গল্প

কর্নেলকে একটা মেয়ে পৌঁছে দিতে হবে

আপডেট : ৩১ মে ২০১৯, ১৯:৪১

আগস্টের সোঁদা আবহাওয়ায় শরীরের অভ্যন্তরে চলতে থাকা বিদ্যুতের প্রবাহে উত্তপ্ত কর্নেল হিকমত লোদির কণ্ঠে অনেকদিন পর পরোক্ষে হলেও বাঙালির প্রশস্তি ঝরে পড়ে—তোদের মেয়েগুলো ভারি খুবসুরত আছে। কিন্তু মেয়েদের সেই সৌন্দর্যের তত্ত্ব দিয়ে কী লাভ যদি না তার বাস্তব পরিচয় খুব কাছ থেকে অবলোকন করা যায়। রসুলপুরের ক্যাম্পের চারপাশে তখন ভাদ্রের রোদ ক্রমবিস্তারী। দু দিন আগে চালানো মিরগঞ্জের অপারেশনের মধুর স্মৃতি তেলহীন ট্যাংকে অকস্মাত্ ঘটিত সরবরাহের মতন কর্নেল এবং তার বাহিনীর লোকেদের প্রভূত তাপের সঞ্চারণ ঘটায় আর তারা সকলেই ভাবে, অল্পদিনের

 

মধ্যেই যুদ্ধের হিসেব চূড়ান্তভাবে গুটিয়ে দিয়ে এবং বাঙালির স্বাধীনতার খায়েশ চিরকালের জন্যে মিটিয়ে দিয়ে তারা যে যার বাড়ি ফিরে যাবে। তোরাবের মনেও এ নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। যে বিক্রমে কর্নেল হিকমত লোদি ও তার দলবল সমস্ত মিরগঞ্জ তছনছ করে ফেলল সে বিক্রম অব্যাহত থাকলে তোরাব হিসেব করে, ভাদ্র আশ্বিন কার্তিক তারপর ধরো অগ্রহায়ণ—হ্যাঁ, তখন তো শীত পড়বে জাঁকিয়ে। মনে হয় না তাদেরকে শীত ঘন হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তার আগেই হয়তো জয়বাংলার লোকগুলোর বাপের নাম চিরকালের মতো ভুলিয়ে দিয়ে দেশকে শত্রুমুক্ত করে চাঁদতারাখচিত পতাকার নিচে সবাই মিলে এক হয়ে গাইতে থাকবে—পাক সার জমিন সাদ্ বাদ্, কিশ্ওয়ারে হাসিন সাদ্ বাদ্।

তোরাবের মনের মধ্যে তখন কর্নেলের কথা ঘুরে বেড়াচ্ছে—তোমরা যারা আমাদের সাহায্য করেছো, সাচ্চা ইমানদারের মতো আমাদের মঞ্জিলে মকসুদে পৌঁছাবার জন্যে জান বাজি রেখেছো তাদের সবাইকে আমরা ইসলামাবাদের ময়দানে লক্ষ লক্ষ লোকের উপস্থিতিতে তুলে ধরবো সমগ্র জাতির সামনে। তোমরা হলে গিয়ে জাতির স্বর্ণসন্তান। এভাবেই তুলনাটা দিয়েছিল হিকমত লোদি। কর্নেলের কণ্ঠের তেজোদ্দীপ্ত আওয়াজের স্মৃতি তোরাবের মনে টগবগ করে। একইসঙ্গে নিজের দায়িত্ববোধের প্রবল ধাক্কায় সে তার কর্তব্য স্থির করে নিতে থাকে। সন্ধ্যে উতরে গেলেই কর্নেলকে একটা মেয়ে পৌঁছে দিতে হবে। কয়েকদিনের মধ্যেই রসুলপুরে মানে তারই নিজগ্রামে অপারেশন। অপারেশন চলাকালে তার অনেক দায়িত্ব। যেসব চিহ্নিত বাড়ি থেকে লোকেরা জয়বাংলার সঙ্গে যোগ দিতে গেছে সেসব বাড়িকে প্রথম দফায় মাটির সঙ্গে মিশিয়ে ফেলতে হবে। পারলে সেসব বাড়ির অবশিষ্ট লোকেদের যার যার বাপের নাম ভুলিয়ে দিতে হবে। যারা দেশ ও জাতির সঙ্গে বেইমানি করে জয়বাংলার দলে গেছে তারা জানুক পাপের শাস্তি কতটা ভয়ানক হতে পারে। তবে সমস্যাও আছে। তোরাব একটুক্ষণ ভাবে—কিছু কিছু ঘর আছে, ধরো, একজন জয়বাংলায় যোগ দিতে গেছে কিন্তু একই ঘরের অন্যজন গেছে কর্নেলদের দলে। সেসব ঘরের কী হবে। পরক্ষণে নিজেকে আশ্বস্ত করে তোরাব, পরম শক্তিমান কর্নেল হিকমত লোদি নিশ্চয়ই একটা ব্যবস্থা নেবেন। তিনি বিচক্ষণ যুদ্ধনেতা। সারা দেশে তিনি ও তাঁর দল প্রচণ্ড শক্তি গতি আর তেজ নিয়ে দাপিয়ে ছুটছেন। সকলেই তাদের ওপর আস্থাশীল।

কর্নেলকে একটা মেয়ে পৌঁছে দিতে হবে। কথাটা যেমন বাস্তব তেমনই আরেকটা বাস্তবের সম্ভাবনা তোরাবের করোটিতে ধাক্কা লাগায় ভাদ্রের ছুটন্ত মেঘের মতো। এই সুযোগে একটা প্রতিশোধেরও ব্যবস্থা করে ফেলা দরকার। এক ঢিলে কর্নেলের অন্তর ঠাণ্ডা হবে এবং অন্য ঢিলে ময়নার ওপর তার প্রতিশোধ নেওয়া হবে। শুধু ময়না কেন, ময়নার নাগর ইব্রাহিমের ওপরও দাদ নেওয়া হবে। পাঞ্জাবিদের হত্যা করবে বলে যে কিনা বৈশাখ মাসে রসুলপুরের কাঁচা রাস্তা ধরে চলে গিয়েছিল কোথাও। কোথায় সে গেছে তা সম্পূর্ণ গোপনীয় থাকলেও তোরাবের দূরবিস্তারী জালে তাকে আসতেই হয়। দৈহিকভাবে ধরা না গেলেও তার সংবাদ তোরাব পেয়েছে ঠিকই। অস্ত্র চালানোর ট্রেনিং নিয়ে শ্যামগঞ্জের দিকে ওরা আস্তানা গেড়েছে। তুই বন্দুক চালা, দাঁতে দাঁত খিঁচে একটা খিস্তি করে তোরাব, শেষ বন্দুক তোর উপের চালাইবো কর্নেল হিকমত। বুঝছস হারামজাদা! এমনভাবে তাকে শাপশাপান্ত করে তোরাব যেন ময়নার সেই প্রেমিক ছেলেটি তার চোখের সামনে দাঁড়ানো। বাপমরা ময়নাকে যখন তোরাব মনেপ্রাণে পেতে চায় তখন ইব্রাহিমই বাধার প্রাকার হয়ে দাঁড়ায় পথে। দোষ অবশ্য ময়নারই। সে-ই উল্টো তার কথাকে পাত্তা না দিয়ে, তাকে এতটুকু গুরুত্ব না দিয়ে ঝুঁকে পড়ল ইব্রাহিমের দিকে। এত বড় নির্লজ্জ আর বেহায়া মেয়েটা—বলে কিনা দুনিয়াতে যদি কাউকে মন দিতে হয় ইব্রাহিমকেই দেবে। ময়নার বেহায়াপনা দিন দিন বেড়েই চলে। বাড়তে বাড়তে তা তোরাবের ধৈর্যসীমা ছাড়িয়ে যায়। পুকুরঘাটে তালের গুঁড়ির ওপর কাপড় আছড়াতে আছড়াতে সে হয়তো কোন প্রতিবেশীকে বলল, তোম্রা দেখবা, ইব্রাহিম ভাই আর যত মুক্তির লোক আছে সবাই মিল্যা পাকিস্তানিগো কচুকাটা করবো। ময়নার জানা, যুদ্ধে দা-ছুরি নয় বন্দুক গুলি রাইফেলই ব্যবহূত হয় তবু অভ্যেসের বশে সে কথাটা বলে ফেলে। আশপাশে যারা থাকে তারা সবাই প্রতিবেশীই কিন্তু কী করে কী করে যেন সেকথা পৌঁছে যায় তোরাবের কানে। শুনে প্রত্যাখ্যানের কষ্ট বুকে চেপে রাখা তোরাবের শিরায় দাপাদাপি। মনে মনে জপে, খাড়া তোর জয়বাংলা কর্নেল হিকমত কেমন কইর্যা তোর ঐহান দিয়া ঢুকায়া দেয়। ময়না ইব্রাহিম এবং সমগ্র জয়বাংলাকে ভালোমতো খিস্তি করতে পারলে তোরাবের প্রাণে একটু শীতলতা আসে।

