পহেলা সেপ্টেম্বর দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে সামনে রেখে আন্দোলনের সূচনা-পর্বের রূপরেখা প্রণয়ন করছে বিএনপি। বিশেষ রাজনৈতিক প্রেক্ষা-পটে সমাগত এবারের প্রতিষ্ঠা-বার্ষিকী উপলক্ষে মাসব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। দলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর কার্যক্রমের সঙ্গে সমন্বয় রেখে ২০ দলীয় জোটের আন্দোলন কর্মসূচিও প্রণয়ন করা হচ্ছে। সবমিলিয়ে আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে পুরো সেপ্টেম্বর মাস জুড়ে প্রায় দেড় মাস নানা কর্মসূচি পালন করবে জোটটি। মাঝে-মাঝে থাকবে নাতিদীর্ঘ বিরতি। বাধ্য না হলে এসব কর্মসূচিতে হরতাল-অবরোধের মতো সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে এমন কর্মসূচি না রাখার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত রয়েছে। এইসময়ে দেশব্যাপী বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশ ও জনসভার মতো অহিংস কার্যক্রমের মাধ্যমে আন্দোলন আপাতত ‘নরম’ কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকবে। একইসঙ্গে জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালার বিরোধিতাসহ ইস্যুভিত্তিক কর্মসূচি দিয়ে জনমত গঠনের চেষ্টাও করবে বিএনপিসহ দলটির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট।
গতকাল রবিবার রাতে অনুষ্ঠিত বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনার নির্যাস ছিল এমনই। স্থায়ী কমিটির সভায় আলোচিত বিষয়বস্তু ও প্রাথমিকভাবে গৃহীত কর্মসূচির ব্যাপারে আজ সোমবার অনুষ্ঠেয় ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে আলোচনা করবেন জোট প্রধান বেগম খালেদা জিয়া। জোটের বৈঠকে কর্মসূচি চূড়ান্ত করার পর আজকালের মধ্যে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তা প্রকাশ করা হবে।
গতকাল রাত ১০টা ৫ মিনিটে স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে বিএনপির একজন জ্যৈষ্ঠ নেতা ইত্তেফাককে জানান, বৈঠকে আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তিনি জানান, গাজায় ইসরাইলী আগ্রাসনের প্রতিবাদে ঢাকায় একটি কালো পতাকা মিছিল এবং জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা বাতিলের দাবিতে রাজধানীতে একটি বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিক্ষোভ সমাবেশটি আগামী সপ্তাহে এবং কালো পতাকা মিছিলটি ২৫ আগষ্টের পর অনুষ্ঠিত হবে। তিনি আরো জানান, প্রায় দেড়মাসব্যাপী বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক কর্মসূচির বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুইজন সদস্য ও ২০ দলীয় জোটের শরিক দুইটি দলের (বিএনপি ছাড়া) শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০ আগস্টের আগে কোনো কর্মসূচি না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা বাতিলের দাবিতে এবং লঞ্চডুবির ঘটনা ও নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে পুরনো মামলায় অভিযোগপত্র দাখিলের প্রতিবাদে চলতি মাসেই ঢাকায় জোটের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশের কর্মসূচি দেয়া হতে পারে। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ দেশব্যাপী বিএনপির দলীয় কর্মসূচি থাকবে দলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী কেন্দ্রিক। প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে সেপ্টেম্বর জুড়েই কম-বেশি দলীয় কর্মসূচি রাখা হচ্ছে। এছাড়া জোটের পক্ষ থেকে সেপ্টেম্বরে বিভাগীয় পর্যায়ে কয়েকটি জনসভা করার নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। এর ফাঁকে-ফাঁকে জোটের নেতারা বিভিন্ন টিমে ভাগ হয়ে তৃণমূল সফরে বের হবেন। এইসময়ে বিএনপিসহ জোটের শরিক দলগুলো নিজেদের দল গোছানোর কাজও চালিয়ে যাবে। এভাবে অক্টোবরে কোরবানির ঈদ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে ২০ দল। কোরবানির ঈদের পর আন্দোলনের দ্বিতীয় ধাপে যাওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। মূলত দ্বিতীয় পর্বেই হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি থাকবে বলে আভাস দিয়েছেন এসব নেতা।