লাশের জন্য লাখ টাকার ক্ষতিপূরণ এখন প্রয়োজন নেই। শেষবারের জন্য শুধু প্রিয় মানুষটির মরা মুখখানা একবার দেখতে চাইছেন পদ্মা পাড়ে অপেক্ষারত নিখোঁজ লঞ্চযাত্রীদের স্বজনেরা। কিন্তু কোথায় লাশ! লাশের জন্য অপেক্ষার প্রহর যে ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে! স্বজনদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ। তাই প্রশাসনের উদ্ধার অভিযানের ওপর ভরসা না করে নিজেরাই লাশের সন্ধানে নেমেছেন তারা। নদীর ভাটি এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে লাশ উদ্ধার হচ্ছে দেখে স্বজনরা মাওয়া ঘাটে অপেক্ষা না করে লাশের সন্ধানে নদীতে ঘুরছেন। কেউ ট্রলারে, আবার কেউ নৌকায় করে নদীর বুকে বিশেষ করে ভাটি এলাকায় খুঁজে ফিরছেন প্রিয়জনের লাশ। তাদের একটাই আশা, ঘরে ফেরার সময় অন্তত স্বজনের লাশটি নিয়ে যেতে চান।
সোমবার কাওড়াকান্দি থেকে মাওয়া আসার পথে আড়াইশ’ যাত্রী নিয়ে পদ্মায় তলিয়ে যায় এম এল পিনাক-৬। দুর্ঘটনার চার দিন পার হলেও গতকাল বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত উদ্ধার করা যায়নি লঞ্চটি। কান্ডারী-২ জাহাজ বুধবার রাত ১২ টা থেকে বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত নদীতে অভিযান চালিয়েও লঞ্চটি শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। গতকাল পদ্মার ভাটি এলাকা থেকে আরো ১২ টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। এ নিয়ে মোট ৩৩ টি লাশ উদ্ধার হলো। এর মধ্যে ১৫ টি লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি ১৮টি লাশ মাদারীপুর জেলার শিবচরের পাঁচ্চর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রাখা হয়েছে বলে মাওয়া ঘাটে স্থাপিত মুন্সীগঞ্জ জেলা পুলিশের সাব-কন্ট্রোল রুম থেকে জানানো হয়েছে। তবে এখনও নিখোঁজ রয়েছেন ১০৪ হতভাগ্য লঞ্চযাত্রী।
এদিকে ডুবে যাওয়া লঞ্চ শনাক্তকরণের জন্য কান্ডারী-২ জাহাজের সাথে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের জাহাজ জরিপ-১০ বৃহস্পতিবার রাতেই মাওয়া পয়েন্টে পৌঁছার কথা। জাহাজের অধিনায়ক ক্যাপ্টেন মাসুদ জানান, রাত ৮ টার দিকে জাহাজটি চাঁদপুর পৌঁছতে পারে। এরপর সেখান থেকে মাওয়া পয়েন্টে যেতে হয়তো আরো ৬ ঘন্টা সময় লাগবে। তবে চাঁদপুরে জাহাজটি নোঙর করার পর সিদ্ধান্ত নেয়া হবে রাতেই তারা মাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিবেন কি না।
স্বজনদের চোখ নদীতে: মাওয়া ঘাটে তিনদিন অপেক্ষা করেও নিখোঁজ স্বজনের খোঁজ পাননি আলী জব্বার। শেষে ট্রলার ভাড়া করে গতকাল কাওড়াকান্দি থেকে চাঁদপুরের হাইমচর পর্যন্ত টানা ৬ ঘন্টা লাশের সন্ধান করেন তিনি। তার স্ত্রী জাহানারা বেগম ও দুই মেয়ে হালিমা আক্তার (১৮) ও তানজিমা (১০) নিখোঁজ রয়েছেন। নদীতে তার দৃষ্টি ছিল দূরে কোথাও লাশ ভাসছে কিনা। নদীতে ভাসমান কোন কিছু দেখলেই, সেটি ভাল করে পর্যবেক্ষণ করেন। যদি তার স্বজনের লাশ হয়!
