যেতে হবে নতুন কোথাও। জসিমের প্রস্তাব সাতছড়ি। আমার ডাকে সাড়া দিয়ে জুটে গেল পাঁচজন। ছুট দিলাম সাতছড়ি। রূপসী বাংলার নয়নাভিরাম রূপ দেখতে দেখতে হাজির হই জীববৈচিত্র্যে ভরপুর নিঝুম বন সাতছড়ি। এক পাশে বন বিভাগের উদ্যান আর অন্য পাশে ঘন বন-জঙ্গল। প্রথমে গভীর বনে প্রবেশ করি। বনের ভিতর যতই যাচ্ছি ততই মুগ্ধ হচ্ছি। প্রকৃতি এখানটায় তার সবটুকু উজাড় করে দিয়েছে । সত্যিই সবুজ বাংলার অবিশ্বাস্য রূপ। সাতছড়ি বনে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় তিন শতাধিক পাহাড় রয়েছে। এখাকার গাছে গাছে চশমা হনুমানের লাফালাফি, বানরের বাঁদরামি, বন-মোরগের ছুটে চলা, গিরগিটির কি তীক্ষ চাহনি, সে এক অন্য রকম শিহরণ জাগানো অপার সৌন্দর্যের প্রাকৃতিক ভুবন। আমরা আরও কিছু দেখার জন্য অগ্রসর হয়ে শীলা খণ্ড দেখতে পাই। ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসে। ভীতু মজিবরের চেঁচামেচি, ‘ফিরে চল, আর যাব না।’ আক্তারের হুংকার, ‘রাতে বনেই থাকব।’ আমি ভাবলাম এতটা পথ কি হেঁটেছি যে, রাত হয়ে গেল! ততক্ষণে পকেট থেকে মোবাইল বের করে সময় দেখি মাত্র ৪টা ৩০ মিনিট। বাহ্ কি রোমাঞ্চকর অনুভূতি। দিনের আলো যেখানে হার মেনেছে, সেখানে আমাদের বিচরণ। আর না এগিয়ে অন্য পথে ফেরার রাস্তা ধরি। মূর্তা গাছের পাশ দিয়ে যেতেই চোখ ছানাবড়া, ওয়াও এত সুন্দর! বাহারি রঙের দুর্লভ প্রজাতির মাকড়শা। দেখে মনে হয় মডেলিংয়ের পোশাক পড়ে আপন মনে জাল বুনে যাচ্ছে। সামনে গিয়ে ক্যামেরা ক্লিক করতেই পেশাদার কোনো র্যাম্প মডেলের মতো পোজ দিচ্ছে। এরকম দৃশ্য দেখে পুলকিত না হয়ে পারি না। বেশ কিছুটা সময় মাকড়শার ফটোসেশন হলো। এবার ছুটার পালা। বনের ছড়া শুকিয়ে সেখানে দুধের মতো সাদা বালু। গাছে গাছে হরেক রকমের পাখি। এই বনে চাপালিশ, ডেউয়া, শিমুল, বহেরা, আমলকী, ডুমুর, বেলপুই, রঙ্গিসহ নানা প্রজাতির গাছ রয়েছে। প্রায় লোকালয়ে চলে এসেছি। এলাকাটি টিপরা পল্লী। কথা বলে তাদের যাপিত জীবন সম্পর্কে জানা হলো। মেয়েরা খুবই চঞ্চল ও অতিথিপরায়ন। এবার বনবিভাগের সৃজন করা উদ্যানের দিকে অগ্রসর হই। বাহ! কি সুন্দর পাহাড়, টিলার পাশে সারি সারি পাম গাছ, ডাব গাছ। সারিবদ্ধ গাছের নিচ দিয়ে হাঁটার মজাই আলাদা। গাইড নিয়ে আধা ঘণ্টা, এক ঘণ্টা এবং তিন ঘণ্টা ট্রেইল করার ব্যবস্থা আছে। সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের আয়তন সাড়ে তিন হাজার একর। এটি রঘুনন্দন হিল রিজার্ভ ফরেস্টের অংশ। সাতছড়ি মিশ্র চির সবুজ বন, চোখে না দেখলে লিখে বুঝানো সম্ভব নয়। পাহাড় থেকে সমতলের দিকে তাকালে মনে হয় শিল্পীর তুলিতে আঁকা কোনো ছবি। দৃষ্টিসীমা যতদূর যায় শুধু সবুজের ঢেউ। বাতাসে বুনো ফুলের গন্ধ। পুরো পরিবেশটাকে মনে হবে প্রকৃতির স্বর্গ। পাম গাছের দৃষ্টিনন্দন বাগান ভ্রমণপিপাসুদের বাড়তি আনন্দের উপাদান। সাতছড়ি বনের পাশেই ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য। ঠিক সন্ধ্যায় বানরের লোকালয়ে বিচরণ ভ্রমণপিপাসুদের অভিভূত করে। ভ্রমণে বাড়তি পাওনা বনের পাশেই চা বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ। সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান হবিগঞ্জ জেলার চুনারঘাট উপজেলায় অবস্থিত। ঢাকা থেকে এর দূরত্ব ১৩০ কিলোমিটার। কোনো এক কাক ডাকা ভোরে ইট, পাথরের গণ্ডি ছেড়ে ছুটে যেতে পারেন নয়ন জুড়ানো বন সাতছড়ির উদ্দেশ্যে। আর মনে রাখবেন, আমাদের মতো হৈ-হুল্লোড় করে যেন উল্লুক না দেখে ফিরতে না হয় তাই বনের ভিতর চাই নীরবতা। প্রবেশ টিকেটের মূল্য প্রাপ্ত বয়স্ক ২০ টাকা, ছোটদের ১০ টাকা।
কীভাবে যাবেন :ঢাকা থেকে সিলেটগামী বাসে শায়েস্তাগঞ্জে নামতে হবে, ভাড়া ৩০০ টাকা। শায়েস্তাগঞ্জ থেকে সাতছড়ি সিএনজি রিজার্ভ করে যেতে হবে, ভাড়া ১৫০ হতে ২০০ টাকা। গাইড নিয়ে ট্রেইল করার ব্যবস্থা রয়েছে।
ছবি :দে-ছুট ও সংগ্রহ