কর্নেলকে আজ রাতেই একটা মেয়ে পৌঁছে দিতে হবে এবং সে হবে ময়না। ইব্রাহিম তুমি এসএমজি কি থ্রিনটথ্রি কি রাইফেল দিয়া ঠুস-ঠুস করো, মারতে তো পারবি না একটাও, আর তোর জানের কইলজারে কর্নেল কেমনে ফালা ফালা কইর্যা ফালায় তা আজ দেখবি। প্রতিপক্ষের প্রবল ধ্বংসকামনায় তোরাবের ভেতরটাতে যখন উথালপাথাল তখন ময়না ওর অসুস্থ মাকে কোনোরকমে শুইয়ে দিয়ে পুকুর থেকে আনা ঝাঁঝরিধোয়া চালগুলো চুলোর পাশে রাখছিল। পানিটুকু একটু ঝরে গেলেই লালচে আউশ ধানের চালগুলো চাপিয়ে দেবে মাটির চুলোয়। যুদ্ধ শুরু হয় হয় এমন একদিন সন্ধ্যেবেলা বাজার থেকে ফেরার সময় সাঁকো পেরোতে গিয়ে অসাবধানে পা ফস্কে নিচে পড়ে গিয়েই মৃত হয়ে যায় লোকটা। বছরের পর বছর এই সাঁকো পেরিয়ে গেছে সে কত কত দিকে, বাজারে কাজে আর বেড়াবার উদ্দেশে কিন্তু সেদিন কী হয় কে জানে। কেউ বলে মাথা ঘুরে কেউ বলে বেখেয়ালে পড়ে গিয়ে সম্পূর্ণ শুকনো জলহীন খালের মধ্যে পড়ে মরে গেল। ময়নার মা অসুস্থ আরো আগে থেকেই। এখন স্বামীর মৃত্যুতে তার হাঁপানির টান অন্ত্রের সমস্যা আর হাড়ের ব্যথা সব এক হয়ে তাকে এমনই ধরাশায়ী করে যে শয্যা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না তার। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে ময়নার। মায়ের সেবা করবে না ঘর সামলাবে না নিজের খাবার জোগাড় করবে সেই ছুটোছুটিতে তার মরণদশা। যুদ্ধের অল্প আগেও অসহায় ময়নাকে আরো অসহায় করে দিয়েছিল তার নিজেরই নিঃসঙ্গ-একাকী নিরবলম্ব অবস্থান। গ্রামের নানা দিক থেকে আসা যুবকবয়সী ছেলেদের আগ্রহাতিশয্য তার জন্যে রীতিমতো নিপীড়নে পরিণত হয়। যুদ্ধ শুরু হলে তা একদিক থেকে আশীর্বাদই বয়ে আনে ময়নার জন্যে। যেসব ছেলেকে ময়না ভেবেছিল দুর্বৃত্তচারী তারাই তখন দেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্যে অস্ত্রহাতে চলে গেছে কাছে বা দূরে। মনে মনে যে ছেলেটিকে ঘিরে ময়নার স্বপ্ন একটু একটু ডালপালা মেলতে শুরু করেছিল শত বৈরিতার পরিস্থিতিতেও সেই ছেলেটাও পর্যন্ত কাছে থাকল না। ময়নার প্রবলাকুতি ছিল, কত কত ছেলেরাই তো যুদ্ধে গেছে, আপেন একজন না গেলে হয় না—প্রশ্নে প্রথমে চুপচাপ থেকে দৃঢ় ইব্রাহিম বলেছিল, অন্যে কী করবো সেডা ভাবার সময় না এডা, আমি কী করমু, আমার কী করা দরকার এহন সেডাই ভাবতে হবে। ময়নাকে চোখের জলে ভাসিয়ে দিয়ে চলে যায় ইব্রাহিম। যাবার সময় বলে যায়, যদি হোনো আমি মইর্যা গেছি মনে করবা আমার হাতে ধরা ছিল অস্ত্র। যদি হোনো মইর্যা গেছি মনে করবা আমি শত্রুর গুলি খাইছিলাম। যদি হোনো মইর্যা গেছি তয় মনে করবা, মরনের সময় আমি কলমা পড়ছিলাম আর হেইলগে তোমার নাম লইছিলাম। রসুলপুরের রাস্তা থেকে মিরগঞ্জ পেরিয়ে তারপর বহুদূরে চলে গেলেও ইব্রাহিম বস্তুত থেকে যায় ময়নার মনের মধ্যেই। সেখান থেকেই সে নানারকম পজিশন নিয়ে, যেমন বলে পাশের গ্রামের যোদ্ধা শরিফ, শত্রুর দিকে অন্তর্ভেদী। যে ছেলে জানত কেবল ধানের নাম রবিশস্যের নাম আর ফলপাকুড়ের নাম এখন তার মুখে অস্ত্রের ঝনঝনানি। একেকটার আওয়াজ একেকরকম। কোনোটা একটা মাত্র শব্দে, কোনোটা একাধিক শব্দে কিংবা কোনোটা দুটো শব্দের মাঝখানে মুহূর্তকাল বিরতি নিয়ে হামলে পড়ে শত্রুর ওপর। শরিফ কৃষকের ছদ্মবেশে মাঝখানে একবার এসেছিল তার অসুস্থ মাকে দেখতে। শরিফের বোন টুনি আবার ময়নার সখী। শরিফের কাছেই জানা যায়, ইব্রাহিমদের ঘাঁটি শ্যামগঞ্জের দিকে। কিন্তু সেটা স্থায়ী নয়, যে কোনো সময় যে কোনো দিকে স্থান বদলে চলে যেতে পারে সে প্রয়োজনে।

এদিকে মিরগঞ্জে স্কুলে আস্তানা গাড়ে পাকিস্তানিরা। তাদের সঙ্গে রয়েছে দেশীয়রাও। তারাই পরিচিত জয়বাংলার লোকেদের শনাক্ত করে দেয় আর তাদের খোঁজে তল্লাশি চালিয়ে ফেরে গ্রামে গ্রামে গিয়ে। শুধু বিদেশি মানে পাকিস্তানিদের পক্ষে কি আর খালবিল রাস্তাঘাট ডিঙিয়ে জয়বাংলার লোকেদের খোঁজ করা সম্ভব নাকি সেটা বাস্তবও! এমনিতে তারা ভয় পায় জলাভূমি পার হতে আর আকাশে মেঘের ইশারা জাগতেই পাকিস্তানিগুলোর বুক ঢিপঢিপ করতে শুরু করে। দারুণ ভয় তাদের বৃষ্টিবাদলাকে। অথচ ইব্রাহিম শরিফ এবং আরো যত জয়বাংলার ছেলেরা আছে, তারা বৃষ্টির পরোয়া না করে বরং বৃষ্টিসিক্ত হয়েও লক্ষ্যচ্যুত হয় না। বৃষ্টি হলো তাদের জন্যে এক অন্যরকম অস্ত্র। টুনি খুব সুন্দর করে বলে, শরিফের কাছ থেকে শোনা, বলে—বৃষ্টি হইলো টিক্কা খানের যম। এনিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকে ছড়াও বানায় রসিকতা করে—‘বৃষ্টি পড়ে রিমঝিম/ টিক্কা পাড়ে ঘোড়ার ডিম।’ কিংবা ধরা যাক—‘বৃষ্টি পড়ে ঝমঝম/ ইয়াহিয়ার আইলো যম।’ বৃষ্টির মতো একটি সাধারণ অতি পরিচিত উপাদানও এভাবে অসাধারণত্ব অর্জন করে গ্রামের লোকেদের স্বতঃস্ফূর্ত কল্পনায়। অন্যদিন হলে যুদ্ধের আচ্ছন্নতার মধ্যেও একটা ঘোরের মতো ঘুম এসে আচমকা ভর করত চোখের পাতায়। কিন্তু ভাদ্রের এই অস্বস্তিতে বাড়তি আশঙ্কা হয়ে দাঁড়ায় মিরগঞ্জের ক্যাম্প। চারপাশ থেকে ভেসে আসা গুঞ্জন ময়নার মধ্যে জাগায় বিপন্নতা। এরইমধ্যে তিন গ্রাম পরের সাগরদি থেকে খবর আসে, সেখানকার একটি মেয়ের তখনো বিয়েই হয়নি অথচ তার নাকি বাচ্চা হবে। ভাইকে নিয়ে আত্মীয়বাড়ি যাওয়ার পথে মিলিটারির কবলে পড়েছিল তারা। বহু জিজ্ঞাসাবাদের পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয় কিন্তু মেয়েটি ফিরতে পারে কেবল সবকিছু হারিয়ে ফেলবার পরে। বিষয়টা আতঙ্কে-অবিশ্বাসে চেপে রাখা গিয়েছিল কিছুকাল, কিন্তু একদিন বাস্তব সবকিছুকে দুদ্দাড় ঠেলে সরিয়ে দিয়ে প্রবল ও ভয়ঙ্কর উত্থানে সবাইকে হতবাক করে দেয়। ময়নার ঘুম আসে না। অনুপস্থিত ইব্রাহিমের ভাবনা মনে একটা আরামের প্রলেপ বুলিয়ে দিলেও মিরগঞ্জ তার শিয়রে নিঃশ্বাস ফেলে।

