বন্ধু হয়ে চিকিত্সাসেবা দেব গ্রামীণ মানুষদের

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০১৪, ২২:৩৪
চিকিত্সকরা মফস্বলে থাকতে চান না। নিয়োগ দিলে তদ্বির করে, প্রভাব খাটিয়ে কিংবা ঘুষ দিয়ে চলে আসেন ঢাকায়। কেউ কেউ চলে যান বিভাগীয় শহর বা জেলা শহরে। শুরু করেন প্রাইভেট প্রাকটিস। চিকিত্সকদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ বেশ পুরনো। তবে এসব অভিযোগের দিন বোধ হয় শেষ হতে যাচ্ছে। সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত তরুণ চিকিত্সকরা পুরনো এসব অভিযোগ তুলে রাখতে চান জাদুঘরে। বললেন, স্বাস্থ্যসেবায় নতুন নজির স্থাপন করবেন তারা। বন্ধু হয়ে গ্রামীণ মানুষদের দেবেন উন্নত চিকিত্সা সেবা। অসহায় ও দরিদ্র মানুষগুলো সবসময় পাশে পাবেন তাদের। পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোকে আর সামান্য অসুখ বিসুখ হলে ছুটতে হবে না শহরে। ৩৩তম বিসিএসের মাধ্যমে গতকাল বৃহস্পতিবার ৬,১৫২ জন চিকিত্সক সরকারি চাকরিতে যোগদান করেছেন। এ নিয়ে বর্তমানে সরকারি হাসপাতালে চিকিত্সকদের সংখ্যা দাঁড়ালো প্রায় ২৫ হাজারে। নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিত্সকদের যোগদান ও ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠান গতকাল বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দে অনুষ্ঠিত হয়। দেশের ১৬ কোটি মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বর্তমান সরকারের অঙ্গীকারের ফসল এই রেকর্ড সংখ্যক নিয়োগ। আর স্বাস্থ্য সেবায় সরকারের সব অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তরুণ চিকিত্সকরা। সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে উচ্ছ্বসিত এই তরুণরা বলেন, চাকরি জীবনের শুরুতেই গ্রামে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের চিকিত্সা সেবা দিতে পারাটা তাদের জন্য গৌরবের। সরকার ঘোষণা দিয়েছিল, চিকিত্সকদের নিজ নিজ জেলায় যোগ দিতে উত্সাহিত করা হবে। আর সরকারের এই ঘোষণাতেও খুশি চিকিত্সকরা। তারা বলেন, এতে চাকরির পাশাপাশি নিজের জেলার মানুষের সেবা করার একটি সুযোগ তৈরি হবে। চিকিত্সক দম্পতিদের একই স্থানে পদায়নের সিদ্ধান্তকেও স্বাগত জানান তরুণরা। গতকালের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক। সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্য সচিব এম এম নিয়াজ উদ্দিন। বক্তব্য রাখেন সাবেক স্বাস্থ্য মন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হক, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. দীন মো. নূরুল হক ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সালান। স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এহতেশামসুল হক বলেন, এখন আর সরকারি হাসপাতালে চিকিত্সকের কোন পদ শূন্য নেই। আগামী দুই বছরেও চিকিত্সকদের পদ শূন্য হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তিনি বলেন, এরপরেও দেশে মানুষের অনুপাতে চিকিত্সকদের সংখ্যা কম। এ মুহূর্তে ৬,১৫২ জন চিকিত্সক নিয়োগ পেল, এর সঙ্গে কমপক্ষে ৫ হাজার নার্স প্রয়োজন। অনুষ্ঠান শেষে অটিস্টিক শিশুদের চিকিত্সা সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এবং প্রখ্যাত নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত। তিনি অটিস্টিক শিশুদের সম্পর্কে তরুণ চিকিত্সকদের কাছে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। এ ছাড়া মানসিক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. গোলাম রাব্বানি বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিত্সক ডা. নাজিয়া মিরাজ, ডা. নাজিয়া রহমান, ডা. মাইনুল কুদ্দুছ, ডা. বিশ্বস্বর চন্দ্র বর্মন ও ডা. মাইনুল হক বলেন, মন্ত্রণালয় যে যে নির্দেশনা দিয়েছে তা তারা মেনে চলবেন। বন্ধু হয়ে গ্রামাঞ্চলের মানুষকে চিকিত্সা দেবেন। একই সঙ্গে তারা চিকিত্সা সরঞ্জাম, জনবল ও নার্সের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। চিকিত্সকদের বাসস্থানসহ কর্মপরিবেশ উন্নত করতে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. দীন মো. নূরুল হক জানান, একশ’ শয্যার জেলা সদর হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা বাড়িয়ে ২৫০ এবং ৩১ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা দ্বিগুণ করা হয়েছে। করোনারি কেয়ার ইউনিট, ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট, বার্ন ইউনিটসহ স্পেশালাইজড ইউনিট চালু করা হয়েছে। এছাড়া জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ ও সিসিইউ সেবা চালুর কার্যক্রম প্রায় চূড়ান্ত। তিনি বলেন, তবে এসব চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নেই। চিকিত্সক ও নার্সদের পদ আরো ১০ থেকে ২০ হাজার বাড়ানো জরুরি। তাহলে ওইসব গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটগুলোতে চিকিত্সাসেবা সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হবে। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ ২০১৪ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরো ১০ হাজার নার্সের পদ সৃষ্টি করার ঘোষণা দেন। প্রধানমন্ত্রী এর ঘোষণাকে নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের সভানেত্রী ইরা দিব্রা ও মহাসচিব জামাল উদ্দিন বাদশা, ডিপ্লোমা স্টাফ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক কামাল হোসেন পাটোয়ারী স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণা চিকিত্সাসেবার মানোন্নয়নে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে। বেকার নার্সদের কর্মসংস্থানে কোন সমস্যা হবে না। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী চিকিত্সাসেবার মান উন্নয়নের পাশাপাশি চিকিত্সক, নার্সসহ জনবল নিয়োগে চিকিত্সাসেবার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এ জন্য নেতৃবৃন্দ প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকার প্রশংসা করেন।