সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন সচেতনতা

আপডেট : ৩১ মে ২০১৯, ১৯:৩১

একুশে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ সাল। ভাবতেই পারি না এইদিনে দাঁড়িয়েছিলাম ৬৬ বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে, রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়ার আন্দোলনে শরিক হয়ে। বয়স তখন আমার তেরো, আরমানিটোলার স্কুলে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র।

বিশ্ববিদ্যালয়ের লোহার কালো ফটক পেরিয়ে সবে ঢুকেছি। বাঁ দিকের ডোবার পাড়ে দাঁড়িয়েছি। ছাত্রছাত্রীতে ‘ছাত্রারণ্য’। অর্ধবৃত্তকারে দাঁড়িয়ে থেকে নেতাদের দীপ্ত বলিষ্ঠ কণ্ঠে বক্তব্য শুনছে। আমি ছোটখাটো কিশোর, গলা উঁচিয়ে দেখার চেষ্টা করছি হাতে লেখা প্ল্যাকার্ডগুলো। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন হবে’, ‘আমার ভাষা মায়ের ভাষা’—আরো অসংখ্য প্ল্যাকার্ড। নানা কথার বক্তব্য। পড়ার চেষ্টা করছি। হঠাত্ ফানুসের মতো টিয়ার গ্যাস ছুটে এল। আমার বাম পাশ ঘেঁষে সোজা পড়ল ডোবায়। ধোঁয়ায় আকাশে ঢেকে গেল। শুরু হলো ছাত্রদের ছুটোছুটি। সামান্য ক্ষণের জন্য ছাত্ররা ছত্রভঙ্গ হলো। তারপরই ঘুরে দাঁড়াল। সংযত হলো। সম্বিত পেল। সংঘবদ্ধ হলো। টিয়ারগ্যাস সত্ত্বেও ওরা জড়ো হয়ে বক্তৃতা শুনতে শুরু করল। এখন হাতে হাত ধরে মিছিল করে বেরোবে। চোখ কচলাতে কচলাতে সেই মিছিলে আমিও শামিল হয়েছিলাম হাফপ্যান্ট পরে।

‘সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন হবে’ কথাটা সেইদিন মনে দাগ কেটেছিল। দাবিটির সম্যক অর্থ কিছুটা উপলব্ধি করতে পারলেও সকল বাংলাভাষীর জন্য সেই দাবির সামগ্রিক ব্যাপকতা সেই মহান ক্ষণে পূর্ণ মননে আয়ত্তে আনতে পারিনি।

আজ ৬৬ বছর পরও কি আমি পেরেছি, আমার সমাজ কি পেরেছে সেই অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে। সেই মর্মার্থ পূর্ণ উপলব্ধি করতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমতলা চত্বরে সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের দাবি এসেছিল ১৯৪৮ সালে। সেই দাবি, সেই চাহিদা ৭০ বছর পরও পূরণ হয়েছে কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃহত্তর পরিধিতে? কমপক্ষে একশটি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্ট কমিশনের স্বীকৃতি পেয়েছে। তাদের মাঝে প্রায় ৯৫ ভাগ নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম রাখা হয়েছে ইংরেজি ভাষায় :নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, সেন্ট্রাল উইমেনস ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস। শুধু এই কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম মনে পড়ল। নতুন ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামগুলো ইংরেজিতে রাখার সার্থকতা কোথায়?

আধুনিক সময়ে নর্থ সাউথ ডায়ালগ হচ্ছে বিশ্বজুড়ে বিশ্বায়নের জন্য। তেমনি হচ্ছে ইস্ট ও ওয়েস্টের  মাঝে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক রীতিনীতির বিবর্তন।  প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মিলনমেলায় শরিক হওয়ার প্রত্যাশায়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নাম বাংলায় হলে সেই নাম কি অধিকতর মধুর ও অর্থবহ হবে? যেমন ধরুন ‘প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের বিশ্ববিদ্যালয়’।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ওয়েবসাইট খুঁজে পেলাম। সেখানে দেখলাম আরো রয়েছে ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ নর্দান ইউনিভার্সিটি, বারিধারায় অবস্থিত আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি, ইবাইস ইউনিভার্সিটি। এদের মাঝে শুধু ইবাইস ইউনিভার্সিটির নামফলক বাংলা হরফে লেখা। ‘ইবাইস’-এর পুরো অর্থ জানতে চেয়েছিলাম। উত্তর পাইনি। এটা সত্য বাংলা ভাষার প্রাণকেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেশির ভাগ এখনো বাংলা ভাষা প্রচলনে পূর্ণ মনোযোগ দেয়নি।

বাংলা ভাষার প্রচলনের অন্বেষণে অন্য একটি স্তরে যাওয়া যাক। প্রতিজনের নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান হলো ব্যাংক। গুলশানে অবস্থিত একটির পরে একটি প্রাসাদোপম স্থাপনায় পনেরো তলা-বিশ তলা ছাপিয়ে স্থাপিত হয়েছে অসংখ্য ব্যাংক। সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক। কিন্তু প্রায় প্রতিটি ব্যাংকের নাম হয়েছে ইংরেজিতে। যদিও ওই ব্যাংকগুলোর কোনোটি আন্তর্জাতিক নয়, ইউরোপীয় বা যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকের শাখা নয়। যথা :ইস্ট ওয়েস্ট ব্যাংক, সাউথ ওয়েস্ট ব্যাংক, এবি ব্যাংক, এশিয়া ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, সিটি ব্যাংক। প্রায় সবগুলো ব্যাংকের সাইনবোর্ড ইংরেজি হরফে লেখা। মনের মাঝে প্রশ্ন আসে, এনআরবি ব্যাংক স্থাপিত হয়েছে গুলশানে, এর নামকরণ কি হতে পারত না ‘অভিবাসী ব্যাংক’? ইস্টার্ন ব্যাংকের বাংলা হতে পারত ‘পূর্বাঞ্চল ব্যাংক’। প্রাইভেট ব্যাংকগুলো কী যুক্তিতে ইংরেজি শব্দ ধরে রেখেছে, আমার ধারণা নেই। কিছু বাংলা নামচোখে পড়ল :মধুমতি ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, গ্রামীণ ব্যাংক। প্রতিটি ব্যাংকের বাংলা নাম আমার হূদয়কে স্পর্শ করছে।

হাসপাতালে প্রায় সবাইকে যেতে হয়। হয় নিজে ভর্তি হতে বা রোগীকে দেখতে। কিন্তু হাসপাতালের নামকরণে রয়েছে বাংলার প্রতি আশ্চর্য অনীহা। ইউনাইটেড হসপিটাল, ফ্যাশন আই হসপিটাল, ক্রিসেন্ট হসপিটাল, বারিধারায় অবস্থিত ক্রিশ্চিয়ান মেডিকেল হসপিটাল। অর্থবহ মনে হচ্ছে কি? ঢাকা নিউ লায়ন্স আই হসপিটাল। বাংলায় হবে ‘ঢাকার নতুন সিংহের চক্ষু হাসপাতাল’। বাংলা ভাষা কি এতই দুর্বল ও ভঙ্গুর? প্রশ্ন আমার থেকেই যাচ্ছে।

কিছু  কিছু টেলিভিশন চ্যানেল অনুষ্ঠানগুলোর নামকরণে বাংলা ভাষার প্রাধান্য দিয়েছে। আশাব্যঞ্জক সেই প্রাধান্য, কিন্তু প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট ব্যতিক্রম রয়েছে। সাম্প্রতিক একটি কথোপকথন অনুষ্ঠান দেখেছিলাম। অনুষ্ঠানটির নাম ‘টু দি পয়েন্ট’। আমার অতি আদৃত কবি মোহাম্মদ নুরুল হুদা মন্তব্য করেছিলেন। ‘বিন্দুর পথে’ বা ‘বিন্দুর দিকে’ হলে যথাযথ হতো।

সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের নেতৃত্ব বর্তায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তার প্রতি, প্রতিটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রকের প্রতি, প্রতিটি মিডিয়ার কর্ণধারের প্রতি। ওরা কি ওদের দায়িত্বশীলতাকে এখনো অবহেলা করে যাবেন? অথচ বাঙালি মধ্যবিত্তের প্রত্যাশা মিলিয়ে এখনো বেশ কিছু দোকানপাটের নামকরণ বাংলায় রয়েছে ঢাকার অভিজাত গুলশান এলাকার। যথা :বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, ইউসুফ বেকারি।

সর্বস্তরে বাংলা ভাষায় প্রচলনের আকাঙ্ক্ষা ও প্রক্রিয়ায় গত চারশ বছর ধরে নেতৃত্ব দিয়েছে বাংলার মধ্যবিত্ত সমাজ, ধনাঢ্য সমাজ নয়। প্রথম দফায় সতেরশ শতাব্দীতে বাংলার আপামর কবি-সাহিত্যিক মোগল শাসক ও উপনিবেশবাদীদের হাজারো প্রলোভন উপেক্ষা করে রচনা  করেছিল তাঁদের সাহিত্য বাংলায়। বাংলা হরফে, আরবি হরফে নয়, রোমান হরফে নয়। দ্বিতীয় দফায় বাংলা মধ্যবিত্ত সমাজ প্রত্যাখ্যান করেছে পাকিস্তানের তত্কালীন শিক্ষামন্ত্রীর প্রয়াস। শিক্ষার প্রতিটি স্তরে বাংলা লেখা হবে বাংলা হরফে নয়। বরং হবে আরবি হরফে। তিরিশটি শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছিল পূর্ব বাংলায়। তৃতীয় দফায় ১৯৫০ সাল থেকে প্রতিটি স্কুলে কলেজে মধ্যবিত্ত ছাত্রনেতারা সংগ্রাম সংগঠিত করেছে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে। অগ্রগণ্য ভূমিকায় ছিলেন তত্কালীন ছাত্র নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। এবং অবশেষে এলো অমর একুশে। ১৯৫২ সাল। আগ্রহী ও সাগ্রহী সাধারণ মানুষের হূদয়ের ঢল নিয়ে শুরু হয়েছিল অমর একুশের সংগ্রাম। রক্তের বিনিময়ে ভাষার অধিকার আহরিত হয়েছিল।

গত সত্তর বছর ধরে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন প্রক্রিয়ায় ধনাঢ্য বাঙালি সমাজের অগ্রগতি কোনোক্রমেই উনিশশ বায়ান্ন সালের সংগ্রামী ছাত্রদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। কিন্তু তাঁদের রক্তদান বৃথা হবে না। সহসা নতুন জনতার আন্দোলন সংগঠিত হবে। বাংলা ভাষা তাঁর অধিকার সর্বস্তরে অর্জন করবে। সেই প্রত্যাশায় অধীর হয়ে অপেক্ষা করছি।

 

১৯ মে ২০১৯ v