দূর-দূর থেকে শব্দ ওঠে অকস্মাত্। সেসব শব্দ অস্ত্রের। এমনই সে শব্দ, প্রভাবে কুকুর-বিড়ালেরাও নিজস্ব ডাক প্রকাশ ভুলে হারিয়ে যায় নির্জনতার গর্ভে। দূর-দূর থেকে শব্দ শোনা গেলেও তা যে কোনো সময়ই ফেটে পড়তে পারে আর পড়ে তা জাগাতে পারে প্রবল  বিস্ফোরণ। দিনদশেক আগে ময়নার ছোট খালার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা ঘুমিয়েছিল রাতে। তাদের বাড়ির অবস্থানটাই এমন। গ্রামটিকে প্রায় সমদূরত্বের বিভাজনে রেখে একদিকে কাঁচামাটির রাস্তা এবং অন্যদিকে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের পাকা চওড়া রাস্তা। দিনমান ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তায় বুনো রঙের ট্যাংক হালকা-ভারী মেশিনগান আর রাইফেল নিয়ে ছুটে বেড়িয়েছে পাকিস্তানি সৈন্যরা। পেছন দিককার কাঁচা রাস্তায় গামছা-লুঙ্গি কি খালি গায়ের মুক্তিযোদ্ধারা ছিল। একটা মারাত্মক আতঙ্কের মধ্যে কাটে সারাদিন। রাতটাও কাটে তেমনি। কিন্তু ভোররাতের দিকে একটি তীব্র হুইসেলের মতো বাতাসচেরা ধ্বনি ছুটে যায় ভয়ঙ্কর গতি নিয়ে। এমনই তীব্রতা সে শব্দের যে গোটা গ্রামের লোকেরা জেগে উঠেছিল আতঙ্কে। কিন্তু কোথাও কোনো তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার সাড়া লক্ষণীয় না হলে তারা ফের ঘুমিয়ে পড়ে বা জেগে থাকে। তারপর ফজরের আজান দেওয়ার প্রাক্কালে পুকুরে নেমে অজু করবার সময় মুয়াজ্জিনেরই প্রথম নজরে পড়ে ভেসে থাকা মৃত মাছেদের মৃতদেহে পুকুর ভর্তি। বলা যায় পুকুরের প্রায় সব মাছই সেখানে উপস্থিত—প্রাণহীন ও নিঃসাড়। কই, বোয়াল, রুই, শিং, মাগুর, চিতল, ভেটকি, টাকি, টেংরা, পুঁটি, কাঁচকি, কাতলা, মৃগেল, শোল, বাইন, চাঁদা, চাপিলা—মাছ আর মাছ, ডানে বামে সামনে পাশে মাছই কেবল। কোনোরকমে মৃত মাছেদের সে পুকুরে অজু সেরে মুয়াজ্জিন উঠে আসেন। আজান দেওয়ার পরে, নামাজ সারবার পরে, সেদিনের পরে আরো আরো দিন পরেও মুয়াজ্জিনের সে স্মৃতি তাঁকে তাড়া করে ফেরে। তাঁর সারা হাতে, হাত ছাড়িয়ে সারা গায়ে তিনি কেবল মাছের গন্ধ পান। শরীরময় মাছের গন্ধ নিয়ে মুয়াজ্জিন মাছ খাওয়াই ছেড়ে দেন শেষে। কিন্তু যেটা মুয়াজ্জিনের মতো সমস্ত গ্রামবাসীকে বিস্ময়বিদ্ধ করে—এত এত নীরব মৃত্যুর ঘটনা ঘটে গেল অথচ তারা জানতে পেলো না। শেষে একজন মুক্তিযোদ্ধার মারফত জানা যায়, সেটি ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা থেকে ছোড়া একটি গোলা ছিল—যেটি সরাসরি পুকুরে পড়েই জলের অভ্যন্তরে ঘটিয়ে দিয়েছিল ওলটপালট—যেটি ঘুমন্ত মানুষেরা জানতে পারে আরো অনেকটা সময় পরে। কাজেই ময়নার মনে বস্তুত দূর আর নিকটের পৃথক কোনো মানে থাকে না। পাতার খসখসে শব্দও তার মনে হয় ত্রস্ত হন্তারকের আগমন। আজকাল এমনও হয়েছে, পত্রপতনের শব্দেও ঘুম ভেঙে যায়। মায়ের কোনো সাড়াশব্দ নেই। হয়তো মা তার ঘুম-মৃত্যুর মাঝামাঝি এমন একটা অবস্থানে, যেখান থেকে জীবন ও মৃত্যুর সংযোগ সমান সমান। তাহলে মা কি তার এই ঘুম ঘুম অবস্থার মধ্য দিয়ে ক্রমে মৃত্যুর দিকেই ছুটে চলেছে! ঘুম ভাঙে মা’র কিন্তু তারপর আবার ঘুম নামে তার চোখে। মায়ের শব্দ ও নিঃশব্দতা ময়নার মধ্যে এমন বোধ জাগায়, তার ঘুমই তার বেঁচে থাকবার চিহ্ন এবং তার ঘুমই তার মৃত্যুরও সম্ভাবনা।

ময়নার হয়তো ঘুম নেমেছিল। এটা সে বলতে পারে, কেননা খসখসে একটা শব্দে চমকে সে চাটাইয়ের শয্যা থেকে উঠে বসে। আটকানো দরজা খুলে কী করে তার কোনো মীমাংসা না হতেই ফের মুহূর্তকাল ভাবে, গোটা দেশ যখন শত্রুর জন্যে খোলা সেখানে সামান্য একটা বেড়ার দরজা খোলা আর বন্ধে কী তফাত! একটু কোণের দিকে মা’টা যেন ঘুমের মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়ে চলেছে কেবলই। ডাক্তার-বদ্যির কাছে যে যায় সে সুযোগও কই। ছিল এক নিমাই ডাক্তার যুগিবাড়িতে। সপ্তাহখানেক আগে বেচারা গিয়েছিল মফস্বলে ঔষধের উপাদান আনবার জন্যে। কিন্তু তার পক্ষে আর জীবিত ফেরা হয় না। শেষ বিকেলে সৈন্যকবলিত বাজার তছনছ হয়ে যায় আর হোমিওপ্যাথ নিমাইচন্দ্র নাথ পড়ে থাকে একটা গুড়ের দোকানের পাশে। ময়না হয়তো একটুক্ষণই ভাবতে পারে নিমাই নাথের কথা। ঘুম-জাগরণের একটা মিশ্রিত অনুভবের ফলে নিজের বর্তমান সম্পর্কেও ময়না খুব ক্ষিপ্র হতে পারে না। পড়ে থাকা মায়ের শরীর হয়ে নিমাই এবং নিহত নিমাই হয়ে পাঞ্জাবি সৈন্য, তারপর উদ্যত সৈন্যের বিপরীতে প্রতিজ্ঞ ইব্রাহিমের ছবিটা সে ক্ষণেকের জন্যেই দেখে আলিঝালি, কিন্তু এসবই দূরে থাকা আবছা আভাস। তার সমস্ত আভাস আর কল্পনা এক ঝটকায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। বাইরে গাঢ় অন্ধকার আর আকাশ থেকে নেমে আসা রাতের আলোর ছায়া-প্রচ্ছায়ামেশানো অন্ধকারে তার ঘরে তার সামনে দাঁড়ানো একটা লোক এবং তার হাতে একটা অস্ত্র। যুদ্ধদিনের অভিজ্ঞতায় ময়না জানে, সেটি পিস্তল। পিস্তলে গুলি থাকে ছয়টা। আর পিস্তল মানে মৃত্যুর পূর্বক্ষণ। কারণ, পিস্তলে ছয়টার বদলে যদি একটা গুলিও থাকে তাহলে সে ময়না এখনই মৃত্যুর গর্তে ঢলে পড়বে। ততক্ষণে ময়নার চোখের সমস্ত আচ্ছন্নতা উধাও। ছায়ামূর্তি আর তার সশস্ত্র অবস্থান ময়নাকে ঠাণ্ডা-হিম করে দিলে চারদিকে সে তার পক্ষে কোনো অবলম্বনই খুঁজে পায় না। দিনের শেষ নামাজের আজান পড়েছিল সে-ও অনেকটা সময় পেরিয়েছে। বাইরে সমস্ত রাত্রি গাঢ় অন্ধকার হয়ে বিরাজমান। ময়না হয়তো চিত্কার দিতে চায়, কিন্তু চিত্কারই তাকে কোনোরূপ সহায়তা জোগায় না। যুদ্ধ শুরু হওয়ার দিন থেকে একটা জিনিসই ময়না এবং গ্রামের লোকেরা শিখেছে, নিস্তব্ধতা ও নিঃসাড়তা। যে কোনো পরিস্থিতিতে দম মেরে পড়ে থাকাটাই একটা কৌশল। সেই কৌশলেই বাঁচতে পেরেছিল তার সখী টুনির ভাই মুক্তিযোদ্ধা শরিফের বন্ধু ইসমাইল। শেষ বিকেলে কবলিত বাজারে গুলি খাওয়া বাজারিরা যখন কাটা গাছের গুঁড়ির মতো একে একে ঢলে পড়ে তখন গুলি না-খাওয়া ইসমাইলও ঢলে পড়ে। পড়ে সে আসলে হয়তো মুহূর্তের স্বয়ংক্রিয় কোনো বিস্ময়ের প্রভাবে। কী করে সে দম আটকে মৃত্যুর সেই স্তূপে পড়ে থাকে তা জানে না, কিন্তু মৃতদের রেখে আরো জীবিতদের মৃত করবার জন্যে সৈন্যরা জায়গাটা ছেড়ে চলে যাওয়ার পরেই কেবল ইসমাইল টের পায় তার শরীরের প্রকোষ্ঠে আটকা পড়েছিল জীবনের হাওয়া। তীরের বেগেই যেন বুকনিংড়ানো সেই হাওয়া ছুটে যায় জীবনের হাওয়ার সংযোগের খোঁজে। মৃত্যুর সেই স্তূপ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে টলতে থাকা ইসমাইল যেন আসলে জীবন নয়, ঐ বিকেলে বাজারে মৃত হয়ে যাওয়া লোকেদেরই চিরকালীন প্রতিনিধি। তার শরীরময় রক্ত যে রক্ত তার নিজের নয়, অন্যদের—ছিটকে আসা।

