কিডনি ফাউন্ডেশন আয়োজিত আন্তর্জাতিক সেমিনারে বক্তারা বলেছেন, সারাবিশ্বেই কিডনি অকেজো রোগীদের চিকিত্সায় পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস (সিএপিডি) ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। অথচ বাংলাদেশে এখনও সেভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি। এই চিকিত্সার মাধ্যমে কিডনি অকেজো রোগীরা দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে পারেন।
একজন রোগী হেমোডায়ালাইসিস করে যতদিন বেঁচে থাকে বরং সিএপিডি করে একই সময় বা তারও বেশি সময় বেঁচে থাকেন। সিএপিডির সুবিধা হচ্ছে, ঘরে বসেই এই চিকিত্সা নেয়া যায়, রোগীরা দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজকর্মও করতে পারেন যা হেমোডায়ালাইসিসে সম্ভব নয়। গতকাল শনিবার সকালে মিরপুরে কিডনি ফাউন্ডেশনে অনুষ্ঠিত সেমিনারে তারা এসব কথা বলেন।
সেমিনারে উত্থাপিত নিবন্ধে বলা হয়, পরিসংখ্যান অনুযায়ী মেক্সিকো ও হংকং-এ ৮০ ভাগ, যুক্তরাষ্ট্রে ৪০ ভাগ ডায়ালাইসিস সিএপিডির মাধ্যমে হয়ে থাকে। কানাডা, ইউরোপ, জাপান ও চীন ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই চিকিত্সা ব্যাপক জনপ্রিয় হলেও বাংলাদেশে এখনও সেভাবে প্রতিষ্ঠা পায়নি। বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ কিডনি রোগী আছে। এর মধ্যে প্রতি বছর ৩৫-৪০ হাজার রোগীর কিডনি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যায়। সম্পূর্ণ কিডনি বিকল রোগীদের চিকিত্সা হচ্ছে ডায়ালাইসিস এবং কিডনি প্রতিস্থাপন। ডায়ালাইসিস দুই ধরনের ১. হেমোডায়ালাইসিস ২. পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস। দেশে মাত্র ১৫-২০ ভাগ রোগী কিডনি বিকল রোগের চিকিত্সা পেয়ে থাকে। এর মধ্যে বেশিরভাগ রোগী হেমোডায়ালাইসিস করে থাকে। তবে অর্থ অভাব ও যাতায়াতের কারণে বেশিরভাগ রোগী স্বল্প সময়ের মধ্যে চিকিত্সা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। কিডনি বিকল রোগীদের হেমোডায়ালাইসিস করার জন্য হেমোডায়ালাইসিস মেশিন, পানি বিশুদ্ধকরণ যন্ত্র, ডায়ালাইজার, ডায়ালাইজার ফ্লুইড, সার্বক্ষণিক বিদ্যুত্ ব্যবস্থা, ডাক্তার ও নার্সের প্রয়োজন। কিন্তু পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস (সিএপিডি) এর জন্য আনুষঙ্গিক কিছুই প্রয়োজন নেই। রোগী ঘরে বসেই এই ধরনের ডায়ালাইসিস নিজে নিজেই অথবা বা একজনের সাহায্যে করতে পারবেন। প্রথমে শুধু একবার ক্যাথেটার প্রতিস্থাপন ও প্রশিক্ষণের জন্য হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। এরপর পেটের ভিতরে ২ লিটার পরিশোধিত পানি ৮ ঘন্টা পর পরিবর্তন করলেই হয়। এসময়ে রোগী দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারেন। সিএপিডিতে রোগীদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং বেশি খাবারের বাধ্যবাধকতা প্রয়োজন হয় না।
সেমিনারে জানানো হয়, কিডনি ফাউন্ডেশন হেমোডায়ালাইসিস হিসাবে বাংলাদেশে এই সিএপিডিকে জনপ্রিয় করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রয়োজনে ফ্লুইড রোগীর বাসায় পৌঁছে দেয়াসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে কিডনি বিকল রোগীদের চিকিত্সা দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। যেহেতু ঢাকা ও অন্যান্য শহরের বড় বড় হাসপাতাল ছাড়া হেমোডায়ালাইসিসের কোন ব্যবস্থা নেই সেহেতু মফস্বলের রোগীদের জন্য এ চিকিত্সা কার্যকর। দেশে এ চিকিত্সা ব্যাপকভাবে শুরু করতে পারলে কিডনি বিকল রোগীদের চিকিত্সায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।
কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক হারুন আর রশিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে হূদরোগ বিশেষজ্ঞ ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি জেনারেল জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার (অব.) আব্দুল মালেক এবং বিশেষ অতিথি বাংলাদেশ ডায়াবেটিক এসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক একে আজাদ খান উপস্থিত ছিলেন। সেমিনারে থাইল্যান্ডের বিখ্যাত সিএপিডি বিশেষজ্ঞ ডা. টেলেংসাক কানজানাবুস সে দেশের প্রচলিত সিএপিডি চিকিত্সা বিস্তারিত তুলে ধরেন। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও বাংলাদেশের কিডনি বিশেষজ্ঞরা বক্তব্য দেন। দুই শতাধিক চিকিত্সক সিএপিডির উপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
