ফের শস্যভাণ্ডার হবে দক্ষিণাঞ্চল ১০ বছরের মহাপরিকল্পনা

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০১৪, ২২:৪৫
এক সময়ের শস্যভাণ্ডারের দক্ষিণাঞ্চল আবারো শস্যের ভাণ্ডার হবে। এ অঞ্চলের খাদ্য চাহিদা পূরণ শেষে উত্পাদিত খাদ্যশস্য পৌঁছবে অন্য অঞ্চলেও। পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থা আরো আধুনিক হবে। গ্রামীণ মানুষের দুর্ভোগ কমবে, বাড়বে আয়। উন্নয়ন হবে জীবনযাত্রার। গ্রামীণ তথা দেশের এই স্বপ্নগুলো বাস্তবায়নে কাজ করছে সরকার। চারটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে পুরো দক্ষিণাঞ্চলের ওপর গবেষণা চালিয়ে কর্মপরিকল্পনাও তৈরি করেছে। কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী এ প্রসঙ্গে ইত্তেফাককে বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। সে সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে কৃষির সামগ্রিক উন্নয়ন করতে চাই। সরকারের এই পরিকল্পনাটির মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের ১৪টি জেলায় (বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালি, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনী, সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার) খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, দারিদ্র্য দূরীকরণ, জনগণের জীবনমান উন্নয়ন করা সম্ভব হবে। এজন্য উপকূলীয় অঞ্চলের এসব জেলায় কৃষি নির্ভর খাতসমূহের উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। যা দশ বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে। মহাপরিকল্পনাটির বাস্তবায়নে মোট ৫৭ হাজার ৮২৬ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। মোট চারটি পর্যায়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দশটি ক্ষেত্রে ২৬টি কর্মসূচির মাধ্যমে ৮৫টি প্রযুক্তিকৌশল চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে অগ্রাধিকারভুক্ত খাত হিসেবে ফসল, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ, পুষ্টি, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, পোল্ডার ব্যবস্থাপনা, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষি বাণিজ্য, কৃষি ঋণ এবং এর সঙ্গে সম্পৃক্ত জনশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি ইত্যাদি বিষয় চিহ্নিত করা হয়েছে। কৃষি, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ ও বন এবং পশু সম্পদ মন্ত্রণালয় এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট এবং ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ সকল বিভাগকে এ কাজে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলে অতিরিক্ত ৩০ লাখ টন খাদ্য শস্য উত্পাদন করা হবে। পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অনাবাদি জমি আবাদের উপযুক্ত হবে। উত্তরাঞ্চলে আবাদ হবে উচ্চ মূল্যের ফসল- তেলশস্য, ডাল। আর দক্ষিণাঞ্চলে অতি গুরুত্ব দিয়ে আবাদ হবে আউশ ও আমন। তবে অন্যান্য আবাদও হবে স্বাভাবিকভাবে। পরিকল্পনার অংশ হিসাবে, নদী-নালা, খাল-বিলের পানি দিয়ে আবাদ করা যায় এমন শস্য আবাদ করা হবে দক্ষিণাঞ্চলে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জমিতে লবণাক্ত পানি প্রবেশ, নদীর উজান থেকে পানি প্রবাহ কমে যাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ, স্লুইস গেট ও পোল্ডার এর দুর্বল ব্যবস্থাপনা, কৃষি জমি অনাবাদিসহ ১৪ ধরনের চ্যালেঞ্জ দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি উত্পাদনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। ঝুঁকিপূর্ণ কৃষি এ অঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তাকে সবসময় অনিশ্চয়তার বেড়াজালে আবদ্ধ রেখেছে। তবে এতসব সমস্যার মধ্যেও ধান উত্পাদন বেড়েছে, বেড়েছে খাদ্য নিরাপত্তা। অনাবাদি ও পতিত জমি আবাদের আওতায় এনে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিকে আরো এগিয়ে নেয়ার জন্য সরকারের এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি বলে মনে করছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা। তথ্য অনুযায়ী, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে