছে। এরপর মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে। জেলেদের অভিযোগ, উপকূলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সার্বক্ষণিক তদারকির অভাব রয়েছে। ফলে দেড় লাখ জেলে বছরের পর বছর দস্যুদের হাতে জিম্মি রয়েছে। জানা গেছে, গত এক বছরে র্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ ও ‘ক্রসফায়ারে’ অন্তত ৪১ দস্যু নিহত হয়েছে। এরপরও নতুন নতুন জলদস্যু বাহিনী গঠিত হচ্ছে। চলছে জেলেদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন আর তাণ্ডব। মানবাধিকার সংগঠনসমূহ বিষয়টিকে আদৌ কোন গুরুত্ব দেয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। জেলে, ট্রলার মালিক ও আড়তদার সূত্রে জানা গেছে, ইলিশ মৌসুমের শুরু থেকে এ পর্যন্ত মুক্তিপণের দাবিতে কয়েকশ’ জেলেকে অপহরণ করেছে দস্যুরা। সুন্দরবন উপকূলে সাম্প্রতিককালে আউয়াল ওরফে ছোট, জাহাঙ্গীর, ইলিয়াস, জুম্মন, মর্তুজাসহ বেশ কয়েকটি জলদস্যু বাহিনীর তাণ্ডব চলছে। চলতি মৌসুমে ট্রলার ও নৌকা প্রতি তারা ৭০ থেকে ৯০ হাজার টাকা করে চাঁদা দাবি করছে। মংলার চিলা ও জয়মনি এলাকার মাছ ধরার ট্রলারের মাঝি ফারুক, চান মিয়া, লাল মিয়া ও নুর মিয়া জানান, দাবিকৃত চাঁদা দিতে ব্যর্থ ট্রলার ও ইঞ্জিনচালিত নৌকাগুলোতে দস্যুরা হানা দিয়ে মাছসহ ট্রলার-নৌকা লুট ও জেলেদের অপহরণ করে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণের দাবিতে সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে আটকে রাখছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের এসব অপহরণের ঘটনা জানিয়ে দু’-একটি ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো প্রতিকার মিলেনি। এদিকে ট্রলার ও ইঞ্জিনচালিত নৌকার মালিকরা মুক্তিপণের টাকা দিতে দেরি করায় জেলেদের হত্যা করে বন ও সাগরে নিক্ষেপ করার ঘটনাও ঘটছে বলে জেলেরা জানিয়েছেন। সে কারণে ট্রলার ও ইঞ্জিনচালিত নৌকাগুলো বাধ্য হয়ে জলদস্যু বাহিনীগুলোকে চাঁদা দিয়ে ‘টোকেন’ নিয়েই সমুদ্রে ইলিশ আহরণ করতে বাধ্য হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুন্দরবনের সাগর উপকূলের মত্স্যজীবীদের বৃহত্ সংগঠন ‘দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপে’র চেয়ারম্যান মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন বলেন, অসহায় জেলেরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জলদস্যু বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার। পেশার তাগিদে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের সাগরে যেতে হয়। নেপথ্য গডফাদারদের আইনের আওতায় না আনতে পারলে, জলদস্যু বাহিনীগুলোকে কোনভাবেই দমন করা যাবে না। কিন্তু সরকারের বিভিন্ন এজেন্সীর কাছে এসব ক্ষমতাধর লোকের নাম-পরিচয় থাকলেও সদিচ্ছার অভাবে এদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না, যা খুবই দু:খজনক। এ ব্যাপারে কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের অপারেশন কর্মকর্তা লে. কমান্ডার আলাউদ্দিন নয়ন জানান, তারা সুন্দরবনে দস্যু দমনে অভিযান অব্যাহত রেখেছেন।