: একটাও শব্দ না, যা কই হোন্। আমার লগে যাওন লাগবো। আর যদি না যাস মাথার খুলি উড়ায়্যা দিমু।

গলার স্বরে তোরাবকে স্পষ্টই চিনতে পারা যায়। তা না হলেও বুঝতে পারত ময়না। কেননা, প্রত্যাখ্যাত তোরাব যে মুক্তিযোদ্ধা ইব্রাহিমের খোঁজ করে সেটা প্রায় সারা গ্রামের লোকেদেরই জানা। ময়নারও জানা, রাজাকারের সর্দার তোরাবের নাম এরইমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে গ্রাম-গ্রামান্তরে। ফুলপুর গ্রামের সরকার বাড়িতে সদলবলে হানা দিয়েছিল তোরাব। সরকারেদের ছোট মেয়ে নীলিমাকে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ঘণ্টাচারেক পরে ফেরে মেয়েটি। ফেরে সে মূলত গলায় দড়ি দেওয়ার জন্যে। কড়িকাঠ থেকে নামাতে থাকা মৃত নীলিমার নিথর শরীরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আচমকা নীলিমার মা জোস্না সমস্ত বিলাপ-প্রলাপের অতীত হয়ে যায় মুহূর্তের মৃত্যুর আক্রমণে। আর মেয়ের আত্মহত্যা স্ত্রীর মৃত্যু সবকিছুর দর্শক অঘোরনাথ সরকার এক সাগর শোক সামলাতে গিয়ে পক্ষাঘাতের কবলে পড়ে। এই দুর্যোগে আশপাশে এমন কোনো ডাক্তারও নেই যে তাকে সারিয়ে তুলবে। নিজেকে সামলাতে সামলাতে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা তোরাবের সামনে এই এত্তটুকুন একটা পোকার মতো হয়ে যায় ময়না। সে নিশ্চিত, তোরাব চাইলেই তাকে গুলি করতে পারে এবং ওর মায়ের জেগে উঠবার ভয়ে যে সে তাকে গুলি করা থেকে নিবৃত্ত থাকবে তা-ও নয়। এমন দুর্যোগের মধ্যেও ক্ষীণ আশা ছিল, সরকারেদের মেয়ে নীলিমা, দাশেদের মেয়ে পূর্ণিমা কি সাহাদের মেয়ে সরোজিনীর কথাই শোনা গিয়েছিল। তাছাড়া তোরাব তো তাদের গ্রামেরই ছেলে। এমন নিকটের মানুষ হয়েও সে কী করে তাকে ক্যাম্পে নিয়ে যেতে পারে! কোণে পড়ে থাকা মা যেন আর জাগবেই না। মনে মনে মায়ের দীর্ঘ ঘুমের প্রার্থনা করতে থাকে ময়না। জেগে ওঠাটাই বরং আশঙ্কার। এখন একমাত্র ময়না আর জেগে উঠলে মা এবং মেয়ে দুজনের জন্যেই নেমে আসবে মৃত্যুর ঝুঁকি।

পরনের কাপড় সামলে নিয়ে যতটা সম্ভব বিস্রস্ততা গুছিয়ে নেওয়ার পরেও ময়নার পক্ষে ঊর্ধ্বাঙ্গ সামলানো কষ্টকর হয়ে পড়ে। বয়সের সুস্পষ্ট-সুষম প্রকাশ তার বক্ষ পরনের শাড়ির আঁচলের দিকটা দিয়ে ঢাকা গেলেও অন্তর্বাসহীন ঊর্ধ্বাঙ্গ সেই মুহূর্তে ময়নার নিজের কাছেই এক অস্বস্তি আর বিরক্তির কারণ হয়ে দেখা দেয়। সে যখন ঘর ছেড়ে এক চিলতে প্রাঙ্গণ পেরিয়ে পুকুরের কাছাকাছি লেবু-কামরাঙ্গা-তেঁতুল গাছ আর নানারকম লতাগুল্মের ঝোপের পাশে মুহূর্তকাল দাঁড়ায় তোরাবকে সামনে রেখে তখন রসুলপুরের চতুর্দিকে রাত্রি এক বিশাল নিদ্রার প্রতীকে ছড়িয়ে রয়েছে। ময়নার সারা শরীরে  একটা কম্পন চলতে শুরু করে। সেটিকে থামানো যায় না, হয়তো ময়না সেটিকে থামাবার চেষ্টাও করে না। অন্য ভাবনা তখন মাথায় চাড়া দেয়। ততক্ষণে ময়নার কাছে পুরো ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে গেছে। তোরাব আসলে তাকে ক্যাম্পে নিয়ে যাচ্ছে প্রথমত তার প্রত্যাখ্যানের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যে এবং দ্বিতীয়ত তারই ভালোবাসার মানুষ ইব্রাহিমের ওপর শোধ নেওয়ার জন্যে। নিকটে কাঠবিড়ালি বা গুইসাপ ধরনের কিছু একটা সটকে পড়বার শব্দ হয়। ময়নার চোখের সামনে গাছপালাপূর্ণ ডাঙা আর তার ওপারকার বিলের নির্জনতা দুলে ওঠে। বিল দেখা না গেলেও মনের মধ্যে সংরক্ষিত থাকা বিলের ছবিটাই ভেসে ওঠে। এই বিলের পাশ দিয়ে যে সরু কাঁচা রাস্তাটা গেছে সেটা ধরে খানিকটা গিয়ে দুটো-তিনটে ধানখেত পেরিয়ে উঠতে হবে বড় রাস্তায় এবং বড় রাস্তার অল্প পরেই রসুলপুর স্কুলটা। স্কুলে সৈন্যদের ক্যাম্প। যে কোনো সময়েই তারা হামলা করতে পারে। পুকুরের পাড় ধরে হাঁটতে থাকা ময়নার শরীর আচমকা অবশ এক অনুভূতির কবলে পড়ে ময়নাকে বিবশ করে দিলে সে একটুক্ষণের জন্যে দাঁড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তকালের সেই নিথরতার মধ্যেই সে ভাবে, ক্যাম্পে না, যাচ্ছি তো আসলে মরতেই। নীলিমা পূর্ণিমা আর সরোজিনীর মতো আমাকেও মরতে হবে। আর ক্যাম্প থেকে ফিরলেও নীলিমাকেও মরতেই হয়েছিল শেষ পর্যন্ত। মোটকথা এই যখন সে তোরাব নামক জ্বলজ্যান্ত এক যমের হাতে পড়েছে তখন কোনোভাবেই তার পক্ষে জীবনের কথা ভাবা সম্ভব নয়। তবু ময়না বাঁচবার কথা মনের গভীরে কোথাও একটুক্ষণ স্থান দিতে চায়। জানে, তোরাবের কাছে অনুনয়-বিনয় করা নিরর্থক কিন্তু ময়না কণ্ঠে একটুখানি আকুতি এনে মিনতির মতো করে একটা বক্তব্য তৈরি করবার চেষ্টা চালায়—তোরাব ভাই, আপেন আমার উপের মনে হয় রাগ করছেন কিন্তু আমি তো আপেনরে অনেক সম্মান করি।

