ব্যাঙ

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০১৪, ১৯:৩০
ইংরেজি নাম ঃ ফ্রগ(ঋত্ড়ম) স্থানীয় নাম ঃ ব্যাঙ বৈজ্ঞানিক নাম ঃ Rama tigrana বিষ্ণু দাশ,গবেষক ব্যাঙের বর্ণনা : ব্যাঙ একটি প্রাণিজাতীয় প্রকৃতির উপাদান। এরা জলে ও স্থলে বাস করতে পারে। এ জন্য এদেরকে উভচর প্রাণী বলে। স্বভাবগত দিক থেকে এরা নিরীহ প্রাণী এবং জলাশয়ের ছায়াযুক্ত স্থানে লতাপাতা আড়ালে নিজেদেরকে লুকিয়ে রাখতে ভালোবাসে। এদের মধ্যে কেউ গাছে, কেউ ঘরের কোনে, কেউ স্থলে আবার কেউ উভয় স্থলে বাস করে। তবে মাংসের পরিমাণ ও ব্যাঙের আকৃতিগত দিক থেকে রানা টিগরানা প্রজাতির ব্যাঙই চাষের জন্য উপযুক্ত। কিন্তু এমন কিছু প্রজাতির ব্যাঙ আছে যেগুলো অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ও বিষাক্ত। এ ধরনের ব্যাঙ আমাদের দেশে পাওয়া যায় না । এ সকল বিষাক্ত ব্যাঙের মধ্যে পশ্চিম কলম্বিয়ায় ফিলোবেটস টেরিবিলস (হলুদ রঙের ব্যাঙ), ইকুয়েডরের জঙ্গলের পেজেবেটস ট্রাইকালার. মধ্য ও উত্তর-দক্ষিণ আমেরিকার ড্রেনডাবেটস আরাটাস অন্যতম। এসব ব্যাঙের কোনো কোনোটির আকার বিশাল আবার কোনোটি দু- থেকে তিন ইঞ্চি। এসব প্রজাতির ব্যাঙের কাছ থেকে অন্যান্য পশু-পাখি সব সময়ই সাবধান থাকে। এসব বিষাক্ত ব্যাঙের শরীর থেকে এক ধরনের উজ্জ্বল আলো বের হয়, যা নিয়ন বাতির মতো। সেই আলো দেখেই সতর্ক হয়ে যায় অন্যান্য জীবজন্তু। অকৃতিগত দিক থেকে ব্যাঙের চারটি পা, দুইটি চোখ , দুইটি নাসারান্দ্র বিদ্যমান। এদের সম্মুখের পা পিছনের পা থেকে ছোট । ফলে এরা সহজেই লাফিয়ে চলতে পারে। দেহের ত্বক খসখসে এবং আচিলে আবৃত। এদের ঘারের কাছে একটি বিষ থলি থাকে। এ বিষ থলির সাহায্যে এরা আত্মরক্ষা করে থাকে। ব্যাঙের খাদ্য :ব্যাঙ সাধারণত পোকা-মাকড়ভোজী, জলজ প্রাণী হিসেবে ছোট ছোট মাছের পোনাও এরা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। এছাড়াও এদের মধ্যে স্বভোজী-স্বভাবও পরিলক্ষিত হয়। কখনো কখনো বড় আকারের ব্যাঙ ছোট ব্যাঙ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। এরা মাছের পোনা খেতে অতি পছন্দ করে। ব্যাঙ রাতে খাবারের জন্য জলাশয়ের আশে পাশের মাঠ, খেত খামার প্রভৃতি স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। এরা সম্পূর্ণভাবে শুষ্কস্থানে বাস করতে পারে না। আবার তাপমাত্রা নিচে নেমে (২৫০ সেলসিয়াসের কম) গেলে এরা শীত নিদ্রায় চলে যায়। এ কারণেই শীতকালে ব্যাঙকে সহজে কোথাও চোখে পড়ে না। সাধারণত ব্যাঙ নতুন পানিতে মে মাস থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত প্রজনন ক্রিয়া সম্পন্ন করে থাকে। এরা পুরাতন পানিতে প্রজনন করে না। তবে বৃষ্টির প্রথম দিকে বেশি পরিমাণ ডিম ছাড়ে। ডিম ফুটে ব্যাঙাচি জন্ম লাভ করে এবং ধীরে ধীরে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়ে পূর্ণবয়ষ্ক হয়। ব্যাঙ বাংলাদেশের একটি অবহেলিত প্রাকৃতিক সম্পদ। যদিও ব্যাঙ আমাদের দেশে খাদ্য হিসেবে ব্যবহূত হয় না। তবুও ব্যাঙের পা রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। কেননা চীন, বার্মা, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের খাবার টেবিলে ব্যাঙের পা প্রথম শ্রেণির খাবার হিসেবে সমাদৃত। এ সকল দেশে এ প্রাণীটির সংরক্ষণ, কৃত্রিম উপায় চাষ প্রভৃতি বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে ও চলছে। ব্যাঙের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ব্যাঙ ফসল ক্ষেতের পোকামাকড় খেয়ে ফসলের অনেক উপকার করে। এ কারণে অধিক পরিমাণে কীটনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। কৃষি জমিতে ব্যাঙ মলমূত্র ও দেহাবশেষ পঁচে মাটির উর্বরতা শক্তি এবং ফসলের উত্পাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। শস্য ক্ষেতের ঘাস ফড়িং, সবুজ পাতা ফড়িং, বাদামী গাছ ফড়িং, পামরী পোকা এবং হলুদ মাজরা পোকা খেয়ে উপকার করে থাকে। মশা ও ছোট ছোট ক্ষতিকর জীবন্ত জীব খেয়ে জনজীবনের উপকার করে। ব্যাঙ জীব বৈচিত্র রক্ষাসহ পরিবেশের ভারসাম্যরক্ষায় গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে অধিকাংশ জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করার কারণে উপকারী ব্যাঙ সর্বত্র হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের মাধ্যমে এদের আবাসস্থল ধ্বংস করে চলেছি । ফলস্বরূপ এরা প্রতিনিয়ত এ পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে পৃথিবীর বুক থেকে ৩৬ প্রজাতির ব্যাঙ হারিয়ে গেছে। এখনই যদি আমরা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নিতে পারি তাহলে এরাও একদিন পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে যাবে। পৃথিবীতে ব্যাঙ সংরক্ষণের উপর গুরুত্ব দিয়ে ‘ সেভ দ্য ফ্রগস ডে’ নামক একটি দিবস পলন করা হয়। যদিও এ দিবসটি জাতিসংঘের স্বীকৃতি প্রাপ্ত নয়। গত ৬ বছর ধরেই পালন করা হচ্ছে এ দিবস । ২৩টি দেশের ১৪০টি স্থানে এই দিবসটি পালন করা হচ্ছে। । মূলত ব্যাঙ রক্ষায় বিশ্ববাসীর মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যেই এ আয়োজন। আমাদের কৃষি বান্ধব ব্যাঙকে রক্ষা করা অতিব প্রয়োজন।