বাংলাদেশের বিনিয়োগ প্রসঙ্গ

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০১৪, ২১:০৬
একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ (দেশি কিংবা বিদেশি উভয়ই) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন পারস্পরিকভাবে সম্পর্কযুক্ত। একের উপর অপরটি নির্ভরশীল। বিনিয়োগ না হলে যেমন অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয় না, তদ্রূপ অর্থনৈতিক উন্নয়ন না হলেও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। অবশ্য একটি দেশের আর্থ-সামাজিক নীতিসমূহ (Policies) তথা বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নীতিই হচ্ছে অনেকাংশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নির্ধারক। একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ, দক্ষ ও ব্যবসা-বান্ধব আমলাতন্ত্র, নির্ভরযোগ্য আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং ব্যবসা-বান্ধব বিনিয়োগ নীতি দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করার জন্য একান্ত প্রয়োজন। শিল্পনীতি, বাণিজ্যনীতি, রাজস্বনীতি, মুদ্রানীতি, শ্রমনীতি, জ্বালানি ও বিদ্যুত্নীতি এবং বিনিয়োগ ও মেধাস্বত্ব অধিকার সংরক্ষণের জন্য অনুকূল আইন এবং তার প্রয়োগ বিনিয়োগকে উত্সাহিত করার জন্য একান্ত অপরিহার্য। একজন সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় রাজস্ব ও মুদ্রানীতির সুসমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ দু’টো নীতির মধ্যে ঘন ঘন পরিবর্তন বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের জন্য নিরুত্সাহব্যঞ্জক। কেবলমাত্র কাগজে-কলমে পরিবেশ-বান্ধব বিনিয়োগ নীতির কথা থাকলে চলবে না, তার বাস্তব প্রয়োগ থাকতে হবে। অন্যথায় উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে এগিয়ে আসবে না। একজন সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী, বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারী তার বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট দেশের বিদ্যমান অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা পর্যালোচনা করে দেখে। এ সকল সুযোগ-সুবিধার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে গ্যাস, বিদ্যুত্, পানির পর্যাপ্ত যোগান, উচ্চ-গতি-সম্পন্ন তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ ব্যবস্থা (data transmission) এবং সর্বোপরি, স্থিতিশীল অর্থনীতি। ১৬০ মিলিয়ন লোকের বাংলাদেশ দেশি কিংবা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বিরাট বাজার বলা চলে। আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশের বিনিয়োগ এবং বাণিজ্য সংক্রান্ত নীতি খুবই উদার এবং দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম বলে প্রতীয়মান হয়। বাংলাদেশের বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগ প্রমোশন ও সংরক্ষণ আইন, ১৯৮০ (Foreign Private lnvestment Promotion and Protection Act, 1980) দ্বারা সকল বিদেশি বিনিয়োগ সুরক্ষিত। কিন্তু পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, সরকারি নীতির সাথে বাস্তবতার যথেষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের নীতির মধ্যেও যথেষ্ট সামঞ্জস্যহীনতা পরিলক্ষিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, সরকারি শিল্পনীতি অনুযায়ী নিউক্লিয়ার এনার্জি, টাকশাল (Security Printing), অস্ত্র শিল্প (armament industry) ছাড়া সকল প্রকার শিল্পে শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হয়েছে, কিন্তু সম্প্রতি ঘোষিত বাংলাদেশ টেলিকম নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের নীতিতে শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগের পরিবর্তে কল সেন্টার অপারেশনের (Call Center Operation) ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে, যেখানে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ হতে পারবে যে কোন একটি অপারেশনে সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ। বলাবাহুল্য, সরকারি মন্ত্রণালয়গুলোর নীতিতে এ ধরনের বহু সামঞ্জস্যহীনতা রয়েছে। তাছাড়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি, গ্যাস ও বিদ্যুত্ সঙ্কট, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা প্রভৃতি তো রয়েছেই। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, অতীতে প্রায় ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো আলোর মুখ দেখেনি, যেগুলো এসেছিল আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত ভারতের টাটা, যুক্তরাজ্যের গ্লোবাল অয়েল এন্ড এনার্জি লি. (Mittal Group), আবুধাবী গ্রুপ, Essar Group of India, Azmat Corporation of Malaysia এবং Italian-Thai Development of Thailand-এর মত কোম্পানীগুলো থেকে। Negotiating Capacity’র অভাব,আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতা, রাজনৈতিক ও পরিবেশগত প্রতিকূল অবস্থা এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিদেশি বিনিয়োগ একান্ত অপরিহার্য। কারণ আমাদের উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও লোকজনের আয় বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য বিমোচনের প্রয়োজন মেটানোর জন্য অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ যথেষ্ট নয়। আমাদের অর্থনীতির সকল প্রধান অর্থনৈতিক নির্দেশকগুলোকে অনুকূল রাখতে হলে বিনিয়োগকে কাঙ্ক্ষিত স্তরে রাখতে হবে। বিনিয়োগকে কাঙ্ক্ষিত স্তরে রাখার অর্থ হচ্ছে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাওয়া, আমদানি ও রপ্তানি বৃদ্ধি পাওয়া, লেনদেনে ভারসাম্যের উন্নতি হওয়া এবং চাহিদা অনুযায়ী দ্রব্য ও লেবার যোগান নিশ্চিত করা। বাংলাদেশে