স্থিরলক্ষ্য তোরাব থমকে পড়ত না। মনে তার ডানামেলা পাখির বিস্তার। কর্নেলের মনের মধ্যে তার একটা সুন্দর অবস্থান তৈরি হয়ে গেছে এরইমধ্যে। আর ক’টা দিন গেলেই মুক্তি আর জয়বাংলাগুলো যখন লেজ তুলে পালাবে তখন সে এবং তার মতো সবাই একজোটে ভাসবে আনন্দের সাগরে। কর্নেল বলেছেন, পাকিস্তান থেকে অনেক অনেক পুরস্কার আসবে তাদের জন্যে। আর, শুয়োরের বাচ্চা, কষে একটা গাল দেয় তোরাব, তোদের জন্মের নাই ঠিক, তোদের বাপ ইন্ডিয়া যখন পাকিস্তানিদের বোমা খেয়ে ‘মাগো গেলাম, মাগো গেলাম’ বলে ককাতে থাকবে তখন দেখি তোদের আর কোন বাপ এসে তোদেরকে রক্ষা করে! কয়েকটা দিনের মধ্যেই তোরাব মোটামুটি তার মহাপরিকল্পনার একটা প্রাথমিক ছক বানিয়ে ফেলেছে। আলামত যা দেখা যাচ্ছে তাতে এটা ধরে নেওয়া যায়, হিন্দুরা সব ধীরে ধীরে দেশ ছেড়ে চলে যাবে। তখন, সেই সুবর্ণ সময়ে সে সরকার বিশ্বাস আর মজুমদারের জায়গাজমি সব দখল করে নেবে। সেই কাজে কর্নেল হিকমত লোদিকে তার সবচাইতে বেশি দরকার। তাই কর্নেলের দিকটা সর্বাগ্রে ঠিক রাখতে হবে। কিন্তু অন্ধকারে ময়নার ডাক স্থিরলক্ষ্য তোরাবকে খানিকটা চমকে দেয়। ‘সম্মান’ শব্দটাকে ইচ্ছে করেই কয়েক সেকেন্ড বেশি সময় নিয়ে সে নাড়াচাড়া করতে চায়। হাতে তার খুব বেশি সময় নেই। কর্নেলের নিশ্চয়ই সারা শরীরে এখন তরঙ্গের ছোটাছুটি চলছে। গত সপ্তাহে একই দিনে দিনের বেলা যুগিবাড়ির একটাকে আর রাতের বেলা মিরগঞ্জের একটাকে মোট দুইটাকে সে পেয়েছে। কর্নেলের হয়ে যাওয়ার পরে সে সৈন্যদের ডেকে বলেছিল, এবার তোমরা ঠাণ্ডা হয়ে নাও। দ্রুতগতি তোরাবের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সম্ভব নয় ময়নার পক্ষে। কিন্তু ময়না কি অন্য কোনো ফন্দিফিকিরের তালে আছে—তোরাব ধমক লাগায় তাকে—

: হাতে সময় নাই কথা হোনোনের। আর একটা শব্দও না বইলা হাঁটতে থাক্। আর যদি তা না করস তাইলে এইহানেই গুলি কইর্যা ফালাইয়া দিমু কইলাম!

হস্তধৃত পিস্তলটা তোরাব অন্ধকারে দোলায় বটে কিন্তু মুহূর্তেই সে সেটা তার পরনের লুঙ্গির পেছনে কী এক কৌশলে আটকে রাখে। ময়না তবু আশা ছাড়ে না। আপ্রাণ চেষ্টায় সে একটিবারের জন্যে অন্তত জ্বলে উঠতে চায়। ক্যাম্পে যাওয়া মানে তো মৃত্যুর দিকে যাওয়া। পূর্ণিমা সরোজিনী নীলিমা এবং আরো আরো নাম না-জানা হতভাগা মেয়েদের দিকে যাওয়া। ইব্রাহিমের কথাগুলো মনের মধ্যে চকিতে ঝলকে উঠতে চায়। যুদ্ধে চলে যাওয়ার আগে বলে গিয়েছিল ইব্রাহিম—শুধু বন্দুক কাঁধে নিলেই যুদ্ধ হয় না। যুদ্ধ মানে আরো অনেক কিছু। যুদ্ধ মানে প্রতিটি মুহূর্তে যে কোনো পরিস্থিতিতে লড়া, শত্রুর সঙ্গে লড়া। সেই লড়াটা সবসময়ে গুলিবন্দুকের মধ্য দিয়েই ঘটবে এমন নয়। যুদ্ধ মানে প্রতিপক্ষের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ততা। সেই অবস্থায় নিজের বুদ্ধি-বিবেক-বিচক্ষণতাকে প্রতিপক্ষের চিন্তার-কর্মের বিপরীতে প্রয়োগ করাটাও যুদ্ধ। এবং অবরুদ্ধতার মধ্যে দেশের প্রতিটি স্থানে প্রতিটি ইঞ্চি জায়গার মধ্যে যুদ্ধাবস্থার পরিস্থিতিতে নিজেকে যুদ্ধের জন্যে দেশের কাজে লাগানোটাও যুদ্ধ। ইব্রাহিমের কথাগুলো ময়নার মনে প্রবল সঞ্চারণ ঘটাতে থাকলে তার মনে হলো, এখন একটা কাজই করতে হবে। কৌশলে বাঁচবার চেষ্টা করতে হবে। তোরাবকে অনুসরণ করা মানে হলো মৃত্যুর গর্তের দিকে যাওয়া। গ্রামের সবাই জানে ক্যাম্পে যাওয়া মানেই হলো চিরকালের এক গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া। ময়না থমকে পড়ে একটা হেলানো সোনালু গাছের গায়ে। পাশেই লম্বা তালগাছটাও রয়েছে। তালের মোটা খসখসে শেকড়গুলো খোঁচা দেয় পদতলে। ময়নাকে থমকে পড়তে দেখে তোরাব ক্রুদ্ধ হয়।

: অই, খানকি হারামজাদি, আইজ কইলাম আমার হাতে তোর মরন আছে। খাড়াইলি ক্যান্? হাঁট্ কইলাম, হাঁট্! 

ময়না গলে পড়তে থাকে। গলতে গলতে এত্তটুকুন সে হয়ে যায় যেন হামাগুড়ি দেওয়া ছোট্ট একটা মেয়ে সে। এক ঝটকায় সে উবু হয়ে তোরাবের পায়ে পড়ে। তার অশ্রুও হয়তো তোরাবের পা স্পর্শ করে। নিজের ওপরেও নিয়ন্ত্রণ তার কিছু আলগা হয়ে পড়ে। মুহূর্তের অসচেতনতায় শাড়ির আঁচলটা সরে পড়ে। অন্ধকারেও সেটা তোরাবের নজর এড়ায় না। অথবা হয়তো ময়নার নারীত্বের বিশেষ অলংকারগুলোকে পরখ করবার মতো পৃথক কোনো চক্ষু তোরাবের রয়েছে যা দিয়ে সেই ছায়ান্ধকারময়তার মধ্যেও সব অবলোকন করা যায় অবলীলায়। কিন্তু মুহূর্তকাল এমনও মনে হতে থাকে তোরাবের, ময়না কি ইচ্ছে করেই কোনো এক গোপন উদ্দেশ্যে তোরাবের সঙ্গে পক্ষ-বিপক্ষতার একটা ব্যাপারে মেতে উঠতে চাইছে। নইলে ময়নার সুগোল মসৃণ আর নরম আকর্ষণীয় দুই স্তন কেন স্পর্শ দেবে তাকে! কী করতে চায় সে! সেই স্তন যে তার শরীরই মূলত স্পর্শ করে সেটা হয়তো শতভাগ সত্যি নয়, কিন্তু মিথ্যেওতো তাকে বলা মুশকিল। ময়না যখন তার পায়ে পড়ে আর অশ্রু বিসর্জন দেয় তখন তার দুই স্তন প্রায় উন্মুক্ত হয়ে পড়ে অথবা সেগুলোর ওপর ময়নার কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না কিংবা ময়না স্বয়ং সেই পরিস্থিতিটা তৈরি করতে চায়। তাহলে কি ময়না তার নারীত্ব দিয়ে দুর্বল ও করুণাময় করে তুলতে চাইছে তাকে। 

