শ্রমিক নেত্রী মোশরেফা মিশু গতকাল থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ঘোষণা দিলেও এর পক্ষে নন বেশিরভাগ আন্দোলনকারী শ্রমিক নেতা। তোবা গ্রুপ শ্রমিক সংগ্রাম কমিটির অন্যতম নেতা মাহবুবুর রহমান ইসমাইল ইত্তেফাককে বলেন, মোশরেফা মিশু একক সিদ্ধান্তে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়েছেন। বেশিরভাগ শ্রমিক নেতা এই সিদ্ধান্তের পক্ষে নন। আপাতত শনিবার ধর্মঘট করার কথা আমরা চিন্তা করছি। যদিও সামগ্রিক বাস্তবতায় সেটিও কঠিন।
তোবা গ্রুপের কারখানায় শ্রমিকদের উপর হামলা ও তাদের সেখান থেকে বের করে দেয়ার প্রতিবাদে ‘তোবা গ্রুপ শ্রমিক সংগ্রাম কমিটি’র পক্ষ থেকে শ্রমিক নেত্রী মোশরেফা মিশু গতকাল দুপুরে অনির্দিষ্টকাল ধর্মঘটের ঘোষণা দেন। এর পরই তাকেসহ কয়েকজন শ্রমিক নেতাকে আটক করে পুলিশ। অবশ্য সন্ধ্যার পর তাকে ছেড়ে দেয়া হয় বলে ইত্তেফাককে জানিয়েছেন বাড্ডা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল জলিল। জলি তালুকদারসহ আটক অন্য দুইজনকেও ছেড়ে দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
রাজধানীর বাড্ডার হোসেন মার্কেটে পুলিশ তোবা গ্রুপের শ্রমিকদের পিটিয়ে বের করে দেয়া এবং শ্রমিক নেত্রীদের আটকের প্রতিবাদে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। শ্রমিকদের উপর হামলা ও মিশুসহ শ্রমিক নেতাদের আটকের ঘটনায় বিরোধী দল বিএনপিসহ বিভিন্ন গার্মেন্টস শ্রমিক সংগঠন নিন্দা জানিয়েছে।
গতকাল বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে তোবা গ্রুপ সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে এক প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। এ সময় অনশনরত শ্রমিকদের উপর হামলার নিন্দা ও শ্রমিক নেত্রী মোশরেফা মিশুর মুক্তি দাবি করা হয়। গার্মেন্টস শ্রমিক নেতা অ্যাডভোকেট মন্টু ঘোষ, মাহবুবুর রহমান ইসমাইল, তাসলিমা আক্তার, আহসান হাবিব বুলবুল প্রমুখ এ সময় বক্তব্য দেন।
তিন মাসের বেতনের দাবিতে ঈদের আগের দিন থেকে অনশন চালিয়ে আসছিলেন তোবা গ্রুপের শ্রমিকরা। বিজিএমইএ ভবন থেকে দুই মাসের বেতন দেয়া হলেও তিন মাসের বেতনের দাবিতে তারা সেখানে অবস্থান করে আসছিলেন। তোবা গ্রুপের ৫টি কারখানায় ১ হাজার ৫৬ জন শ্রমিকের অনেকেই এই অনশনের সঙ্গে শরিক ছিলেন। তবে শ্রমিকদের বের করে দেয়ার পর তাদের প্রায় সবাই বিজিএমইএ ভবনে এসে বেতন নিয়েছেন। এর আগের দিন সাড়ে পাঁচশ’ শ্রমিক বেতন নিলেও গতকাল বিকাল পর্যন্ত ১ হাজার ৩১৫ জন শ্রমিক বেতন নিয়েছেন বলে বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। সংগঠনের সভাপতি আতিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সন্ধ্যা নাগাদ ১৪ শতাধিক শ্রমিক বেতন নিয়েছেন।
এদিকে নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান বলেছেন, শ্রমিকদের আন্দোলনকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা হয়েছিল। সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। নৌ পরিবহন মন্ত্রী নিজেও ৫২টি গার্মেন্টস শ্রমিক সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ‘গার্মেন্টস শ্রমিক সমন্বয় পরিষদের’ আহ্বায়ক। তিনি বলেন, গার্মেন্টস শ্রমিক সমন্বয় পরিষদ ধর্মঘটের পক্ষে নেই। এ সময় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি এই আন্দোলনে কাজ করেছে বলে শুনেছি।
এ সময় বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, এই খাত নিয়ে কেউ রাজনীতি করবেন না। গার্মেন্টস খাত জাতীয় সম্পদ। এটি রক্ষার দায়িত্ব সবার।
অনশনে পুলিশের হামলা, মিশু আটক, ধর্মঘটের ঘোষণা
