কবিতার জীবন

আপডেট : ৩১ মে ২০১৯, ১৯:৩০

এই আত্মকথা কোনো পূর্ণাঙ্গ জীবনকথা নয়, খণ্ডাংশ, সেইটুকু যা কবিতার জীবন। প্রকৃতপক্ষে তা-ই আমার জীবনী। সব জীবনীই মূলত খণ্ডিত, পূর্ণাঙ্গ নয়, পূর্ণাঙ্গ জীবনী হয় না। এই আত্মকথার মধ্যে নানা অসঙ্গতিও আছে, জোড়াতালি দিয়ে যা দাঁড়িয়েছে, তা-ই একই কথা একই বিষয় হয়তো একজায়গায় একভাবে বলেছি, এখন বলছি অন্যভাবে। এটাই স্বাভাবিক। আমি আত্মজীবনী শিখিনি ঠিকই, কিন্তু বিভিন্ন সাক্ষাত্কারে, অন্য কোনো কোনো রচনার মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে নিজের জীবনের নানা কথা বলেছি, সে সব আমার মনে নেই, কোথায় কী বলেছি কী লিখেছি ভুলে গেছি, স্মৃতি প্রতারক। ফলে একই ঘটনা অন্যরকম হতেই পারে, কিছু করার নেই। এ কোনো সুসংবদ্ধ আত্মজীবনী নয়, অনেকটাই এলোমেলো, অসংলগ্ন। আত্মকথা লেখার জন্য আমার কোনো প্রস্তুতি ছিল না, কোনো নোট রাখিনি, দিনলিপি বলে আমার কিছু নেই, স্মৃতিই নোটবুক, ‘স্মৃতি ছাড়া কোনো নোটবুক নাই’। তার ওপর নির্ভর করেই যখন যা মনে পড়েছে বলেছি বা লিখেছি, স্বাভাবিকভাবেই তাতে দুই রকম কথা কিংবা দুইর কম বিবরণ থাকতেই পারে। জীবনকথা কোনো যথার্থ ইতিহাস নয়, ইতিহাসও আছে, কাহিনিও আছে, খণ্ড খণ্ড স্মৃতি, এক অর্থে উপন্যাসও, গল্পও। সত্য আছে, অসত্যও আছে, তাকে নিখাদ সত্য বলার উপায় নেই। সে পারেন রুশো, তাঁর ‘কনফেশন’, যা জীবনীগ্রন্থের মহত্তম দৃষ্টান্ত, আত্মস্বীকৃতির মহাকাব্য। এমন জীবনী প্রায় দুর্লভ। বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, মানুষ যখন নিজের অপরাধের কথা বলে তখনো এমনভাবে বলে যাতে অন্যের মনে সহানুভূতির উদ্রেক হয়, মানুষ নিজেকে খারাপ বলেও ভালোই বলতে চায়। এই দুর্বলতা মানুষের সহজাত। মহত্ জীবনীগ্রন্থগুলোও সম্পূর্ণভাবে এই প্রবণতা থেকে মুক্ত নয়। কোন মানুষ না চায় অন্যের কাছে তার ভালো ভাবমূর্তি তুলে ধরতে, নিজেকে যে খারাপ বলে সেও তার কৌশল। আলবার্তো মোরাভিয়া বলেছিলেন, ভান না করাও একধরনের ভান। নিখুঁত সত্য মেলা দুষ্কর।

জীবনী মাত্রই অসম্পূর্ণ, তাকে জীবনসমগ্র বলার উপায় নেই। সেখানে সত্যমিথ্যার মিশ্রণও থাকে, অতিকথনও থাকে। ‘সে কহে বিস্তর মিছা যে কহে বিস্তর’। অন্যের চোখে নিজেকে মহত্ করে তোলার, হিরো করে তোলার চেষ্টা কার না থাকে। স্বীকারোক্তিমূলক কবিতাও তো এই চিন্তা থেকেই লেখা, অন্তরালে থাকে এই মনোভাবই। মানুষ নিজেকে শুদ্ধ করার জন্যই আত্মঅপরাধের ক্ষমা চায়, নিজেকে দগ্ধ করে, রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘অন্য পথ নাহি’। মানুষ সম্পূর্ণ ভালোও নয়, সম্পূর্ণ মন্দও নয়; দোষগুণ ভালোমন্দ মিলিয়েই মানুষ, সংযতও, সে অসংযতও, কামনাতাড়িত, আবার সংযমী, দৃঢ়। এই দুই মানুষকে একইসঙ্গে চিত্রিত করা সহজ নয়, মানুষ নিজেও জানে না এক মানুষের মধ্যে এই যে বহু মানুষ, এত ভিন্ন ভিন্ন মানুষ। এক জীবনের মধ্যেই যে কত রকম জীবন মানুষ নিজেও তা জানে না। আত্মজীবনী রচনার ক্ষেত্রে আত্মআবিষ্কার নিঃসন্দেহেই কঠিন কাজ।

আত্মজীবনীকে আমি মনে করি ভুলসমগ্র, কবিতার জীবনও তো তা-ই। ধারাবাহিক সুবিন্যস্ত আত্মজীবনী নয়, কবিতার জীবন হচ্ছে ধারাবাহিকতার বাইরে পারম্পর্যহীন জীবন, অস্বাভাবিক, অসংলগ্ন। আমি কিছুই তো গড়তে পারিনি, শুধুই ভেবেছি, কোনো কীর্তি নেই আমার, কোনো প্রতিষ্ঠান, সমাজহিতৈষণা, কিছুই নেই, বলা যায়, অক্ষম মানুষ আমি, কাতর। জীবনী লেখার বড় সমস্যা নিজে ঘটনার মধ্যে থেকে তা নির্মোহভাবে দেখা। তরী থেকে তীর দেখা। তরীও দেখা। নির্মোহ হয়ে না দেখতে পারলে সে দেখা মোহমুক্ত হবে না। কিন্তু এ বড় কঠিন কাজ, কঠিন সাধনা। আমিত্ব ত্যাগ করা সহজ নয়, আমিত্ব বা সেলফ ত্যাগ করতে পারলে তো সমস্যাই থাকে না, তার জীবনী লেখারই বা প্রয়োজন কী? আমি কিছুই নই, যন্ত্রমাত্র, এখানে পৌঁছাতে পারলে আত্মকথা তো লেখারই প্রয়োজন হয় না। সব প্রশ্নের তো মীমাংসার উপায় নেই, তাই ‘উত্তরে রহিবে মৌন’। নিজের জীবনকে নির্মোহ দর্শকের দৃষ্টিতে ফুটিয়ে তোলা যায় কি, গেলেও কতটা যায়?

প্রতিদিনের যে জীবন তার সব তথ্য তো আর খুঁজে পাওয়া যাবে না, সময় তো গ্রাস করে ফেলেছে বহু কিছুই, তার মধ্যেও তো আছে কত ঘটনা, কত সামগ্রী, কত উপকরণ, কত নাম, একেকটি অধ্যায় কত বিচিত্র, কতদিনের হারানো স্মৃতি, কতকিছুই তো ভুলেও গেছি হারিয়েও ফেলেছি, সেই র্যালে সাইকেল, কলের গান, হারমোনিয়াম, পাশা খেলার গুটি, মার্বেল, গুলতি, লাটিম, কদমা, বাতাসা, মিছরি, পাটালি, গুড়, মুড়কি, ঝুরি, মুড়ির মোয়া, চিড়ার মোয়া, নারকেলের নাড়ু, তিলের নাড়ু, চালের নাড়ু, কত রকমের যে পিঠা, কুলফি পিঠা, পুয়া পিঠা, গোকুল পিঠা, হারানো জীবনের কত যে চিত্র, কত যে বিবরণ। সেই তো আমার জীবন, তা তো আর দেখানোর উপায় নেই, সেসব যে আমার মন ভরে আছে। তাকেই আমি মনে করি জীবনী, কেউ নাও করতে পারে। আমি নিরুপায়। কথায়, ব্যাখ্যায়, বিবরণে আমি বোঝাতে চেয়েছি জীবন কেমন, বিশেষভাবে কবির জীবন, পাকেচক্রে সেই আমার জীবন, দিনপঞ্জি নয়, সময়ের খণ্ড ক্ষুদ্র ছবি। কবির পক্ষে যা হওয়া সম্ভব, যেমন হওয়া সম্ভব, কত কিছুতে জড়িয়ে গেছি, আনন্দিত হয়েছি, বাসনাতাড়িত হয়েছি, দমন করা হয়নি; দ দ দ, দাম্যত, দত্ত, দয়াধ্যম্, আত্মদমন করো, দান করো, দয়া করো, এলিয়টের ওয়েস্ট ল্যান্ডেও এই তিন দ-এর প্রতিধ্বিনি শোনা যায়। শেক্সপিয়র তো প্রস্তরখণ্ডের মধ্যেও সদুপদেশ পেয়েছিলেন (Sermons in Stones), সবার হয় না। এমনি করেই ঘোরের মধ্যে দিন চলে গেছে, একেকটি ঘূর্ণিস্রোতে, একেকটি ঝাপটায় কোথা থেকে কোথায় চলে গেছি, সব ভেঙেচুরে তছনছ হয়ে গেছে, কিছুই দাঁড়ায়নি, কতবার যে আমি স্রোতের মুখে পড়েছি, জ্ঞানবুদ্ধি লোপ পেয়েছে, স্বপ্নতাড়িত মানুষের মতো কোথায় যে চলে গেছি, ভাবলে কেঁপে উঠি, কাতর হয়ে পড়ি, দুঃস্বপ্ন বলে মনে হয়। কিন্তু কিছুই তো আর করার নেই, টাইম মেশিন নেই, কিছুই আর শোধরানো যায় না। নিজের জীবনকে কতবার দুর্যোগের মুখে ঠেলে দিয়েছি, আমিই জানি সে কী ভয়াবহ দুর্যোগ, কী বিষম আত্মক্ষয়, নিজেকে ধ্বংস করা; সেজন্যই এই ভয়াবহ জীবনকে বলেছি কবিতার জীবন, কবি ছাড়া এমন ধস্ত জীবন আর কারই বা হতে পারে? কবির জীবন বড় সুখের নয়, ঝরাতে ঝরাতে, ছড়াতে ছড়াতে একটা জীবন চলে যায়। এই ছোট্ট জীবনটা নিয়ে বড় বেশি পাগলামি।

স্কুলে পড়ার সময়ই আমি লেখালেখি শুরু করি, তা সবই কিশোর বয়সের লেখা। এর মধ্যে আমাদের স্কুলটি শিক্ষাবোর্ডের মঞ্জুরি না পেয়ে বন্ধ হয়ে যায়। আমি ধুনট হাইস্কুলে পড়তে যাই। বগুড়া জেলায়, কিন্তু কয়েক মাইল দূরে। এখানে যজ্ঞেস্বর বাবু বাবার মেসতুতো ভাই। বিত্তশালী ব্যক্তি, নামডাকও আছে, স্কুল কমিটির প্রভাবশালী সদস্য। এই বাড়িতেই আমি থাকি। স্কুলের হেডমাস্টার তখন সোলায়মান মিয়া। ইংরেজির শিক্ষক প্রভাষ দত্ত, চিত্রপরিচালক সুভাষ দত্তের বাবা। বাংলা পড়ান আবদুর রহমান সাহেব। আমার আরেক কাকা সতীশবাবুও এই স্কুলের শিক্ষক। শিক্ষকেরা পত্রিকার পাতায় আমার কবিতা দেখে খুবই খুশি হন। সবাই স্নেহ করেন আমাকে। বুধাদা স্কুলের দপ্তরি, ঘণ্টায় ঘণ্টায় বেল বাজান, খুব ভালো মানুষ। তখন আমাদের পরীক্ষাকেন্দ্র ছিল বগুড়ায়। পরীক্ষার দু দিন আগে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। অসুস্থ শরীরেই পরীক্ষা দিতে যাই। পরীক্ষা শেষে বাড়ি আসি। অখণ্ড অবসর। রেজাল্ট হতে দুই মাস, আড়াই মাস। ঠিক করলাম ঢাকা কলেজে পড়ব। ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ তখন এম ইউ আহমেদ। সাইকোলজির নামকরা শিক্ষক। পরে আজিমপুরে চায়না বিল্ডিংয়ের গলিতে ‘সাইকি’ নামে তাঁর বাড়িটির পাশে ‘রংপুর হাউস’-এ আমি থেকেছিও। ইংরেজির শিক্ষক আবু রুশদ মতীন উদ্দীন, মাসুদ সাহেব, নুরুজ্জামান সাহেব। বাংলার অধ্যাপক হিশামউদ্দীন, কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান, কবি আশরাফ সিদ্দিকী। বিখ্যাত ব্যক্তিদের সমাবেশ তখন ঢাকা কলেজে। আমি এই কলেজে এসে ভর্তি হলাম। নিউ মার্কেটের পাশেই নতুন ভবন। খুবই সুন্দর। নিউ মার্কেটও তখন জ্বলজ্বল করে! কেউ ঢাকা এলে নিউ মার্কেট না দেখে যায় না। ঢাকা কলেজের হিন্দু হোস্টেল তখন কলেজ থেকে অনেক দূরে, আগামসি লেনে। এখানে তখন একটি ল কলেজ ছিল। সেই ল কলেজের গা ঘেঁষে একটি পুরনো পরিত্যক্ত জমিদার বাড়িতে এই হোস্টেল। হোস্টেল সুপার হচ্ছেন বাংলার অধ্যাপক নিজামুদ্দীন সাহেব। তিনি তাঁর পরিবারসহ দোতলায় থাকেন। হিসাব বিভাগের অনিল বাবুও এই হোস্টেলে থাকেন। তাঁর ওপর ছাত্রদের দেখাশোনার দায়িত্ব। আমরা পনেরো-বিশজন ছাত্র এই হোস্টেলে থাকি। পুরনো ইঁদারা থেকে যার যার দড়ি বালতি নিয়ে জল তুলে স্নানের ব্যবস্থা। শীতের দিনে ইঁদারার জল বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে থাকে। স্নান করা এক দুঃসহ ব্যাপার। একটি টিনের ঘরে রান্নার ব্যবস্থা। বারান্দায় লম্বা টেবিল পাতা। সেখানে গামলা একটা বাঁশের ঢাকনা নিয়ে ঢাকা থাকে। স্যানিটারি ব্যবস্থা বলার মতো নয়। নিজামুদ্দীন স্যারের একটি মুলতানি গাভী ছিল। হোস্টেলের সামনের উঠানে ছেড়ে দেওয়া থাকত। একটু বৃষ্টি হতেই ওই উঠানে জলকাদা হয়ে যেত। যখন জলকাদা থাকত না তখন এখানে ব্যাডমিন্টন খেলতাম। পাশের বাড়িটিতে কারা থাকতেন ঠিক জানি না। এই বাড়িরই একটি মেয়ে ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। মাঝে মাঝে দোতালার বারান্দায় বসে আমাদের খেলা দেখে। তার নাম ঠিক মনে নেই, আমরা তাকে দিদি বলি, বোধহয় উষাদি। কখনো হয়তো একটু হাসে বা হাত নাড়ে। কথা তো হয়নি তেমন।

