মোর্শেদ আরবি শব্দ। যার অর্থ পথ প্রদর্শক। ফার্সিতে একে ‘পীর’ বলে। বাংলা অভিধানের মতে- পীর মানে মুসলিম দীক্ষাগুরু, পূণ্যাত্মা, মুসলমান সাধু মহাপুরুষ। নবুয়তের সিলসিলায় আল্লাহর বান্দাকে পবিত্র হওয়ার শিক্ষা দিয়ে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য জগতে আগমন করেছেন, অসংখ্য নবী-রসূল ও পয়গম্বর। নবুয়তের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। কেয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর পক্ষ হতে মানুষের হেদায়েতের জন্য অলীআল্লাহগণের আগমন হবে। আল্লাহর অলীগণকে ‘হিজবুল্লাহ’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। একজন অলীর ইন্তেকালে অন্যজন সেই পদে স্থলাভিষিক্ত হন। দুনিয়ার বাদশাদের যেমন রাষ্ট্র চালাতে প্রশাসন লাগে, ঠিক তেমনি আল্লাহপাকের এই বিশ্ব জগত্ পরিচালনার জন্যও তাঁর আছে প্রশাসন। সেখানেও রুহানী সংসদ রয়েছে। আল্লাহ বলেন, “আমি আমার সৃষ্টির (মানুষ) মধ্যে এমন একদলকে সৃষ্টি করেছি যারা মানুষকে সত্ পথ দেখাবে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে” (সূরা আরাফ : ১৮১)। এরশাদ হয়েছে, “তারাই আল্লাহর দল, জেনে রাখ আল্লাহর দলই বিজয়ী” (সূরা মুজাদালাহ : ২২)। আরও এরশাদ হয়েছে, “সাবধান! আল্লাহর বন্ধুগণের কোন ভয়-ভীতি নেই এবং তাঁরা কোনরূপ দুশ্চিন্তাগ্রস্থও হবেন না” (সূরা ইউনুস : ৬২)।
অলীআল্লাহগণের মধ্যে তিনটি শ্রেণী আছে। যথা- ১. হাদী ২. মাজ্জুব ও ৩. দেশ রক্ষক। হাদী শ্রেণী হেদায়েতের দায়িত্বে নিয়োজিত। মাজ্জুব হলেন আল্লাহর পাগল। আর দেশরক্ষক অলীগণ সমগ্র সৃস্টিজগতে সৈনিকের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের অনেকগুলো পদবী আছে- কুতুবুল আকতাব, গাউস, আওতাদ, আবদাল, আখিয়ার, নুজাবা-নুকাবা ও কুতুব। আল্লাহ বলেন, “তোমাদের জন্য সুন্দরতম আদর্শ হচ্ছে মুহাম্মদ (স.)-এর জীবনচরিত।” মোর্শেদ হবেন শরিয়ত ও মারেফাতের পূর্ণ পাবন্দ। তাঁর মধ্যে থাকবে অলৌকিক কারামত। তিনি ধর্ম ও সমাজ সংস্কারক হবেন। তাঁর মুখনিঃসৃত প্রতিটি বাণী হবে কলব থেকে উদ্ভাসিত। তিনি নামাজসহ ধর্মের সকল আহকামগুলো নিজে পালন করবেন ও অনুসারিদেরকেও করাবেন। তিনি মুছকি হাসবেন, স্বল্পভাষী হবেন। ধৈর্য্যশীল, নিরহঙ্কারী হবেন। অন্যকে কটাক্ষ্য করবেন না। মানুষের প্রতি ভালো ব্যবহার ও আচরণ করবেন। স্ত্রী-সন্তান ও আওলাদবর্গ সবার কাছে তিনি শ্রদ্ধার পাত্র হবেন। নিজ সন্তান-সন্তুতিকে আধুনিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষায় উচ্চ শিক্ষিত করবেন। পরিমিত আহার করবেন, সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন থাকবেন। খুশবু ও খেজাব লাগাবেন। মানুষের নালিশ মনোযোগ সহকারে শুনবেন। কারো সঙ্গে