সারাদেশে গার্মেন্টসে আজ ধর্মঘট আহ্বান

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০১৪, ২২:৫১
দেশের সব গার্মেন্টস শিল্পাঞ্চলে আজ শনিবার পূর্বঘোষিত ধর্মঘটের কর্মসূচি রয়েছে। তোবা গ্রুপের শ্রমিকদের ৫ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ‘তোবা গ্রুপ শ্রমিক সংগ্রাম কমিটি’ এই ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়েছে। গতকাল এই কমিটির সদস্যরা এক বৈঠকে ধর্মঘট কর্মসূচি বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাজধানীর বাড্ডার হোসেন মার্কেটে তোবা গ্রুপের কারখানা থেকে শ্রমিক নেত্রী মোশরেফা মিশুসহ সব শ্রমিকের উপর হামলা করে পুলিশ। জোর করে বের করে দেয়ার পর তাত্ক্ষণিক বৃহস্পতিবার থেকেই অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন মিশু। অবশ্য ওই দিন বিকালে তোবা গ্রুপ শ্রমিক সংগ্রাম কমিটি এক সমাবেশ করে শনিবার এই ধর্মঘট পালনের ঘোষণা দেন। ধর্মঘটের বিষয়ে গতকাল মোশরেফা মিশু ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, আগামী কাল (আজ শনিবার) সরকার দমননীতি চালালে পাল্টা কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবো। তিনি বলেন, শুনলাম তোবা’র শ্রমিকদের নামে মামলা হয়েছে। সত্যি সত্যি সরকার এ পথে হাঁটলে আমরা ছাড়বো না। একই সঙ্গে শ্রমিকদের সব পাওনা দেয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, বেতন দেয়ার কথা বলা হলেও শ্রমিকদের ওভারটাইম ও বোনাসের কথা বলা হচ্ছে না। শ্রমিকদের সব পাওনা দিতে হবে। মিশু বলেন, এ মুহূর্তে আমাদের তিনটি দাবি রয়েছে। আগামীকালের (আজ শনিবার) মধ্যেই বেতন-বোনাস ও ওভারটাইম পরিশোধ করতে হবে, তোবার সব কারখানা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে চালু রাখতে হবে। তোবার কিছু শ্রমিকের নামে মামলা হয়ে থাকলে তা প্রত্যাহার করতে হবে। এছাড়া গতকাল পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনেও পুলিশ বাধা দিয়েছে এবং বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের উপর হামলা করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। সাভারে ধর্মঘটের সমর্থনে মিছিল করেছে একটি শ্রমিক সংগঠন। তারা বিক্ষোভ কর্মসূচির প্রস্তুতি নিলেও পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। অন্যদিকে চট্টগ্রামের দেওয়ানহাট মোড়ে ৫টি শ্রমিক সংগঠন বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম প্রতিনিধি। ধর্মঘটে সাধারণ শ্রমিকদের সমর্থন নেই বলে জানিয়েছে বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম। তিনি ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, তোবা’র শ্রমিকদের দুই মাসের বেতন দেয়া হয়েছে। রবিবার আরো এক মাসের বেতন দেয়ার জন্য আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আন্দোলন করার কোন যুক্তি দেখি না। দেশের অর্থনীতিতে গার্মেন্টস শিল্পের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, এই খাত অর্থনীতির প্রাণভোমরা। এটি রক্ষার দায়িত্ব সবার। তিন মাসের বকেয়া বেতনের দাবিতে ঈদের আগের দিন থেকে বাড্ডায় হোসেন মার্কেটে টানা অনশন পালন করে আসছিলেন শ্রমিকরা। সরকারের চাপে বিজিএমইএ ভবনে দুই মাসের বেতন দেয়ার সিদ্ধান্ত হলেও শ্রমিকরা তা প্রত্যাখ্যান করেন। তারা দাবি করেন, তাদের তিন মাসের বেতন, বোনাস ও ওভারটাইমের টাকা কারখানায় গিয়ে দিতে হবে। তাদের এই আন্দোলনে সমর্থন দেন বাম ঘরানার ১৫টি শ্রমিক সংগঠন। এসব সংগঠনের সমন্বয়ে তোবা গ্রুপ শ্রমিক সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার পুলিশ আন্দোলনকারীদের উপর চড়াও হয়। অনশনরত শ্রমিকদের লাঠিপেটা করে কারখানা থেকে বের করে দেয়ার অভিযোগ উঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। এছাড়া সেখানে কাঁদানে গ্যাস ও পিপার সেপ্র ছিটানো হয়। সেখান থেকে শ্রমিক নেত্রী মোশরেফা মিশুসহ তিন জনকে আটক করা হয়। এর প্রতিবাদে আজ ধর্মঘটের ঘোষণা দেয়া হয়। আজকের ধর্মঘটের সফলতার বিষয়ে মোশরেফা মিশু বলেন, যারা সরকার এবং বিজিএমইএ’র দালাল শ্রমিক সংগঠন বাদে বেশিরভাগ শ্রমিক সংগঠন এই কর্মসূচির পক্ষে রয়েছে। তবে পোশাক শ্রমিকদের কল্যাণে কাজ করা ১৫ টি প্রকৃত শ্রমিক সংগঠনের আহবানে শ্রমিকরা ধর্মঘট পালন করবে। কাল ধর্মঘট শেষে আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানান তিনি। ধর্মঘটের