আগে ঢাকার রেলস্টেশন ছিল ফুলবাড়িয়া। পুরনো রেললাইন ধরে আমরা হেঁটে কলেজে যাই। অনেক সময় লাগে। সকালে উঠেই কলেজের জন্য তৈরি হতে হয়। দৌড়ঝাঁপ করে স্নান, খাওয়া, তারপর কলেজে ছোটা। আমার সঙ্গে পড়ত দ্বিজেন, বোধহয় কুষ্টিয়ায় বাড়ি। দুজনে একইসঙ্গে কলেজে যাই। কলেজে যখন ক্লাস থাকে না তখন দুজনে ঘুরতে যাই নিউ মার্কেটে। তখনকার দিনের নিউ মার্কেট একেবারে ঝকঝক করত। নিউ মার্কেটের ভেতরে ঢুকে আমরা আর রাস্তাটা খুঁজে পেতাম না। ঘুরে ঘুরে পথ বের করি। দুপুরবেলার দিকটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাও বইখাতা কিনতে নিউ মার্কেটে আসত। দ্বিজেন কথায় কথায় ইংরেজি বলে। প্রথম প্রথম কলেজে পড়ার সময় বোধহয় একরমই হয়। এই নিয়ে সবাই ওকে ঠাট্টাতামাশা করে। দ্বিজেনের তাতে কিছু আসে যায় না। সে অসংকোচে যেখনে সেখানে ইংরেজি বলে। আমি মনে করি, দ্বিজেন ইংরেজি বললে ক্ষতি কী। আমি এজন্য কখনোই ওকে হাসিঠাট্টা করিনি। অল্পদিনের মধ্যেই আমরা দুজন বন্ধু হয়ে উঠি। এভাবে বেশিদিন চালানো গেল না। কিছুদিনের মধ্যেই টাইফয়েড হয়ে গেল আমার। ভীষণ জ্বর। তখনকার দিনে টাইফয়েড সারতে অনেক সময় লাগত। মাথার চুল উঠে যেত। শরীরও দুর্বল হয়ে যেত খুব। সম্ভবত ক্লোরো মাইসেটিন নামে একটি ক্যাপসুল খেতে হতো। সারারাত জ্বরে কাঁপছি। মাথায় জল দিতে হচ্ছে, জলপট্টি দিতে হচ্ছে। জ্বরের ঘোরে প্রায় কিছুই টের পাই না। আমার জ্বর শুনে দোতলা থেকে নিজামুদ্দীন স্যারের স্ত্রী আসেন, পাশের বাড়ি থেকে আসে উষাদি। এসে অনেক রাত পর্যন্ত মাথায় জল দেয় জলপট্টি দেয়।

পরের দিন আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রায় দুই-তিন সপ্তাহ হাসপাতালে ছিলাম। হোস্টেলে এসে আমার কিছুই ভালো লাগে না। শরীর খুব খারাপ। ঠিক করলাম বাড়ি চলে যাব। দু-একদিনের মধ্যে বাড়ি যাওয়ার জন্য তৈরি হই।

যাওয়ার সময় দেখলাম, উষাদি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে, হাত নেড়ে বলল, সুস্থ হয়ে তাড়াতাড়ি ফিরে এসো। মনে হলো তার চোখ ভেজা। আমার আর ফিরে আসা হয়নি। তার সঙ্গে আর দেখাও হয়নি। বাড়ি এসে আবার জ্বরে পড়ি। এক বছরেরও বেশি সময় পড়াশোনা বন্ধ। ঢাকারই এক নামকরা ডাক্তারের নির্দেশমতো ওষুধ খাই, শুয়ে বসে বিশ্রাম করি। লেখালেখিও খুব হয় না। ঢাকা থেকে বন্ধুরা কেউ কেউ তাড়াতাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য চিঠি লেখে। কিন্তু বাড়ি থেকে এই শরীর নিয়ে যেতে দেবে না। বসে বসে দিন কাটে। আমাদের স্কুলটি বন্ধ হয়ে আছে, ঠিক করলাম স্কুলটি আবার যেমন করেই হোক চালু করতে হবে। কয়েকজন বন্ধু ও গ্রামের কিছু উত্সাহী লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে স্কুলটি চালু করার উদ্যোগ নিলাম। ঘরদরজা ঠিক করা, টেবিলবেঞ্চ তৈরি, শিক্ষকদের বেতন, টাকা আসবে কোত্থেকে। ছাত্রও পেতে হবে। তবু স্কুল গড়ার কাজে নেমে পড়লাম। সপ্তাহে দু দিন হাট বসে। ঠিক হলো হাট থেকে সাহায্য পাওয়া যাবে। কিছুই নেই, তার মধ্যেই শুরু করলাম। স্থানীয় শিক্ষকেরা ছিলেন, দুই-এক মাস বেতন ছাড়াই কাজ করতে রাজি হলেন।  শেরপুর থেকে অর্ধেন্দু নারায়ণ মুন্সি নামে একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে প্রধান শিক্ষক করে নিয়ে আসা হলো। তিনি থাকেন আমাদের বাড়িতে। বেশ বয়স হয়েছে তাঁর, কানে ভালো শুনতে পান না। যা হোক এভাবেই স্কুলটি শুরু হলো। ছাত্র পেতে খুব অসুবিধা হলো না। বছরখানেকের মধ্যেই আমরা বোর্ডের স্বীকৃতিও পেলাম। একজন স্কুল পরিদর্শক এসেছিলেন পাবনা থেকে। আমাদের স্কুলগড়ার উদ্যোগ দেখে খুব খুশি হলেন। সাধ্যমতো সহায়তা দেওয়ার কথাও বললেন। আমি একটু বেশি দায়িত্বই কাঁধে তুলে নিলাম। আমার বিশ্রামে থাকার কথা হলেও তা আর ঠিকমতো হলো না। সে দিনগুলোর কথা ভাবলে আনন্দই বোধ করি। গ্রামে স্কুল বেশ ভালোভাবেই চলতে লাগল। ছেলেরাও স্কুল থেকেই বোর্ডের পরীক্ষা দেবে। গ্রামের মানুষও সবাই খুব খুশি হয়ে উঠল। রেজাল্টও ভালোই হলো। মন্টু, হানিফ, কাইয়ুম, কালাম—এরা খুব পছন্দও করে আমাকে। আবদুল খালেক মন্টু এখনো যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করে। হানিফ সরকারও তা-ই। ওদের সঙ্গে কথা হলে আনন্দ পাই। নতুন করে চালু হলো স্কুল। ঘরদরজা ঠিক হলো, চেয়ারবেঞ্চ তৈরি হলো, একটি ঘরও উঠল। স্কুলটি দাঁড় করাতে পেরে মনে খুব স্বস্তি পেলাম। বলা যায়, সারাদিনই স্কুলের কাজে থাকি। আমাদের গ্রামের একজন শিক্ষক ছিলেন অঙ্কে খুব পারদর্শী। তাঁকে সবাই আইএসসি সাহেব বলে। নাম ওসমান গনি। স্কুলের খাতাপত্র ও হিসেব সবই ভালো বোঝেন। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেছিলেন। ভালো ছাত্র ছিলেন, ইংরেজিও জানতেন ভালো। তখন মর্নিং নিউজ পত্রিকায় গেট-এ ওয়ার্ড নামে শব্দ প্রতিযোগিতা হতো। শব্দ মেলাতে পারলে টাকা পাওয়া যেত। একবার তিনি অক্ষর বসিয়ে যে শব্দটি মেলালেন সে শব্দটি ছিল Prorogue স্থগিত রাখা, to discontinue meetings of parliaments; তখন শব্দটি অনেকেরই অজানা ছিল। আইএসসি সাহেবের আরো নাম হলো। এবার আমার স্কুল ছেড়ে যাওয়ার পালা। আমি কলেজে ভর্তি হব। অনেকটা সময় চলে গেছে। ঢাকায় আর যাওয়া হলো না। বগুড়া সরকারি কলেজে ভর্তি হব। যাওয়ার আগে স্কুলের সেই ফেয়ারওয়েল মিটিংটি এখনো আমার খুব মনে পড়ে। কত মানুষ যে এসেছিলেন আমার মতো এক নগণ্য তরুণ শিক্ষকের বিদায় অনুষ্ঠানে। অনেকেরই চোখ অশ্রুসিক্ত। কিন্তু আমাকে তো যেতেই হবে। স্কুলের ভার নেবেন এখন অন্য সকলে। আমি না থাকলেও কিছু হবে না। শুনেছি সইে স্কুলটি এখন বিশাল স্কুল হয়ে উঠেছে। তিনতলা-চারতলা ভবন। বহু ছাত্রছাত্রী। বহু বছর আমার গ্রামে যাওয়া হয়নি, দেখাও হয়নি। ভালো থেকো আমার জন্মগ্রাম, জন্মনদী, হয়তো দূরে থাকি, স্কুলটির সঙ্গেও তো জড়িয়ে আছি আমি, সে যেভাবেই হোক। এখনো এই স্কুল, স্কুলের শিক্ষকজীবনের জন্য এ অঞ্চলের বহুজনের আমি স্যার, কী যে সৌভাগ্য আমার, তারা আমাকে খুব মান্য করে, ভালোবাসে। এত মানুষের ভালোবাসা সেকি ভোলা যায়? এই ক্ষুদ্র জীবনে এও কি কম? মন ভরে যায় আমার, চোখে জল আসে। স্কুলটি আরো বড় হোক, সরকারি স্কুল হোক, মানুষকে শিক্ষায় জ্ঞানে আরো আলোকিত করে তুলুক এই আশা। অযোগ্য মানুষ আমি, কিছুই তো করতে পারলাম না, তবু আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ, আমি যে গান গেয়েছিলাম।

