নতুন ভ্যাট আইন নিয়ে ফুঁসছে ব্যবসায়ী সমপ্রদায়। এই আইনে ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত না করায় অর্থমন্ত্রীকে তা বাতিলের জন্য অনুরোধ জানিয়েছে এফবিসিসিআই। তাদের মতে, নতুন আইনে যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তা বর্তমান আইনে সংশোধন করেই করা যায়। তাই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত পূরণে নতুন আইন প্রণয়ন না করার অনুরোধ জানিয়েছে এফবিসিসিআই।
এদিকে ভ্যাটের নামে জনগণের পকেট থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। ভ্যাটের মূলনীতি থেকে সরে এসে সরকার অধিক হারে রাজস্ব আদায়ের দিকেই বেশি মনোযোগী হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, কোন পণ্য বা সেবার বিপরীতে যে পরিমাণ মূল্য সংযোজিত হবে, তার ওপরই ভ্যাট প্রযোজ্য হবে। কিন্তু এখন ঢালাও ভাবে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় করা হচ্ছে। এফবিসিসিআই সূত্র মতে, একশ’ টাকার কোন পণ্যের ওপর যদি বিশ টাকা মূল্য সংযোজন হয়ে থাকে, তবে ঐ বিশ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপিত হবে। কিন্তু সেটি না করে মোট মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট কর্তন করা হচ্ছে। যা নীতিবিরুদ্ধ এবং জনগণের সঙ্গে প্রতারণার সামিল।
প্রসঙ্গত, আইএমএফের চাপে নতুন ভ্যাট আইন প্রণয়ন করে সরকার। আগামী এক জুলাই ২০১৫ থেকে এই আইন কার্যকর করা হবে। এই আইনে এফবিসিসিআইর সুপারিশ উপেক্ষা করায় এফবিসিসিআইর সদস্যরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তারা সংগঠনের সভাপতির কাছে তাদের ক্ষোভ জানানোর পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখেছেন এফবিসিসিআই সভাপতি। এফবিসিসিআই মনে করে আইএমএফ’র কাছ থেকে ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ (বর্ধিত ঋণ সুবিধার আওতায়) নেয়ার শর্ত হিসেবে এ আইন করা হচ্ছে। শুধু শর্ত পূরণের জন্য দেশের সর্বস্তরের ব্যবসায়ীরা গত ২৩ বছর ধরে যে আইনের সাথে অভ্যস্ত সে আইনের পরিবর্তে নতুন আইন প্রণয়ন করা বাস্তবসম্মত নয়। তাছাড়া এই আইন প্রণয়নে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। যদিও অর্থমন্ত্রী এফবিসিসিআইর চিঠির জবাবে বলেছেন, নতুন ভ্যাট আইন নিয়ে ২০০৯ সাল থেকে ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করা হয়েছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীদের দাবি, তাদের সাথে আলোচনা করলেও তাদের কোন সুপারিশ এতে প্রতিফলিত হয়নি। উল্লেখ্য, সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ভ্যাট পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় এর তীব্র সমালোচনা করেছিলেন আবুল মাল আবদুল মুহিত।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন ভ্যাট আইনে ভ্যাট আদায়ের পরিধি ব্যাপকতর করা হয়েছে। এ আইনে আমদানি, উত্পাদন, ব্যবসায়ী পর্যায় এবং সেবা ছাড়াও ইমমুভেবল অ্যাসেট, লিজ, গ্রান্ট, লাইসেন্স, পারমিট, রাইট, ফ্যাসিলিটি ইত্যাদির উপর মূসক আরোপ করা হয়েছে। ফলে নতুন মূসক আইনে মূসকের ভিত্তি সম্প্রসারিত হয়েছে। এফবিসিসিআই মনে করে, মূসকের ভিত্তি সম্প্রসারিত করার জন্য নতুন করে মূসক আইন প্রচলন করার প্রয়োজন নেই। বর্তমানে কার্যকর মূসক আইনের ধারা-৩ (মূল্য সংযোজন কর আরোপ)তে অন্তর্ভুক্ত করলেই মূসকের ভিত্তি সম্প্রসারিত হয়ে যাবে।
নতুন মূসক আইনে সর্বমোট প্রাপ্তির উপর মূসক আরোপের পরিবর্তে বিনিময় মূল্যের উপর মূসক আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু বিনিময় মূল্যের উপর মূসক আরোপ করতে হলে নতুন করে একটি আইন প্রবর্তন করার কোন প্রয়োজন নেই। বর্তমানে কার্যকর মূসক আইনের ধারা ৫ (মূল্য সংযোজন কর ধার্যের জন্য মূল্য নিরূপণ) এ বিনিময় মূল্য অন্তর্ভুক্ত করলেই বিনিময় মূল্যের ভিত্তিতে মূসক আদায় করা যাবে। নতুন মূসক আইনে মূল্য ঘোষণা দাখিল করার বিধান নেই। কিন্তু মূসক ব্যবস্থা থেকে মূল্য ঘোষণা রহিত করার জন্য নতুন করে মূসক আইন প্রণয়ন করার কোন প্রয়োজন নেই। বর্তমান আইনের ধারা ৫ এবং বিধি-৩ এর মূল্য ঘোষণা সংক্রান্ত বিধান সংশোধন করাই যথেষ্ট।
বর্তমানে প্রচলিত মূসক আইনে সংকুচিত ভিত্তিমূল্য কার্যকর রয়েছে। নতুন মূসক আইনে সংকুচিত ভিত্তিমূল্যের বিধান নেই। সব পণ্য ও সেবার উপর ১৫ শতাংশ হারে মূসক আরোপিত হবে। যা আন্তর্জাতিক রীতি-নীতির সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে প্রচার করা হচ্ছে। অথচ চীন, জাপানসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একাধিক হারে মূল্য সংযোজন কর আরোপিত আছে। আমাদের দেশের মূসক ব্যবস্থায় রেয়াত গ্রহণে নানা ধরনের জটিলতা, ম্যানুয়্যাল হিসাব পদ্ধতি, মূসক প্রশাসনে দুর্নীতি ইত্যাদি নানা কারণে সংকুচিত ভিত্তিমূল্য একটি রাজস্ব-বান্ধব ও ব্যবসা-বান্ধব পদ্ধতি। তাছাড়া বর্তমান মূসক ব্যবস্থা থেকে সংকুচিত ভিত্তিমূল্য উঠিয়ে দিতে হলেও নতুন করে আইন করার কোন প্রয়োজন নেই। বর্তমানে প্রচলিত মূসক আইনের ধারা ৫ এর উপ-ধারা (৪) এর শতাংশ বিলোপ এবং সংকুচিত ভিত্তিমূল্য সংক্রান্ত এসআরও বাতিল করলেই সংকুচিত ভিত্তিমূল্য বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
বর্তমানে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে সরবরাহের সময় মূসক পরিশোধ করতে হয়। আর সেবার ক্ষেত্রে পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে দাখিলপত্র দাখিল করার সময় মূসক পরিশোধ করতে হয়। নতুন মূসক আইনের মাধ্যমে সকল ক্ষেত্রে পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে দাখিলপত্র দাখিল করার সময় মূসক পরিশোধের বিধান করা হয়েছে। এ সংস্কারের জন্য আইন পরিবর্তন করার কোন প্রয়োজন নেই। বর্তমান আইনের ধারা ৬ সংশোধন করে এই সংস্কার সাধন করা যায়।
এফবিসিসিআই বলছে, নতুন মূসক আইনে প্রত্যর্পণ প্রদানের পদ্ধতি সহজ ও ব্যাপকভিত্তিক হবে বলে বলা হচ্ছে। কিন্তু নতুন মূসক আইন পর্যালোচনা করে এমন কোন বিষয় দেখা যায়নি বরং নতুন মূসক আইনে প্রত্যর্পণ পদ্ধতি বিকেন্দ্রীভূত করা হয়েছে যার ফলে জটিলতার সৃষ্টি হবে বলে বেসরকারি খাত মনে করে। নতুন মূসক আইনে প্রত্যর্পণ প্রদানের ক্ষমতা কমিশনারদের উপর ন্যস্ত করা হয়েছে। এর ফলে প্রত্যর্পণ প্রদান সহজ হবে বলে আমরা মনে করি না। বর্তমানে রিফান্ড দেয়ার ক্ষমতা কমিশনারদের উপর অর্পিত রয়েছে। কিন্তু এর ফলে রিফান্ড প্রদান সহজ হয়নি।
নতুন মূসক আইনে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কিস্তিতে কর পরিশোধ করার বিধান করা হয়েছে। তাই এই আইনকে ব্যবসা-বান্ধব বলা হচ্ছে। কিস্তিতে কর পরিশোধের বিধান বর্তমান আইনেও অন্তর্ভুক্ত করা যায়। নতুন আইনে ব্যবহূত পণ্য বিক্রিও মূসকের আওতায় আনা হয়েছে। এসব বিষয় বর্তমান আইন সংস্কার করেই অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। এদিকে নতুন মূসক আইনের আওতায় জাতীয় বোর্ড অটোমেশন কার্যক্রম শুরু করেছে। এই অটোমেশনের সাথে কোন পর্যায়ে বেরসরকারি খাতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। পিএসআই ব্যবস্থাসহ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আওতায় বড় ধরনের সব কাজে প্রাইভেট সেক্টরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস অটোমেশনে প্রাইভেট সেক্টর প্রচুর অবদান রেখেছে। কিন্তু এফবিসিসিআইর দাবি, অজ্ঞাত কারণে মূসক অটোমেশনে বেসরকারি খাতকে সম্পূর্ণরূপে অগ্রাহ্য করা হয়েছে।
এফবিসিসিআই সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ অর্থমন্ত্রীর কাছে সুপারিশ করেছেন, নতুন মূসক আইন বাস্তবায়নে করদাতাদের মধ্যে একটি জরিপ পরিচালনা করা যেতে পারে। জরিপে যদি নতুন মূসক আইনের প্রতি করদাতাদের আগ্রহ দেখা না যায় তবে তা বাতিল করা যেতে পারে। নতুন মূসক আইনের ইতিবাচক দিকগুলো বর্তমানে প্রচলিত মূসক আইনে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে সংস্কার করার লক্ষ্যে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। কমিটিতে বেসরকারি খাতের পক্ষে এফবিসিসিআইসহ অন্যান্য স্টেক হোল্ডারদের অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