সমর্থক গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দে র সাধারণ সম্পাদক কাজী রুহুল আমীন এ প্রসঙ্গে ইত্তেফাককে বলেন, ধর্মঘটের সমর্থনে রাজধানী এবং আশপাশের পোশাক খাত অধ্যুষিত এলাকায় আজ (গতকাল) বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে বিজিএমইএ সহ-সভাপতি শহিদুল্লাহ আজিম বলেন, এরকম কোন কর্মসূচি পালিত হয়নি। তবে বিকালে সাভারে কয়েকজন শ্রমিক জড়ো হতে চাইলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দিয়েছে। গার্মেন্টস শ্রমিকদের উপর হামলায় ভার্সিটি শিক্ষকদের নিন্দা তোবা গার্মেন্টসের শ্রমিকদের উপর হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের এমডি দেলোয়ার হোসেনের জামিন বাতিল, হামলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ ও শ্রমিকদের সমস্ত বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবি জানিয়েছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষক। গতকাল শুক্রবার পাবলিক ইউনিভার্সিটি টিচার্স নেটওয়ার্কের এ সদস্যরা এক বিবৃতিতে বলেন, আমরা ঈদের আগেরদিন থেকে উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি তোবা গ্রুপের ছয়টি গার্মেন্টসের ১ হাজার ৬ শত শ্রমিক তাদের প্রাপ্য তিন মাসের বকেয়া বেতন ও ঈদ বোনাসের দাবিতে অনশন করে আসছিলেন। সংবাদ মাধ্যম থেকে আরো জেনেছি, এর আগে সরকার ও বিজিএমইএ শ্রমিকদের প্রাপ্য পরিশোধ করবে বলে অঙ্গীকার করেও তা ভঙ্গ করে। এই শ্রমিকরা অনশন শুরু করার পরও আমরা সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি পূরণে কোন ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখিনি। আমরা দেখতে পাই শ্রমিকদের আন্দোলনকে অজুহাত করে তোবা গ্রুপের মালিক, তাজরীন গার্মেন্টসে শ্রমিক হত্যা মামলার আসামি দেলোয়ার হোসেনকে জামিনে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এর অব্যবহিত পরেই দেখি আন্দোলনে সংহতি জানাতে আসা রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, লেখক ও অনশনরত শ্রমিকদের জন্য মেডিক্যাল সাপ্লাই নিয়ে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. সামিনা লুত্ফা ও নৃবিজ্ঞানী ও পিএইচডি গবেষক সায়দিয়া গুলরুখকে প্রথমে পুলিশ লাঠিপেটা করে ও পরে পুলিশের উপস্থিতিতে বিজিএমইএ’র লেলিয়ে দেয়া গুন্ডারা ব্যাপক মারধর করে আহত করে। সামিনা লুত্ফা নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিচয় দেয়ার পরও তার উপর পুলিশ ও গুন্ডারা চড়াও হয়। এই খানেই ঘটনা থেমে থাকেনি পরদিন অনশনরত শ্রমিকদের নির্মম ভাবে লাঠিপেটা করে অনশনস্থল থেকে বের করে দেয়া হয়। শ্রমিকদের প্রতি এই অন্যায় ও ন্যক্কারজনক হামলায় আমরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। বিবৃতিতে শিক্ষকরা বলেন, শিক্ষক, সাংবাদিক, লেখক, রাজনীতিবিদদের উপর পুলিশ ও গুন্ডা বাহিনীর যৌথ হামলার ঘটনাকে সংগঠিত ও বিভিন্ন শ্রেণীর পরস্পরের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং সংহতির রাজনীতির উপর সুগভীর চক্রান্ত বলে মনে করি, তার প্রমাণ বাড্ডা থানা হামলাকারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। আমরা সরকারের দায়িত্বহীনতা, তদুপরি শ্রমিকের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে গার্মেন্টস মালিকদের পক্ষ অবলম্বন করার তীব্র নিন্দা জানাই। এই পরিস্থিতিতে তোবা গ্রুপের শ্রমিকদের সমস্ত বকেয়া বেতন বোনাস পরিশোধ করার দাবি জানাচ্ছি। একইসাথে এই ঘটনায় পুলিশি ও গুন্ডা বাহিনীর হামলাকারীদের তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানাই। বিবৃতিতে তাজরিন গার্মেন্টস-এর শ্রমিক হত্যা মামলার আসামি দেলোয়ারের জামিন অবিলম্বে বাতিলেরও আবেদন জানান শিক্ষকরা। তারা বলেন, আমরা সংশ্লিষ্টদের এও জানিয়ে দিতে চাই যে, এইরকম হামলা করে আমাদের বিবেককে কখনই স্তব্ধ করে দেওয়া যাবে না। বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী শিক্ষকরা হলেনঃ রায়হান রাইন, মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান, আইনুন নাহার, ফাতেমা শুভ্রা, সায়েমা আহমেদ, মির্জা তাসলিমা, গীতি আরা নাসরীন, রাহমান নাসির উদ্দিন, ফাহমিদুল হক, মোশাহিদা সুলতানা, অভী চৌধুরী, মানস চৌধুরী, আ-আল মামুন, কাজী সুস্মিন আফসানা, তাসলিমা আতিক, স্বাধীন সেন, মাহমুদুল সুমন, শাহীনা পারভীন, সাহিদ সুমন, জোবাইদা নাসরীন।