পকেটে টাকা নেই। তারপরও আত্মীয়র কাছ থেকে টাকা ধার করে আলী জব্বার এই ট্রলার ভাড়া করেন। গতকাল মাওয়া ঘাটে আলী জব্বারের মামা ইদ্রিসের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। ইদ্রিস জানান, নারায়ণগঞ্জে দেওভোগে বাড়ি আলী জব্বারের। ঈদে শরীয়তপুরের জাজিরায় শ্বশুর বাড়িতে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ফেরার সময় এই দুর্ঘটনা ঘটে। তার ধারণা, আলী জব্বারের স্ত্রী ও দুই সন্তান এখন বেঁচে নেই। শেষ আশা হিসাবে লাশগুলো মিললেও মনকে সান্ত্বনা দেয়া যাবে। এ কারণে বৃহস্পতিবার সকালে মাওয়া ঘাট থেকে একটি ট্রলার ভাড়া করে কাওরাকান্দি পর্যন্ত যান জব্বার। কিন্তু প্রিয়জনের লাশ খুঁজে পাননি তিনি।
এদিকে দিনের আলোতে সন্ধানের পাশাপাশি রাতের আঁধারেও স্বজনরা লাশের সন্ধান চালাচ্ছেন। ট্রলারে চেপে হাতে টর্চ নিয়ে তারা লাশ খুঁজছেন নদীতে।
তিনদিন মাওয়া ঘাটে অপেক্ষার পর রানী বেগমের চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। নিখোঁজ স্বামীর জন্য এখন তার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। কিন্তু চোখ দিয়ে কোন জল ঝরছে না। চাঁদপুরের হাইমচর থেকে তিনি জানতে পারেন তার স্বামী সোহেল সরকার (৪৫) পিনাক-৬ এর যাত্রী হয়েছিলেন। লঞ্চ ডুবে যাওয়ার পর থেকে স্বামীর মোবাইল ফোনটি বন্ধ। গতকাল সকালে রানী একটি ট্রলারে যাত্রী হয়ে রওনা দেন কাওরাকান্দির উদ্দেশ্যে। এই ট্রলারে আরো অনেক নিখোঁজদের স্বজনরা যাত্রী হয়েছিলেন। তারাও খুঁজতে থাকেন নদীতে যদি তাদের স্বজনদের লাশ ভেসে থাকতে দেখেন। রানী বেগম জানান, স্বামীর শোকে তিনি খেতেও ভুলে গেছেন। লাশ উদ্ধারে চরম গাফিলতির অভিযোগ করেন তিনি।
আরো ১২ লাশ উদ্ধার: মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক সাইফুল হাসান জানান, গতকাল পদ্মার ভাটি এলাকা থেকে ১২ টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে ভোলা থেকে ৫, লক্ষ্মীপুরে ১, শরীয়তপুরে ৩ ও বরিশাল থেকে ৩ টি লাশ উদ্ধার হয়। ৫ টি লাশের পরিচয় মিলেছে। এরা হলেন ফরিদপুরের সদরপুরের আজিজ মাতবরের ছেলে আবু ইউসুফ (২২), বরিশালের বাকেরগঞ্জের হানিফ মাস্টারের ছেলে জাকির হোসেন জুলহাস (৩০), গাজীপুরের কাপাসিয়ার ইব্রাহিম হোসেনের মেয়ে ইসরাত জাহান মীম (১৪), লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের সায়েদুল হক জাজী (৫৫) ও কুমিল্লার বড়ুরার রুবেলের মেয়ে ফাইজা (৭)। এ পর্যন্ত উদ্ধার করা ৩৩ টি লাশের মধ্যে ১৫ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ায় তা স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