এভাবেই আমার জীবনের একেকটি অধ্যায় চলে গেছে। এখান থেকে ওখানে, ওখান থেকে সেখানে, যেন পথে পথেই জীবন কাটল আমার। কোথায় থেকে না কোথায় গেলাম। গ্রাম ছেড়ে শহরে, শহর ছেড়ে আরেক শহরে, এক শহরেই কত জায়গায়, কত ঘাটে যে ভিড়ল আমার তরী, তারপর শহর ছেড়ে দেশ, এদেশ ছেড়ে সেদেশ, সেদেশ ছেড়ে অন্যদেশ, হেথা নয় হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে। এই কি আমার নিয়তি? তখন বুঝতে পারিনি। শুধু ছুটেছি। যাকগে সেসব। বগুড়া সরকারি কলেজে এসে ভর্তি হলাম, আজিজুল হক কলেজ। অধ্যক্ষ তখন ড. মুহম্মদ ইসহাক। ইতিহাসের অধ্যাপক। বাংলা বিভাগের প্রধান মহসীন আলী দেওয়ান। স্নেহপরায়ণ শিক্ষক। ছাত্রদের বাবা ছাড়া কথা বলেন না। সজ্জন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রিয় কবি। ছন্দ বিষয়ে তাঁর একটি মূল্যবান গ্রন্থ আছে। বগুড়া থেকে তিনি একটি পত্রিকাও বের করেন, ‘বগুড়া বুলেটিন’। তাঁর স্নেহ-ভালোবাসা ভোলা যায় না। তাঁর স্ত্রীও ছিলেন অসাধারণ মহিলা, কোনো ছাত্র বাসায় গেলে না খেয়ে ফিরতে পারত না। ছাত্রছাত্রীরা তাঁর কাছে ছিল নিজের সন্তানের মতো। তাঁদের সন্তানেরাও ছিল ছাত্রছাত্রীদের কাছে ভাইবোনদের মতোই আপন। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই ত্যাগী শিক্ষককে নির্দয়ভাবে হত্যা করে। কবি আতাউর রহমানও ছিলেন এই কলেজের বাংলার শিক্ষক, দার্শনিক স্বভাবের মানুষ। সুধীন্দ্রনাথের কবিতার অনুরাগী। তাঁর কাব্যগ্রন্থের নাম ‘দুই ঋতু’, পরের বইটি ‘একদিন প্রতিদিন’। নজরুলের কবিতা নিয়ে তিনি একটি মূল্যবান বইও লিখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় আমরা একসঙ্গে ‘অগিলভি’ হোস্টেলে থেকেছি। স্কটিশ চার্চ কলেজের ছাত্রাবাস। তরুণ সান্ন্যাল এই কলেজ হোস্টেলের সুপারেনটেনডেন্ট। বগুড়া তখন ছোট শহর। সাতমাথাই ছিল শহরের কেন্দ্র। উডবার্ন পাবলিক লাইব্রেরিটি ছিল খুবই সমৃদ্ধ। বহু মূল্যবান বই ছিল সেখানে। রেল লাইনের পাশ দিয়ে হেঁটে বা রিকশায় কলেজে যেতে হতো। নতুন কলেজ ভবনটি খুবই সুন্দর। এই কলেজ থেকেই এইচএসসি পাস করি। বাংলা অনার্সেও ভর্তি হই। বগুড়া থেকে এই সময় আমরা কয়েকজন তরুণ মিলে ‘বিপ্রতীক’ নামে একটি লিটল ম্যাগাজিনও বের করেছিলাম। ঢাকায়ও পত্রিকাটি বেশ সাড়া জাগায়। সাতমাথার কাছেই ‘বেনীপুর বুক হাউস’ নামে একটি বইয়ের দোকান। এখানে ঢাকা থেকে নতুন নতুন বই ও পত্রপত্রিকা আনা হতো। এখানেই আমি প্রথম ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকাটি দেখি। একেবারে অন্যরকম পত্রিকা। লেখাও অন্যরকম। বেনীপুর বুক হাউস থেকেই প্রথম কণ্ঠস্বর পত্রিকাটি সংগ্রহ করি। বগুড়ায় তরুণ কবি তখন ফারুক সিদ্দিকী, মহম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজী রব, মনোজ দাশগুপ্ত—সবাই মিলে বিপ্রতীক বের করি। তখন দেশে আইয়ুব খানের দুঃশাসন, ‘বেসিক ডেমোক্রেসি বা মৌলিক গণতন্ত্র’। সরকারের পোষা ছাত্র সংগঠন এনএসএফ ক্রমেই প্রবল হচ্ছে। বগুড়া কলেজে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন খুবই শক্তিশালী। দেশব্যাপী তখন আইয়ুববিরোধী ছাত্র ও গণআন্দোলন তীব্রতর হয়ে উঠছে। আইয়ুব খানের অপশাসনের বিরুদ্ধে বগুড়ার ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বগুড়ার সংগ্রামী ছাত্ররা সেসময়ের ছাত্রআন্দোলনে সর্বদা সক্রিয় থেকে সোচ্চার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে অংশ নেয়। বগুড়া কলেজের প্রতিবাদী ছাত্রদের সংগ্রামী ভূমিকা অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল। কোনো নিপীড়ন নির্যাতনই তাদের আন্দোলন ও প্রতিরোধ থেকে পিছু হটাতে পারেনি। আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে তাদের এই ত্যাগ, সাহস ও সংগ্রামের কথা স্মরণ করি। যত সামান্যই হোক, আমি এই আন্দোলন ও সংগ্রামের সঙ্গে থাকতে পেরেছি, এ আমার গর্ব।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এলাম এমএ পড়তে। পদ্মার পাড়ে মতিহারের সবুজ চত্বরে এই ক্যাম্পাস। অত্যন্ত মনোরম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির কথাও ভেবেছিলাম, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় বদল করা অনেক ঝামেলা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ভর্তি হলাম। আমরা যে হলে থাকি তখন তার নাম ছিল জিন্নাহ হল। এই হলের এখন নতুন নাম হয়েছে, বড় সড়কের পাশেই বিশাল হল ভবন। তখন বোধহয় অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী এই হলের প্রোভোস্ট। বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান তখন ড. মযহারুল ইসলাম। অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলামও তখন বাংলা বিভাগের শিক্ষক। অল্পদিনের মধ্যেই তাঁদের স্নেহসান্নিধ্য লাভের সুযোগ পেলাম আমি। রাজশাহী থেকে তখন ‘পূর্বমেঘ’ নামে একটি বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা বের হয়। সম্পাদক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ও মুস্তাফা নূরউল ইসলাম। ঠিক মনে নেই, হাসান আজিজুল হকের ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ গল্পটি বোধহয় পূর্বমেঘ পত্রিকাতেই ছাপা হয়। পূর্বমেঘে তাঁর অনেক লেখা ছাপা হয়েছে। পত্রিকাটি দেখাশোনা করেন বাংলা বিভাগের গবেষক অধ্যাপক আবদুল হাফিজ। রাজশাহী শহরের মডার্ন প্রেস থেকে ছাপা হয়। প্রেসটির মালিক আবদুর রশিদ খান সাহিত্য শিল্পের অনুরাগী। নিজেও কবিতা লেখেন। আমি এই পত্রিকাটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়লাম। প্রেসে যাই, সন্ধ্যার দিকে অনেকটা সময় কাটাই এই প্রেসে। আমার ‘আনন্দের মৃত্যু নেই’ প্রবন্ধটি পূর্বমেঘে ছাপা হয়। অধ্যাপক আলী আনোয়ার, সনত্ কুমার সাহা ও আরো বেশ কয়েকজন শিক্ষক পূর্বমেঘে প্রায় নিয়মিত লেখেন।

এরই মধ্যে ড. মযহারুল ইসলামের সম্পাদনায় ‘উত্তর অন্বেষা’ নামে আরেকটি উন্নতমানের সাহিত্য পত্রিকা বের হলো রাজশাহী থেকে। এই পত্রিকাটি দেখাশোনার দায়িত্ব হাফিজ সাহেবের। আমিও দুটি পত্রিকার কাজে মেতে উঠলাম। মতিহার থেকে প্রায় প্রতিদিন প্রেসে যাওয়া, অনেকটা রাত পর্যন্ত সেখানে সময় কাটানো একরকম নিয়মিত ব্যাপার হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে সাহিত্যের আড্ডাও জমে উঠল। প্রায় নিয়মিত আসেন শেখ আতাউর রহমান। মহসীন রেজা, সাইফুল ইসলামও আসে। রাজশাহী থেকে আরো দুটি ছোট কাগজ বের হয়, ‘সুনিকেত মল্লার’ নামে একটি পত্রিকা বের করে মহসীন রেজা, সাইফুল ইসলাম বের করে ‘বনানী’ নামে আরেকটি পত্রিকা। সাহিত্যের কাজকর্ম ও লেখালেখি বেশ জমে উঠল। বাংলা বিভাগের শিক্ষক তখন ড. আবুদল মান্নান, ড. আবদুল খালেক, ড. গোলাম সাকলায়েন, সুনীল মুখোপাধ্যায় ও খোন্দকার সিরাজুল হক। আবু হেনা মোস্তফা কামাল বিদেশে গেছেন, পিএইচ ডি করতে। ড. গোলাম মোরশেদ এসে যোগ দিলেন। সারোয়ার জাহানও ছিলেন বাংলা বিভাগের শিক্ষক। তিনি গান লিখতেন, গাইতেনও। সেলিনা হোসেন, জুলফিকার মতীন, ফজলুল হক—আমরা একসঙ্গে বাংলা বিভাগে পড়ি। লেখালেখি, পত্রিকা এসব নিয়ে চমত্কার সময় কাটছিল। এদিকে ছাত্রআন্দোলন ও বিক্ষোভ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ব্যাপক ছাত্রআন্দোলন আরো তীব্র হয়ে উঠতে থাকে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলো। ছাত্রছাত্রীরা আরো সক্রিয় হয়ে উঠল আন্দোলনে। সাহিত্যশিল্প, সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, এসব মিলে সে এক আলাদা জীবন, সে হচ্ছে বাঙালির জেগে ওঠার সময়। এই ইতিহাসের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হতে পারা সে কি কম ভাগ্যের ব্যাপার! একে দুর্লভ ভাগ্য বলেই মানি আমি।

এই সবকিছুর মধ্যে জড়িয়ে পড়তে পেরে মনে সত্যি খুব আনন্দ বোধ করছি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে পড়ে আবদুল লতিফ, পাশেই কাজলার দিকে বাড়ি। লতিফ ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় কর্মী, আমারও খুব অনুরাগী হয়ে উঠল। আমার রুমমেট মোসাদ্দেক ও সগির আহমদ। দুজনই বিজ্ঞানের ছাত্র। কিন্তু আমার লেখার মনোযোগী পাঠক। সেসময় রাজশাহী বেতারের জন্য আমি কিছু গানও লিখেছিলাম। বাংলা বিভাগের ছাত্র সুকুমার বিশ্বাস সুর দিয়ে গানগুলো রেডিওতে গায়। রাজশাহীতে এভাবে আড্ডায়, লেখালেখিতে দিনগুলো ভালোই কাটছিল। এদিকে দিনদিনই দেশে উত্তেজনা বাড়ছে, আইয়ুবী দুঃশাসনে মানুষ অতিষ্ঠ, বিক্ষোভ ও গণআন্দোলন যতই জোরদার হচ্ছে, নিপীড়ন ও নির্যাতন ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু বাঙালি জাতি কঠিন সংগ্রামের শপথ নিয়ে আরো জেগে উঠছে। বুকে তার নতুন স্বপ্ন, এই যৌবনতরঙ্গ কে রোধ করে? সেই নবজাগরণের দিনগুলোর কথা যত ভাবি, গর্বে বুক ভরে ওঠে।

তখন রাজশাহী শহরে একটি পার্কের নাম ছিল ভুবনমোহন পার্ক। জানি না পার্কটি এখন আছে কি না। এই পার্কের পাশ দিয়ে শহরের ভেতরে যেতাম। মতিহার থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস যেত শহরে। আমরা বাসেই যাতায়াত করতাম। যাঁরা শহরে থাকতেন তাঁরাও এই বাসেই আসতেন। মতিহার খুব সুন্দর এলাকা। গাছপালা আর সবুজে ছাওয়া। কোলাহল নেই, শব্দ নেই, লেখাপড়ার জন্য উত্তম পরিবেশ। এখানে এসে আমারও মন ভরে গেল। সামান্য দূরে পদ্মা। কোনো কোনোদিন বিকেলে চর পাড়ি দিয়ে পদ্মার তীরেও বেড়াতে যেতাম। সঙ্গে থাকত দেলোয়ার। আমাদের সঙ্গে বাংলা বিভাগেরই ছাত্র। আমরা একই হলে থাকতাম। এদিকে দিনদিনই দেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী শুরু হয় প্রবল গণঅভ্যুত্থান। রাজশাহী সবসময়ই প্রতিবাদের শহর। সেই ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিলই রাজশাহী জেলের সব খাপড়া ওয়ার্ডে চলে বেপরোয়া গুলিবর্ষণ। তখন কমিউনিস্ট পার্টি ছিল নিষিদ্ধ। দ্বিজাতিত্ত্বের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া পাকিস্তান রাষ্ট্রে শুরু থেকেই কমিউনিস্টরা ছিল শাসকগোষ্ঠীর চক্ষুশূল। ‘পঞ্চমবাহিনী ও দেশের শত্রু’, এই অপপ্রচার চালিয়ে পাকিস্তানি শাসকেরা বামপন্থি ও কমিউনিস্টদের ওপর যখন তখন নির্যাতন চালাত। বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানি শাসকদের বন্দুকের নল তাক করা ছিল এই রাষ্ট্রটির জন্মের পর থেকেই। পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর এই হত্যাকাণ্ডে শহিদ হয়েছিলেন দিনাজপুরের কৃষকনেতা কম্পরাম সিং, খুলনার দৌলতপুরের ছাত্রনেতা আনোয়ার হোসেন, ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামী সুধীন ধর, রেলশ্রমিক নেতা দেলোয়ার হোসেন, ময়মনসিংহের সুখেন ভট্টাচার্য, কুষ্টিয়ার হানিফ শেখ, আন্দামান ফেরত বিপ্লবী বিজন সেন। রাজশাহীতে যতই পাকিস্তানি শাসকদের নির্যাতন বাড়তে থাকত ততই এসব কথা ভাবতে থাকি, ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে কত প্রাণ হলো বলিদান’। ১৯৬৬ সালের ৭ জুন ছয় দফার দাবিতে যখন হরতাল চলছিল তখন শ্রমিকদের একটি মিছিল যাচ্ছিল তেজগাঁও রেলগেটের ওপর দিয়ে, সেখানেই পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান শ্রমিকনেতা মনু মিয়া। মনু মিয়া কাজ করতেন সেভেন আপ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে। তাঁর মৃত্যু সারাদেশে দাবানল সৃষ্টি করে। ছয় দফার আন্দোলন ধীরে ধীরে রূপ নেয় স্বাধীনতার আন্দোলনে। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন, দিনটি ছিল ২১ ফেব্রুয়ারি। এর আগে ১৫ ফেব্রুয়ারি আটক অবস্থায় নিহত হন আগরতলা মামলার আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হক। ১৮ ফেব্রুয়ারি সৈন্যদের গুলিতে নিহত হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহা। এ সময় সামরিক সরকারের রোষানলে পড়ে ইত্তেফাক প্রকাশ হতে পারে না, প্রকাশনা নিষিদ্ধ করা হয়। দেশব্যাপী গণআন্দোলন, সংগ্রাম ও গণদাবির মধ্য দিয়ে ইত্তেফাক পুনঃপ্রকাশিত হয় ১৯ ফেব্রুয়ারি। এভাবে গণআন্দোলন এগিয়ে যেতে থাকে। প্রতিবাদ ও আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এই আন্দোলন দমন করার লক্ষ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ১৪৪ ধারা ও কারফিউ ঘোষণা করা হয়। সভা, মিছিল নিষিদ্ধ। সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ঘিরে রাখে আর্মি, ইপিআর, পুলিশ। ছাত্ররা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটগুলো বন্ধ। পুলিশ ও সৈন্যরা মহাসড়কে আবিরাম টইল দিচ্ছে। উত্তেজনা ক্রমশই বাড়তে থাকে। মিছিল ও স্লোগান হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে। দুপুরের দিকে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে। গেটের বাইরে শত শত রাইফেল তাক করা। ছাত্ররা ১৪৪ ভঙ্গ করে করে মহাসড়কে যাবে। শিক্ষকেরাও এসে দাঁড়িয়েছেন ছাত্রদের পাশে, মিছিল গেট অতিক্রম করলে রক্তপাত শুরু হবে। জীবন বাজি রেখে গেটের দিকে এগিয়ে চলেছে মিছিল। স্লোগানে উত্তাল সারা এলাকা। ঠিক এই সময় মিছিলের পুরোভাগে এসে দাঁড়ালেন ড. জোহা। বারবার নিষেধ করছেন যেন গুলি না হয়। হঠাত্ বিনা উস্কানিতেই শুরু হলো গুলিবর্ষণ। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে ঢলে পড়লেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহা। আমি ও রাজশাহী সিটি কলেজের ছাত্র সিকানদার আবু জাফর ড. জোহার ঠিক পেছনেই ছিলাম। রুহুল আমিন প্রামানিকও ছিল এখানেই। সে আহতও হয়েছিল। আহত হয়েছিলেন বাংলা বিভাগের শিক্ষক ড. আবদুল খালেক ও আরো কয়েকজন শিক্ষক। গুলি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা মাটিতে শুয়ে পড়ি। সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য এখনো চোখে ভাসে। উত্তেজনা চলতেই থাকে। সারা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। শিক্ষক, ছাত্রসহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার মানুষ শোকে স্তব্ধ। ড. জোহা সবারই খুব প্রিয়। খেলাধুলা করতেন, হাসিখুশি মানুষ। থাকতেন আমাদের হালের পাশাপাশি স্টাফ কোয়ার্টারে। কতদিন দেখেছি স্টাফ কোয়ার্টারের সামনে ব্যাডমিন্টন খেলছেন। এই হাসিখুশি প্রাণবন্ত মানুষটি সৈন্যদের গুলিতে প্রাণ দিলেন। সারা মতিহার শোকে স্তব্ধ। ড. জোহার এই আত্মদান ৬৯-এর গণআন্দোলনে আরো নতুন মাত্রা যোগ করল। দেশের মানুষ ক্ষোভে প্রতিবাদে ফেটে পড়ল। 