বকেয়া বেতন-বোনাস ও ওভারটাইম পরিশোধের দাবিতে ১২ দিন ধরে রাজধানীর বাড্ডার হোসেন মার্কেটে তোবা গ্রুপের তিনটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা অনশন করে আসছেন। গতকাল দুপুরে শ্রমিকদের আন্দোলনের সমর্থনে পার্শ্ববর্তী একাধিক গার্মেন্টসের শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে আসেন। এ সময় পুলিশ তাদেরকে বাধা দিলে শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ফাঁকা গুলি ও লাঠিচার্জ করে। এছাড়া রাবার-বুলেটের পাশাপাশি জল-কামানও ব্যবহার করে। এ সংঘর্ষে বাড্ডার প্রগতি সরণী সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শ্রমিকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে বেশকিছু গাড়ি ভাংচুর করে। এক পর্যায়ে বেলা দেড়টার দিকে পুলিশের একটি বড় দল তোবা গ্রুপের গার্মেন্টসে প্রবেশ করে কারখানা থেকে তোবা গ্রুপ শ্রমিক সংগ্রাম কমিটির সমন্বয়ক শ্রমিক নেত্রী মোশরেফা মিশুসহ অনশনরত শ্রমিকদের পিটিয়ে বের করে দেয়। ঘটনাস্থল থেকে মিশু ও শ্রমিক নেত্রী জলি তালুকদারসহ কয়েকজন অনশনকারী হেঁটে কেন্দ ীয় শহীদ মিনারের উদ্দেশে রওনা হন। এ সময় সাংবাদিকদের মোশরেফা মিশু বলেন, এখন থেকে কেন্দ ীয় শহীদ মিনারে শ্রমিকদের অনশন কর্মসূচি চলবে। এ অনশনকে গণ-অনশনে রূপ দেয়া হবে। এছাড়া দেশের সব গার্মেন্টসে আজ থেকে (গতকাল বৃহস্পতিবার) অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট চলবে। এরপরই মিশু ও জলিকে পুলিশ টেনে-হিঁচড়ে ভ্যানে তুলে নেয়। বাড্ডা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এম এ জলিল বলেন, মিশু ও জলিকে আটক করা হয়েছে। তাদেরকে বাড্ডা থানায় নেয়া হয়েছে। বেতন-বোনাসের দাবিতে তোবা গ্রুপের শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনে উস্কানি দেয়া ও উত্তেজনা ছড়ানোর অভিযোগে মোশরেফা মিশুসহ সাতজনকে আটক করা হয়েছে।
মোশরেফা মিশুকে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর পর শ্রমিকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তারা হোসেন মার্কেট থেকে মধ্যবাড্ডা, লিংক রোড পর্যন্ত এলাকায় গাড়ি ভাংচুর করেন। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাস, ফাঁকা গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। এ সময় দফায় দফায় পুলিশ-শ্রমিক সংঘর্ষ হয়। পরে বিকাল তিনটার দিকে পুলিশ শ্রমিকদের সরিয়ে রাস্তার নিয়ন্ত্রণ নিলে যান চলাচল শুরু হয়।
এদিকে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে আহত ৪ শ্রমিক চিকিত্সার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গতকাল বিকাল সাড়ে চারটার দিকে তাদের সহকর্মীরা হাসপাতালে ভর্তি করেন। আহতরা হলেন- নাজমা আক্তার, তার মেয়ে হ্যাপি আক্তার, আসমা বেগম ও মাহমুদা আক্তার। তাদের মধ্যে নাজমা আক্তারকে মাথায় রাবার বুলেটবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
হামলা ও আটকের ঘটনায় নিন্দা
শ্রমিকদের উপর হামলা ও শ্রমিক নেত্রী মোশরেফা মিশুকে আটকের ঘটনায় বিরোধী দল বিএনপিসহ বাম ধারার রাজনৈতিক ও শ্রমিক সংগঠন নিন্দা জানিয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ন্যায্য বকেয়া বেতন-ভাতাসহ ৫ দফা দাবি মেনে নেয়ার আহ্বান জানানো হয়। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে না নিয়ে অনাহারী শ্রমিকদের উপর বর্বর নির্যাতন করা হয়েছে। শ্রমিকরা অনন্যোপায় হয়ে অনশন করেছিলেন। অথচ তাদের লাঠিপেটা করা হয়। এতে বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে। অন্যদিকে এখন থেকে মালিক পক্ষ ‘যা ইচ্ছে তা করাতে’ উত্সাহিত হবে।
বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কারখানার ভেতর থেকে শ্রমিকদের জোর করে বের করে দেয়ার ঘটনাকে মধ্যযুগীয় বর্বরতার সঙ্গে তুলনা করেন। এই ঘটনায় অন্যদের মধ্যে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে, বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চা, জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চ, জাতীয় গণফ্রন্ট, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা।
