টিনের ঘর। ঘরের সামনে ছোট্ট উঠান। সেই উঠানের একপাশে বাঁশে ঝুলে শুকাচ্ছে মোটা রঙিন সুতি সুতা। উঠানের আরেক পাশে মাটিতে ছড়িয়ে আছে বাঁশের তৈরি চাকার স্তূপ। উঠানের মাঝ বরাবর মাঝ বয়সী এক নারী দড়িতে ঝুলিয়ে রঙিন সেই সুতি সুতা বাঁশের চাকায় মুড়িয়ে বুনছেন, ঠিক জালের মতো করে। আর এই বুননের দৃশ্য কেবল এ বাড়ির ছোট্ট উঠানেই নয়, এমন দৃশ্য দেখা যাবে পুরো গ্রাম জুড়েই। ঠিক যেনো বুননের গ্রাম এবং বুননকারীর অধিকাংশই নারী। মোটা রঙিন সুতি সুতায় এবং বাঁশের চাকায় মুড়িয়ে যে বুনন প্রক্রিয়া, এগুলো মূলত দোলনা তৈরি করা হচ্ছে। আর এই দোলনা তৈরির গ্রামের নাম— দৈয়ারা। এর অবস্থান কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার ২১নং বাবুটিপাড়া ইউনিয়নে।
পঁচিশ বছর বয়সী ফেরদৌসী বেগম দোলনা তৈরি করেন। তিনি জানালেন, দোলনা তৈরির সুতা কেনা হয় সোনারগাঁও থেকে। প্রথমে সাদা সুতা কেনা হয়, তারপর সেই সুতা প্রয়োজন মতো রঙ করে নেয়া হয়। সুতার রঙও কেনা হয় সোনারগাঁও থেকে। দোলনা তৈরি করা হয় কয়েকটি মাপে। এগুলো প্রতিটি খুচরা বিক্রি হয় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। তবে পাইকারদের কাছে বিক্রি করা হয় প্রতিটি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। ঢাকা, যশোর, খুলনাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা এসে কিনে নেন এসব দোলনা। অনেক পাইকার দোলনা তৈরির অর্ডারও দেন। অনেক সময় যারা দোলনা তৈরি করেন, তারা নিজেরাই বিভিন্ন স্থানে গিয়ে পাইকারী বাজারে বিক্রি করে আসেন।
এখানকার দোলনা তৈরির কারিগর রাজিয়া বেগম জানালেন, পুরো দোলনাটি তৈরি হয় কয়েকটি ধাপে এবং কয়েকজন কারিগরের মাধ্যমে। যেমন, একজন কেবল বাঁশের চাক বা চাঁকা তৈরি করেন। প্রতিটি বাঁশের চাকা তৈরির মজুরি ৩ থেকে ৪ টাকা। আবার একজন শুধু সেই বাঁশের চাকায় সুতা প্যাঁচান। প্রতিটি বাঁশের চাকায় সুতা পেঁচানোর মজুরি ৫ থেকে ৬ টাকা। আবার একজন কেবল দোলনা ঝুলিয়ে রাখার দড়ি বা চেইন (স্থানীয়দের ভাষায় চেইন বলে) তৈরি করেন। চেইন তৈরির মজুরি প্রতিটির জন্য ২ থেকে ৩ টাকা। তবে সবচে বেশি ভূমিকা রাখেন যিনি পুরো দোলনাটি বুনেন।
দোলনা তৈরির কারিগর রহিমা বেগম জানান, সংসারের কাজের ফাঁকে ফাঁকে দোলনা তৈরি করেন। এই দোলনা তৈরি করেই চলে তাদের সংসার। ছেলে-মেয়েরাও লেখাপড়া করছে। দোলনা তৈরির সব কাজ তিনি নিজেই করেন। স্বামী-সন্তানরাও তার কাজে সহযোগিতা করেন। অর্চনা রানী সরকার জানান, দোলনা তৈরি এখানকার কয়েক হাজার নারী-পুরুষের ভাগ্য বদল করে দিয়েছে। শুধু দোলনা তৈরি করেই তারা আজ সচ্ছল জীবন-যাপন করছেন। জাহানারা বেগম জানান, দোলনা তৈরির এই কুটির শিল্পটি যদি সরকারি-বেসরকারি সংস্থার পৃষ্ঠপোষকতা পায়, তবে এর প্রতি আরও অনেকেই আগ্রহী হবেন।
দোলনার বাঁশের চাকায় সুতা পেঁচানোর কাজ করেন ফাতেমা আকতার। তিনি জানান, তাদের মতো অনেক শিক্ষার্থী পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে দোলনার কাজ করে সংসারে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। দোলনার চেইন তৈরির কারিগর শিরিন আকতার জানান, তাদের গ্রামে দোলনা তৈরির প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে অনেক শিক্ষার্থী নিজেরাই নিজেদের পড়ালেখার খরচ জোগাতে পারছেন।