কিছুক্ষণের জন্য ১৪৪ ধারা শিথিল করা হলেও সন্ধ্যার পরই ১৪৪ ধারা ও কারফিউ জোরদার করে মতিহার অঞ্চলটিকে আতঙ্কের এলাকায় পরিণত করা হলো। সারা এলাকা অন্ধকার। অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, জুলফিকার মতিন, মতিউর রহমান বাচ্চু ও আমি মিলে এসএম হল থেকে সেই অন্ধকারের মধ্যেই উপাচার্য ভবনের দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। টেলিফোন লাইন কাটা, সারা মতিহার অন্ধকার, সে এক ভয়ঙ্কর রাত্রি। উপাচার্য ভবনে না গেলে ঢাকায় খবর পাঠানোর আর কোনো উপায় নেই। মতিউর রহমান বাচ্চু বিশ্ববিদ্যালয়ের রিপোর্টার হিসেবে পত্রিকায় কাজ করে। আমরা এসএম হল থেকে উপাচার্য ভবনের দিকে যাচ্ছি। কলাভবনের কাছাকাছি আসতেই দেখতে পেলাম ইপিআর ও সৈন্যরা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ভেতরে ঢুকে পড়েছে। মুহূর্তের মধ্যে আমরা লাফিয়ে পাশের ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে পড়লাম। কে কিভাবে ছিলাম জানি না, সৈন্যরা সরে গেলে আমরা যার যার মতো উপাচার্য ভবনে গিয়ে পৌঁছালাম। সেখান থেকে মতিউর রহমান বাচ্চু ঢাকায় পত্রিকা অফিসে গুলি ও হত্যার খবর পাঠাল।

সেই অন্ধকার ও কারফিউয়ের মধ্যে হলে ফেরা সে ছিল এক ভয়াবহ পরিস্থিতি। এইচ এম কামরুজ্জামান চার জাতীয় নেতার একজন, বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত। রাজশাহীতে সকলের হেনা ভাই। খুবই জনপ্রিয় তিনি। তাঁরই নেতৃত্বে রাজশাহীতে গণআন্দোলন ও সংগ্রাম পরিচালিত হচ্ছে। তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর সাথে পরিচিত হওয়ার। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও দেখা করেছি। তিনি ছিলেন সব রকম প্রলোভনের ঊর্ধ্বে আদর্শ রাজনৈতিক নেতা, দেশের জন্য নিবেদিতপ্রাণ, বঙ্গবন্ধুর অকুণ্ঠ সমর্থক, তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত। রাজশাহীর একটি এলাকার নাম ছিল সাহেব বাজার। সেই সাহেব বাজার দিয়ে কত যাতায়াত করেছি। এদিকে বোধহয় একটি বড় পুকুরও ছিল, স্পষ্ট মনে পড়ছে না, প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের কথা।

এরই মধ্যে একদিন ‘কণ্ঠস্বর’-এর জন্য একটি কবিতা পাঠিয়ে দিলাম। ঢাকার অনেক পত্রিকায়ই তখন আমার লেখা বেরোয়। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই কণ্ঠস্বর সম্পাদক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের চিঠি পেলাম। একটি হলুদ কার্ডে লেখা চিঠিতে তিনি জানিয়েছেন, চলতি সংখ্যাতেই কবিতাটি ছাপা হচ্ছে। ‘নৈশচিন্তা’ নামের এই কবিতাটি আমি আমার কোনো কাব্যগ্রন্থে নিইনি, যদিও সায়ীদ ভাই তাঁর সম্পাদিত এক দশকের কবিতায় এই কবিতাটি ছেপেছেন। এভাবে কণ্ঠস্বরের সঙ্গে জড়িয়ে গেলাম। ‘উত্তর অন্বেষা’ পত্রিকায়ও আমার হেমন্ত সিরিজের কবিতা ছাপা হয়েছে। কবিতা লিখছি, প্রবন্ধ লিখছি, গানও লিখছি বেতারের জন্য। পত্রপত্রিকা ও লেখালেখির মধ্যেই আছি। লিখি, প্রেসে যাই, বাকি সময় কাটে লাইব্রেরিতে। পরীক্ষা শেষ হলো, থিসিসের কাজ নিয়ে তখন বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। ঠিক এরকম কোনো একটি সময়ে ঢাকা থেকে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের চিঠি পেলাম। তিনি লিখেছেন, কণ্ঠস্বরের চতুর্থ বর্ষপূর্তিতে একটি সম্মেলন হচ্ছে। আমাকে এই সম্মেলনে একটি প্রবন্ধ পড়তে হবে। রাজি হয়ে গেলাম। রাজশাহী থেকে হাফিজ ভাই আর আমি যাব। এসে উঠলাম সায়ীদ ভাইয়ের গ্রিন রোডের স্টাফ কোয়ার্টারে। তোপখানা রোডে প্রেসক্লাবের উল্টোদিকে তত্কালীন পাকিস্তান কাউন্সিল হলে সম্মেলন। মুনীর চৌধুরী সভাপতি। এই আমার প্রথম কোনো সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দেওয়া। মনে মনে বেশ চিন্তাও হতে লাগল। আাামর প্রবন্ধটির নাম ছিল ‘অমিতাচারী কবিতা’। এই প্রবন্ধটিও পরে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত ‘এক দশকের প্রবন্ধ’ বইটিতে ছাপা হয়।

রাজশাহী থেকে ঢাকা এসেছি, বুক কেমন দুরু দুরু করছে। হলভর্তি মানুষ, সেসময়ের তরুণ কবি-লেখকেরা প্রায় সকলেই। আমি প্রবন্ধ পড়লাম। সভাপতির ভাষণ দিতে গিয়ে অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী তাঁর অনবদ্য বক্তৃতায় সাহিত্য-শিল্প সম্পর্কে যেসব কথা বললেন, তাকে এককথায় বলা যায় অতুলনীয়। আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনছি। একসময় তিনি আমার কথাও বললেন, আমার শব্দ ব্যবহারের প্রশংসা করে বললেন, আমি উজ্জ্বল না বলে দীপ্র বলি, এই ব্যতিক্রম তাঁর চোখ এড়ায়নি। মুনীর চৌধুরীর সঙ্গে আমার আগেই দেখা হওয়ার সুযোগ হয়েছিল। তিনি রাজশাহী গিয়েছিলেন আমাদের মৌখিক পরীক্ষার পরীক্ষক হয়ে।

আমাকে বললেন, বলো ‘আর পাব কোথা/দেবতারে প্রিয় করি, প্রিয়েরে দেবতা’, এটি কোন কবিতা? আমি বললাম, রবীন্দ্রনাথের ‘বৈষ্ণব’ কবিতা। মনে আছে কোন কাব্যগ্রন্থে? বললাম, ‘সোনার তরী’। স্যার খুব খুশি হলেন। বললেন, ভালো, খুব ভালো। বুঝতে পারছি, তুমি পারবে। সেই মুনীর স্যারের সামনে দাঁড়িয়ে প্রবন্ধ পড়লাম, আমি কীইবা জানি, কীই বা লিখতে পারি। সেসময় অবজারভার পত্রিকার সাহিত্য ম্যাগাজিনের সম্পাদক জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত। পরদিন অবজারভার আফিসে গেলাম জ্যোতিদার সঙ্গে দেখা করতে। তাঁর সঙ্গে বগুড়ায়ই আমার পরিচয় হয়েছিল। জ্যোতিদা বললেন, অবজারভার হাউস থেকে একটি বাংলা দৈনিক বেরুচ্ছে, ‘পূর্বদেশ’। আবদুল গনি হাজারী তখন অবজারভারের ম্যানেজিং এডিটর। তাঁর সেসময়ের বিখ্যাত কবিতার বই ‘কতিপয় আমলার স্ত্রী’। পাবনার মানুষ। জ্যোতিদাই তাঁর কাছে আমাকে নিয়ে গেলেন। হাজারী ভাই বললেন, অবজারভার হাউস থেকে একটি বাংলা পত্রিকা বেরুচ্ছে। একটা দরখাস্ত করে যাও। বলেই একখানা কাগজ এগিয়ে দিলেন। আমি তখন বাংলা একাডেমির বৃত্তি নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করি। অধ্যাপক কবীর চৌধুরী ছিলেন বাংলা একাডেমির ডিরেক্টর, তখন বাংলা উন্নয়ন বোর্ডও ছিল, বাংলা একাডেমি ও উন্নয়ন বোর্ড একত্রিত হয়নি। সেইসঙ্গে ইংরেজিও পড়ছি। ভাবলাম পড়ে গেলাম। হাজারী ভাই বললেন, কী এত ভাবছ, দরখাস্তটা করে যাও। পরে চিন্তাভাবনা করে ঠিক কোরো। আমি হাজারী ভাইয়ের টেবিলে বসেই একটা দরখাস্ত লিখে দিলাম। পাশেই ‘সমকাল’ অফিস। সম্পাদক সিকান্দার আবু জাফর। সেখানে দেখা হলো নির্মলেন্দু গুণের সঙ্গে। সন্ধ্যায় গেলাম নিউ মার্কেটে। সেখানে দেখা হলো সৈয়দ আকরম হোসেন, হুমায়ুন আজাদ, আবুল হাসানের সঙ্গে। সঙ্গে ছিল মলয়, সে-ই পরিচয় করিয়ে দিল। সৈয়দ আকরম হোসেন তখন বোধহয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের শিক্ষক।

রাজশাহী ফিরে নিজের কাজকর্মে ডুবে যাই। রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক কবিতা নিয়ে গবেষণার কাজ, ইংরেজির ক্লাস। বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। সেই দরখাস্তের কথা ভুলেই গেছি। হঠাত্ দেখি অবজারভার হাউস থেকে একটা চিঠি, মানে নিয়োগপত্র। পত্রিকায় সাব-এডিটরের কাজ। রাজশাহীতে আমাকে যাঁরা স্নেহ করেন তাঁরা সকলেই বললেন, না, এই চাকরিতে যাওয়া ঠিক হবে না। মুস্তাফা স্যার বললেন, জানিয়ে দাও সহকারী সম্পাদক হিসেবে নেওয়া হলে তুমি যাবে, নইলে না। আমি তা-ই করলাম। মাত্র সপ্তাহখানেকের মধ্যেই অবজারভার হাউস থেকে একখানা টেলিগ্রাম গিয়ে হাজির। তাতে লেখা, ‘ইওর আপয়েন্টমেন্ট অ্যাজ অ্যাসিসট্যান্ট এডিটর ফাইনালাইজড কাম শার্প।’ অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার। আর কী করা; এবার ঢাকায় চলে আসার পালা।

ভাবলে কেমন অবাক হয়ে পড়ি, কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছি আমি, একবার এখানে, একবার সেখানে। এ যেন কেবলই ভেসে চলা, ভাসতে ভাসতে কোথা থেকে কোথায় যাব, পথের শেষ কোথায়?

