ঠন ঠন ঠন.......
স্কুল ছুটি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দৌড় শুরু করে খোকা। স্কুল থেকে বাড়ি খুব দূরে না। এক নিঃশ্বাসে বাড়ি চলে আসে। বাড়ির উঠোনে ঢুকে হাঁপায়। সঙ্গে সঙ্গে এক ঝাঁক পায়রা ওকে ঘিরে মাথার ওপর উড়তে থাকে। কেউ কেউ আবার খোকার মাথায় বা কাঁধের ওপর বসে। পায়রাগুলো খোকার আসার অপেক্ষায় থাকে।
খোকা ওদের সঙ্গে খেলতে শুরু করে। বই খাতা রেখে দুদিকে দু হাত প্রসারিত করে দাঁড়ায়। বাকি পায়রাগুলো ওর দুহাতের ওপর দাঁড়ায়। ডাক ছাড়ে গম গম গম...। বাক বাকুম বাক বাকুম...। এ এক অদ্ভুত খেলা খোকা আর পাযরাগুলোর। বাড়ির সবাই অভ্যস্ত এই খেলা দেখতে।
মা সায়রা খাতুন তাড়া দেন, ও খোকা স্কুল থেকে এলি, চারটে মুখে দে। সকালেও না খেয়ে স্কুলে গেলি। ও খোকা?
আসতেছি, তুমি খাবার দাও।
মা বারান্দায় আসন পেতে খেতে দেয় খোকাকে। খোকা আর পায়রা মিলে খেতে বসে। খোকা ভাত মাখে ওরা চারপাশে ঘোরে। বোয়াল মাছ দিয়ে ভাত মেখে নিজে খায়, ওদের জন্য ছিটিয়ে দেয়। কেউ দু একটা ভাতে ঠোকর দেয়, কেউ দেমাগ দেখিয়ে দূরে সরে যায়। ভাব দেখায়, আমি ভাত খাই না। আমি খাই মটরদানা, ধান, কাউন, গম।
খাওয়া শেষে খোকা যায় পায়রাদের খোপের কাছে। ওরাও উড়তে উড়তে যায় খোকার সঙ্গে। পুরনো দালান বাড়ি। খোকা দালানের বারান্দায় কয়েকটা খোপ বানিয়ে দিয়েছে। বাড়িতে কয়েকটা বিড়াল আছে। তারা তক্কে তক্কে থাকে, কখন পায়রাদের কাউকে ধরে সাবাড় করা যায়, এই চেষ্টায়। খোপের কাছে গিয়ে ভেতরে উকি দেয় খোকা। পানি নেই। দানা নেই। ভেতরে দুটো সাদা ডিম । ডিম দুটো হাতে নেয়। গালের সঙ্গে চেপে ধরে। মিহি ডিমের ওম মাখে। বেশ লাগে।
ডিম আবার রেখে দেয় খোপের ভেতরে। দৌড়ে পুকুর পারে যায় খোকা। ওর পেছনে পেছনে উড়ছে কয়েকটা পায়রা। পুকুর পারের গাছের ডালে বসে। খোকা পানি নেয় বাটিতে করে। উড়ে এসে বসে মাথায়। সারাদিন এভাবেই খোকা আর পায়রাদের খেলা চলে।
মাঝে ঝামেলা হয়েছিল। দাদি জানতে চাইছিলেন, খোকা তোর পায়রা কতোগুলোরে?
বাইশটা দাদি।
একটা পায়রা আমাকে দে।
হাসে খোকা, তুমি পায়রা দিয়ে কী করবে?
খাবো।
মানে?
আমার খুব ইচ্ছে করছে পায়রার মাংস দিয়ে ভাত খেতে।
না, আমি তোমাকে পায়রা খেতে দেবো না।
তোর এতো পায়রা, একটা পায়রা দিলে আর কী হবে? ডিম পারতেছে কতো, ছাও হবে। আবার পায়রা বাড়বে। দে না দাদু ভাই। বুড়া মানুষ, কবে মইরা যাই!
শোনো দাদি, পায়রা হচ্ছে শান্তির প্রতীক। আমি শান্তির এতো সুন্দর পায়রা হত্যা করতে পারবো না। তুমি ভেবে দেখো, পায়রাগুলো কিভাবে আমার চারদিকে ঘোরে আর উড়ে বেড়ায়। ওরা আমার মাথায় বসে, হাতে বসে, ওরা আমার ঠোঁটে চুমু খায়। দেখতে কী সুন্দর লাগে, দল বেঁধে যখন আকাশে ওড়ে, মনে হয় আকাশ জুড়ে শান্তির মেঘ উড়ে যায়, সেই পায়রাদের মাংস কেমন করে খাবে?
দাদিতো অবাক। বলে কী খোকা? শান্তির প্রতীক পায়রা? বাপের জন্মে এমন কথা শোনেননি দাদি। ছোট বেলায় দাদির ভাইয়েরা কতো পায়রা পেলেছে। মাসেতো দু একবার পায়রার মাংস দিয়ে ভাত খেয়েছেই। সেই স্বাদ এখনও জিব্বায় লেগে রয়েছে। কতো বার খোকার মাকে বলেছে, বৌমা আমি পায়রার মাংস দিয়ে ভাত খাবো। বৌমাতো জানে, পায়রা জবাই করলে বাড়িতে তুলকালাম কাণ্ড বেঁধে যাবে। অথচ মুরব্বী মানুষ একটা আশা করেছে, কি করা যায়? বুদ্ধি করে সায়রা খাতুন ছোট আকারের একটি মুরগী জবাই করে রান্না করেন। দুপুরে মুরগীর মাংস দিয়ে শ্বাশুড়িকে ভাত খেতে দেন। মজা করে ভাত খেয়ে তিনি বললেন, ও বৌমা? মাংস যে আমারে দিলা, কিসের মাংস?
