গাজা হত্যাযজ্ঞে বিশ্ব বিবেকের নীরবতা দেখে আমি হতবাক

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০১৪, ২২:৫২
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা গাজায় বর্বরোচিত ইসরায়েলি হামলার ঘটনায় পশ্চিমা বিশ্বসহ উন্নত দেশ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নিশ্চুপ থাকার সমালোচনা করে বলেছেন, এখানে (বাংলাদেশে) যখন প্রাণহানির কোন ঘটনা ঘটে তখন এর সমালোচনায় কংগ্রেসম্যানদের অসংখ্য চিঠি পাই, কত প্রতিবাদ শুনতে পাই। কিন্তু আজ যখন ফিলিস্তিনের শত শত নারী, শিশু, সন্তানসম্ভবা মা’দের নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে তখন তারা নীরব কেন? যারা নিজেদের সভ্য হিসেবে দাবি করে সেই বিশ্ব বিবেক এখন কীভাবে নিশ্চুপ আছে! বিশ্ব বিবেকের এই নীরবতা দেখে আমি হতবাক। আমরা এর প্রতিবাদ, ঘৃণা ও নিন্দা জানাই। গাজায় ইসরায়েলি হামলার বিরুদ্ধে সমাজের সবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৮৪তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এ আলোচনা সভার আয়োজন করে। দেশীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলোরও সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কিছু ঘটলেই দেখি বিবেকের তাড়নায় তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে ছুটে যান, চরে ছুটে যান। এখানে যান, ওখানে যান। এখন তারা চুপ করে আছেন কেন? অনুষ্ঠানে উপস্থিত নারী সংগঠনগুলোসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আরো সক্রিয়ভাবে এর প্রতিবাদ জানানোর আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, নারী ও শিশু হত্যার ঘটনায় চুপ করে বসে থাকা যায় না। এর প্রতিবাদ করতেই হবে। বিশ্বের যে কোন স্থানে এ ধরনের বর্বর ঘটনা ঘটলে এর প্রতিবাদ আমাদের জানাতে হবে। আমরাও এ ধরনের হামলার শিকার হতে পারি। অতীতেও নারী ও শিশু হামলার শিকার হয়েছে। গাজায় ইসরায়েলের বর্তমান হত্যাযজ্ঞকে বাংলাদেশে ১৯৭১, ১৯৭৫ ও ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পরে ঘটা হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে তুলনা করে শেখ হাসিনা বলেন, আজ যখন নির্বিচারে ফিলিস্তিনি নারী শিশুদের হত্যা করতে দেখি তখন একাত্তরের কথা মনে পড়ে যায়। গণহত্যার শিকার ফিলিস্তিনির নারী শিশুদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান তিনি। বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছাকে জাতীয় ইতিহাসের এক সাহসী, প্রজ্ঞাময়, নিবেদিত ও স্নেহপরায়ণ অনুপ্রেরণাদাত্রী হিসেবে অভিহিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় ইতিহাসে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ভূমিকা অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি ও আওয়ামী লীগের আন্দোলনে তার বিপুল অবদান রয়েছে। ইতিহাস অবশ্যই বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধুর কৃতিত্বের পাশে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সচেতন এই মহীয়সী দেশ প্রেমিকের অবদান মূল্যায়ন করবে। কারণ স্বাধীনতা আন্দোলনে পর্দার আড়ালে গুরুত্বপূর্ণ ও বিচক্ষণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। বঙ্গমাতার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগ-আপ্লুত কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর জীবন তাঁর পিতার আদর্শ এবং তাঁর মাতার দৃঢ়তা দ্বারা পরিচালিত। মায়ের দৃঢ়তা ও ত্যাগ তার রাজনৈতিক জীবনের জন্য শিক্ষণীয়। তিনি বলেন, আমি আমার মায়ের কাছ থেকে অনেক শিখেছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফজিলাতুন্নেছা মুজিব রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে তার অনেক অবদান রয়েছে। তিনি গেরিলা কায়দায় বোরখা পরেও নেতা-কর্মীদের কাছে সিদ্ধান্ত পৌঁছে দিতেন এবং তাদের খোঁজখবর নিতেন। তিনি যেমন ছিলেন দৃঢ়চেতা তেমনি আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান। পাকিস্তানি শাসকরা বাবাকে নিয়ে গেলে ৬ মাস পর্যন্ত আমরা জানতাম না তাকে কোথায় রাখা হয়েছে। এ সময় মা বিচলিত ছিলেন কিন্তু মনোবল হারাননি। সব সময়ই তার ভেতরে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দৃঢ়তা দেখেছি। বঙ্গবন্ধু যখন জেলখানায় থাকতেন, তখন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বাড়িতে বাজারের টাকা পৌঁছে দিয়েছেন আমার মা। বঙ্গবন্ধু জেলখানায় থাকতেন এ নিয়ে কখনও তাকে আক্ষেপ করতে দেখিনি। তিনি ভোগ বিলাসী হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আসতো না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুকে দেখতাম প্রতিটি বিষয়ে মায়ের সঙ্গে আলোচনা করতেন এবং মা প্রতিটি সিদ্ধান্তে সমর্থন জানাতেন। পরবর্তীতে দেখা যেত সঠিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। সংসার জীবনে মায়ের অপরিসীম ত্যাগের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, খুব কম বয়সে বাবার সঙ্গে মায়ের বিয়ে হয়েছিল। সেই অল্প বয়স থেকে বাবার পাশে ছায়ার মতো লেগে থেকেছেন মা। আমার মনে হয় মায়ের মতো জীবনসঙ্গী না পেলে বাবা বাংলাদেশ স্বাধীন করতে পারতেন না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মায়ের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, সাংগঠনিক ক্ষমতা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতায় অপরিসীম অবদানের কথা মাথায় রেখেই ১৫ আগস্টের খুনিরা মাকেও রেহাই দেয়নি। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি এমপির সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরো বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর সভাপতি সেলিনা হোসেন, মহিলা ও শিশু বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি রেবেকা মমিন, জাতীয় মহিলা সংস্থার সভাপতি মমতাজ বেগম প্রমুখ। অনুষ্ঠানে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জীবন ও কর্মের উপর একটি প্রামাণ্য চিত্র মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের মাধ্যমে দেখানো হয়।