রাজশাহীর পাট চুকিয়ে ঢাকা রওনা হচ্ছি। এখনো মনে পড়ে, চলে আসার দিন রাজশাহী স্টেশনে বন্ধু-শুভানুধ্যায়ীদের বিষণ্ন মুখ। হাফিজ ভাই, শেখ আতাউর রহমান, মহসীন রেজা, রুহুল আমিন প্রামাণিক, লতিফ, সাইফুল ইসলাম, মডার্ন প্রেসের আবদুর রশিদ খান। এত স্নেহ এত ভালোবাসা জীবনে সেও কি কম পাওয়া, সেই যে ‘দিয়েছি যত নিয়েছি তার বেশি’। ঢাকা চলে এলাম, পেছনে পড়ে রইল রাজশাহী, মতিহার, পদ্মা। ঢাকা এসে উঠলাম এলিফ্যান্ট রোডের একটি মেসে। সায়ীদ ভাই ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। সেখানে থাকেন আবুল কাসেম ফজলুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক শফি আহমদ। অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরীও থাকতেন এই মেসে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছিলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্টাফ কোয়ার্টারে চলে গেছেন। আমি এই খালি সিটটিতে থাকব। একটি কম বয়সী তরুণ ছিল মেসের বাবুর্চি। আমাদের রান্না করে দেয়। এরপর চলে যাই তোপখানা রোডে, অন্য একটি মেসে। সেখানে মলয় ভৌমিক থাকত। তাজুল, মলয় দুজনে আমাকে সেখানে নিয়ে যায়। দুজনই আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এখানে কাশীনাথ রায়ও থাকত। এখান থেকে পূর্বদেশ অফিসও কাছে। উল্টো দিকেই প্রেসক্লাব। পূর্বদেশ বের হবে আগস্টে। তার আগেই এসে যোগ দিয়েছি। নতুন অফিস, নতুন চেয়ার-টেবিল, রুমভর্তি লোকজন, একেবারে গমগম করছে। অফিসে ঢুকে খুবই ভালো লাগল। বয়সও কম, যা দেখি তা-ই ভালো লাগে। নামকরা সাংবাদিকেরা পূর্বদেশে যোগ দিয়েছে। ‘আমাদের মুক্তি সংগ্রাম’-এর লেখক মোহাম্মদ ওয়ালীউল্লাহ, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, নূরুল ইসলাম পাটোয়ারী, আবদুর রাজ্জাক চৌধুরী, ফয়েজ আহমেদ, এহতেশাম হায়দার চৌধুরী, কামাল লোহানী, জিয়াউল হক, সাহিত্য সম্পাদক আ ন ম গোলাম মোস্তফা, শিশুকিশোর পাতা ‘চাঁদের হাট’-এর সম্পাদক রফিকুল হক। জেনারেল ম্যানেজার এম আর আখতার মুকুল। তিনি অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলামের ছোট ভাই। হিসাববিভাগের প্রধান দত্ত বাবু।

সম্পাদক মাহবুবুল হক। নতুন পত্রিকা বেরুচ্ছে। সবার মধ্যে উত্সাহ আর উদ্দীপনা। একেবারে জমে উঠেছে পূর্বদেশ অফিস। আমি তারই মধ্যে গিয়ে নতুন পত্রিকা অফিসটিতে যোগ দিলাম। নতুন পত্রিকা প্রকাশ একটা দারুণ উত্তেজনার ব্যাপার। আমার বয়সও কম, বোধহয় আমিই সর্বকনিষ্ঠ। সবাই স্নেহ করেন। রাজ্জাক ভাই আমাকে ডাকেন খোকন। ভালোই হলো, একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের সবটাই দেখা হচ্ছে। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর বিখ্যাত কলাম ‘তৃতীয় মত’ বের হতে লাগল পূর্বদেশে। আবদুল গনি হাজারী লেখেন ‘কালো প্যাঁচার ডায়েরী’। তখন অবজারভারের বার্তা সম্পাদক কে জি মোস্তফা। সালাম সাহেব সম্পাদক। এবিএম মুসা পূর্বদেশে ‘বারোয়ারী’ নামে একটি কলাম লেখেন। ওবায়দুল হক সাহেবও কলাম লেখেন। এতসব বিখ্যাত সাংবাদিকদের সঙ্গে কাজ করছি। আমি ‘মল্লিনাথ’ ছদ্মনামে ‘পাদটীকা’ নামে একটি কলাম লেখা শুরু করলাম।

রাস্তা পার হলেই সেইসময়ের ‘দৈনিক পাকিস্তান’ অফিস। বড় কবিরা এখানে কাজ করেন। শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান সহকারী সম্পাদক। সাহিত্যে সম্পাদক আহসান হাবীব। ফজল শাহাবুদ্দিনও কাজ করেন। একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীফ মিয়ার ক্যান্টিন থেকে সায্যাদ কাদির আমাকে দৈনিক পাকিস্তান অফিসে নিয়ে যায়। সায্যাদই আহসান হাবীব, শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান ও ফজল শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়। এখানে আছেন আহমেদ হুমায়ুন, মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহও। আমি পূর্বদেশে কাজ করি কিন্তু বেশির ভাগ সময় কাটাই শামসুর রাহমান ও হাসান হাফিজুর রহমানের রুমে, কবিদের সান্নিধ্যে। তাঁরা দুজনই এক রুমে বসেন। নির্মল, হাসান, হুমায়ুন কবির, সানাউল হক খান—এরাও আসে। এখানেই শহীদ কাদরীর সঙ্গে দেখা হয়। হাসান ভাই স্নেহপ্রবণ মানুষ, দেখা হতেই বুকে জড়িয়ে ধরতেন। সেই উষ্ণতা কি আর পাওয়া যাবে? হাসান ভাই খুব পান খেতেন, আমার কাঁধে হাত রেখে হাঁটতে হাঁটতে পান কিনতে চলে যেতেন রাস্তার ওপারে। কোনো কোনোদিন সমকাল অফিসে, কয়েক পা হেঁটে সমকাল অফিসেই আল মাহমুদের সঙ্গে পরিচয় হয়। সেই উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকা এসেছি, মাঝে মাঝে খুব নিঃসঙ্গ বোধ করি, মন খারাপ হয়ে যায়। এই রুক্ষ শহরে কিছুই ভালো লাগে না। অপরিচিত শহরে কোথাও একটু স্নেহ-ভালোবাসা পেলে কী যে ভালো লাগে। পূর্বদেশ অফিসেও সবাই স্নেহ করেন আমাকে। আমি কবিতা লিখি, কখন আসি কখন যাই এসব নিয়ে কেউ মাথা ঘামান না। প্রায় প্রতিদিন দুপুরেই আরামবাগে পাটোয়ারী ভাইয়ের বাসায় গাফ্ফার ভাই, রাজ্জাক ভাই ও আমি খেতে চলে যাই। সবার সেই স্নেহ-ভালোবাসা ভোলা যায় না। পাশেই ছিল ‘অতিথি’ নামে একটি চমত্কার রেস্টুরেন্ট। সেখানেও খেতে যেতাম আমরা। দুপুরের খাওয়া কখনোই আমরা কেউ আলাদা খেতাম না। সে এক সময় ছিল, এর মধ্য দিয়ে কবি হয়ে উঠছি। আ ন ম গোলাম মোস্তফাও সহূদয় মানুষ, কবিতার খুব অনুরাগী। দৈনিক পাকিস্তান অফিসে হাবীব ভাইও তরুণদের স্নেহ করতেন। ওই বয়সেই আমাদের লেখা কী যত্নেই না ছাপতেন তিনি। সমকালে গেলে জাফর ভাইয়ের স্নেহসন্নিধ্য, হাস্যরসিকতায় মন ভরে যেত। সত্যিকার অর্থেই সে ছিল কবিতায় মেতে থাকার জীবন।

ওদিকে ইত্তেফাকে রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই সাহিত্য সম্পাদক। দাদাভাইয়ের সঙ্গে আরো আগেই আমার পরিচয় হয়। তখন নিয়মিত ‘কচি-কাঁচার আসর’-এ লিখি। একবার ঢাকা এসে দাদাভাইয়ের সঙ্গে দেখা করি। ইত্তেফাকের প্রধান আকর্ষণ তখন সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার বিখ্যাত কলাম। মাঝে মাঝেই হুমায়ুন কবির আর আমি রামকৃষ্ণ মিশন রোডে ইত্তেফাকে দাদাভাইয়ের কাছে যাই। সেখানে সিরাজভাই ও রেজা ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়। ইত্তেফাক থেকে চলে যেতাম বংশালে ‘সংবাদ’ অফিসে। রণেশ দাশগুপ্ত সংবাদের সাহিত্য পাতা দেখেন। আমার দীর্ঘ ‘ফ্লাড’ কবিটাটি পাতাজুড়ে তিনিই ছেপেছিলেন। পরে সাহিত্যের পাতা দেখতে শুরু করেন শুভ রহমান। শুভ রহমান, আবেদ খান, শশাঙ্ক মিলে করেন ‘সৃজনী’। সংবাদে তখন ছিলেন শহীদুল্লাহ কায়সার, বজলুর রহমান, সন্তোষ গুপ্ত। বজলু ভাই আমাকে খুব পছন্দ করতেন। অনেকবারই আমাকে সংবাদে যোগ দিতে বলেছেন। যাওয়া হয়নি, তবে পরে দীর্ঘদিন ‘সারথি’ ছদ্মনামে কলাম লিখেছি। এভাইে দিন কাটছিল। কবিতাই তখন দিবারাত্রির স্বপ্ন, কবিতা নিয়েই মেতে থাকা। দৈনিক পত্রিকাগুলোর কোনো না কোনোটিতে প্রতি সপ্তাহেই কবিতা ছাপা হচ্ছে। কবিতা নিয়ে সে কী মাতামাতি আর উত্তেজনা। বহু বছর পর একটি ইংরেজি দৈনিকের সাহিত্য ম্যাগাজিনে ছাপা আমার একটি সাক্ষাত্কারের শিরোনাম ছিল ‘ইটিং পোয়েট্রি’। কিটস ‘নেগেটিভ ক্যাপাবিলিটি’র কথা বলেছেন, কেউ বলেছেন, তন্ময়তা আবার কেউ কেউ একে উন্মাদগ্রস্ততাও বলেছেন, আজ অর্থটা বুঝি, কবিকে একধরনের সৃষ্টিশীল বিচ্ছিন্নতা তৈরি করতে হয়, একধরনের ঘোর, ট্রান্স।

এদিকে দৈনিক পত্রিকার অফিস, কাছাকাছি সমকাল, ওদিকে কণ্ঠস্বর, গ্রিনরোডে সায়ীদ ভাইয়ের বাসা। কণ্ঠস্বরের সঙ্গে জড়িয়ে আছি, সায়ীদ ভাইয়ের সঙ্গে প্রেসে যাই, ছাপার কাজও দেখি। সন্ধ্যায় কোনো কোনোদিন গ্রিনরোডের এই ছোট্ট বাসাটিতে জমজমাট আড্ডা বসে। বসার জায়গা নেই, সেসময়ের তরুণ লেখক-কবিরা প্রায় সবাই সেখানে।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ‘ভালোবাসার সাম্পান’-এ তার বিবরণ আছে। একদিন সন্ধ্যাবেলা জমজমাট আড্ডা, আমি মাত্র কিছুদিন আগে ঢাকা এসেছি। ওইদিন তখনকার দৈনিক পাকিস্তানের সাহিত্যের পাতায় আমার একটি কবিতা ছাপা হয়। আমি যেতেই একজন বললেন, তখন ঠিক সবার নামও জানি না, আপনাকে পড়লাম। কিছুই বুঝতে পারি না আমি, ‘আপনাকে পড়লাম’ মানে কী, নিজেকে কেমন বোকা মনে হতে লাগল। ভেবে পাই না কী বলব। পরে বললেন, আজ দৈনিক পাকিস্তানের সাহিত্যের পাতায় আপনার কবিতা পড়লাম। এতক্ষণে বুঝতে পারলাম। ঢাকায় বুঝি কবিতা পড়লে এভাবেই বলতে হয়। আমি অনেকটা বোকার মতোই তাকিয়ে থাকি।

মেসটির উল্টোদিকেই প্রেসক্লাব। সকালে উঠেই প্রেসক্লাবে যাই খাবার খেতে, কোনো কোনোদিন চলে যাই শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে। তখন পাবলিক লাইব্রেরি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের দোতলায়, রাস্তার লাগোয়া, একটু এগিয়েই শরীফ মিয়ার ক্যান্টিন। এখানে তরুণ কবি-লেখকেরা আসে সকালের খাবার খেতে। ছয় আনায় তেহারি, দুই আনায় চা। খাওয়া আর জমাট আড্ডা। সেখান থেকে পূর্বদেশ অফিস। বিকেলে রেক্স, স্টেডিয়ামের প্রভিনসিয়াল, একটু দূরেই সালিমাবার রেস্টুরেন্ট, ওদিকে নবাবপুর রোডের আরজু হোটেল, বাংলাবাজারের বিউটি বোর্ডিং, কিংবা পানীয়ম। স্টেডিয়ামে ‘মেরিয়েটা’, ‘আইডিয়াস’ দুটি বইয়ের দোকান। এখানেই মাহফুজের সঙ্গে আমার পরিচয়। হাসান ও মাহফুজ দুজনে কলেজের বন্ধু। মাহফুজ আমারও বন্ধু হয়ে ওঠে। একসময় সে হয়ে ওঠে আমার সুখ-দুঃখের সঙ্গী। দোতলায় একটি বড় বইয়ের দোকানে শুধুই সোভিয়েত রাশিয়ার প্রগতি প্রকাশনীর বই, ননী ভৌমিকের অনুবাদ। আইডিয়াস থেকে পেঙ্গুইন মডার্ন পোয়েট সিরিজের বইগুলো কিনি। সার্ত্রে ও সিমোন দ্য বোভোয়ারের বইও এই মেরিয়েটা কিংবা আইডিয়াস থেকে কিনি। সন্ধ্যায় রমনা পার্কের রেস্টুরেন্টটিকে মনে হতো যেন লেকের ওপর ভাসমান বোট, কিংবা সেখান থেকে সোজা চলে যেতাম নিউ মার্কেটের মনিকো বা লিবার্টিতে। নিউ মার্কেটে তখন ‘নওরোজ কিতাবিস্তান’, ‘মহিউদ্দিন’, ‘নলেজ হোম’—এইসব বইয়ের দোকান। পকেটে টাকা নেই, দোকানে বই প্যাকেট করে রেখে আসতাম। তোপখানা রোডের মেসটি উঠে গেল। এখানে হোটেল হবে। নাম হলো বোধহয় সম্রাট হোটেল, এখানে ‘জলযোগ’ নামে একটি রেস্টুরেন্টও ছিল। আমরা আজিমপুরে চলে আসি। ১১৩ আজিমপুর রোড। দিনরাত কবিতা, পত্রিকার অফিস, আড্ডা এভাবেই দিন কাটছে। একটি নতুন কবিতা লেখা হলে কী যে উত্তেজনা, কবিতাটি নিয়ে সোজা পত্রিকা অফিসে। এমন কবিতামগ্ন সময় আর পাওয়া যাবে? একেবারেই আচ্ছন্নতার মধ্যে। দিনরাত যে কোথা দিয়ে চলে যেত বোঝাই যেত না। হাতে নতুন নতুন কবিতার বই, কত যে কবিতা পড়া, মাতামাতি, তর্কবির্তক, উত্তেজনা বলে শেষ করা যাবে না। আমরা যারা কবি হয়ে উঠছি, নতুন কবিতার জন্য তাদের কী যে উন্মাদনা। কবিতা বোধহয় এমনি এক দুর্মর নেশা, দুরন্ত ঘোর, কতজন যে এই কবিতার জন্য কতভাবে নিজেকে ক্ষয় করেছে তার সব কথা হয়তো জানাও যাবে না কোনোদিন। কবিতার ইতিহাস এমনি সুখের এমনি দুঃখের। ‘অলৌকিক বেদনার ভার/বিধাতা যাহারে দেন তার বক্ষে বেদনা অপার/তার নিত্য জাগরণ’।