১৫ লাশ হস্তান্তর : মাওয়া ঘাটে পুলিশের স্থাপিত সাব-কন্ট্রোল রুমের দেয়া তথ্য অনুযায়ি, হস্তান্তর হওয়া ১৫টি মৃতদেহের পরিচয় হলো-মাদারীপুর জেলার শিবচরের দলিল লেখক নূরুল হকের মেয়ে নুসরাত জাহান হীরা (২২), আলম শেখের স্ত্রী হাসি বেগম (৩৮), নূরুল ইসলাম হাওলাদারের ছেলে মিজানুর রহমান (৩৫), হায়দার চৌকিদারের মেয়ে ইমা (১৮), রহিম মাতবরের মেয়ে ইপা আক্তার (১৪), রহিম মাতবরের দেড় বছরের সন্তান ইব্রাহিম ( দেড় বছর), ফরিদপুরের নগরকান্দার রিয়াজুল, আব্দুল হাই খলিফার মেয়ে রিতা আক্তার (২৫), ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার আজিজ মাতবরের ছেলে আবু ইউসুফ (২২), সদরপুর উপজেলার সাতরশি গ্রামের মো. রুবেলের মেয়ে ফাইজা, মানিকনগর গ্রামের মনির উদ্দিনের ছেলে জামাল (২৭), গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার ইব্রাহীম হোসেনের মেয়ে ইশরাত হোসেন মীম (১৪), বরিশালের বাকেরগঞ্জের শহীদুল ইসলাম জমাদ্দারের ছেলে জাহিদ হোসেন (১৫), হানিফ মাস্টারের ছেলে জাকির হোসেন জুলহাস (৪০) ও ঝালকাঠি জেলার কাঁকড়াদিয়ার লুত্ফুর রহমানের ছেলে ফাহাদুল করিম (২৪)।
মুন্সীগঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার (শ্রীনগর সার্কেল) মিয়া কুতুবুর রহমান জানান, পরিচয় পাওয়া মাত্র লাশ হস্তান্তর করা হচ্ছে। লাশ হস্তান্তরের সময় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে পাওয়া লাশ প্রতি ২০ হাজার টাকা প্রদান করা হচ্ছে।
কান্ডারী-২ এর অভিযান: ডুবে যাওয়া লঞ্চ শনাক্তকরণের জন্য বুধবার রাতেই মাওয়া পয়েন্টে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের উদ্ধারকারী জাহাজ কান্ডারী-২ পৌঁছে। রাত থেকে বিআইডব্লিউটিএ’র সন্ধানী জাহাজ, ফায়ার সার্ভিসের অগ্নি বিনাশ, অগ্নি শাসক, বিআইডব্লিউটিএ’র টাগ বোট তিস্তাসহ মোট ১৫টি জাহাজ কান্ডারী-২ এর সাথে লঞ্চ শনাক্তকরণ অভিযানে অংশ নেয়। বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত এই অভিযানে তেমন কোন তথ্য মিলেনি। লঞ্চ শনাক্তকরণের জন্য উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন ‘সাব-বটম প্রোফাইলার’ দিয়ে অনুসন্ধান কাজ চালাচ্ছে কান্ডারি-২ জাহাজ । যন্ত্রটি পানির নিচে মাটির উপরিভাগ থেকে ২০০ মিটার (কাঁদা ও মাটি) ও ১৮ মিটার (বালি মাটি) গভীরতায় অনুসন্ধান চালাতে সক্ষম।
ডুবে যাওয়া লঞ্চ শনাক্তকরণ অভিযানের সমন্বয় করছেন নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন নজরুল ইসলাম। তিনি সাংবাদিকদের জানান, ‘সাব-বটম প্রোফাইলার’ মেথডে মাটির নীচে অনুসন্ধান করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে প্রচন্ড স্রোতের কারণে ডুবে যাওয়া লঞ্চটি ভাটির দিকে যেতে পারে। এ কারণে ভাটির দিকেও তল্লাশি করা হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক নূরুল ইসলাম জানান, ফায়ার সার্ভিসের দুইটি জাহাজ থেকে নোঙর ফেলে নদীতে ডুবে যাওয়া লঞ্চটি শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তেমন কোন তথ্য মিলেনি। তবে ফায়ার সার্ভিসের ডুবরীরা বৃহস্পতিবার কোন অভিযান পরিচালনা করেনি। লঞ্চ শনাক্ত হওয়ার পর ডুবরী দিয়ে তল্লাশি করা হবে বলে জানা গেছে।