একটা জিনিস সুস্পষ্ট ও সন্দেহাতীত। তোরাব পরিপূর্ণভাবে নিশ্চিত, ময়না তার সম্পূর্ণ কবলে। যে ময়না একদিন তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, যে ময়না গল্প ছড়িয়ে বেড়ায়, একদিন জয়বাংলার লোকেরা কর্নেল হিকমত ও তার লোকেদের নির্মূল করে দেবে আজ সেই ময়না তার এমনই দখলে যে তার সমস্ত ভবিষ্যত্ তার সব স্বপ্ন একমাত্র তোরাবেরই অধীনতায়। ওদিকে ময়নাও তখন কী এক স্বয়ংক্রিয়তায় নিজেকে কার্যকর করবার প্রবল চেষ্টায় লিপ্ত। সে বুঝতে পারে তোরাবের নিয়ন্ত্রণ থেকে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব। কিন্তু তোরাবের অস্ত্র দিয়েই তোরাবকে ঘায়েল করবার শেষ চেষ্টা ময়নাকে গাঢ় অন্ধকারের মধ্যেও একটুখানি আলোক ইশারা জোগায়। কম্পিত-শক্তিহীন কণ্ঠে মুমূর্ষুতার মুদ্রা এনে ময়না কাঁদোকাঁদো—

:তোরাব ভাই, আমার পায়ে আর শক্তি নাই, হাঁটতে পারতাছি না। তোরাব ভাই, এত কষ্ট কইর্যা ক্যাম্পে যাওনের দরকার নাই। আপেন যা কইবেন আমি আপেনর হুকুম তামিল করমু। আপেন দয়া কইর্যা আমার পাশে এইহানো একটু বসেন। আমি দম নিতে পারতাছি না।

সত্যি ময়নার কষ্ট হয় দম নিতে গিয়ে। মায়ের মুখ উঁকি দেয়। আচমকা ঘুম ভেঙে তাকে না দেখতে পেলে নির্ঘাত্ মা’টা তার মরেই যাবে। তোরাবকে বলা কথাগুলো যে সে খুব ভেবেচিন্তে বলে তা নয়। সে চাইছিল একটা আকস্মিকতার পরিস্থিতি তৈরি করতে যাতে তোরাবের ক্ষণেক লক্ষ্যচ্যুতি ঘটে। যাতে তাকে নিয়ে তোরাবের ক্যাম্পের দিকে যাওয়াটা বিলম্বিত হয়। যাতে তার বেঁচে উঠবার আশাটা আরো খানিকটা সময়ের অবলম্বন খুঁজে পায়। সেই সময়টা প্রলম্বিত হলে সেই অবলম্বনটা হাতে পেলে কী করবে সেই ভাবনাটা আরো অনেক পরের ব্যাপার, আপাতত একটি মুহূর্ত বা মাত্র কয়েকটি মুহূর্তের সম্ভাবনাকে আশ্রয় করে প্রগাঢ় অন্ধকারের মধ্যে একটুখানি আলোর বিন্দুই তৈরি করতে চেয়েছিল ময়না। তাতে তোরাবের লক্ষ্যচ্যুতি হয় কি না কে জানে, কিন্তু একটা ভিন্ন অনুভূতি সাপের মতো দ্রুত বয়ে যায় তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত। ক্যাম্পে কর্নেল অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে। কর্নেলকে সে কথা দিয়েছে, আজ রাতেই সে একটা মেয়ে তাকে পৌঁছে দেবে ক্যাম্পে। ময়নার কথার মর্মের ঠিক ঠিক অনুবাদ করলে সেই অন্ধকারেই তোরাবের মনের ভেতরটাতে আলোর ঝিলিক জেগে ওঠে। হ্যাঁ, ময়না নিজেকে সমর্পণ করবার প্রস্তাবই দিয়েছে তাকে, কিন্তু ময়না তো ইব্রাহিমের সম্পত্তি হওয়ার কথা, তার নয়। তোরাব তখনকার মতো হাঁটা স্থগিত রাখে কিন্তু কণ্ঠে তার তীব্র বিদ্রূপ—

: ক্যান্ তোর নাঙ ইব্রাহিম হারামজাদার কথা বল্! কর্নেল সাব তোর নাঙের পাছা দিয়া, বুঝছস্, ওনার মেশিনগানের লম্বা নলটা এক্কেবারে গোটা ঢুকায়্যা দিবো। আর তোর নাঙ হেই সময় ‘আল্লা আল্লা’ না কইয়া যদি ‘জয় বাংলা বাংলা’ও কয় অর কোনো বাপও আইসা অরে বাঁচাইতে পারবো না।

ময়না শোনে চুপচাপ স্থির হয়ে। শুনতেই হবে। গোটা দেশে তখন বলবার দিন শেষ, কেবল শোনাটাই মুখ্য। কথা শোনা, কান পেতে গুলির শব্দ শোনা, মাথার ওপর দিয়ে সাঁই চলে যাওয়া বোমারু বিমানের আওয়াজ শোনা, জয়বাংলাকে লক্ষ করে রাজাকারদের উদগ্র উল্লাস শোনা—সবই এক অবরুদ্ধ সময়ের বাস্তব ব্যাকরণ। কিন্তু, মনের গভীরে কোথাও যোদ্ধা ইব্রাহিম তখনো তার দলবল নিয়ে বহুপথ কেটে বিল-পাথার পেরিয়ে রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে গামছা-লুঙ্গি পরে গর্জে চলেছে ঠিক গুলির সুতীব্রতার মতন। পোশাক দেখে সবাই তাকে গ্রামের কৃষক বলে ধরে নিলেও ময়না জানে সে যোদ্ধা সে জয়বাংলা। কণ্ঠে মৌন সম্মতির মতো শব্দ তুলে ময়না জবাব ফোটায় কষ্টেসৃষ্টে—

:তোরাব ভাই, আপেন যে কী কন। হ্যা তো যুদ্ধে গেছে কইতাছেন, যুদ্ধে গেলে কী আর মানুষ বাঁচে, যুদ্ধে গেলে মানুষ তো আর ফির্যা আইবার পারে না। আপেন একশো ভাগ নিশ্চিত থাকেন, হ্যা মরবো, মরনের লাইগাই হেরা রাস্তায় নামছে।

ময়নার কথা স্পষ্ট হলেও বুঝতে তোরাবের সময় লাগে। হ্যাঁ, তোরাব ভাবে, ময়নার একটা কথা ঠিক, ইব্রাহিমের বাঁচার রাস্তা নাই, মরতে তাকে হবেই। কিন্তু ময়না এসব কথা বলে আসলে কী করতে চায়। আশপাশের নিস্তব্ধতা ও রাত ও অন্ধকার সবই তোরাবের সপক্ষে। তার হাত থেকে ময়নাকে রক্ষা করবার কেউ নেই। ময়নাও কি তা জানে না! নিশ্চয়ই জানে। তোরাব সাজায় তার ভেতরে ভেতরে, হতে পারে পাকিস্তানি কর্নেলকে তার ভয়। সে তুলনায় তোরাবকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সে তো তোরাবই, একই গ্রাম রসুলপুরের লোক। ক্যাম্পে গিয়ে কর্নেলের হাতে পড়বার চেয়ে তোরাবের হাতে পড়লে অন্তত বেঁচে থাকবার কিছুটা আশা, হোক তা ক্ষীণ তবু তো জেগে উঠতে পারে। দুর্বোধ্যতার খোলসমুক্ত হয়ে ময়না ক্রমে আভাসিত হতে থাকে। মুহূর্তকাল কর্নেলের চিন্তাটা খোঁচাতে থাকে। কর্নেল খুব ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে তার ওপর। আর যদি সে কোনোভাবে ময়নাকে পৌঁছে দিতে পারে তাহলে অর্থ তো বটেই, জুটবে ভবিষ্যতের সুসম্ভাবনা। কর্নেল বলেছেন, আর অল্পদিনের মধ্যে চিরকালের জন্যে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে হবে আসল হিসাবনিকাশ। তখন জয়বাংলার লোকগুলোর হাত-পা শেকলে বেঁধে তাদেরকে খোলা মাঠে দাঁড় করিয়ে ভাগ্যনির্ধারণ করা হবে। আর যারা কর্নেল হিকমতদের সহায়তা জুগিয়ে প্রকৃত ইমানদারের কাজ করেছিল তাদেরকে করা হবে পুরস্কৃত। কী যে ভালো লাগে ভাবতে। সামনে তাকালে প্রান্তরের ওপারকার বিলের বিশালতার ইশারা যেন তোরাবের সামনের দিনগুলির বিস্তীর্ণ সম্ভাবনা ছড়িয়ে রয়েছে। কত যে জমিজিরেত কত যে টাকাপয়সা হবে তার। পায়ের ওপর পা তুলে বসে থাকবে আরামের গদিতে। তখন ময়নার মতো একশো একটা বাঁদি থাকবে তার। কেউ তার পা টিপে দেবে, কেউ টিপে দেবে মাথা। একটা ঘোরের মতো অনুভূতি তোরাবকে আচ্ছন্ন করতেই আচমকা এক প্রবল শক্তির টান বা চাপ সে টের পায় এবং ঘোরটাকে তখনকার মতো মুলতবি রেখে কর্নেল বিষয়ে মনোযোগী হতে চাইলে তারও অধিক তার মনোযোগ কেড়ে নেয় ময়না, রসুলপুরের ময়না।