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘কর্মসূচি অবশ্যই আসছে। তবে তা হবে শান্তিপূর্ণ। এখন আন্দোলনের ফোকাস থাকবে ঢাকায়। ইস্যুভিত্তিক কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা জনমত গঠনে কাজ করবো।’ একইসঙ্গে নির্দলীয় সরকারের অধীনে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সকল দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির প্রচেষ্টাও অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, দলটি মনে করছে- ইলেক্ট্রনিক সংবাদ মাধ্যমের জন্য জারিকৃত জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালায় কেবল গণমাধ্যমই নয়, সামনের সরকার বিরোধী আন্দোলনও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাদের আশঙ্কা, বেসরকারি টেলিভিশন-রেডিওর সংবাদ ও টকশো নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সরকার কার্যত আন্দোলন এবং এই সম্পর্কিত খবরাখবরকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করবে। যে কারণে বিএনপি যখন আন্দোলনের কথা বলছে, তখনই এই নীতিমালা জারি করা হয়েছে।
এই বিষয়ে বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, মূলত সরকার বিরোধী সমালোচনা দমন করতেই সরকার এই ধরনের জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা জারি করেছে। গণমাধ্যমে যেন সরকারের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে না পারে, কোনো আলোচনা করতে না পারে এবং বিশেষ করে পুলিশ-র্যাবের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা যেন করা না যায়, সেই উদ্দেশ্যেই এই নীতিমালা। তিনি বলেন, এই নীতিমালার বিরুদ্ধে বিএনপি জনমত গঠনে মাঠে নামছে।
জানা গেছে, সম্প্রচার নীতিমালাসহ বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে দেশে-বিদেশে জনমত গঠনের কাজেই আপাতত মনোযোগ থাকবে ২০ দলীয় জোটের। জোট শরিক বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ ইত্তেফাককে বলেন, এবারের কর্মসূচিতে নতুন মাত্রা থাকবে। এসব কর্মসূচি হবে গণভিত্তিক, যেখানে সাধারণ জনগণের স্বার্থ ও মৌলিক অধিকার সম্পৃক্ত থাকবে। দেশব্যাপী জনমত গঠনের মাধ্যমেই এ সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করা হবে বলে দাবি করেন তিনি।
পাঁচ দফা প্রস্তাব গ্রহণ
এদিকে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে পাঁচটি প্রস্তাব-দাবি জানানো হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে লঞ্চডুবির ঘটনায় নিহতদের ক্ষতিপূরণ প্রদান, তোবার শ্রমিকদের সম্পূর্ণ পাওনা পরিশোধ ও পুনরায় কর্মসংস্থানের সুযোগ দেয়া, দলের নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের মুক্তি, গাজায় ইসরাইলী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ ও ওআইসির হস্তক্ষেপ কামনা এবং জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা বাতিল।
গতকাল রবিবার রাত পৌনে ৯টায় শুরু হওয়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক চলাকালে মাঝখানে বের হয়ে এসব প্রস্তাব-দাবির কথা জানান দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ডুবে যাওয়া লঞ্চ ও নিহতদের উদ্ধারে সরকারের অযোগ্যতা, অক্ষমতা ও ব্যর্থতা প্রমাণিত হয়েছে। বিএনপি অবিলম্বে নিহতদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণের দাবি জানাচ্ছে।
তিনি বলেন, তোবায় পাওনা আদায়ের দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের উপর প্রশাসন ও সরকার দলীয়রা নিন্দনীয় হামলা চালিয়েছে। বিএনপি এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে। ফখরুল বলেন, গাজায় যে হামলা চালানো হয়েছে তা নির্দয় ও অমানবিক। জাতিসংঘ, ওআইসি ও আরবলীগসহ সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন বলে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। তিনি বলেন, সম্প্রচার নীতিমালার মাধ্যমে সরকার গণমাধ্যম ও জনগণের বাকস্বাধীনতা হরণ করতে চায়। এটা বাকশাল প্রতিষ্ঠার অন্যতম লক্ষ্য। বিএনপি অবিলম্বে এ নীতিমালা বাতিলের দাবি জানাচ্ছে।
রাজধানীর গুলশানে বিএনপির চেয়ারপার্সনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বেগম খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আরএ গণি, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, তরিকুল ইসলাম, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