মামলার অগ্রগতি নেই : লঞ্চ ডুবে যাওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ৬ আসামির মধ্যে এখনও কেউ গ্রেফতার হননি। লঞ্চ ডুবে যাওয়ার পরদিন মঙ্গলবার মাওয়া ঘাটের পরিবহন পরিদর্শক জাহাঙ্গীর ভুঁইয়া বাদি হয়ে লঞ্চের মালিক বিএনপি নেতা আবু বক্কর সিদ্দিক কালু মিয়া, কাওড়াকান্দি ঘাট পরিচালনাকারী আব্দুল হাই সিকদার, পিনাক-৬ এর চালক নবীসহ ৬ জনকে আসামি করে মামলা করেন। লৌহজং থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন জানান, এখনও কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি।
স্বজন ও ঘাট শ্রমিকদের বিক্ষোভ : গতকাল লাশের সন্ধানে পদ্মার ভাটি অঞ্চলে মাদারীপুরের শিবচর, কাওড়াকান্দি ও শরীয়তপুরের সুরেশ্বরে স্বজনরা বিক্ষোভ করেন। লঞ্চডুবে যাওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় কাওড়াকান্দি ঘাটের ইজারাদার আব্দুল হাই সিকদারকে আসামি করার প্রতিবাদে শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেন। তারা বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের অপসারণের দাবিতে দুপুরে কাওড়াকান্দি ঘাট সংলগ্ন ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এতে কিছু সময়ের জন্য সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে।
বরিশাল অফিস জানায়, গতকাল মুলাদী উপজেলার আবুপুর সংলগ্ন নদী থেকে এক শিশু ও এক যুবকের (৩০) লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া মরদেহ দুটি মাওয়ায় কন্ট্রোল রুমে পাঠিয়েছে মুলাদী থানার পুলিশ। এছাড়া হিজলার মেঘনা নদীতে আরো ৩টি লাশ উদ্ধার অভিযান চলছে বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার একেএম এহসান উল্লাহ।
মেহেন্দিগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, উপজেলার চানপুর ইউনিয়নের ইলিশা নদী থেকে দুপুরে জিন্সের প্যান্ট পরিহিত এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। লাশের পকেটে থাকা আইডি কার্ড দেখে পরিচয় পাওয়া যায় লাশটি বাকেরগঞ্জের কৃষ্ণকাঠি গ্রামের আ. হামিদের ছেলে জাকির হোসেনের (৪৫)। তিনি এমভি পিনাক লঞ্চের হতভাগ্য যাত্রী ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভোলা দক্ষিণ প্রতিনিধি জানান, মেঘনা নদী থেকে গতকাল দুই নারী ও দুই পুরুষের মৃতদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের দাসেরহাট, মনপুরা উপজেলার হাজিরহাট ইউনিয়নের চরজংলা ও লামমোহন উপজেলার মঙ্গল সিকদার বাজারের বাতিলখাল সংলগ্ন মেঘনা নদী থেকে লাশগুলো উদ্ধার করা হয়। এসব মৃতদেহ ডুবে যাওয়া লঞ্চের নিখোঁজ যাত্রীদের হতে পারে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গোসাইরহাট (শরীয়তপুর) সংবাদদাতা জানান, গতকাল দুপুরে শরীয়তপুর জেলার গোসাইরহাটের কোদালপুর ও নলমুরির আবুপুর নামক স্থানে ৩টি লাশ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২ জন শিশু এবং ২৭ বছরের এক যুবক রয়েছেন। লাশগুলো পচে গলে গেছে। লাশগুলো এ্যাম্বুলেস যোগে কাওড়াকান্দি ঘাটে পাঠানো হয়েছে।