ময়না তখন কর্তব্য ঠিক করে নিয়েছে। ইব্রাহিমের ছবিটা ভাসে—যুদ্ধ মানেই শুধু রণক্ষেত্র নয়, যুদ্ধ মানে সারাক্ষণ প্রতিপক্ষকে আক্রমণ শানাবার তত্পরতা। যুদ্ধ মানে কেবল বন্দুক নিয়ে ছোটা নয়, যুদ্ধ মানে নিজেকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াদের সঙ্গে দৃশ্যে-অদৃশ্যে সংযুক্ত করে রাখা। তোরাবের কথামতো ক্যাম্পের দিকে রওনা করা মানে হলো নিশ্চেষ্ট হয়ে পরাজয় মেনে নেওয়া যে পরাজয়ের অপর পিঠে নিশ্চিত মৃত্যুর অবস্থিতি। কিন্তু ময়না তো মরতে চায় না। যেভাবেই হোক বাঁচতে তাকে হবেই। বাঁচবে কি না তা না জেনেও, এমনকি হয়তো মৃত্যুই হবে সেটা ভেবে নিয়েও তাকে চেষ্টা করতে হবে মৃত্যুর বিপরীতে বাঁচবার চেষ্টা করা। দুই হাত বাড়িয়ে সে জাপ্টে ধরে তোরাবকে। আর তোরাব যে এরইমধ্যে দুঃস্বপ্নের একটি বাস্তব প্রতিমূর্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে রসুলপুর এবং এর আশপাশে, সেও ঘোরলাগা ভাব এক ঝটকায় সরিয়ে নিয়ে মুহূর্তকাল বুঝবার চেষ্টা করে, ময়নার হাত বাড়ানোটা আসলেই কী, আহ্বান না অন্য কোনো ইঙ্গিত। ময়নার মধ্যে তখন নিজেকে তোরাবের খপ্পর থেকে বাঁচানোর তীব্র উন্মাদনা। তাকে বাঁচতে হবে তোরাব এবং কর্নেল দুজনের হাত থেকে। যদি তাকে ক্যাম্পের দিকে না-ও যেতে হয়, এই অন্ধকার রাতে তোরাবের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হতে হবে। তোরাব যদি তাকে এই পুকুরঘেঁষা বিললাগোয়া ঝোপঝাড়ের মধ্যে গলা টিপে হত্যা করে চলে যায়, কেউ কোনোদিন তা নিয়ে ভাবিত হবে না। ভাববে ময়নার মৃত্যু নীলিমা পূর্ণিমা কি সরোজিনীর মৃত্যুর মতনই একটি মৃত্যু। পার্থক্য শুধু স্থানে আর কালে। কিংবা মৃত্যু যদি নিঃশব্দ গলাটেপায় না হয়ে তোরাবের পিস্তল গর্জানো ক্রিয়ার পরিণতিতেও হয় তবু লোকেরা ঘুমের মধ্যে এপাশ-ওপাশ করবে আর ভাববে কোথাও মুক্তিযোদ্ধা বা রাজাকারেরা শব্দ করেছে অস্ত্রের। এমন শব্দ শোনা যেতে পারে যে কোনো সময় যে কোনো স্থানে।

ময়নার দুই হাত এক ঝটকায় সরিয়ে নিতেই তোরাবের বাহুতে লাগে ময়নার পরিপুষ্ট স্তন। স্খলিতবসন ময়না তখন নিজের ঊর্ধ্বাঙ্গের নগ্নতা নিয়ে একটুও ভাবিত নয়। তোরাবের মনের মধ্যে তখন একবার কর্নেল একবার ময়না এমন অবিরত কম্পন। নিজের পরনের লুঙ্গির পেছন দিকটাতে গুঁজে রাখা পিস্তলের ঠাণ্ডা ধাতব স্পর্শ তাকে তার শক্তির নিশ্চয়তা সম্পর্কে সজাগ রাখে। তা সত্ত্বেও তোরাবের শরীরে একটা অন্যতর আবর্তের সৃষ্টি হলে সে আগুয়ান ময়নার দুই স্তনে রাখে তার দুটি হাত। রাখে এমন ভঙ্গিতে যেন উপুড় করা মসৃণ দুটি পেতলের বাটির গায়ে তার হাত। এমন মুদ্রার পাঠ করবার জন্যে আলো-অন্ধকার লাগে না। ময়নারও তার প্রয়োজন হয় না। ময়না চায় তোরাবকে কর্নেলের কথা ভুলিয়ে দিতে। ময়না চায় তার নারীত্ব দিয়ে তোরাবের মধ্যে এমন মৌহূর্তিক আবেশ জাগাতে যে আবেশের ফলে তোরাব ভাববে সে-ই কর্নেল সে-ই সেনাপতি। তোরাবের আত্মপর ভাবনাকে উস্কে দিতেই হয়তো অন্ধকারে ক্ষিপ্র-ক্ষিপ্রতর মুদ্রার সমান্তরালে ময়নার সহযোগী সংলাপ। গলাকে আঠালো করে ময়না, হঠাত্ই আশ্চর্য রকম সাহসী হয়ে ওঠা ময়না তার হাতকে তোরাবের পিস্তলের চাইতেও অধিক কার্যকর করে তোলে। তোরাব ততক্ষণে পরিণত হয়ে গেছে দেশীয় কর্নেলে। ময়নার আবেশাচ্ছন্ন কণ্ঠে বুঝি ধ্বনিত হয় তারই স্বীকৃতি—

ময়না তার মধ্যে থাকা আত্মবিশ্বাস আর পরিতৃপ্তির বোধকে দৃঢ়তর করে তুলেছে। কিন্তু সেসব ভাবনা ভাববার সময় নয় সেটা। ময়নার আঁচলমুক্ত ঊর্ধ্বাঙ্গ তখন তোরাবের সামনে অন্ধকারে পাশাপাশি স্থাপিত দুটি ক্ষুদ্র স্তূপের ধরনে উদ্ভাসিত। অনেকটা সময় পরে তোরাব একটা জোরালো শ্বাস নেয়। তার নিম্নাঙ্গের পরিচ্ছদ তার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়লে লুঙ্গির আশ্রয়মুক্ত পিস্তলটা তোরাব উবু হয়ে হস্তগত করে। ময়নার ঊর্ধ্বাঙ্গ সম্পূর্ণ নগ্ন এবং নগ্ন তোরাবের নিম্নাঙ্গ। তোরাবের হাতে ধরা পিস্তল এবং নিম্নাঙ্গে তার শরীরে আটকে থাকা চিরপিস্তলটি তার ধাতব সঙ্গীর প্রতি মৌন সমর্থনের মতো মনে হলে কর্নেলবিস্মৃত তোরাব মুহূর্তের বিহ্বলতায় খানিকটা দিশেহারা। ময়নার কথাগুলো ক্রমে বিধ্বংসী হয়ে উঠছিল—এমেন হবে না তোরাব ভাই, শার্টটাও খুইল্যা ফালান না। মন্ত্রচালিতের মতো কিংবা ময়নার বাড়তি তত্পরতায় নিজেকে পরিপূর্ণভাবে নগ্ন করে ফেলে তোরাব। কিন্তু শাড়িপরা ময়না তখনো অর্ধনগ্ন। তোরাব কিন্তু তখন তার পরবর্তী কর্তব্য সাজিয়ে ফেলছিল মনে মনে। এখানকার কাজ সেরে ময়নাকে সে ফের কর্নেলের কাছেই নিয়ে যাবে ক্যাম্পে। এসব কর্নেল কখনোই জানতে পারবে না। ভয়ে ময়নাও আর কিছু প্রকাশ করবে না। আর কর্নেল এবং তার লোকেরা তো একেকটা মেয়েকে একজন পরপর একাধিকবার কিংবা একজনকে দুজনে তিনজনে মিলেই ভোগ করে। আত্মবিশ্বাসী তোরাব তখন বিস্ফোরণের অপেক্ষায় যে বিস্ফোরণ গোলাগুলির শব্দের মতো হবে না, হবে নিঃশব্দ ও একরোখা।