সরকারি বিনিয়োগের যথেষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রথমত. সরকার ব্যবসাতে নিয়োজিত হওয়া উচিত নয়। তাছাড়া সরকারি সম্পদ ব্যয়ের এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র (Priorities) রয়েছে যেগুলো উত্পাদনশীল নয়। উদাহরণস্বরূপ, আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য ব্যয়, গরীবদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনির জন্য ব্যয় প্রভৃতি। সুতরাং বাংলাদেশে বেসরকারি বিনিয়োগকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। যেহেতু বাংলাদেশে দেশীয় বেসরকারি সেক্টর (Local private sector) খুব একটা শক্তিশালী নয়, সেজন্য বিনিয়োগের প্রয়োজন মেটানোর জন্য বিদেশি বিনিয়োগ হচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্স। কিন্তু হতাশাব্যঞ্জক হলেও সত্য যে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের অবস্থা সন্তোষজনক নয়। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ ও জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা। বিভিন্ন কারণে সৃষ্ট রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের ক্রমবর্ধমান আন্দোলন ও অসন্তোষ এবং অবনতিশীল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উত্সাহ বহুগুণে কমিয়ে দিয়েছে যা’ বিশ্বব্যাংকের ‘Doing Business Report’-এ প্রকাশিত বাংলাদেশের পরিবেশগত ক্রমমান (ranking for hassle-free environment) থেকে সহজেই প্রতীয়মান হয়। যা হোক, উপরোক্ত বিভিন্ন বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও বিগত তিন দশক ধরে বাংলাদেশে বিভিন্ন সেক্টরে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ পূর্বের তুলনায় মোটামুটি বেড়েছে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের অবস্থাও খুব বেশি অসন্তোষজনক নয়। এটা সম্ভব হয়েছে জনগণের দৃঢ় প্রত্যয় ও কঠোর পরিশ্রম এবং বিনিয়োগকারীদের সাহসী উদ্যোগের ফলশ্রুতিতে। যদি বিনিয়োগ সংক্রান্ত সরকারি নীতির মধ্যে সামঞ্জস্যহীনতা না থাকত, অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতি সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার, সমর্থন ও কার্যকরী পদক্ষেপ যে কোন প্রতিকূল অবস্থায়ও অব্যাহত থাকত, তা’হলে এদেশ বিনিয়োগ ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে অনেকদূর এগিয়ে যেত। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমান নিরুত্সাহ কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকারি বিনিয়োগ, শিল্প ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সংক্রান্ত নীতিসমূহ বাস্তবায়নের ধারা ও গতি অব্যাহত রাখা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের নীতিসমূহের মধ্যে স্ববিরোধিতা দূর করার জন্য আশু পদক্ষেপ একান্ত জরুরি। এ লক্ষ্যে সরকারকে বহু বছরের পুরনো ঘুণেধরা নিয়োগ পদ্ধতি (recruitment system) বাতিল করে যে সকল সংস্থা ও মন্ত্রণালয় বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও উপযোগ সেবা (utility services) প্রদানের সাথে জড়িত, সে সকল প্রতিষ্ঠানের নীতি এবং সিদ্ধান্ত নির্মাণ (decision making) স্তরে ক্যাডার সার্ভিসের বাইরে থেকে চুক্তির ভিত্তিতে উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ কর্মকর্তা নিয়োগের জন্য প্রশাসনিক সংস্কার করতে হবে এবং বাজার মূল্যের উপর ভিত্তি করে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বিশেষ ক্ষতিপূরণ প্যাকেজের (Special compensation Package) ব্যবস্থা করতে হবে। বিদ্যুত্ ও গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতিকল্পে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আয়তনের অসংখ্য বিদ্যুত্ প্ল্যান্ট (Power Plant) প্রতিষ্ঠার জন্য সম্ভাবনাময় (Prospective) বেসরকারি অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকারীদেরকে উত্সাহিত করার জন্য যথাশিগিগরই সম্ভব এ্যাকশন প্ল্যান (Action Plan) হাতে নিতে হবে। প্ল্যান্টের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানির জন্য শুল্ক মওকুফ করতে হবে এবং বাধ্যতামূলক বিডিং প্রথা (bidding process) বাতিল করতে হবে। বেসরকারি বিদ্যুত্ উত্পাদনকারী কর্তৃক ন্যায়সঙ্গত একক মূল্যে (unit price) সরকারি সংস্থা যথা: PDB, DESA, REB প্রভৃতিকে উত্পাদিত বিদ্যুত্ বিক্রয় করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের উন্নতির জন্য bapex (Bangladesh Petroleum Exploration Company)-কে সম্ভাবনাময় স্থানে গ্যাস উত্তোলন প্রকল্প/গ্যাস অনুসন্ধান প্রকল্প হাতে নেয়ার জন্য দায়িত্ব ন্যস্ত করতে হবে এবং সরকারের তরফ থেকে পর্যাপ্ত আর্থিক বা তহবিল বরাদ্দ দিতে হবে। ওয়েজ আর্নার রেমিট্যান্স থেকে এ তহবিল বরাদ্দ দেয়া যেতে পারে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি প্রভৃতির শেকড় উপড়ে ফেলতে হবে এবং দেশের অর্থনীতিসহ সামগ্রিক অবস্থার প্রতি বিনিয়োগকারীদের মনে আস্থাভাব সৃষ্টি করতে হবে। অবকাঠামোগত উন্নয়নকে একটি অব্যাহত ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে চালু রাখতে হবে। এ পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নের জন্য সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও দৃঢ় অঙ্গীকার থাকতে হবে এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। শ্রমিক অসন্তোষ দূর করতে হবে, মালিক কর্তৃক শ্রমিকদেরকে শোষণ করা বন্ধ করতে হবে এবং কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থাগুলো কার্যকরভাবে গ্রহণ ও প্রয়োগ করা গেলে এশিয়ান টাইগারস (Asian Tigers)-দের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে বাংলাদেশের খুব একটা সময় লাগবে না। লেখক : প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়