চমকে ওঠেন সায়রা খাতুন। নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন, কেনো আম্মা রান্না ভালো হয়নি?
হাসেন খোকার দাদি, রান্না তোমার ভালোই হয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয়েছে মাংসটা পায়রার না, মুরগীর।
কী যে বলেন আম্মা!
বাড়ির বিড়াল মাস তিনেক আগে একটা পায়রার বাচ্চা মেরে ফেলেছিল। খোকা সারাদিনে খায়নি। পড়ার টেবিলে পায়রার মৃত বাচচা নিয়ে বসে থেকেছে। বিকেলে বাড়ির সামনের কবরস্থানে কবর দিয়ে, কবরের পাশে একটা বাদাম গাছ লাগিয়েছে। সেই ছেলের পায়রা জবাই করলে, ছেলে তার না খেয়েই থাকবে কয়েক বেলা। তখন বাড়িতে শুরু হবে নতুন এক মহাঝামেলা।
তার মাস চারেক আগে বিকেলে খেলার মাঠ থেকে এসে দেখে, দুটো পায়রা বাসায় আসেনি। পায়রাগুলো সারাদিন নানা জায়গায় যায়, মাঠে যায়, খাবার খুঁটে খুঁটে খায়। পায়রা না পেয়েই কান্নায় ভেঙে পড়ে খোকা। বাবা লুত্ফর রহমান জিজ্ঞেস করেন, কী হয়েছে?
আমার দুটো পায়রা আসেনি।
আসেনি মানে?
কেউ ফাঁদ পেতে ধরেছে।
কেউ ফাঁদ পেতে ধরে ফেললে আর কী করবে?
আমি ওদের বিরুদ্ধে মামলা করবো।
বাবা হাসেন, কে বা কারা তোমার পায়রা ধরেছে তুমি জানো?
চোখ মুছে খোকা, আমি কেমন করে জানবো?
তাহলে মামলা করবে কার বিরুদ্ধে?
চুপ করে থাকে খোকা। রাতে না খেয়ে ঘুমিয়েছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে টো টো করে সারা এলাকা ঘুরেছে। যারা পায়রা পালে, তাদের কাছে গিয়েছে। কেউ কোনো খবর দিতে পারেনি। দুপুরে বিষন্ন মুখে বাড়ি এসেছে। বাবা বলেন, পায়রা এভাবে অনেক সময়ে পাওয়া যায় না। দুষ্ট লোকেরা ফাঁদ পেতে ধরে ফেলে। তাই বলে না খেয়ে থাকতে হবে?
মানুষ এমন কেনো? পায়রাগুলো ওদের কী ক্ষতি করেছিল? জলচোখে প্রশ্ন করে খোকা।
মানুষ এমনই হয়, স্বস্নেহে বলেন বাবা লুত্ফর রহমান, রাতে খাওনি। সকালে খাওনি। এখন দুপুর— তোমার মাও খায়নি। দুপুর হয়েছে। যাও, গোসল করে ভাত খাও। আমি বিকেলে বাজার থেকে চারটে পায়রা কিনে দেবো।
খোকা তাকায়, সত্যি দেবে?
সত্যি দেবো।
এক দৌড়ে খোকা পুকুরপারে যায়। বাবা হাসেন, তার ছেলেটা সব ছেলেমেয়েদের মধ্যে একটু অন্যরকম। ভীষণ অভিমানী আর সাহসী।
খোকা তো আর চিরকাল গ্রামে টুঙ্গিপাড়ায় থাকতে পারে না! খোকা বড় হয়েছে। লেখাপড়া করেছে গোপালগঞ্জে, মাদারীপুর, কলকাতায় ও ঢাকায়। খোকা রাজনীতি করে দেশের মানুষের জন্য। কিন্তু তাঁর পায়রা, পায়রার খোপ থেকে যায় টুঙ্গিপাড়ায়। যখনই যায়, তাদের সঙ্গে কথা বলে। পায়রাগুলো তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আদর খায়। বাক বাকুম ডাকে...।
এলো ভয়ংকর একাত্তর সাল। ছাব্বিশে মার্চ। পাকিস্তানি আর্মিরা খোকাকে বন্দী করে নিয়ে গেছে পাকিস্তানে। আর গ্রামের বাড়িঘর দিয়েছে জ্বালিয়ে। সব পুড়ে ছাই। কিন্তু খোকার শান্তির পায়রাগুলো কোথায়? ওরা আকাশে আকাশে উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়ায়, অপেক্ষায় থাকে— কবে আসবে খোকা? কখন আসবে খোকা? খোকার শান্তির পায়রাগুলো জানেন না, তাদের খোকা বন্দী পাকিস্তানের লায়ালপুর কারাগারে। চারদিকে কঠিন পাহারা। কারাগার কঠিন দেয়াল দিয়ে ঘেরা। সামান্য একটু ফাঁক। সেই ফাঁক দিয়ে তাকায় খোকা আকাশের দিকে, যদি তার পায়রাদের দেখা যায়, এই আশায়!