ধর্মঘট নিয়ে বিভক্ত শ্রমিক নেতারা
এদিকে ধর্মঘট নিয়ে স্পষ্টত দুই ভাগ হয়ে গেছেন শ্রমিক নেতারা। ১৫টি শ্রমিক সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত তোবা গ্রুপ শ্রমিক সংগ্রাম কমিটির বাইরে বড় একটি অংশ ধর্মঘটের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরাম ছাড়াও গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্ট, গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতি, বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, ওএসকে গার্মেন্টস এন্ড টেক্সটাইল শ্রমিক ফেডারেশন, গার্মেন্টস শ্রমিক মুক্তি আন্দোলন, বিপ্লবী গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতি, শ্রমজীবী সংঘ ধর্মঘটের পক্ষে রয়েছে। অন্যদিকে নৌ মন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বাধীন গার্মেন্টস শ্রমিক সমন্বয় পরিষদ ধর্মঘটের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এতে রয়েছে জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী লীগ, গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, সংগ্রামী গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, গার্মেন্টস টেক্সটাইল ফেডারেশন, জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনসহ ৩০টির বেশি গার্মেন্টস শ্রমিক সংগঠন।
ধর্মঘটের পক্ষে শ্রমিক নেতা কাজী রুহুল অমিন বলেন, শনিবার ধর্মঘট পালিত হবে। বৃহস্পতিবার উত্তর বাড্ডা, মধ্য বাড্ডা, গাজীপুর চৌরাস্তা, কালিয়াকৈর এবং সাভারের বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকরা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে। অন্যদিকে গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি ইত্তেফাককে বলেন, ট্রেড ইউনিয়নের রীতি-নীতিকে অবজ্ঞা করে ধর্মঘট ডাকা হয়েছে। এই ধর্মঘট শ্রমিকদের স্বার্থে নয়। আমরা একে সমর্থন করতে পারি না।
জুলাইয়ের বেতন ১০ আগস্ট
রাজধানীর বিজিএমইএ ভবনে প্রেস ব্রিফিংয়ে শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু জানিয়েছেন, ১০ আগস্টের মধ্যে শ্রমিকদের জুলাই মাসের বেতন দিতে মালিককে বাধ্য করা হবে। এটি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ। মালিককে বলেছি, প্রয়োজনে টাকা বানাতে হবে। তিনি বলেন, ঈদের আগে বেতন না দেয়ায় শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে মালিকের বিরুদ্ধে শ্রম আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারতাম। কিন্তু তাতে শ্রমিকদের বেতন ঝুলে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এতে মালিক সুবিধা পেয়ে যেত। তিনি ধর্মঘট আহ্বানকারীদের উদ্দেশে বলেন, এমন কর্মসূচি নেবেন না যাতে শ্রমিকদের ক্ষতি হয়। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করবেন না।
তোবার মালিকের সঙ্গে নৌ-মন্ত্রীর বৈঠক
জুলাই মাসের বেতনের বিষয়ে নৌ পরিবহন মন্ত্রী ও বিজিএমইএ’র নেতৃবৃন্দের সঙ্গে তোবা গ্রুপের এমডি দেলোয়ার হোসেনের বৈঠক হয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী শাজাহান খান। তিনি বলেন, তোবা গ্রুপের মালিককে বলা হয়েছে, যেকোন উপায়ে ১০ আগস্ট শ্রমিকদের বেতন দিতে হবে। গ্যারান্টি দিচ্ছি, শ্রমিকদের টাকা আদায়ের জন্য যা যা করা দরকার, সব করব। প্রয়োজনে সম্পত্তি বিক্রি করে হলেও তাদের বেতন দিতে হবে। তাজরীন দুর্ঘটনার এক মামলায় তিনি কারাগারে ছিলেন। গত সোমবার রাতে তিনি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান।
বিজিএমইএ’র নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, আগামী রবিবার কীভাবে শ্রমিকদের জুলাই মাসের বেতন দেয়া যাবে তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ১০ আগস্ট শ্রমিকদের বেতন দেয়া হবে বলে আমরা আশা করছি।