রয়েছে মোট জমির ২৭ ভাগ। আর জনসংখ্যা ২১ ভাগ। বাংলাদেশের আবাদি জমির প্রায় এক তৃতীয়াংশও দেশের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত। কিন্তু শস্য ঘনত্ব (বছরে যে কয়টি ফসল করা হয়) উত্তরাঞ্চলের চেয়ে কম। যেখানে সারাদেশের শস্য ঘনত্ব ১৭৬ ভাগ, সেখানে দক্ষিণাঞ্চলের শস্য ঘনত্ব ১৫৯ ভাগ। আর এ অঞ্চলে অনাবাদি ১৫ শতাংশ জমি। এ কারণে দক্ষিণাঞ্চলের শস্য উত্পাদন বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। প্রধান সমস্যা লবণাক্ততা দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান সমস্যা লবণাক্ত মাটি। ক্রমশ লবণাক্ত এলাকা ছড়িয়ে পড়ছে। এ কারণে আবাদের পরিকল্পনাও পরিবর্তন করছে কৃষকরা। কৃষকরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে উত্পাদন স্বাভাবিক রাখার জন্য, সফলও হচ্ছে। কৃষকদের চেষ্টার সাথে যোগ হয়েছে সরকারের নানামুখী উদ্যোগ । ব্রি ধান ৪৭ ও বিনা ধান ১০ এ অঞ্চলের কৃষককে আশার আলো দেখিয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গম, সূর্যমুখীসহ একাধিক লবণসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনের জন্য কৃষি বিজ্ঞানীদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১৯৭৩ সালে দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ত জমির পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৩৩ হাজার হেক্টর। ২০০৯ সালে তা বেড়ে হয় ১০ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর। নতুন এলাকা বিস্তৃত হয়েছে ২৬ দশমিক ৭ শতাংশ। দক্ষিণাঞ্চলের পিরোজপুর জেলায় ১৯৭৩ সালে ২১ হাজার ৩শ’ হেক্টর জমি লবণাক্ত ছিল। ২০০০ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ২৮ হাজার হেক্টরে। ২০০৯ সালে ৩৫ হাজার ৮শ’ হেক্টরে। ঝালকাঠিতে ১৯৭৩ সালে কোন লবণাক্ত জমি ছিল না। ১৯৭৩ সালের ৩ হাজার ৫শ’ হেক্টর জমি লবণাক্ত হয়ে পড়ে। ২০০৯ এ মাত্রা বেড়ে হয় সাড়ে ৪ হাজার হেক্টর। বরিশালে ১৯৭৩ সালে কোন জমি লবণাক্ত ছিল না। ২০০০ সালে ১০ হাজার ৮২০ এবং ২০০৯ সালে ১৩ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমি লবণাক্ত হয়। ভোলায় ২০০৯ সালে লবণাক্ত জমির ছিল পরিমাণ সাড়ে ৯৪ হাজার হেক্টর জমি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, লবণের তিব্রতা বাড়ছে দশমিক ৭৪ শতাংশ। বরিশাল মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, গত ফেব্রুয়ারিতে ভোলায় ৬ দশমিক ৬৫ ডিএস/মি মাত্রার, মার্চে ১২ দশমিক ৫ মাত্রার, এপ্রিলে ১৩ দশমিক ৫ মাত্রার লবণ পাওয়া গেছে। লবণাক্ত মাটি মোকাবিলা করে উত্পাদন অব্যাহত রাখার জন্য কৃষকরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। ব্রি ধান ৪৭ ও বিনা ধান ১০ আবাদ করছে কৃষকরা। তবে সব কৃষক আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার না করায় প্রত্যাশা অনুযায়ী ফলন পাওয়া যাচ্ছে না। কৃষি সচিব ড. এস এম নাজমুল ইসলাম বলেন, আমরা উত্তরাঞ্চলে উচ্চ মূল্যের শস্য যেমন তেল, ডাল শস্য বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছি। আর দক্ষিণাঞ্চলে আবাদের জন্য গুরুত্ব দেয়া হয়েছে আউশ ও আমন। কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেন, আমরা মানুষের খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে চাই। এ কারণেই আমাদের সকল পরিকল্পনা। মন্ত্রী বলেন, শুধু বর্তমানে কৃষি উন্নয়ন ও চাহিদার দিকে তাকালেই হবে না। আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্মের কথা ভেবে সে অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করতে হবে। অনাবাদি ও পতিত জমি রাখা যাবে না। তিনি বলেন, ১ কেজি ধান উত্পাদনে ২ হাজার ৩শ’ লিটার পানি প্রয়োজন। এই পানি মাটির গভীর থেকে এনে সেচ দিলে তাতে খরচ বৃদ্ধি পায়। অগভীর উত্স থেকে পানি ব্যবহারের মাধ্যমে শস্য উত্পাদনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, আমাদের প্রতিদিন ১ লাখ টন চাল লাগে। সে অনুযায়ী, বছরে চাল লাগে ৩ কোটি ৬৫ লাখ টন। এই চাল আমাদের উত্পাদন করতে হচ্ছে। প্রতিনিয়ত লোক বাড়ছে। তাই সীমিত জমিতে ফলন বৃদ্ধি করতে হবে। এ কারণে আমরা নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছি।