জামায়াত নিষিদ্ধের আইন থেকে সরছে না সরকার

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০১৪, ২২:৪৯
জামায়াত নিষিদ্ধের আইন থেকে সরে আসছে না সরকার। এ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস আইন ১৯৭২ এর চতুর্থ দফার সংশোধন বিল শিগগিরই মন্ত্রিসভার বৈঠকে উঠবে। খসড়া বিলে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত সংগঠনকে নিষিদ্ধ এবং নিজ নামে বা অন্য কোন নামে ভবিষ্যত্ কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালকে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছেন, খসড়া প্রস্তুত, মন্ত্রিসভার শিডিউল পেলে তা উত্থাপিত হবে। তিনি বলেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুসারে মানবতাবিরোধী অপরাধী দল হিসাবে জামায়াতের বিচার হতে হবে। ১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস আইন প্রণয়ন করা হয়। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে প্রথম এই আইনে ব্যাপক সংশোধন করা হয়। ২০১২ সালে দ্বিতীয় সংশোধনীতে আসামির অনুপস্থিতিতে তাকে পলাতক ঘোষণা করে বিচার এবং এক ট্রাইব্যুনাল থেকে আরেক ট্রাইব্যুনালে মামলা স্থানান্তরের বিধান যুক্ত করা হয়। এরপর সংশোধনী আনা হয় ২০১৩ সালে। ওই বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। তখন তার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে গড়ে ওঠে গণজাগরণ মঞ্চ। ওই সময়ের আইনে ট্রাইব্যুনালের যে কোন দণ্ডের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের সুযোগ ছিল না। তবে ট্রাইব্যুনাল যদি কাউকে খালাস দেন সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের সুযোগ রয়েছে। গণজাগরণ মঞ্চের দাবির প্রেক্ষিতে ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দিয়ে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষেরও আপিলের সুযোগ রেখে ওই বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি আইনটির তৃতীয় সংশোধনী আনা হয়। ওই সংশোধনীতে ব্যক্তির পাশাপাশি সংগঠনের বিচারের ক্ষমতা ট্রাইব্যুনালকে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বিচার করতে দিলেও শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা সুনির্দিষ্ট ছিল না। এ পরিস্থিতিতে গত বছরের ১ আগস্ট জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে দেয়া হাইকোর্টের রায়ে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম (বর্তমানে ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান) সংগঠনের বিচারের ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালস আইনের দুর্বলতা নিয়ে পর্যবেক্ষণ দেন। এতে বলা হয়, ‘মূল আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য কোন দল বা গোষ্ঠীকে বিচারের সম্মুখীন করার বিধান করা হলেও কোন দল মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত হলে তাকে কী ধরনের দণ্ড ও সাজা প্রদান করা হবে, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কিছু উল্লেখ নেই। আমার নিঃসংকোচ অভিমত এই যে, ওই আইনে মানবতাবিরোধী কোন দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে, সেই দলের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের দণ্ড আরোপের বা গৃহীত ব্যবস্থা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট বিধান করা প্রয়োজন।’ এদিকে ট্রাইব্যুনাল আইনে সংগঠনের শাস্তির বিধান না থাকলেও তদন্ত সংস্থার পক্ষ থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধী সংগঠন হিসেবে জামায়াতকে দোষী সাব্যস্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। শাস্তির বিধান না রেখে এ ধরনের অভিযোগপত্র দেয়ার আইন সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের অনেকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। খোদ আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও বলেন, বিদ্যমান আইনে জামায়াতের বিচার করা সম্ভব নয়। আইনমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার পর মানবতাবিরোধী অপরাধী সংগঠনের বিচারে বিদ্যমান আইনের সংশোধনের উদ্যোগ নেন আনিসুল হক। আইনের একটি খসড়াও প্রণয়ন করা হয়। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিফেন জে. র্যাপ পঞ্চম বারের মত ঢাকা সফরে আসেন। গত মঙ্গলবার তিনি এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামী বা কোন দল, সংগঠনের বিচার চায় না যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধাপরাধী হিসাবে ব্যক্তির বিচার করা উচিত, কোন দলের নয়। র্যাপের এই অভিমতের পরেও জামায়াত নিষিদ্ধের আইন থেকে সরে আসছে না সরকার। এ প্রসঙ্গে গতকাল আইনমন্ত্রী ইত্তেফাককে বলেন, মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের দল হিসাবে অবশ্যই জামায়াতের বিচার হতে হবে। র্যাপের মন্তব্য সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি তার নিজস্ব মত। আমরা অগ্রসর হব বাংলাদেশের জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী। আইন মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, খসড়ায় বিদ্যমান আইনের ১০টি ধারায় সংশোধনের প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে সাতটি ধারায় কেবল ব্যক্তি শব্দের পাশাপাশি সংগঠন শব্দটি বসেছে। খসড়ার ২০ ধারার ২ উপধারায় বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনাল দোষী সাব্যস্ত সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করবেন এবং এর নিজ নামে বা অন্য কোন নামে ভবিষ্যত্ কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবেন। পাশাপাশি মামলার বিষয়বস্তু সাপেক্ষে সংগঠনটির সদস্যদেরও ট্রাইব্যুনাল সাজা দিতে পারবেন। বিদ্যমান আইনের ২০ নং ধারায় কেবল ব্যক্তির সাজার বিধান রয়েছে। খসড়ায় ৪ নং ধারা সংশোধনের প্রস্তাব করে বলা হয়েছে, কোন সংগঠনের কার্যনির্বাহী কমিটি অথবা কেন্দ্রীয়, আঞ্চলিক বা স্থানীয় কমিটির সদস্য যদি অপরাধ করেন, তবে ওই অপরাধের জন্য সদস্যের পাশাপাশি সংগঠনও দায়ী হবে। ১০ ধারায়ও একটি পরিবর্তন আনা হচ্ছে। খসড়া অনুসারে, সংগঠনের বিরুদ্ধে মামলার বিচারের ক্ষেত্রে অন্যান্য মামলার মতই ট্রাইব্যুনাল তার কার্যপ্রণালি বিধিমালা অনুসারে অভিযোগ গঠন, দোষী সাব্যস্তকরণ ও রায় ঘোষণা করবেন।