অভাব-অনটনে এমনিতেই সংসার চলে না, তার উপর মেয়ের হূদযন্ত্রে জন্মগত ত্রুটি। একটি নয় হূদযন্ত্রে দুটি ছিদ্র। কি করবেন কিছুই ভাবতে পারছিলেন না সুজন। মেয়ে সুষমাকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ধর্নাও দিয়েছেন। কোন লাভ হয়নি। অবশেষে সুষমার অপারেশন হয়েছে বিনামূল্যে। বুক থেকে পাথর নেমেছে সুজনের। সুষমার মত এমন শতাধিক দরিদ্র শিশুকে নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ করে দিয়েছে রাজধানীর জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট। অপারেশন করে সারিয়ে দিয়েছে অসহায় দরিদ্র শিশুদের হূদযন্ত্রের নানা জটিলতা। ২০১১ সাল থেকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দরিদ্র শিশুদের ব্যয়বহুল চিকিত্সা দিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি সারজাহ চ্যারিটি ইন্টারন্যাশনালের সহযোগিতায়। গতকাল সোমবার পর্যন্ত দেড়শ শিশু ফিরে পেয়েছে স্বাভাবিক জীবন ।
বুক না কেটে শুধুমাত্র ধমনির মাধ্যমে এ চিকিত্সাসেবা দেয়া হয়। পা ও পেটের মধ্যবর্তীস্থানে কুচকিতে সুইয়ের মাধ্যমে রক্তনালীর মধ্যে টিউব ঢুকিয়ে দেয়া হয়। টিউবটি হূদযন্ত্রের যেখানে ছিদ্র রয়েছে সেখান পর্যন্ত ঢুকানো হয়। টিউবের ভেতর ঢোকানো হয় সরু নল, নলের এক মাথায় থাকে ছোট একটি ডিভাইস। অপর প্রান্তে থাকে ছোট পাম্পার। নলটি হূদযন্ত্রে যেখানে ছিদ্র থাকে সেখানে গেলে পাম্পারে চাপ দিলে ডিভাইসটি বেলুনের মত ফুলে উঠে। বন্ধ হয়ে যায় হূদযন্ত্রের ছিদ্র। পুরো অপারেশনে সময় লাগে মাত্র ৪৫ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা। রোগীকে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটেও রাখতে হয় না। রোগী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ফিরতে পারেন বাড়ি। সর্বাধুনিক এই চিকিত্সা পদ্ধতিকে বলে এনজিওগ্রাফি।
ঝুঁকিমুক্ত সর্বাধুনিক এই পদ্ধতি উন্নত বিশ্বে হূদযন্ত্রে জন্মগত ত্রুটি ও জটিলতা নিয়ে জন্মানো শিশুদের চিকিত্সায় ব্যবহার হচ্ছে। আগে হার্ট ছিদ্র ও জটিলতা নিয়ে জন্মানো এ সকল শিশুদের বুক কেটে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টার অপারেশন করা হতো। যাকে বলে ওপেনহার্ট সার্জারি। ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ৭ দিন পর্যন্ত থাকতে হত রোগীকে। তারউপর বুকে দাগ থেকে যায় বহু বছর। এরপরও শরীরের থাকে নানা জটিলতা । এখনও হার্টে পুরাতন জটিলতা কিংবা ভালব ছিদ্র নিয়ে জন্মানো শিশুদের ক্ষেত্রে অপারেশন করা হয়। তবে সংখ্যায় খুব কম বলে হূদরোগ ইনস্টিটিটিউটের শিশু কার্ডিয়াক সার্জন ডা: আবদুস সালাম জানান। জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউটের সূত্রে জানা যায় গত বছর ৪৫০ জন শিশুকে সর্বাধুনিক পদ্ধতিতে অপারেশন করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৮০ ভাগ ছিল দরিদ্র শিশু।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি একশ শিশুর মধ্যে দুই জনের হূদযন্ত্রে ছিদ্র কিংবা গুরুতর জটিলতা থাকে। বাংলাদেশে ভেজাল ও বিষাক্ত খাদ্য গ্রহণের কারণে নানা জটিলতা নিয়ে জন্মানো শিশুদের সংখ্যা অনেক বেশি।