: তোরাব ভাই, আপেন এইহানো হুইয়া যান, আমি তাইলে আপনার পাশে হুইয়া পড়মু।

ময়নার কথায় সমতলে শুয়ে পড়ে তোরাব। খানিকটা ঘাস আর লতায় ঢাকা জায়গাটা তত ঠাণ্ডা নয়, তাতে ভাদ্রের ভাপ মেশানো। পরনের লুঙ্গি আর গায়ের শার্টটা একটা ছোট্ট স্তূপের মতো গুটিয়ে রাখা। পিস্তলটা তোরাবের মাথার কাছে রাখা। তখন ময়না গলাকে আরো আঠালো করে ক্রমে দাঁড়ানো থেকে উবু হতে হতে তোরাবের অগ্নিকামনাকে আরো উস্কে দেয়। আপেনরে যে বিয়া করবো হে’র অনেক ভাগ্য। হ্যাঁ, ময়নার কথাটা নিঃসন্দেহে সত্যি। যুদ্ধ শেষ হলে হিন্দুদের দখল করা জায়গাজমিগুলো আর টাকাপয়সা যা হবে তা দিয়ে রসুলপুরের শ্রেষ্ঠ সুন্দরীকে অনায়াসে তোলা যাবে ঘরে। শুধু রসুলপুর কেন দরকার হলে মিরগঞ্জ তারপর প্রয়োজনে মিরগঞ্জ ছাড়িয়ে রাখালিয়া শ্যামগঞ্জ বদরপুর সাগরদি যে কোনো জায়গা থেকেই মেয়ে নিয়ে আসা যাবে। আর কর্নেল হিকমত লোদির কল্যাণে আরো যে কতকিছুর সে মালিক হবে তার কি সীমাসরহদ্দ আছে! ময়না তখন এক টুকরো আগুনই বটে। তার শরীরের ভেতরে এক অসীম উন্মাদনার জাগরণ। তার সমস্ত ভাবনার একটাই অভিমুখ একটাই কেন্দ্র—বাঁচতে হবে। কোনোভাবেই মৃত্যুকে মেনে নেওয়া যাবে না। মৃত্যু মানে পরাজয় মৃত্যু মানে যুদ্ধের শেষ। তার চাইতে বরং শেষ চেষ্টা জড়ো করে একবার কি বাঁচবার উদ্যোগ নেওয়া যায় না! তোরাব তো তার জন্যে একপ্রকারের যুদ্ধই। ইব্রাহিমেরা হয়তো কোথাও অপারেশনের জন্যে ছক কাটছে। এদিকে সে ময়না ভয়ঙ্কর এক যুদ্ধের মুখোমুখি। ইব্রাহিমও বলেছিল যুদ্ধে যাওয়ার আগে, শত্রুকবলিত দেশে আলাদা কোনো যুদ্ধের ক্ষেত্র নেই, সবটাই যুদ্ধক্ষেত্র। এক ঝটকায় তোরাবের পাশে রাখা পিস্তলটা হাতে নিয়ে যতটা সম্ভব শক্তি ও গতি নিয়ে তোরাবকে হতচকিত করে দিয়ে দৌড়াতে শুরু করে ময়না। দৌড়াতে থাকে সোনালু সুপারি তেঁতুল কামরাঙ্গা গাব এবং আরো সব নাম না-জানা গাছপালা ঝোপঝাড় পেরিয়ে। তোরাব কী করবে, তোরাব তাকে পাকড়াও করবে কি করবে না, তোরাব তাকে আদৌ ধরতে পারবে কি না সেসবের কিছুই তার মাথায় কাজ করে না। তার কেবল মনে হতে থাকে, যেভাবেই হোক বাঁচতে হবে। তোরাবের কবল থেকে রক্ষা করে যেভাবেই হোক ছুটে যেতে হবে।

আশপাশের জঙ্গল বিল পুকুর কাঁচা রাস্তা সবই তার চেনা। প্রায় মধ্যরাতে তেমন কোনো শব্দ কানে আসে না। কোত্থেকে এত শক্তি ময়না পায় কে জানে, সে দৌড়াতেই থাকে। হাতে তার পিস্তল—তোরাবের। একটু দূরেই লোকেদের ঘরবাড়ি যদিও তারা সকলেই হয়তো নিদ্রাভিভূতই। একটা সুপারি গাছের সঙ্গে ধাক্কা এড়িয়ে দ্রুত পাশ কাটিয়ে ছুটতেই আচমকা মাদার গাছের মধ্যে আটকে যায় ময়নার শাড়িটা। কিন্তু সময় নষ্ট করবার মতো সময় হাতে নেই। নিশ্চয়ই তোরাব এরইমধ্যে নিজেকে বিন্যস্ত করে নিয়ে ধাওয়া করবে তাকে ধরবার জন্যে। এক ঝটকায় শাড়ি ছাড়িয়ে নিতে গেলে ময়নার শাড়ির আঁচলসহ অনেকটাই মাদার গাছে আটকে থাকে। ঊর্ধ্বশ্বাস ময়না উন্মুক্ত ঊর্ধ্বাঙ্গ নিয়ে অব্যাহত রাখে দৌড়। কোনোরকমে তার নিম্নাঙ্গটা ঢেকে রাখে বাকি শাড়িটুকু। হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়াতে দৌড়াতে একটা বাড়ির উঠোনে এসে পৌঁছায় ময়না। শরীর একেবারে শক্তিরহিত তার। একটু দম নিয়ে কান পাতে। খসখসে একটা শব্দ হয় কোথাও। মনে হয় কারো ছোটার—পাতা মাড়িয়ে পথ কেটে ছোটার মতো শব্দ। যুগপত্ আতঙ্ক ও গ্রাসিত হওয়ার ভয়ে পাশ ফিরে তাকাতেই ময়নার চোখে পড়ল একটা কুকুর। কুকুরটা তার পাশে এসে দাঁড়ায়। কুকুরটা ময়নারই পাশের বাড়ির কালাম হাজির কুকুর, মানিক। ময়নার চেনা কুকুর মানিক ময়নার গা ঘেঁষে আসে। শরীরের সমস্ত শক্তি নিঃশেষিত ময়না উঠোনের কোণে বেতের ঝোপটার পাশে বসে পড়লে কুকুরটাও তার পাশে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়ে লেজ নাড়াতে থাকে।

আবারও কান পাতে ময়না। তোরাব নিশ্চয়ই বসে থাকবে না। তোরাব ছুটবেই তার পিস্তলের খোঁজে। দৌড়াতে গিয়ে হয়তো মাদার গাছে লেগে গিয়েছিল পা। রক্তপাত হচ্ছে। কুকুরটা কী ময়নার উপদ্রুততা বুঝতে পারে! সে তার আরো গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। জিভ দিয়ে আলতো করে চেটে দিতে থাকে ময়নার ডান হাঁটুর দিকটা যেখানটায় কাঁটার ঘায়ে রক্তপাত ঘটেছিল। কৃতজ্ঞতা ঝরে পড়ে ময়নার সারা সত্তায়। কুকুরটা তার কান্না টের পায় কি না কে জানে, কিন্তু কুকুরটা যেন ময়নাকে রক্ষা করবার তত্পরতায় সটান দাঁড়ায়। ময়নার মতো সেও তীক্ষতা নিয়ে উত্কর্ণ হয়। আচমকা একটা শব্দ পাওয়া যায়। দূর থেকে নিকটে আসছিল ক্রমে। ত্রস্তে উঠে দাঁড়ায় ময়না। আর কুকুর মানিক তখন তার সারা শরীর একটা ক্ষিপ্র টানটান উেসর মতো করে সমস্ত শক্তি জড়ো করে চরাচর কাঁপিয়ে গর্জন করে ওঠে—ঘেউ, ঘে-উ-উ-উ-উ! মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা-শূন্যতায় রসুলপুরের আকাশের নিচে কুকুর মানিকের সেই ডাক এসএমজি এলএমজি কি থ্রিনটথ্রি’র শব্দের মতোই গর্জে ওঠে এবং সেই গর্জনের ঘটে ধ্বনি-প্রতিধ্বনি। v