পশ্চিম আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়া ইবোলা ভাইরাস প্রতিরোধে দেশে ৯০ দিনের সতর্কতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার। এসময় সারাদেশে আন্তর্জাতিক বিমান, সমুদ্র, স্থল ও নৌবন্দরে বিশেষ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এর অংশ হিসেবে উল্লিখিত বন্দরগুলোতে একটি সমন্বিত শক্তিশালী মেডিক্যাল টিম কাজ করবে। ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়া দেশগুলো থেকে আসা যাত্রীদের পাশাপাশি সন্দেহজনক কাউকে পেলে তারা ইবোলার পরীক্ষা করবে। এজন্য কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ২০ শয্যা বিশিষ্ট একটি পৃথক ওয়ার্ড খোলা হচ্ছে। ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী পেলে তাকে তত্ক্ষণিক সেই হাসপাতালে প্রেরণ করা হবে।
গতকাল রবিবার সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ইবোলা ভাইরাস প্রতিরোধ সংক্রান্ত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম দেশের জনগণকে আশ্বস্ত করে বলেন, ইবোলা ভাইরাস প্রতিরোধে সরকার সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। এই ভাইরাসে আক্রান্ত কোন ব্যক্তি যেন কোনভাবেই দেশে প্রবেশ করতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রেখে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে জনগণকে আতঙ্কিত না হয়ে কেবল সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি। প্রসঙ্গত, লাইবেরিয়া, গিনি, সিয়েরা লিওন ও নাইজেরিয়াতে ইবোলা ভাইরাসের সংক্রমণে এ পর্যন্ত ৯৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। লাইবেরিয়া সরকার ইতিমধ্যে সে দেশে জরুরি সতর্কতা অবস্থা ঘোষণা করেছে। এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে উচ্চ তাপমাত্রার জ্বর, রক্তক্ষরণ, স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি, ডায়রিয়া ও বমির মতো উপসর্গ দেখা দেয়। সংক্রমণের পর রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায় ২ থেকে ২১ দিনের মধ্যে। ১৯৭৬ সালে কঙ্গোয় প্রথমবারের মতো শনাক্ত হয় ইবোলা ভাইরাস, যার নাম রাখা হয় সে দেশের একটি নদীর নামে। বন্য প্রাণী থেকে এই ভাইরাস প্রথমে মানুষে এবং পরে মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়। ইবোলা ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কার হয়নি। প্রাথমিক পর্যায়ে আক্রান্ত রোগীদের ৯০ শতাংশই মারা যাচ্ছিলেন। তবে বর্তমানে তা কমে ৬০ শতাংশে নেমে এসেছে। আক্রান্ত দেশগুলোতে দায়িত্বপালনরত বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের কেউ এ পর্যন্ত ইবোলায় আক্রান্ত হননি বলে আইএসপিআরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাস আফ্রিকা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে কয়েকদিন আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আন্তর্জাতিক সতর্কতা জারি করেছে। তবে ইবোলা ভাইরাস বাংলাদেশে ছড়ানোর ঝুঁকি খুবই কম। তাছাড়া পশ্চিম আফ্রিকার ইবোলা সংক্রমণের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি বিমান যোগাযোগও নেই। তারপরও সতর্কতার অংশ হিসেবে বিদেশ থেকে আসা সন্দেহভাজন যাত্রীকে বাংলাদেশে ঢোকার পথেই ইবোলা পরীক্ষা করা হবে। মোহাম্মদ নাসিম বলেন, আন্তর্জাতিক বন্দরগুলোতে নিয়োজিত মেডিক্যাল টিম-এ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সেনাবাহিনী, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, ইমিগ্রেশনসহ সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। তাদের কর্ম পরিধি এবং কার্যক্রম তত্ত্বাবধানে স্বাস্থ্য সচিবের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি কেন্দ্রীয়ভাবে কাজ করবে।
বৈঠকের শুরুতে রোগতত্ত্ব, রোগ নিরাময় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক ডাঃ মাহমুদুর রহমান ইবোলা ভাইরাস নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা সবার সামনে তুলে ধরে বলেন, যেসব দেশে ইবোলা ছড়িয়ে পড়েছে, সেসব দেশেই আক্রান্ত রোগীদের দেশত্যাগ করতে না দেয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। তারপরও বাড়তি সতর্কতা হিসাবে বাংলাদেশে বিমানবন্দর ও সব বন্দরে এর পরীক্ষা করা হবে। আগামী তিন মাস এই ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে। পরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যালোচনার ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভায় অন্যান্যের মধ্যে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক, স্বাস্থ্য সচিব এম এম নিয়াজউদ্দিন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডাঃ দীন মো. নূরুল হক, বিএমএ এর মহাসচিব অধ্যাপক ডাঃ ইকবাল আর্সলানসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