শিশু কার্ডিয়াক সার্জনদের মতে এদেশে বর্তমানে তিন লক্ষাধিক শিশুর হূদযন্ত্রে ছিদ্র রয়েছে। এদের মধ্যে ৮০ থেকে ৯০ ভাগই দরিদ্র। তাদের পক্ষে এ ব্যয়বহুল চিকিত্সা করানো প্রায় অসম্ভব।
এই অবস্থায় জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট তাদের সীমিত সম্পদ দিয়ে জনহিতকর কাজ করছে। সরকারের ঘোষণা, হাসপাতাল কর্তপক্ষ, চিকিত্সক, নাসসহ সংশ্লিষ্টদের সেবার মানসিকতায় এটি করা সম্ভব হয়েছে।
হূদরোগ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা: আবদুল্লাহ আল কাদী মজুমদার ও শিশু কার্ডিয়াক সার্জন অধ্যাপক ডা:আবদুস সালাম হতদরিদ্র শিশুদের চিকিত্সা সেবা দেয়ার উদ্যোগ নিলে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় সারজাহ চ্যারিটি ইন্টারন্যাশনাল। ওই প্রতিষ্ঠানের একটি শিশু কার্ডিয়াক বিশেষজ্ঞ দল ২০১১ সাল থেকে জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউটে হতদরিদ্র শিশুদের সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে বিনামূল্যে চিকিত্সা দিয়ে আসছে।
গতকাল এ দলটি ১৭ জন হতদরিদ্র শিশুর অপারেশন করে। রবিবার করে ৫ জনের।চিকিত্সকরা জানান, ওই্ শিশুরা এখন সুস্থ আছে। বিশেষজ্ঞ দলটি আগামীকাল বুধবার পর্যন্ত তাদের কার্যক্রম চালাবে। এ জন্য ৫০ জন শিশুকে বিশেষজ্ঞ দলটি হতদরিদ্র পরিবারের বলে নিশ্চিত করে তালিকা করেছে। তাদের ৪০ জনকে সর্বাধুনিক পদ্ধতিতে এবং ১০ জনকে ওপেনহার্ট সার্জারি করবে।
২০১১ সাল থেকে বিশেষজ্ঞ দলটি ৪ বার এসে একশ হতদরিদ্র শিশুকে সর্বাধুনিক পদ্ধতি চিকিত্সাসেবা দিয়ে সুস্থ করে স্বাভাবিক জীবন দিয়েছে।
এর ফলে হূদরোগ ইনস্টিটিউটের শিশু কার্ডিয়াক সার্জন, অন্যান্য চিকিত্সক, নার্স ও টেকনোলজিস্ট অভিজ্ঞতাও অনেক অর্জন করছে বলে পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ আল সাফী মজুমদার জানিয়েছেন।
মৌলভীবাজার জেলার বালাগঞ্জ উপজেলার ফতেপুর গ্রামের কৃষক তহুর আলীর ১৫ মাসের শিশু কন্যা মরিয়ম, সাভারের মোগরাকান্দা গ্রামের কৃষক জমির আলীর ৮ মাসের শিশুপুত্র আব্দুল্লাহ, মিরপুর কাজী পাড়ার ভ্যান চালক ফারুকের দুই বছরের শিশু কন্যা সুর্বনা, কেরানীগঞ্জ জিনজিরা এলাকার হোটেল কর্মচারী সুজন আহমেদের তিন বছরের শিশু কন্যা সুষমা, বগুড়া জেলার আদমদীঘি উপজেলার সিহাড়ি গ্রামের টেইলার্সের কর্মচারী আব্দুল মান্নানের শিশু কন্যা মীমের অপারেশন সম্পন্ন্ হয়েছে।
এ সব শিশুদের অভিভাবকরা জানান, জন্মগত হার্ট ছিদ্রের কারণে শিশুদের সর্দি কাশি লেগেই থাকতো। চিকিত্সায় ভাল হতো না। মাঝে ডায়রিয়া দেখা দিত। বিনামূল্রে এ ব্যয়বহুল সর্বাধুনিক চিকিত্সা পেয়ে তাদের সন্তানরা সুস্থ জীবন ফিরে পাবে। এটা যেন আকাশের চাঁদ পাওয়ার কাহিনী। অনেকে আবেগে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