এই জীবনের কথা লিখতে গেলে স্বভাবতই আবেগতাড়িত না হয়ে উপায় থাকে না, কী লিখব, কোথা থেকে লিখব, বোঝাই দুষ্কর হয়ে পড়ে। একধরনের স্বপ্নাচ্ছন্নতার মধ্যেই এ লেখা লিখতে হচ্ছে। এখানে পারম্পর্য রক্ষার উপায় নেই। এভাবেই লিখে যেতে হবে, যা দাঁড়ায়। তা থেকে যতটুকু খণ্ডচিত্র পাওয়া যায়, সেসময়ের বিবরণ পাওয়া যায় তা-ই নিয়ে এই লেখা, তা-ই দিয়ে এই লেখা। সেই ছড়ানো ছিটানো হারানো মুহূর্তগুলো ধরার চেষ্টা করেছি, যতটুকু পারা যায়। অমৃত, বিষ, যা ওঠে উঠুক।

আজিমপুরের মেসে দোতলায় একটি রুমে আমি থাকি, রুমটা কিছুটা গোলাকার। আজিমপুর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, নিউ মার্কেটও কাছে। বেশ সুবিধা হলো। সকালে উঠেই শরীফ মিয়ার চায়ের দোকানে চলে যাই। সকালের খাওয়া, চা আর জমজমাট আড্ডা। অফিসে যাই কোনোদিন প্রেসক্লাব থেকে দুপুরের খাবার খেয়ে; কোনোদিন বা অফিসে গিয়ে সবাই খাই পাটোয়ারী ভাইয়ের বাসায়। কোনো কোনোদিন অফিসেও খাবার আনা হয়, লেখার কাজ সেরেই হয় সমকালে যাই না হয় হাসান ভাই, শামসুর রাহমানের রুমে। রাতে যখন রুমে ফিরে আসি, তখন বুকভরা কবিতা। ঘোরের মধ্যে রাত জেগে কবিতা লিখি। আমাদের কাছে তখন জীবন আর কবিতা আলাদা কিছু নয়। শুধু বই পড়ে কবি হওয়ার নয়, বই ও জীবন দুইই পড়তে হবে। আমরা যারা সেই বিক্ষুব্ধ সময়ে ক্ষমতা লিখি, তারা জীবন থেকেই কবিতার উপাদান সংগ্রহ করেছি, জীবন পাঠ করেছি আমরা। মধ্যরাতের ফুটপাত কী প্রিয় ছিল আমাদের। ফুটপাতের একটা ভাষা আছে, নৈঃশব্দ্যের একটা ভাষা আছে, জনজীবনের একটা ভাষা আছে, কোলাহলের মধ্যেও ছন্দ পাওয়া যায়। আমরা এসব ভাষা আহরণের চেষ্টা করেছি। এগুলোও অর্থাত্ রাত্রি, নৈঃশব্দ্য, নিস্তব্ধ ফুটপাত, নির্জন শহর এসবও আমাদের পাঠ্য ছিল। মানুষের জীবন ছিল আমাদের কাছে আনেক বড় পাঠ্যবই, প্রিন্টেড বইয়ের চাইতে তা কম মূল্যবান ছিল না। আবার বইও পড়েছি, নতুন বই এলেই তা প্রথম আমাদেরই হাতে। আমি গীতাবিতান মুখস্থ করেছি, কেবল গানই শুনিনি, গান পাঠ্য করেছি। গীতবিতানে কত ছন্দের খেলা, কত অপূর্ব মিল, কত চিত্র, ‘ফুলের গন্ধ বন্ধুর মতো জড়ায়ে ধরেছে গলা’। যে শব্দের কোনো বিকল্প হয় না এমন শব্দ গীতবিতানের ছত্রে ছত্রে। বুঝেছিলাম, নবীন কবির জন্য এই বইটি অবশ্যপাঠ্য, মুখস্থ করে ফেলতে হবে এই বই। সেইসঙ্গে জীবন থেকেও পাঠ নিতে হবে। সেই অস্থির সময়কে আমরা বোঝার চেষ্টা করেছি, সেই ভাষা, সেই শব্দ, সেই কোলোহল, সেই দ্রোহ থেকে রচিত হয়েছে আমাদের কবিতা। সেখানেই হয়তোবা কবিতায় মোড় ফেরা, সেখানেই হয়তোবা কবিতায় পাঠকের আবার ফিরে আসা। সেই বিচিত্র রাতগুলো আমরা উত্সর্গ করেছি কবিতাকে।

৬৮, ৬৯-এর দিনগুলো খুব উত্তাল। সামরিক স্বৈরশাসনের নিপীড়ন-নির্যাতন যতই বাড়ছে মানুষও ততই বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা যেন একসঙ্গে গর্জে উঠছে, মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠে, ‘আমাদের ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’। সে এক আগুনঝরা দিন, মানুষ অত্যাচার-অনাচারের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়ছে। সেই উত্তাল উত্তপ্ত সময়ে আমরা কবি হয়ে উঠছি। আমাদের কবিতা তাই আলাদা। রাজপথ, মিছিল, গণআন্দোলনের উষ্ণ সাহচর্যে রচিত হচ্ছে আমাদের কবিতা, জীবন ও কবিতা আমাদের কাছে অভিন্ন, আমরা কবিতার পাঠ নিচ্ছি জীবনের কাছ থেকে। এই জীবনমুখী কবিতার ধারাই বাংলাদেশের কবিতার মূলধারা হয়ে ওঠে। আমরা এই ক্ষোভ, দ্রোহ, প্রতিবাদের মধ্যেই খুঁজতে চেষ্টা করেছি কবিতার নতুন ভাষা, নতুন ছন্দ; নতুন ইমেজ বাঙালির নবজাগরণের সেই স্বপ্ন ও আবেগের মধ্য দিয়ে রচিত হতে থাকে সেসময়ের একেকটি নতুন কবিতা, তাই তার ভাষা আলাদা, চিত্রকল্প আলাদা। আমাদের প্রেমের কবিতাও স্বভাবতই হয়ে ওঠে দেশপ্রেমের কবিতা, আমাদের সেসময়ের প্রতিটি দিনরাত্রি আমরা উত্সর্গ করি কবিতাকে, জীবনকে। জীবন ও কবিতাকে আমরা বিচ্ছিন্ন করে দেখিনি, গণআন্দোলনের উষ্ণ নিঃশ্বাসে বেড়ে উঠছে আমাদের কবিতা, হয়ে উঠছে নতুন আবেগ, নবজীবনের জাগরণের মন্ত্র। তখন বাঙালির চোখে যে নতুন স্বপ্ন, নতুন আশা, তা-ই এই সময়ের কবিদের জীবন ও কবিতাকে আন্দোলিত করে। এভাবেই আমরা কবিতার নতুন অর্থ আবিষ্কার করি। ভাষা ও শব্দের নতুন ব্যঞ্জনা খুঁজে পাই। কবিতা হয়ে ওঠে জীবন, জীবন হয়ে ওঠে কবিতা।

আজিমপুরে আমার কাছাকাছি থাকে নির্মল। কোনো কোনোদিন আমরা একসঙ্গে শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে চলে যাই। তাজুলও এই মেসে থাকে। আজিমপুর কলোনির খোলা মাঠ আমার খুব ভালো লাগে। অন্যরকম একটা পরিবেশে এখানে দিনগুলো কাটছিল ভালোই। প্রায় সপ্তাহেই আমাদের কারো না কারো কবিতা ছাপা হয়। সবাই দুই হাতে লিখছি, আমরা, এদিকে শরীফ মিয়া, স্টেডিয়াম, গুলিস্তান, নিউ মার্কেটের চায়ের দোকানগুলোতে প্রতি সন্ধ্যায় আমাদের আড্ডাও জমে উঠেছে।

এসবই আমাদের তরুণ বয়সের কথা। তরুণ কবির জীবন বড় অস্থির। নিঃসঙ্গতা তাকে পীড়িত করে, একাকীত্ব তাকে ব্যথিত করে তোলে। একটি কবিতার জন্য সে রাতের পর রাত জেগে থাকে। এমনি করেই রচিত হয় একেকটি নতুন পঙিক্ত। এই অচেনা-অজানা শহরে কত সময়ই তো মন বড় খারাপ হয়ে যায়, কিছুই ভালো লাগে না, সব কেমন বিষণ্ন হয়ে পড়ে। এই একাকীত্ব ও বিষাদ তাকে হয়তোবা নতুন কবিতারও সন্ধান দেয়; কতদিন মন খারাপ করে ঘরে ফিরে কবিতা লিখেছি, কবিতাই তখন ছিল একমাত্র সঙ্গী। এভাবেই সময় চলে যাচ্ছে। নির্বান্ধব নির্মম শহরে কিছুই ভালো লাগে না। মাকে খুব মনে পড়তে থাকে, বাড়ি ফিরে যেতে  ইচ্ছে করে। আমি এই শহরে এসেছি সবার পরে, শেষ বাসের যাত্রী। ষাটের প্রথম ভাগের কবিরা প্রায় সবাই তখন প্রতিষ্ঠিত; শিকদার আমিনুল হক, রফিক আজাদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আসাদ চৌধুরী, মোহাম্মদ রফিক, অরুনাভ সরকার। দ্বিতীয় ভাগের নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, হুমায়ুন কবির, তারাও দাঁড়িয়ে গেছে। আমার পায়ের নিচে তখন মাটি নেই, প্রতি ইঞ্চি মাটি দখল করতে হচ্ছে। কত বৈরী পরিবেশ পার হচ্ছি, নির্মম খরখরে হাসি, কঠিন বিদ্রূপ, তাচ্ছিল্য—এসবের মধ্য দিয়েই কবিতা লেখা। কতদিন আহত, ক্ষতবিক্ষত মন নিয়ে ঘরে ফিরে দু চোখের জলে কবিতা লিখেছি, সেকথা কেউ জানে না। মন খারাপ হলে কখনো একা একা রেলস্টেশনে চলে গেছি, একা একা পার্কের নিঃসঙ্গ বেঞ্চে বসে থেকেছি, দুপুরের নির্জন রেস্তোরাঁয় চুপচাপ বসে সময় কাটিয়েছি।

এইসব উপেক্ষা, তাচ্ছিল্য, অবহেলা ভোলার জন্য আবার কবিতার কাছেই ফিরে গেছি। কবিতা লেখার এই ইতিহাস তো সব আর লেখা যাবে না, সব মনেও নেই। বিদ্রূপ, তাচ্ছিল্য উপেক্ষা করে কবিতা লিখেছি। বিরোধিতা ও বিরূপতার মধ্যেও আমি এই সমেয়ই কিংবা এর কিছু আগে পরে ‘শহরে, এই বৃষ্টিতে’, ‘বন্ধুর জন্য বিজ্ঞাপন’, ‘বৈশাখে নিজস্ব সংবাদ’, ‘ফ্লাড’, ‘আজীবন একই চিঠি’, ‘ফিরে দাও রাজবংশ’, কবিতাগুলো লিখেছি। পরে ৭১-এর সেই উত্তাল গণআন্দোলনের সময় আবুজর গিফারী কলেজের তরুণ ছাত্র ফারুক ইকবাল পাকিস্তানি আর্মির গুলিতে নিহত হওয়ার প্রতিবাদে আমি ‘ফারুকের মুখ’ নামে যে কবিতাটি লিখি তা হাসান হাফিজুর রহমান গুরুত্বের সঙ্গে সেসময়ের দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকার সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় ছেপে দেন। ‘ফিরে দাও রাজবংশ’ কবিতাটি অনেকেই আবৃত্তি করেন। দেশব্যাপী সেই গণআন্দোলনের সঙ্গে আমারও দু-একটি কবিতা যুক্ত হয়। ভেবে বুক ভরে যায়।