রাগ করবেন না, অশোভন বাক্যও উচ্চারণ করবেন না। নিজের পিতা-মাতার যত্ম নেবেন এবং অর্থ কষ্ট লাঘব করবেন। মানুষের সুখে আনন্দ পাবেন ও দুখে পেরেশান হবেন। এবং গভীর রাতে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকবেন। এখন প্রশ্ন জাগে, কেন যাবে মানুষ পীর-মোর্শেদের কাছে? মানুষ যাবে তার ভেতরের ময়লাকে দূর করতে, মুর্দা কলবকে জিন্দা করতে এবং ফায়েজ অর্জন করতে। যে পীরের কাছে এগুলোর সন্ধ্যান মেলে না অথচ তিনি কেবল শিক্ষা দেন ঢিলা-কুলুপ, জুববা, হালকায় জ্বিকির ইত্যাদি বুঝতে হবে তাঁর ভেতরে কামালিয়াত নেই। এরশাদ হয়েছে, “আর তোমরা এমন লোকের আনুগত্য করবে না, যার কলবকে আমি আমার জ্বিকির থেকে গাফেল করে দিয়েছি” (সূরা কাহফ : ২৮)। মাওলানা রুমী (রহ.) বলেন, “তুমি যদি কোন আল্লাহর অলির নিকট বায়েত হও, তবে ৪০ দিবস তাঁর নির্দেশিত ওয়াজিফা আমল কর এবং নিজেকে তাঁর নিকট শপে দাও। যদি তুমি এ সময়ের মধ্যে আল্লাহর নূর (আল্লাহকে) দেখতে না পাও তবে দৌড়ে পালাও।” একজন মোর্শেদ প্রথম মানুষের কলবে তাওয়াজ্জোহ দেন। যা লাভ করে সাধক পাঁচওয়াক্ত নামাজ শেষে মোরাকাবা করে সাধনার উচ্চ স্তরে পৌঁছে। এবং ক্রমে সে তার আত্মিক উন্নতি প্রত্যক্ষ করে।
মুক্তি পাওয়ার জন্য মানুষকে উসিলা অন্বেষণ করতেই হবে। উসিলা ছাড়া জগতে কেউ আল্লাহকে পায় না। এরশাদ হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয়
কর এবং সাদিক্বীনদের সত্যবাদীদের সাথী হয়ে যাও” (সূরা তাওবাহ : ১১৯)। হযরত আদম (আ.) ৩৯০ বছর কেঁদেও যখন মাপ পাননি তখন উসিলা ধরে তওবা করে মাপ পেয়েছেন। তাইতো আল্লাহ বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর নৈকট্য লাভের জন্য উছিলা তালাশ কর এবং আল্লাহকে পাওয়ার পথে নফসের সাথে সংগ্রাম কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও” (সূরা মায়েদা : ৩৫)। হাদিস শরিফে আছে, “যে ব্যক্তি তার জামানার ইমামকে (মোজাদ্দেদ) চিনতে পারলো না এবং এ অবস্থায় যদি মৃত্যু ঘটে, তবে তার মৃত্যু অন্ধকারে নিমজ্জিত ও নিপতিত হবে” (মেজামুয়ায়ে ফতুয়া)। নবীজি (স.) সাহাবাগণকে নবুয়ত লাভের পর থেকে নামাজ আসা পর্যন্ত এলমে মারেফাত তথা ধ্যান-মোরাকাবার শিক্ষা দিতেন। শরিয়ত ব্যক্তির আচার-আচরণ, পোশাক-পরিচ্ছদ, রীতি-নীতি ও বাহ্যিক বিধান পরিপাটি করে। আর মারেফাত দ্বারা আত্মশুদ্ধি লাভের মাধ্যমে আল্লাহকে দেখা যায়, লাভ করা যায়। নবুয়তের যুগে মানুষ নবী-রাসুলগণের নিকট বায়েত হলে যেমন আল্লাহর সাহায্য পেত, ঠিক তেমনি এ যুগেও তারা যদি সত্যিকার অলিআল্লাহর কাছে দীক্ষা নিয়ে মোমেন বান্দায় পরিণত হতে পারে তবে, আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে তাঁর ওপর অবারিত রহমত ঝরতে থাকবে।