এদিকে দেশে বিক্ষোভ ও আন্দোলন ক্রমেই ব্যাপক হয়ে উঠতে থাকে। ইয়াহিয়া ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার নানা ফন্দি-ফিকির করেও গণদাবির মুখে ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর নির্বাচন দিতে বাধ্য হন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি তে জয়ী হলো। আওয়ামী লীগ পেলো নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। শুরু হলো ষড়যন্ত্র। দেশজুড়ে তখন গণআন্দোলন। ঢাকা হয়ে উঠেছে মিছিলের নগরী। গঠিত হয়েছে ‘লেখক শিল্পী সংগ্রাম কমিটি’ এবং প্রতিদিন শহীদ মিনারে প্রতিবাদ সভা, গান, কবিতা পাঠ। এরপর ভয়াল ২৫শে মার্চের রাতের সেই নৃশংস গণহত্যা। আমি তখন থাকি আজিমপুর রোডের মেসবাড়িটিতে। সন্ধ্যায় ফিরতেই মিজান খবর দিল, শোনা যাচ্ছে আর্মি নেমে গেছে। এই মেসবাড়িটিরই নিচতলায় থাকে ছাত্রলীগের কর্মী মিজান, সে আমার কবিতারও খুব অনুরাগী। ২৫শে মার্চের সেই বীভত্স রাত্রির বর্ণনা করা যায় না, মনে পড়লে এখনো গা শিউরে ওঠে। পরের দিন কিছুক্ষণের জন্য কারফিউ তুলে নেওয়া হলো। নির্মল এল মেসে, খাবার নেই, পাশের বাসা থেকে কিছু খাবার পাঠায়। আমি জগন্নাথ হল, ড. জিসি দেব-এর বাড়ি ও মেডিক্যাল কলেজে যাই। আবুল হাসান ছিল তখন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। গেটেই তার সঙ্গে দেখা হয়। দুজনে মিলে দেখতে যাই জ্যোর্তিময় গুহঠাকুরতাকে। তিনি তখনো জীবিত। ২৭ তারিখ সকালে বুড়িগঙ্গা পার হয়ে ওপারে যাই। সেখান থেকে কখনো রিকশা, কখনো নৌকা, কখনো পায়ে হেঁটে দু-তিন দিনে বাড়ি পৌঁছাই। মাত্র এক মাস পরেই ২৫শে এপ্রিল আমাদের গ্রামে ঢুকে পড়ে পাকিস্তানি বাহিনী, রাতের অন্ধকারে মা-বাবা, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে কোনোমতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যাই, আশ্রয় নিই দূরের একটি গ্রামে আমাদের এক আত্মীয়বাড়িতে। কিন্তু বর্বর বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারায় আমার জ্যাঠাই মা, যে ছিল আমার মায়ের মতো, যাকে আমি বড়মা ডাকতাম। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা আমাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করে, লুট করে নেয় সবকিছু। সেই দুর্যোগের মধ্যেও দবির, সিরাজ, সাইফুল, মন্টু আমাদের অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে দেয়।

এভাবেই সেই ভয়াবহ দুঃসময়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। রেল বা সড়কপথে যাওয়ার উপায় নেই। সীমান্ত পাড়ি দিতে বহুপথ হেঁটে যেতে হবে। আমার বৃদ্ধ মা-বাবার পক্ষে এত দীর্ঘপথ হেঁটে যাওয়া সম্ভব নয়। আমি একমাত্র সন্তান। তাদের কার কাছে রেখে যাব। এগ্রাম থেকে ওগ্রাম পালিয়ে বেড়াচ্ছি।

সে এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। কত বাড়িতে যে মেঝেতে শুয়ে রাত কাটিয়েছি তার সব হয়তো মনেও নেই। তার ওপর প্রতি মুহূর্তের অনিশ্চয়তা, ভীতি আর আতঙ্ক। হঠাত্ শোনা গেল মিলিটারি আসছে, সবকিছু ফেলে তখনই প্রাণ নিয়ে ছোটা। এই অবস্থার মধ্যে দিন কাটে। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের অনুষ্ঠান শুনি আর সারা দিনরাত ঘরের মধ্যে থাকি। মে মাসের দিকে নদীপথে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার একটা ব্যবস্থা হয়। রাতের অন্ধকারে সবাই মিলে নৌকায় উঠি। যমুনা দিয়ে আমাদের নৌকা চলে আসাম মেঘালয়ের দিকে। দুই দিন দুই রাত কাটে নৌকায়। কতবার পাকিস্তানি বাহিনীর মুখোমুখি পড়তে পড়তে বেঁচে যাই। শেষ পর্যন্ত আমরা গোটা পরিবার গিয়ে পৌঁছালাম আসামের মানকাচরে। আমরা তখন শরণার্থী। মানকাচরে প্রায় সপ্তাহখানেক ছিলাম আমরা। আসাম থেকে পশ্চিমবঙ্গে যেতে হলে তখন বিশেষ পাস সংগ্রহ করতে হতো। মানকাচরের পাশেই মেঘালয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাম্প। সেখানে একজন উচ্চপদস্থ ভারতীয় সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাত্ করে আমার পরিচয় জানাই। আমার পরিচয় জেনে তিনি খুবই খুশি হন। আমাদের জলপাইগুড়ি যাওয়ার সব ব্যবস্থা করে দেন। পশ্চিম দিনাজপুরে তখন আমার মামা থাকেন। আমরা সবাই সেখানে চলে যাই। মে মাসের শেষের দিকে কিংবা জুন মাসের প্রথমে আমি কলকাতা গিয়ে পৌঁছাই। হাওড়া স্টেশনে নেমে একটা ট্যাক্সি নিয়ে চলে যাই পার্ক সার্কাসে বাংলাদেশ মিশনে। পাশেই বালু হাক্কাক লেনে ‘জয় বাংলা’ পত্রিকার অফিস। সেখানে গিয়ে রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নিই। টেবিলের ওপর খবরের কাগজ মাথায় দিয়ে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ি। খুব ছোটবেলায় বৃত্তি পরীক্ষার আগে দিয়ে মা ও জ্যেঠতুতো বড়দা ও তাঁর ছেলেমেয়ে আমরা সবাই মিলে কলকাতা যাই। এবার দ্বিতীয়বারের মতো কলকাতা আবিষ্কার, শরণার্থী বেশে। পরদিনই বন্ধু ও পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। দুপুরের দিকে গেলাম ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র অফিসে। সেখানে আমাদের প্রিয় কবি-লেখকেরা আছেন, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, গৌরকিশোর ঘোষ। অমিতাভ চৌধুরী, নিরঞ্জন হালদার তাঁরাও আনন্দবাজারে। এখানেই সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গেও দেখা হয়। ‘দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক তখন সাগরময় ঘোষ। বাংলাদেশ থেকে গেছি, উদ্বাস্তু, শরণার্থী, তার ওপর ওই বয়সের ছন্নছাড়া জীবন, সবার কাছেই স্নেহ-ভালোবাসা পেয়ে যাই। এরপর ‘আকাশবাণী’ অফিসে গিয়ে সরল গুহ, দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রণবেশ সেনকে পেয়ে গেলাম। সরলদা আমাকে পূর্বাঞ্চলীয় অনুষ্ঠানে নিয়মিত কথিকা লেখার ব্যবস্থা করে দিলেন। আমি দীর্ঘদিন আকাশবাণীতে নিয়মিত কথিকা পড়েছি। পাকিস্তানিদের অত্যাচার, নির্যাতন ও ইয়াহিয়ার বর্বরতা আর পাকিস্তানের কারাগারে বঙ্গবন্ধুর দুঃসহ বন্দিজীবন নিয়ে কথিকা লিখেছি। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে নিয়মিত অনুষ্ঠান করি, কবিতা পড়ি, ‘বিশ্ববিবেক ও বাংলাদেশ’ নামে একটি কথিকা পাঠ করি। পাকিস্তান শাসকদের বর্বরতা ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতা তুলে ধরেছি কথিকাটিতে, বিশ্ববিবেকের কাছে এই বর্বরতার চিত্র তুলে ধরে হত্যা ও বর্বরতা বন্ধ করার জন্য প্রতিবাদ করার আহ্বান জানাই।

স্বাধীন বাংলা বেতারে তখন ছিলেন কামাল লোহানী, আমরা পূর্বদেশ পত্রিকায় একসঙ্গে কাজ করেছি। এম আর আখতার মুকুলের ‘চরমপত্র’ ছিল খুবই জনপ্রিয়। মুকুল ভাই তাঁর অননুকরণীয় কণ্ঠে যখন কথিকাটি পড়তেন তখন সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনত। মানুষের মুখে মুখে তখন চরমপত্রের কথা। তখন থাকি অগিলভি হোস্টেলে। হেদুয়া পার্কের কাছাকাছি। হোস্টেলের সুপারেনটেন্ডেন্ট ছিলেন কবি তরুণ সান্যাল। তাঁর সঙ্গে কলেজ স্ট্রিটে ‘পরিচয়’ পত্রিকার অফিসে দেখা হয়। তখন পরিচয়-এর সম্পাদক দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। পরিচয় পত্রিকার অফিসেই সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে দেখি। এখানেই সুভাষদার সঙ্গে পরিচয় হয়। ‘কফি হাউস’-এ অমিতাভ দাশগুপ্তের সঙ্গে দেখা হলে তিনিই পরিচয় অফিসে নিয়ে যান। বিষ্ণু দে-র সঙ্গে দেখা করতে গেছি হাফিজ ভাইয়ের সঙ্গে। তাঁর যোগাযোগ ছিল বিষ্ণু দে-র সঙ্গে । বুদ্ধদেব বসু থাকতেন নাকতলায়। কমল সাহা এদিকেই থাকত, সে-ই বুদ্ধদেব বসুর বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যাওয়া হয়নি। থাকি অগিলভি হোস্টেলে। এখানে নূর মোহাম্মদ মিয়া, সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়, আতাউর রহমান ও বাংলাদেশের আরো কয়েকজন লেখক ও অধ্যাপক থাকতেন। পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করি। কলকাতায় তখন যে বিদেশি সাংবাদিকরা ছিলেন তাঁদের সঙ্গে দেখা করে বাংলাদেশে পাকিস্তানি গণহত্যা ও বর্বরতার বিবরণ জানাই। আমার হারিয়ে যাওয়া কবিতাগুলো উদ্ধারের জন্য কলকাতা ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকাগুলো অনুসন্ধানের চেষ্টা করি। ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে তখন ছিলেন নচিকেতা ভরদ্বাজ। কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে এসে বাংলাদেশের পুরনো পত্রিকার পাতা উল্টাই। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। ইয়াহিয়া তাঁকে ফাঁসি দেওয়ার পায়তারা করছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের কবি, লেখক ও বুদ্ধিজীবীরা সক্রিয় সমর্থন জুগিয়েছেন। পাকিস্তানি বাহিনীর ববর্রতা ও গণহত্যার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন তাঁরা। সুভাষ মুখোপাধ্যায়, অন্নদাশঙ্কর রায়, মৈত্রয়ী দেবী প্রমুখ কবি-লেখকেরা বিশেষভাবে সোচ্চার ছিলেন। ভারতে তখন প্রায় এক কোটি শরণার্থী। ইন্দিরা গান্ধী স্বয়ং শরণার্থী শিবিরগুলোতে ঘুরে ঘুরে শরণার্থীদের দেখেছেন এবং খোঁজখবর নিয়েছেন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন যে সমর্থন ও সহযোগিতা জুগিয়েছে তার তুলনা হয় না। ফরাসি লেখক আঁদ্রে মারলো, মাদার তেরেসা, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, গিনসবার্গ, জর্জ হ্যারিসন, পণ্ডিত রবিশঙ্কর, লতা মুঙ্গেশকর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে দৃঢ় সমর্থন জানান। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর আক্রমণের খবর শুনে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো ৮১ বছর বয়সে অসুস্থ শরীরে আর্জেন্টিনার রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ মিছিল করেছিলেন। বাংলাদেশের শিশুরা খাবার পাচ্ছে না জেনে লতা মুঙ্গেশকর তাত্ক্ষণিকভাবে এক লাখ রুপি দিয়েছিলেন তাদের জন্য। মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয় মাস তাঁর গানের আয় থেকেও একটি বড় অংশ বাংলাদেশের জন্য দিয়েছেন তিনি। ছবির সাইনিং মানি দিয়ে দিয়েছিলেন ওয়াহিদা রহমান। ‘জয়বাংলা’ অফিস থেকে খুব দূরে নয়, থাকেন আবু সায়ীদ আইয়ুব ও গৌরী আইয়ুব। মোহাম্মদ রফিক আর আমি অনেকদিন তাঁদের বাসায় চলে গেছি। আবু সায়ীদ আইয়ুবের মতো মনস্বী লেখক দুই তরুণকেও হাসিমুখে সময় দিয়েছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তাঁর ছিল গভীর শ্রদ্ধা।

আগে পরে কিছুই খুব একটা ঠিক রাখতে পারছি না, যখন যার কথা মনে পড়ছে তখনই লেখার চেষ্টা করছি, যদি মনে করতে না পরি। এভাবেই লিখতে হবে। বঙ্গবন্ধুর ওপর চলছে পাকিস্তানি শাসকদের সীমাহীন নির্যাতন। পাকিস্তানের কারাগারে রাতের পর রাত তিনি না ঘুমিয়ে কাটান। তাঁর ওপর শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। এর মধ্যেই কলকাতায় অনেকদিন হয়ে গেল, মা-বাবা পড়ে আছে পশ্চিম দিনাজপুরে। সবসময় ঠিকমতো তাদের খবরও পাই না। বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের অত্যাচার আরো বাড়ছে। গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করে দিচ্ছে তারা। আত্মীয়স্বজন কে কোথায় আছে তা-ও জানি না। ঢাকারও খবর জানি না কতদিন। কে কেমন আছে তা-ও জানি না। সেই গণহত্যা ও বর্বরতার মধ্যে কখন কার কী হয় কে জানে। মুক্তিবাহিনীর তরুণেরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। মাঝে মাঝে মন বড় অস্থির হয়ে ওঠে, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়পরিজন কে কেমন আছে কিছুই জানি না, কে বেঁচে আছে কে নেই, কে জানে, ‘সে এখন বেঁচে আছে কি না/ তা সুদ্ধ জানি না’ মন বড় বিচলিত হয়ে পড়ে। হেদুয়া পার্ক কিংবা মানিকতলা হয়ে অগিলভি হোস্টেল, স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্র, পত্রপত্রিকার অফিস, কলেজ স্ট্রিট, কফি হাউস এভাবে সময় কাটছে।

এরমধ্যেই একদিন চলে গেলাম ‘যুগান্তর’ অফিসে। যুগান্তরের বার্তা সম্পাদক তখন দক্ষিনারঞ্জন বসু। খুব সহূদয় মানুষ। যুগান্তরে তখন ছিলেন প্রফুল্ল রায়, খুবই স্নেহ করেন আমাকে। অনেকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। তখন যুগান্তরের সাহিত্য সম্পাদক কৃষ্ণ ধর। ‘অমৃত’ পত্রিকার সম্পাদক মনীন্দ্র রায়। যুগান্তরে কলাম লেখাও শুরু করি। শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে পরিচয় হয় আরো পরে, বোধহয় ‘পরিচয়’-এ এসেছিলেন। একদিন কফি হাউসে বেলাল চৌধুরীর সঙ্গে দেখা হলো, কলকাতায় থাকেন। দেশ পত্রিকার অফিসেই একদিন তারাপদ রায়ের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। একদিন দেখা হলো সমরেশ সেনগুপ্তের সঙ্গে। আনন্দবাজার অফিসেই শরত্কুমার মুখোপাধ্যায় ও প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের সঙ্গেও দেখা হয়। কলকাতার সেই দিনগুলোতে মনে হয় যেন কবিতার মধ্যেই ডুবে আছি, প্রতিদিনই নতুন নতুন কবি-লেখকদের সঙ্গে দেখা। কত কথা ভুলেও গেছি, তবে একথাটি মনে আছে, সে ছিল কবিতার দিনরাত্রি। নতুন দেশের স্বপ্ন আর রাত জেগে নতুন কবিতা লেখা এই নিয়ে মগ্ন হয়েছিলাম। কত মানুষের সঙ্গে যে দেখা হয়েছে কলকাতায়, কবি, লেখক, শিল্পী, রাজনৈতিক কর্মী সবার মধ্যে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষের জন্য বুকভরা ভালোবাসা। প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যা কাটে কফি হাউসে। সেখানে প্রতিদিনই কারো না কারো সঙ্গে পরিচয় হয়। শান্তনু দাশ ও ময়ূখ বসু সেসময় ‘গঙ্গোত্রী’ নামে একটি পত্রিকা বের করতেন। একদিন তাঁদের সঙ্গে পরিচয় হলো, জীবন সরকার ও রণজিত্ রায় চৌধুরীর সঙ্গেও দেখা হলো একদিন। এরমধ্যেই দেবারতি মিত্রের সঙ্গেও দেখা হয়েছে।

আমাদের সেই দুঃসহ দিনগুলোতে কলকাতায় যেখানে যার কাছেই গেছি মনে হয়েছে যেন কতদিনের চেনা। বাংলাদেশের মানুষের জন্য তাদের ভালোবাসার অন্ত ছিল না। বয়স তখন কম। আত্মীয়-পরিজনহীন এত বড় শহরে মাঝে মাঝে মন খুব খারাপ হয়ে যায়। ঢাকার বন্ধুদের কথা খুব মনে হতে থাকে। সারাদিন ট্রামে বাসে ছোটাছুটি, রাতে ঘরে ফিরে বড় ক্লান্ত হয়ে পড়ি। কোনো কোনোদিন একা একাই বারান্দায় বসে ভাবতে থাকি এই শহরে রবীন্দ্রনাথ জন্মেছেন, কত মনীষী, মহাপুরুষ, ক্ষণজন্মা মানুষের জন্ম এই শহরে, আমি  একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের শরণার্থী, দেশের কোটি কোটি মানুষ পাকিস্তানি বর্বরতার নির্মম শিকার, কত মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসেছে, কত নারী-শিশু পাকিস্তানি বর্বরদের অকথ্য নির্যাতনের শিকার, বিছানায় শুয়েও ঘুম আসে না, বুকটা হাহাকার করে ওঠে। ‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ‘ভয় নাই ওরে ভয় নাই—/ নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান/ ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।’ এত দুঃখের মধ্যেও একটি নতুন স্বাধীন দেশের স্বপ্নে আশায় বুক ভরে যায়, ঘুমের মধ্যেই শুনতে পাই হাজারো কণ্ঠের ‘জয়বাংলা’ ধ্বনি। থিয়েটার রোড, স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র, আকাশবাণী, পত্রপত্রিকার অফিস, কফি হাউস, সারাদিন ঘুরে ঘুরে দিন কাটে। থিয়েটার রোডে গিয়ে দেশের মানুষের সঙ্গে দেখা হয়, বাংলাদেশের লেখক-শিল্পী, সাংবাদিক, মুকুল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়। জয়বাংলা পত্রিকার অফিসে গাফ্ফার ভাই, রাজ্জাক ভাই, স্বাধীন বাংলা বেতারে লোহানী ভাই, জাস্টিস মাসুদ সাহেবের বাড়িতে শওকত ওসমান। কলাকাতার লেখকশিল্পী সংস্থাও গড়ে উঠেছে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির অফিসেও বাংলাদেশের শিক্ষকদের সঙ্গে দেখা হয়। একদিন তখনকার তরুণ ন্যাপ নেতা মোনায়েম সরকারের সঙ্গে দেখা হলো। তখন বেশ শীতও পড়েছে। মোনায়েম সরকার আমাকে কয়েকটি কম্বল দিলেন। এগুলো শরণার্থীদের জন্য সাহায্যের কম্বল। রাজনৈতিক অফিস ও বিভিন্ন সংগঠনের কাছে দেওয়া হয়। কম্বলগুলো খুবই কাজে লাগে। অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম তখন লন্ডনে, পিএইচ ডি করতে গেছেন। সেখানে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে কাজ করছেন, জনমত সংগঠিত করার কাজে বিশেষভাবে সক্রিয়। তিনি শুনেছেন আমি কলকাতায় আছি। লন্ডন থেকে কলকাতা যাত্রী একজন শিক্ষকের হাতে তিনি আমার জন্য কিছু অর্থও পাঠিয়ে দেন। সেসময়ের এই স্নেহ-ভালোবাসা ও সহমর্মিতার কোনো তুলনা হয় না।

৩রা ডিসেম্বর ভারতের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হয় পাকিস্তান। মনে পড়ে, ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তানের এই আক্রমণের কথা উল্লেখ করে ভারতজুড়ে যুদ্ধাবস্থার ঘোষণা দেন। মুক্তিযুদ্ধের বিজয় তখন দ্বারপ্রান্তে। ৬ই ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পরদিন স্বীকৃতি দেয় ভুটান। আমি কলকাতা থেকে ঢাকা আসি জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি। কিন্তু তার আগেই কলকাতা থেকে একটি মাইক্রোবাস নিয়ে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, তারাপদ রায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, নিরঞ্জন হালদার ও আমি ভোমরা হয়ে সাতক্ষীরা এসেছিলাম। সাতক্ষীরা তখন মুক্ত এলাকা। পাকিস্তানিদের এর আগেই সেখানে পতন হয়। ১৬ই ডিসেম্বরের আগেই আমি স্বাধীন বাংলাদেশের মাটি স্পর্শ করতে পেরেছিলাম—এ আমার পরম সৌভাগ্য। ভাবতেই গর্বে বুক ভরে ওঠে। বাংলাদেশের বিজয় সূচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইয়াইয়া খান প্রেসিডেন্ট পদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। ২০ শে ডিসেম্বর ভুট্টো প্রেসিডেন্ট হন। ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে নানাভাবে চাপ দিয়েও একচুলও টলাতে পারেননি। বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি না দিয়ে তখন তার উপায় ছিল না। ৭ই জানুয়ারি ভোর রাতে, ইংরেজি ক্যালেন্ডারের হিসেবে ৮ই জানুয়ারি ভোরবেলা ভুট্টো তাঁকে বিমানে তুলে দেন। বঙ্গবন্ধু লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান। ১০ তারিখ সকালে বঙ্গবন্ধু এসে নামেন দিল্লিতে। রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, মন্ত্রিসভার সকল সদস্য, প্রধান নেতৃবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধান ও বিশিষ্ট নাগরিকদের কাছ থেকে তিনি উষ্ণ অভ্যর্থনা লাভ করেন। ওইদিন অপরাহ্নেই তিনি ঢাকা পৌঁছান। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি আমি নিজের চোখে দেখতে পারিনি। আমি তখনো কলকাতায়। ফিরে আসি ১৮ তারিখে। কলকাতায় বসেও বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের এই আনন্দ ও উত্তেজনা অনুভব করেছি। কলকাতায় লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁকে দেখার জন্য উদগ্রীব ছিল। বঙ্গবন্ধু আসছেন শুনে মানুষের মনে আনন্দের জোয়ার। খবরের কাগজগুলোতে বড় বড় হেডিং, আকাশবাণীর খবর ও সংবাদ পরিক্রমায় বঙ্গবন্ধুর বন্দনা। কলাকাতায় রাস্তায় রাস্তায় মানুষের একমাত্র আলোচনা বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু। আমি নিজে তখন কলকাতা ছিলাম জন্যই মানুষের এই আবেগ ও ভালোবাসা কাছে থেকে প্রত্যক্ষ করতে পেরেছি।

এবার দেশে ফেরার পালা। মন ব্যাকুল হয়ে আছে। আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে মা-বাবা দেশের পথে রওনা হয়েছে শুনেছি। তারা কোথায় গিয়ে উঠবে, কোথায় থাকবে, কিছুই জানি না। পরে জানতে পারি গ্রামের তরুণ মুক্তিযোদ্ধারাই তাদের সব ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেয়। ঢাকা পৌঁছে বন্ধুবান্ধবদের দেখার জন্য মন ব্যাকুল হয়ে পড়ে। কে কেমন আছে, কোথায় আছে কিছুই জানি না। কত মানুষ দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে, কত নারী-শিশু বর্বরতার নির্মম শিকার হয়েছে। কত মানুষ সর্বস্ব হারিয়েছে। এয়ারপোর্টে নামতেই চোখ জলে ভিজে ওঠে। সেইসঙ্গে বুকে জাগে দেশের মাটি স্পর্শ করার আনন্দ শিহরণ। সেই অনুভূতির কথা বলে বোঝানো যাবে না। এয়ারপোর্ট থেকে সোজা চলে যাই প্রেসক্লাবে। মনে মনে চিন্তা করি সেখানে সহকর্মী বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে, পাশেই তাজুলেরও অফিস। তখন প্রেসক্লাবে যাঁরা ছিলেন আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। কিছুক্ষণ পরেই চলে যাই পূর্বদেশ অফিসে। সেখানেই প্রায় সারাদিন কাটাই। পূর্বদেশ-এর সম্পাদক তখন এহতেশাম হায়দার চৌধুরী। সাহিত্য সম্পাদক আ ন ম গোলাম মোস্তফা পাকিস্তানি বর্বর বাহিনীর দোসরদের হাতে নিহত হয়েছেন। সন্ধ্যার কিছু আগেই তাজুলের সঙ্গে ওর মগবাজারের বাসায় যাই। ঢাকা তখনো ভীতি ও আতঙ্কের শহর। দেশ স্বাধীন হলেও স্বাধীনতার শত্রুরা তখনো সক্রিয়, তারা নানাভাবে ষড়যন্ত্র করছে। চলাফেরা খুব নিরাপদ নয়। কত বন্ধু-পরিচিতজন বর্বরদের হাতে প্রাণ দিয়েছেন। সেকথা ভাবতেই বুকের মধ্যে হাহাকার করে ওঠে। গ্রামে মা-বাবা কী অবস্থায় আছে কিছুই জানি না। ঢাকা কয়েকদিন থেকে গ্রামে চলে যাই, সেখানে গ্রামের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়। তারা নতুন করে আমাদের ঘরবাড়ি তৈরির কাজে সহযোগিতা করে। কোনোমতে মাথা গোঁজার মতো ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিই। বোধহয় সপ্তাহখানেক পর আবার ঢাকায় ফিরে আসি। ঢাকা তখন শোকে স্তব্ধ, কত প্রিয়জন, কবি, লেখক, বুদ্ধিজীবী ঘাতকদের হাতে প্রাণ দিয়েছেন, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার, সিরাজউদ্দীন হোসেন, এমনি কত কৃতী মানুষ। কতজনের সঙ্গে আর দেখা হবে না। কতজনকে আর কোথাও খুঁজে পাব না—এসব ভাবতেই মন কেমন করে ওঠে। জানি না, ঢাকা কবে আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠবে, কান্নায় বিষাদে তখনো ঢাকার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে আছে। দেশজুড়ে তখন স্বজন হারানোর বেদনা। ঢাকার সেই মেসবাড়িটি উঠে গেছে। তারা কে কোথায় জানি না। আজিমপুরের সেই বাড়িটিতে  আমার বইপত্র সব সযত্নে রক্ষা করেছেন ওই বাড়ির মালিকেরা। আমার সঙ্গে দেখা হতেই তাঁরা খুব খুশি হলেন। তাঁদের কাছেই শুনতে পেলম পাশেই চায়না বিল্ডিংয়ের গলিতে ‘রংপুর হাউস’-এ এই মেসে যারা ছিল তারা কয়েকজন মিলে একটি মেস করে আছে। সেখানেই আমার থাকার ব্যবস্থা হলো। মেসের পুরনো বন্ধুরা আমার জন্য একটি রুম রেখে দিয়েছে। এই মেসে এসে উঠলাম। পাশেই চায়না বিল্ডিং, সবাই চায়না বিল্ডিং বললেই চেনে। সব এলোমেলো হয়ে গেছে—মেস, শরীফ মিয়ার ক্যান্টিন, অফিস আর প্রেসক্লাব। কোথাও খুব যাই না। ধীরে ধীরে পুরনো বন্ধু ও পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, সবখানে কেমন ভীতি ও আতঙ্ক। স্বাধীনতার শত্রুরা নানা চক্রান্ত করে চলছে। বেশির ভাগ সময় অফিসেই কাটাই। পূর্বদেশে আমাদের সঙ্গে তখন যোগ দিয়েছেন প্রবীণ সাংবাদিক আবু জাফর শামসুদ্দীন। প্রগতিশীল চিন্তা ও মুক্তমনের মানুষ। পূর্বদেশের সম্পাদকীয় বিভাগে তখন আরো আছেন রেজাউর রহমান ও সালাহউদ্দিন চৌধুরী। কোনো কোনোদিন অফিস থেকে শামসুর রাহমানের কাছে যাই। তিনি আমাকে বেশ পছন্দও করেন। সেখানে হাসান ভাইয়ের সঙ্গেও দেখা হয়। দুজনই আমার প্রিয় মানুষ। v